২০ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

প্রতিবাদের নামে যা ঘটেছিল ভোলায়

প্রকাশিত : ২৩ অক্টোবর ২০১৯
  • ছাত্রদল নেতার উস্কানির ভিডিও ফুটেজ

হাসিব রহমান, ভোলা থেকে ॥ বোরহানউদ্দিন উপজেলায় সংখ্যালঘু যুবক বিপ্লবের ফেসবুকের একটি মেসেজকে কেন্দ্র করে তৌহিদী জনতার ব্যানারে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করা হয়েছে। বর্বর তা-বে যোগ দেয় স্থানীয় কিছু শার্ট, জিন্সপ্যান্ট পরা যুবক। তারা লাঠিসোটা নিয়ে মসজিদের দোতলায় হামলা চালায়। এমনকি গুলি করার জন্য ছাত্রদলের এক নেতাকেও উস্কানি দিতে দেখা যায়। সভামঞ্চে জামায়াতের এক নেতা পর্যন্ত ছিল বলেও বলছেন স্থানীয়রা। হামলাকারীদের ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হলেও এখনও কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। তৌহিদী জনতার প্রতিবাদের নামে তা-ব ও পুলিশের এ্যাকশনের ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজসহ অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে বিপ্লবের ভগ্নিপতি বিধান মজুমদারসহ (৩১) দুজনকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় থানায় জিডি করা হয়েছে। এছাড়া ভোলা পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সারের ব্যক্তিগত ফেসবুক এ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রতিবাদ সমাবেশে হামলা, সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনায় সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্যপরিষদের ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশ ঘিরে মঙ্গলবার দিনভর শহরে উত্তেজনা বিরাজ করে। শেষ পর্যন্ত বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচী স্থগিত করায় কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে পুলিশ সন্দেহভাজন দুজনকে আটক করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ র‌্যাব, বিজিবি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে। এছাড়া নাশকতা ও ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় জেলা আওয়ামী লীগ অফিস এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। অন্যদিকে বোরহানউদ্দিনে সংঘর্ষ, হামলায় চারজন নিহতের ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। বুধবার তদন্ত রিপোর্ট দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টায় ভোলা জেলাপ্রশাসকের কক্ষে ঐক্যপরিষদ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক হয় জেলাপ্রশাসনের। বৈঠক থেকে বের হয়ে ভোলা-২ আসনের এমপি আলী আজম মুকুল জানান, বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে এবং বুধবার সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যপরিষদ নেতৃবৃন্দ বিস্তারিত জানাবেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সংঘর্ষের ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বোরহানউদ্দিন ঈদগা মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশের একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। ওই মাঠের পাশেই মার্কাস মসজিদ। মসজিদের দোতলার মেঝেতে অসংখ্য ইট। উচ্ছৃঙ্খল লোকজন যাতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে না পারে সেজন্য মুসল্লিরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে বাধা দিতে। কিন্তু তারপরও শার্ট গেঞ্জি জিন্স প্যান্ট পরা কিছু অল্প ও মধ্য বয়সী যুবক দোতলায় ঢুকে পড়ে। এরপর নিচে আরেক দল লোক লাঠিসোটা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারা এক পর্যায়ে লাঠিগুলো ওপরে নিক্ষেপ করে হামলাকারীদের কাছে। এ সময় কিছু যুবক ওই লাঠি নিয়ে তা-ব চালায়। জানা যায়, মসজিদের ভেতরের রুমে তখন আটকা ছিল পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার ও বরিশাল রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি একে এম এহসানউল্লাহসহ পুলিশ সদস্যরা। তারা প্রাণ বাঁচাতে মসজিদের ভেতরে আশ্রয় নেন। কিন্তু তাদের ওপর হামলা চালাতে মসজিদের রুমের দরজা লাঠি দিয়ে ভাঙ্গার চেষ্টা চালানো হয়। এ সময় কিছু মুসল্লি উত্তেজিত যুবকদের থামাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে দেখা যায়, পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং নিজেদের বাঁচাতে একের পর এক অতর্কিতভাবে গুলি চালায় পুলিশ। এরই এক পর্যায়ে এক পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। তাকে স্থানীয়দের সহায়তায় ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়। এদিকে সংঘর্ষ শেষে দেখা যায় চার যুবক নিহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধসহ আহত হয় দুই শতাধিক মানুষ।

ভিডিও ফুটেজে আরও দেখা যায়, রবিবার বিক্ষোভ সমাবেশের শুরুতে মাঠের ভেতরে এক যুবক আল্লাহ ও নবীকে নিয়ে ফেসবুকে মেসেজ দেয়া যুবক বিপ্লব চন্দ্র শুভকে ইঙ্গিত করে বলতে থাকে ‘ওকে গুলি করে মারে না কা।’ বোরহানউদ্দিন পৌরসভার মেয়র রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি ওই যুবকের ভিডিও ফুটেজ দেখেছেন। তিনি নিশ্চিত করে বলেন, ওই যুবকের নাম আশ্রাফ আলী সবুজ। সে ছাত্রদলের সভাপতি। এছাড়াও ওই সমাবেশে যুবদলের এক নেতা এবং প্রতিবাদ সভার মঞ্চে বোরহানউদ্দিন উপজেলা জামায়াতের সাবেক এক আমীর ছিলেন। তিনি আরও বলেন, যা ঘটেছে তৌহিদী জনতার নামে, সেটা বিএনপি জামায়াতের চক্রান্ত। বোরহানউদ্দিন উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতির নাম আশ্রাফ আলী সবুজ বলে নিশ্চিত করেন ভোলা জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নুরে আলম ।

ভোলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাফিন মাহমুদ জানান, তারা ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ওই যুবকের ‘ওকে গুলি করে মারে না কা’ ভিডিওটি নিশ্চিত হতে যাচাই-বাছাই করছে। নিশ্চিত হলে বলা যাবে। তদন্ত চলছে। এটা নিয়ে কাজ চলছে। তিনিও ওই যুবকের নাম আশ্রাফ আলী সবুজ বলে শুনেছেন। ওসিকে তদন্তের জন্য বলেছি। এছাড়াও যারা হামলা করেছে তাদের ভিডিও ফুটেজ দেখে আলাদা আলাদাভাবে নাম-পরিচয় বের করার কাজ চলছে। এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকে শহরের পরিস্থিতি শান্ত ছিল। তবে বিকেলে সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্যপরিষদের ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশ কেন্দ্র করে জনমনে এক ধরনের ভীতি বিরাজ করছিল। কিন্তু ভোলার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৪শ’ পুলিশ সদস্যকে প্রস্তুত রাখা হয় বলে পুলিশ সূত্র জানায়। তাদের ভোলার বিভিন্নস্থানে বাসযোগে পাঠানো হয়। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ভোলা বাংলা স্কুল মোড়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে প্রচুর নেতাকর্মী অবস্থান নেন।

ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান ইয়ানুর রহমান বিপ্লব মোল্লা জানান, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠন বিএনপি জামায়াত শিবিরের নাশকতা ও ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় জেলা আওয়ামী লীগ অফিস ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। তিনি বলেন, আমরা চাই না আর একটি নাসিরনগর, রামুর মতো ট্র্যাজেডি হোক। দুপুর একটার পর থেকে সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্যপরিষদের ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচীর স্থল শহরের কালিনাথ রায় বাজারহাট খোলা মসজিদ এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। মহাজনপট্টি, কালিনাথ রায় বাজার, হাটখোলা মসজিদ, মোল্লাপট্টি এলাকায় র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি মোতায়েন করা হয়। এ সময় ওই এলাকা দিয়ে চলাচলের সময় নিরাপত্তার জন্য অনেকের সঙ্গে থাকা ব্যাগ তল্লাশি করা হয়। বিকেলে পুলিশ সন্দেহভাজন দুজনকে আটক করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নেয়ায় শেষ পর্যন্ত সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্যপরিষদ কর্মসূচী স্থগিত করতে বাধ্য হয়।

বিপ্লবের ভগ্নিপতিসহ দুজন নিখোঁজ ॥ চরফ্যাশনের রোদ্রেরহাট বাজার থেকে আলোচিত যুবক বিপ্লবের ভগ্নিপতি বিধান মজুমদার (৩১) ও তার চাচাত ভাই সাগরকে (১৯) ডিবি পরিচয় দিয়ে তার মা জুয়েলার্স থেকে তুলে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় বিধানের বাবা বিনয় ভূষণ মজুমদার মঙ্গলবার দুলারহাট থানায় জিডি করেন। বিধানের বাড়ি গজারিয়ার পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়নে। অপরদিকে ভোলায় সংখ্যালঘু আরও এক যুবকের ফেসবুক এ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় জিডি করা হয়েছে।

বিধানের বাবা বিনয় ভূষণ মজুমদার সাংবাদিকদের জানান, সোমবার সন্ধ্যার পর তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মা জুয়েলার্স থেকে তার ছেলে বিধান ও বিপ্লবের চাচাত ভাই সাগরকে (১৯) সাদা পোশাকে ৭/৮ জন লোক ডিবি পরিচয়ে কালো একটি গাড়িতে নিয়ে যায়। তারপর থেকে আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। যাওয়ার সময় ওই জুয়েলারির অপর কারিগর শুভর মোবাইল নিয়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে সাগর ও বিধানের মোবাইলও নিয়ে যায়। বিধানের বাবা বিনয় আরও জানান, তারা ওই বাজারে বিকেলে আসেন। দোকানে চা খান। সন্ধ্যার তারা হঠাৎ তার ছেলেসহ দুজনকে নিয়ে যায়। ছেলেকে অপহরণের খবরে এদিকে বিধানের মা দ্বিতীয়বার স্ট্রোক করেন। ওই ঘটনার পর সংখ্যালঘু পরিবারে সদস্যরা থানা পুলিশে যোগাযোগ করে কোন তথ্য জানতে পারেননি।

চরফ্যাশনের দুলারহাট থানার ওসি মিজানুর রহমান পাটওয়ারী সাংবাদিকদের জানান, বিধান ও সাগরের বিষয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয়, ওই দুজন বাসা থেকে আসার পর আর তাদের পাওয়া যায়নি। বিধান ও সাগরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তুলে নেয়ার ঘটনা তার জানা নেই। ভোলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাফিন মাহমুদ জানান, পুলিশের কোন সদস্য ওই যুবকদের আটক করেনি।

এসপির ফেসবুক হ্যাকড ॥ সংখ্যালঘু যুবকের আইডি হ্যাকসহ আপত্তিকর মেসেজ নিয়ে বোরহানউদ্দিনে সংঘর্ষে চারজন নিহতের জের না কাটতেই এবার ভোলা পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সারের ব্যক্তিগত ফেসবুক এ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভোলা থানায় একটি জিডি করা হয়। পুলিশ সুপার সরকার মোঃ কায়সার জানান, তিনি মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন তার ফেসবুক এ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি পুলিশ হেডকোয়ার্টারে বিষয়টি অবহিত করেন এবং থানায় জিডি করেন। এ বিষয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার কাজ করছে বলে জানান তিনি।

প্রকাশিত : ২৩ অক্টোবর ২০১৯

২৩/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: