১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

গুজব ছড়িয়ে নাশকতা ॥ ভোলায়ও একই কৌশল

প্রকাশিত : ২২ অক্টোবর ২০১৯

জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ আবারও সেই পুরনো খেলা। কৌশল একই। কোন সংখ্যালঘু ব্যক্তির নামে ফেসবুকে ধর্ম বা মহানবীর (সাঃ) অবমাননার গুজব ছড়িয়ে জনতাকে উস্কানি দিয়ে সাম্প্রদায়িক হামলা। বিএনপি নেতারা পেছনে থাকলেও প্রকাশ্যেই সামনে থেকে নেতৃত্বে জামায়াত, হেফাজতসহ মৌলবাদীরা। প্রতিবারই গুজবের বিষয়টি প্রমাণিত হলেও অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। উস্কানি দিয়ে পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানোতে কাজ করছে এরা। যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা সাঈদীর বিচারের পর নৃশংসতা এবং রামুর কলঙ্কিত অধ্যায়ের ধারাবাহিকতায় নীলনক্সা অনুযায়ীই চলছে নাশকতা। টার্গেট হিন্দু, বৌদ্ধসহ সংখ্যালঘু পরিবার ও উপাসনালয়। যথারীতি এবারো একই কৌশলে পরিকল্পিতভাবে ফেসবুকে মহানবীকে নিয়ে কটূক্তি করে সংখ্যালঘুর নাম দিয়ে গুজব ছড়িয়ে তা-ব চালানো হয়েছে ভোলার বোরহানউদ্দিনে।

ইতোমধ্যেই পরিষ্কার হয়ে উঠেছে বিএনপির রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত ও হেফাজতের একটি অংশের সরকারবিরোধী ফায়দা লোটার চেহারা। ঘটনায় ক্ষুব্ধ পুরো দেশ। তবে আগের ঘটনাগুলোতে তা-বের পর অপকৌশলের প্রমাণ মিললেও এবারই প্রথম পুলিশ শুরুতেই জানিয়েছে, তারা এটি উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে যে ভোলার বোরহানউদ্দিনে একজন হিন্দু ব্যক্তির বিরুদ্ধে নবী মোহাম্মদকে অবমাননার অভিযোগ তোলা হলেও এটি করেছেন দুজন মুসলিম। সংখ্যালঘু ওই ব্যক্তি আগেই তার আইডি হ্যাকের কথা পুলিশকে জানিয়েছিলেন। পুলিশ বলছে, যে দুই ব্যক্তি একজন হিন্দু ব্যক্তির ফেসবুক হ্যাক করে নবী অবমাননাকর বার্তা দিয়েছিলেন তাদের আটক করা হয়েছে।

তবে তারপরেও সহিংসতার পথেই হেঁটেছে মৌলবাদী গোষ্ঠীটি। পুলিশের ওপর হামলা চালানোর পর হতাহতের ঘটনার পর এবার উল্টো প্রতিবাদ নিয়ে মাঠে নেমেছেন তারা। বিএনপি ও তাদের মিত্র জামায়াত মহানবীর অবমাননাকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে উল্টো সংখ্যালঘু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তুলে উস্কানি দিয়েছেন। অন্যদিকে পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে চারজন নিহত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে হেফাজত। সোমবার দুপুরে চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে সংগঠনটির কার্যালয়ে মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী এক সংবাদ সম্মেলনে এই কর্মসূচীর ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি জেলা শহরে জোহরের নামাজের পর শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।

জুনায়েদ বাবুনগরী ফেসবুকে কটূক্তিকারীর ঘটনার অধিকতর তদন্তের দাবি জানান। তিনি বলেন, আমাদের তদন্তে জানা গেছে, বিষয়টি পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। যদিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আইডি হ্যাক হয়েছে। তার কথা মাথার ওপরে। এরপরও প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাচ্ছি, বিষয়টি যেন অধিকতর তদন্ত করা হয়। চট্টগ্রামের হেফাজতে ইসলাম অধ্যুষিত এলাকা হাটহাজারীতে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। ভোলার ঘটনার পর হেফাজতের নেতা-কর্মীরা প্রথমে হাটহাজারী-খাগড়াছড়ি মহাসড়কে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করেন। একপর্যায়ে তারা হাটহাজারী মডেল থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ তাদের শান্ত করার চেষ্টা চালায়।

এ সময় হেফাজত নেতা-কর্মীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও থানায় ভাংচুর চালায়। এ অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং মহাসড়কেই আছর, মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করেন বিক্ষোভকারীরা। সোমবার রাজধানী ঢাকাতেও অনেক মাদ্রাসা ছাত্রকে মাঠে নামানো হয়েছে। মোহম্মদপুরের মাদ্রাসাগুলোতে বিক্ষোভ হয়েছে।

বলা হয়ে থাকে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করলেও ডিজিটালের সবচেয়ে বেশি কুফল ভোগ করতে হচ্ছে সেই সরকারকেই। আরও পরিস্কার করে বললে ডিজিটালের জন্য সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে আওয়ামী লীগ তথা প্রগতিশীল শক্তিকে। বাংলাদেশে গত আট বছরে অনেক সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এদের বড় অংশই ফেসবুক ভিত্তিক।

তবে বড় বড় হামলার ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায, একই অপকৌশল ব্যবহার করে হামলার পটভূমি তৈরি করা হয়েছে। ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধদের বাড়িঘর ও বৌদ্ধবিহারে হামলার ঘটনায় পুরো দেশকেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। তখনও ফেসবুকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একজনের নামকে যুক্ত করে দেয়া হয়েছিল একই ধরনের স্ট্যাটাস।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে পরিষ্কারÑ হাটহাজারী, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, পটিয়া, পাবনার সাঁথিয়ায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আর ভোলার ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা। কক্সবাজারের ঘটনায় জামায়াতের ইন্ধন ছিল বলে ইতোমধ্যেই প্রমাণ মিলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত যুদ্ধাপরাধীর বিচার ঠেকাতেই প্রথমে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সংঘাত সৃষ্টির এ পরিকল্পনা শুরু করে জামায়াত-শিবির ও জঙ্গীরা। দুটি উদ্দেশ সামনে রেখে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করছে বলে মনে করছে পুলিশ।

এক. সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করে অরাজকতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশকে হেয় করা। দুই. হামলার প্রতিউত্তরে সংখ্যালঘুরা পাল্টা হামলা চালালে ধর্মের দোহাই দিয়ে সারাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরি করা।

কক্সবাজার জেলার রামুতে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে একটি ছবি ট্যাগ করার গুজব ছড়িয়ে নাশকতা চালিয়েছিল মৌলবাদীরা। উত্তম বড়ুুয়া নামের এক যুবকের ফেসবুকে পবিত্র কোরান অবমাননার ছবি ট্যাগ করে দেয়া হয়েছিল তখন। এরপর রামুতে বৌদ্ধ স্থাপনা ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা করা হয়। অনেক বেশি বৌদ্ধ হামলা হয়।

ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার নাসিরনগরেও ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর হামলা হয় একই কায়দায়। এখানে ব্যবহার করা হয় রসরাজ নামের এক হিন্দু ব্যক্তির নাম। অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে মুসলমানদের কাবা ঘরের সঙ্গে হিন্দুদের দেবতা শিবের একটি ছবি জুড়ে দিয়েছিলেন রসরাজ। পরে বিক্ষোভ সমাবেশ ডাকে ও সেখান থেকেই হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা শুরু হয়। প্রায় তিন শ’ বাড়ি ভাংচুর করা হয়। অথচ রসরাজ জানান তিনি ফেসবুক চালাতে পারেন না। এমনকি এর যে পাসওয়ার্ড বলে একটি বিষয় আছে তা নিয়ে তার কোন ধারণাই নেই।

২০১৭ সালের ১০ নবেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়াতে ফেসবুক থেকে ছড়ানো গুজবের জের ধরে এক জনের মৃত্যু হয়। অভিযোগ সেই একই। হিন্দু তরুণের ফেসবুকে থেকে নবীকে অবমাননার অভিযোগ। মাইকিং করে হামলা হয়েছিল হিন্দুদের বাড়ি ঘরে।

এর আগে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ ও নেতাকর্মীদের সরিয়ে নেয়া নিয়ে এখনো ছড়ানো হয় গুজব। ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে বেশ কজন ব্লগারের বিরুদ্ধে কর্মসূচীর অংশ হিসেবে সেদিন তাদের ঢাকা অবরোধ ছিল। রাতে র‌্যাব পুলিশ বিজিবির মিলিত অভিযানে খালি করে ফেলা হয়েছিল শাপলা চত্বর। হেফাজতের শত শত কর্মী ও সমর্থকরা এলাকা ছেড়ে যান। বিএনপি, জামায়াত, হেফাজতের দাবি গুজব ছড়ায় এ বলে যে হাজার হাজার নিহত হয়েছে। কিন্তু অভিযানের পর সেখানে উপস্থিত সংবাদকর্মীরা জানিয়েছিলেন বড় আকারে হতাহতের ঘটনা তারা দেখেননি।

এবার সর্বশেষ ভোলাতেও সেই একই কৌশল দেখা গেছে। তবে এবার পুলিশ শুরুতেই জড়িত দুজনকে আটক করেছে। বিপ্লব বৈদ্য নামে একজনের এ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ঐ বার্তাটি বিভিন্নজনকে পাঠানো হয় বলে প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। কিন্তু এরই মধ্যে এর জের ধরে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে চার জন এবং উগ্রবাদীরা উল্টো সংখ্যালঘু ছেলেটির ফাঁসি দাবি করছেন।

পুলিশ সদরদফতর জানিয়েছে ভোলার বোরহানউদ্দিনের ঘটনার জন্য যে দুজন দায়ী তাদের আটক করা হয়েছে তারাই বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যের এ্যাকাউন্ট হ্যাক করে মেসেঞ্জারে নবী অবমাননাকর বার্তা দিয়েছে যেগুলো পরে স্ক্রিনশট নিয়ে বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যের বলে প্রচার করে।

এবার প্রথমেই ভোলার বোরহানউদ্দিনে সংঘটিত সহিংস ঘটনায় উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়ে দেশের বিশিষ্টজন বলেছেন, পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার পরও মৌলবাদীরা দিনব্যাপী তা-ব চালায়।

প্রকাশিত : ২২ অক্টোবর ২০১৯

২২/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: