১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

অমর্ত্য সেন

প্রকাশিত : ৮ নভেম্বর ২০১৯
  • নজনীন বেগম

বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করে যারা বাংলা ও বাঙালীকেই শুধু নয় সারা ভারতবর্ষকে আন্তর্জাতিক সীমানায় মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ সম্মান অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের। এর আগে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুনিয়া জয় করার কাহিনী অবিভক্ত পরাধীন ভারতকে এক অনন্য ঐশ্বর্যে পূর্ণ করে দেয়। প্রথম বারের মতো শুধু বাঙালী কিংবা ভারতীয়ই শুধু নন তার চেয়েও বেশি এশিয়ায় সর্বপ্রথম নোবেল অর্জনের কৃতিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। সঙ্গত কারণেই অর্মত্য সেনের নামটি ্আসলেই স্বাভাবিকভাবে উচ্চারিত হয় কবিগুরুর অজেয় সম্মানটিও। এছাড়াও অন্য এক চমকপ্রদ ঘটনা রবীন্দ্রনাথ এবং অমর্ত্য অচ্ছেদ্য বাঁধনে বাধা। প্রসঙ্গক্রমে সেসবও আলোচলায় চলে আসবে। তার আগে এই বিজ্ঞ, খ্যাতিমান, দারিদ্র্য বিমাচনের বিশিষ্ট কর্ণধার অমর্ত্য সেনের জন্মের শুভক্ষণই প্রথমে নিয়ে আসতে চাই। ১৯৩৩ সালে ৩ নবেম্বর শান্তি নিকেতনের গুরুপল্লীর খড়ের ছাউনি পর্ণ কুটিরে এই প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব রত্নগর্ভা অমিতা সেনের জঠর থেকে কাঁদতে কাঁদতে পৃথিবীর আলো দেখেন। শান্তি নিকেতন মানেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর গুণমুগ্ধ শিষ্য ক্ষিতিমোহন সেনের আরাধ্য তীর্থ ভূমি। ক্ষিতি মোহন সেনের প্রিয়তমা কন্যা অমিতা সেনের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন তৎকালীন আরও এক যশস্বী ব্যক্তিত্ব ড. আশুতোষ সেন। এক সময়ের প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এই কৃতী শিক্ষকের সুযোগ্য পুত্র ড. অমর্ত্য সেন। মাতা অমিতা সেন বিশ্ব স্বীকৃত এই খ্যাতিমান সন্তানকে তার শুভ জন্ম মুহূর্তের কিছু ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সরাসরি তাঁর কথা উদ্ধৃত করছি-

‘এখন মনে পড়ছে সেই দিনের কথা। শান্তি-নিকেতনের গুরুপল্লীর খড়ের চালের ঘর। আমার বাবলু জন্ম নিল। ওর ছোট বেলাকার কথাই শুধু মনে পড়ছে। ওর জন্মের পর গুরুদেব তখন বলেছিলেনÑ ছেলের একটা অসাধারণ নাম দিলাম। দেখবি ও একদিন অসাধারণ হয়ে উঠবে। তবে দেখিস নামের শেষের ‘য’ ফলাটা ঠিক দিবি কিন্তু। বাংলা সাহিত্যের তেজোদ্দীপ্ত মধ্যগগনের আলোকিত রবি কত আগে বুঝতে পারলেন কোন এক সময় র‌্যাফ-এর সঙ্গে য ফলা নাও থাকতে পারে।

অমর্ত্য সেনের ডাক নাম বাবলু। মা সে নামেই ছেলেকে বরাবরই সম্বোধন করতেন। নোবেল পাওয়ার শুভক্ষণটিও মাতৃহৃদয়ে অম্লান ঐশ্বর্যের মতো দীপ্ত হয়ে আছে। তাঁর কথাই শোনা যাক ‘বিশ্বাস হচ্ছে নারে! এই গুজবতো অনেকবার রটেছে। যতক্ষণ না কাগজে দেখছি ততক্ষণ বিশ্বাস করছি না। বাবলু বললো- তোমাকেই প্রথম খবরটা দিলাম।’ এই খবরে আমি গর্বিত নই, খুশি। আসলে আরও আগেই আমার ছেলের নোবেল প্রাইজ পাওয়ার কথা। আজ খবরটা শুনে ওর বাবার কথা বারবার মনে পড়ছে। উনি মৃত্যুশয্যায় বলেছিলেন- অমর্ত্যরে নোবেল পাওয়া আর দেখে যাওয়া হলো না।’

মাতামহ ক্ষিতিমোহন সেন। রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতনের আশ্রম থেকে শুরু করে বিদ্যা আর জ্ঞান চর্চার অপার সম্ভাবনাময় শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি জড়িত এই প-িত ব্যক্তিটির স্নেহছায়ায় ভূমিষ্ঠ হওয়া অমর্ত্যরে শৈশবের কিছু সময় কেটেছে এই শান্তিনিকেতনের শুদ্ধ নির্মোহ পরিবেশে। বংশ পরম্পরায় উত্তরাধিকার সূত্রে বাড়ি বাংলাদেশের ঢাকার মানিকগঞ্জে। যেহেতু পিতা ড. আশুতোষ সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন সেই কারণে পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে। ঢাকা মহানগরীর ওয়ারীতে ছিল তাদের নিবাস। ’৪৭ এর দেশ ভাগের পর ঢাকা থেকে শান্তিনিকেতনে বসতি স্থাপন। ততদিনে মাতামহ ক্ষিতিমোহন সেনের শান্তিনিকেতনের প্রতীচী গৃহটি থাকার আবাসস্থল হিসেবে বাসস্থানের উপযোগী হয়ে যায়। তাই পরের লেখাপড়া শুরু শান্তিনিকেতনের এই বিদ্যাশ্রমে। তবে অবিভক্ত বাংলায় শৈশব-কৈশোর অতিক্রান্তের সুবর্ণ সময়ে বাঙালীর আত্মপরিচয়ের সমৃদ্ধ চেতনাটি এমনভাবে গেঁথে যায় আজও যাকে সযত্নে লালন ধারণ করে যাচ্ছেন। বাঙালী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে কখনও ভাবতে হয়নি। কোন এক সময় বলেছেন উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে গিয়ে দেশে-বিদেশে যেখানেই হোক মাতৃভাষাকেই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনায় এনেছেন। তবে কখনও অন্য কোন ভাষাকে বর্জন কিংবা অবজ্ঞা করার ক্ষুদ্র মনোবৃত্তি আমলেই নেননি। বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করতে যা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং অপরিহার্য। তবে দেশাত্ববোধের চেতনার সঙ্গে সাংস্কৃতিক দ্যোতনায় মাতৃভাষার শৌর্য কখনও অন্য কিছুর চেয়ে বড় হতে পারে না। এই অদম্য মানসিক শৌর্যে শান্তি নিকেতনের আপন প্রকৃতির বেড়াজালে এক উদীয়মান প্রতিভাদীপ্ত মনন অমর্ত্য সেনের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ সমাপ্ত হয় গুরুদেবের আশীর্বাদ পুষ্ট এই বিশ্বভারতীয় সমৃদ্ধ আঙিনায়। এক মেধাবী শিক্ষার্থীর চারপাশের সমাজ সংস্কার নিরীক্ষণের যে অদম্য স্পৃহা তা কৈশোর বয়স থেকেই উদ্দীপ্ত হওয়ার অনেক স্মৃতি বিজড়িত ঘটনা মা অমিতা সেনকে এখনও অবাক-বিস্ময়ে অনুভব করায়। মার উক্তিই স্মরণ করা যাক। কারণ জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময় মার সাহচর্য, সান্নিধ্য এবং স্নেহছায়ায় পরিপুষ্ট হয়েছে। অমিতা সেনের কথাÑ ‘বাবলু অদ্ভুত ছেলে। এমন যে ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে কোনদিন ওকে পড়তে দেখিনি। একবার আইএসসি পরীক্ষার সময়ের কথা। ওর দাদু (ক্ষিতিমোহন সেন) এসে বললেন, নাতিটাকে দেখলাম পরীক্ষার সময় চলছে, তাও বকুলবীথিতে বসে ছাত্র সম্মিলনীর মিটিং করছে। ঘণ্টা পড়তেই ছুট পরীক্ষা দিতে। আড্ডা মারত চুটিয়ে। পড়ার টেবিলে গোয়েন্দা গল্পের একরাশ বই থাকত। বেজাল্ট বেরুলে দেখতাম ও প্রথম হয়েছে। এই হলো এক নিবেদিত জ্ঞান সাধকের শিক্ষার্থী জীবনের মায়ের স্মৃতিচারণ।

জীবনের পরবর্তী অধ্যায়গুলো ছিল সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক জীবনের অপরিহার্য সূচকগুলো জ্ঞানচর্চায় সন্নিবেশিত করে আরও বৃহত্তর জগৎ উন্মোচন করা। সেই লক্ষ্যেই বিজ্ঞানের ছাত্র অর্থনীতির মতো সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের গভীর বিষয়কে পাঠ্যক্রমের আওতায় আনতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। সময়টা ছিল ভারতের বামপন্থী রাজনৈতিক চেতনার এক যুগসন্ধিক্ষণ। বলতে দ্বিধা করেননি-রাজনৈতিক আগ্রহই আমাকে অর্থনীতিতে নিয়ে আসে। তাও জীবনের এক অনন্য আকাক্সিক্ষত স্বপ্ন। স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে কিভাবে অর্থনীতি পাঠ্যক্রমের সঙ্গে গণিতের মতো গভীর বিষয়টিকে একীভূত করা। নোবেল পাওয়ার পর এক আলোচনায় বলেছিলেন- ভাষা শেখার কোন বয়স থাকে না। তবে গণিতের ভিত্তি অতি শৈশব থেকে না হলে মেধার স্ফুরণ ঘটতে সময় লেগে যায়।

১৯৫১ সালের জুলাই মাসে বর্ষণস্নাত একদিনে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়ে যান। কলকাতার এই প্রেসিডেন্সিই খুলে দেয় এক অপার সম্ভাবনার জগত। কলেজ স্ট্রিটে যে অসংখ্য বিদ্যানিকেতন পাশাপাশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জ্ঞানচর্চার উন্মুক্ত তীর্থকেন্দ্রও জীবনকে সমৃদ্ধ করতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে। উচ্চশিক্ষার পীঠস্থানগুলোর অবিস্মরণীয় সংস্পর্শে মেধা ও মননের যে অভাবনীয় সংযোগ সেটাই পরবর্তীতে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যায়ের মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করার সময়োপযোগী অবদান রাখে। তার আগে প্রেসিডেন্সিতেই বাম ঘরানার রাজনৈতিক চেতনায় সমর্পিত হওয়ার ব্যাপারটিও উল্লেখ্য যা পরবর্তীতে তার গবেষণার বিষয়বস্তুকে কোন এক গন্তব্যে পৌঁছে দিতে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। নোবেল জয়ীর কথাই এখানে উল্লেখ্য- ‘রাজনীতিতে আগ্রহী যেসব সহপাঠীর সঙ্গে আমি মেলামেশা করতাম তাদের অনেকেই আমার মতো স্টুডেন্স ফেডারেশনের মধ্য দিয়ে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু অধিকাংশই কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়নি। কিছু বাধাধরা ধারণার নিগড়ে বাঁধা দলীয় শৃঙ্খলার ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ অস্বস্তিকর ছিল। তা সত্ত্বেও সেই সময়ে বামপন্থার মধ্যে সাম্য ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি এমন এক দায়বদ্ধতা ছিল অন্য কোন ছাত্রগোষ্ঠী যার কাছাকাছি আসতে পারত না। মননচর্চা ও সংস্কৃতির দিক থেকে কলকাতায় বিপুল সমৃদ্ধি সত্ত্বেও তার চারপাশে অবিচ্ছিন্ন ও অসহনীয় দারিদ্র্য উপেক্ষা করা প্রেসিডেন্সির মতো উচ্চবর্গীয় কলেজের পক্ষেও সম্ভব ছিল না।’

তবে এই কথাও উল্লেখ্য বাম রাজনীতির প্রতি সচেতন দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর থেকে উদ্দীপ্ত করতে সাংগঠনিক কার্যক্রমের কট্টর, অযৌক্তিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণকে কখনও আমলে নিতেন না। নিজের মতো করে যুক্তি বুদ্ধিতে দেশকে ভালবাসতেন, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায় বামঘরানার দর্শন আর পথ নির্দেশনায়ও উদ্বুদ্ধ হতে ভাবতে হয়নি।

অন্তর্নিহিত বোধে বাম চেতনায় শাণিত হওয়া সেও জগতখ্যাত এই মননশিল্পীর এক অভূতপূর্ব জ্ঞানসাধনা। ১৯৫৩ সালে লন্ডনের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করতে প্রয়োজনীয় সময়ের বেশি এতটুকুও লাগেনি। ফলে ১৯৫৬ সালেই উচ্চতর গবেষণার লক্ষ্য নিয়ে পিএইচডি প্রোগ্রামে নিজেকে নিয়তই তৈরি করতে থাকেন। ফলশ্রুতিতে বিশ্বমানের কিছু গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশ পেতে দেরি হয়নি। পরামর্শক কেমব্রিজ অধ্যাপক মরিস ডব গবেষণা প্রবন্ধের মধ্যে পিএইচডি অভিসন্দর্ভের সারসত্তা অন্তর্নিহিত আছে বলে মন্তব্য করলে থিসিস জমা দিতে আর বেশি কালক্ষেপণ হয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ৩ বছরের আগে থিসিস জমা নেয়া হয় না। এমন টানাপোড়েনে নিজের শহর কলকাতা চলে আসাটাও ছিল এক অবিস্মরণীয় কাল পর্ব। কেমব্রিজে থিসিস রেখে আসার স্মৃতিটা খুবই মজার ব্যাপার ছিল। অমর্ত্য সেনকেই উল্লেখ করছি, ‘আমার থিসিসটাকে বয়স বাড়ানোর জন্য কেমব্রিজে রেখে এলাম। মদের গুণ বাড়াতে যেমন তাকে পুরনো হতে রেখে দেয়া হয়।’ এরপর মাত্র ২৩ বছর বয়সে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়াও ছিল এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। প্রশংসা, নিন্দা, সমালোচনা, অভিযোগ সে সময় বয়ে চলার এক পালাক্রম। গবেষণার অন্যতম বিষয় ছিল দুর্ভিক্ষ। গবেষণার স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিলÑ১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলার মহামনন্বত্বর আর ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ।

সেই পুরাকাল থেকে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় সনাতন হিন্দু ধর্মের সঙ্গে ত্রয়োদশ শতাব্দীর থেকে বাংলায় মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন সবই যেন পারস্পরিক সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা এবং সহযোগিতার এক অনবচ্ছেদ সম্পর্কের ডালি। মাতামহ ক্ষিতিমোহন সেনের বিখ্যাত বই ‘হিন্দু ইজামে’র প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে গিয়ে গ্রন্থের সারবত্তায় দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে এক অচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক বন্ধন যে পারস্পরিক মিলনকে অবারিত করে তারই অনবদ্য নজির এই সমৃদ্ধ বইটি। অবিভক্ত পরাধীন ভারত যেভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে আক্রান্ত হয়ে স্বাধীনতাকে সর্ব মানুষের আকাক্সিক্ষত স্বপ্নের দুয়ারে নিয়ে যেতে না পারাটা সবচেয়ে বড় বিষাদঘন অধ্যায়। যার রেশ টানতে গিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের সহজ মিলনের পথটাই রুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। সেই দ্বাদশ শতব্দী থেকে ভারতে মুসলিম সাম্রাজ্যের পত্তনে দেশীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিন্দু রাজারা তাদের আধিপত্য নিয়ে টিকে ছিল। তবে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিত্বের লড়াই, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, বিবদমান সাংঘর্ষিক সম্মুখ সমর কখনও হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরোধ কিংবা বিবাদ ছিল না। আধিপত্যের মর্যাদায় আপন সম্প্রদায়ের মধ্যেও এমন ঘটনা ঘটত। ধর্মীয় বিভাজনে দেশ বিভাগ কিংবা সাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ কোনটাই মন থেকে মানতে পারেননি। বাঙালী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে যেমন অকুণ্ঠিত পাশাপাশি বাংলাদেশকেও নিজের ভাবতে দ্বিধাহীন ছিলেন।

নোবেল জয়ীর অর্থনীতির তত্ত্বেও দেশপ্রেম এবং সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায় যে মাত্রায় উদ্দীপ্ত ছিলেন সেখান থেকেই বের হয়ে আসে, তৃতীয় বিশ্বের অসহায় মানুষদের কথা ভাবাই শুধু নয় অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া অর্ধাংশ নারীদের প্রতি তার সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে উচ্চতর মাত্রা দিয়েছে। শ্রেণী বিভক্ত সমাজের মালিকানাভিত্তিক বৈষম্যপীড়িত অর্থনীতিতে নারীরাই হয় সব থেকে বেশি লাঞ্ছিত ও অবহেলিত। মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং শ্রমের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন সচেতন এক অর্থনীতির সূক্ষ্ম আলোচক। দুর্ভিক্ষ শুধু যে খাদ্য ঘাটতির জন্য হয় সেটা তিনি মানতেই চাননি। মার্কসীর অর্থনীতির সমর্থক ড. অমর্ত্য সেন অর্থনীতির সঙ্গে দর্শনের অবিচ্ছেদ্যতাকে দুর্ভিক্ষ এবং দারিদ্র্যের যৌক্তিক পর্যালোচনায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই দারিদ্র্যের দর্শনই তার গবেষণা কর্মকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ১৯৪৩ সালের মহামনন্বত্বর দেখেন মাত্র ১০ বছর বয়সে। যার সেভাবে স্মৃতিতে স্পষ্টও নয়-তবে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে আসতে তার অসুবিধাই হয়নি। ১৯৪৩ সালের দেশ বিভাগের মাত্র চার বছর আগেই হয়ে যাওয়া এই দুর্ভিক্ষকে জানতে তাকে ঐতিহাসিক তথ্য উপান্তের ওপর বেশ খানিকটা নির্ভর করতে হয়েছিল। সব মিলিয়েই তিনি তৈরি করেন তার কল্যাণমুখী অর্থনীতির রূপরেখা যা তৃতীয় বিশ্বের অসংখ্য দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের প্রতিদিনের যাপিত জীবনের বিষাদঘন ঘটনা পরম্পরা। এ ছাড়াও নির্দিষ্টভাবে ভারত ও বাংলাদেশের দারিদ্র্য এবং দুর্ভিক্ষের ওপর তার সমৃদ্ধ গবেষণা কর্মটি নোবেল জুড়ি বোর্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস ১৯৯৮ সালের ১৪ অক্টোবর সর্বসম্মতিক্রমে এই বাঙালী ও ভারতীয়কে নোবেলজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করেন। একাডেমি জানায়, কল্যাণমুখী অর্থনীতিতে অবদান রাখার জন্য দুর্ভিক্ষ বিশেষজ্ঞ অমর্ত্য সেনকে নোবেল পুরস্কারে অভিষিক্ত করা হলো। বাঙালী হিসেবে দ্বিতীয় কিন্তু অর্থনীতিতে এশিয়ান হিসেবে তিনিই প্রথম যিনি কিনা এই বিরল কৃতিত্বের অধিকারী হলেন।

অনেক দুর্যোগ আর অনভিপ্রেত ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে গবেষণার বিষয়বস্তু তিনি খাড়া করেন সেটাও ছিল ব্যতিক্রমী এবং চমকপ্রদ। তার সিদ্ধান্ত এভাবে উপস্থাপিত হয় খাদ্যের স্বল্পতাই কেবল দুর্ভিক্ষের কারণ নয়। কারণ বিগত বছরগুলোতে দেখা যায় খাদ্যের সরবরাহে তেমন কমতি না থাকলেও অনেক জায়গায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। নিউইয়র্কের এক হোটেল নিজের অভিব্যক্তি জানাতে গিয়ে আনন্দ আর আবেগী কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনের উত্থান-পতনকে বিষয়বস্তু করে যে গবেষণা কর্মটিকে আমি সর্বাধিক গুরুত্ব বিবেচনায় সম্পন্ন করেছি বিশ্বদরবারে তার স্বীকৃতি মিলেছে। এ শুধু তার নিজের প্রাপ্য নয় অসংখ্য ক্ষুধাপীড়িত দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত সহায় সম্বলহীন মানুষদের নিত্য যন্ত্রণার অবিস্মরণীয় স্বীকৃতি।

কল্যাণমুখী ও মানব সম্পদ উন্নয়ন সমৃদ্ধ অর্থনীতির সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক এবং বিশ্লেষক ড. অমর্ত্য সেন সব সময় মানুষ আর মানবতার সম্মানকে স্থান দিয়েছেন অনেক ওপরে। যেখানে ধর্ম, বিত্ত, শ্রেণী, জাতি, বর্ণ কোন কিছুরই ফারাক থাকতে পারে না। রবীন্দ্র আর নজরুল অনুরাগী এই বিশ্বখ্যাত অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় পরিপুষ্ট রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলকে অবিভক্ত বাংলার সাংস্কৃতিক দ্যোতনার বর্ণধার বিবেচনা করতেও আগ্রহী এবং উৎসাহী ছিলেন। সবার ওপরে মানুষ সত্য- তাহার ওপরে নাই এই মর্মবাণীতে সর্বজনের মিলন গ্রন্থিই ছিল তার মেধা ও মনন বিকাশের মূল শৌর্য।

প্রকাশিত : ৮ নভেম্বর ২০১৯

০৮/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: