১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

পল্লী উন্নয়নে প্রায়োগিক ভাবনা

প্রকাশিত : ২১ অক্টোবর ২০১৯
  • ড. মিহির কুমার রায়

বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিগত ২৮ আগস্ট ২০১৯ তারিখে তার নিজ নির্বাচনী এলাকা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি কমপ্লেক্স সংলগ্ন জমি অধিগ্রহণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ পরিকল্পনা শীর্ষক উপস্থাপনা প্রত্যক্ষকালে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সকল নাগরিকের সুবিধা নিশ্চিত করে দেশের প্রতিটি গ্রামকে পরিকল্পিতভাবে সাজাতে হবে। তিনি আরও বলেন, জাতির পিতা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফসলি জমি যাতে নষ্ট না হয়, সেভাবে কর্মসূচী গ্রহণ করেছিলেন। শুধু ইট-কংক্রীটের স্থাপনা নির্মাণ করা নয়, বরং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এখানে উল্লেখ্য, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের অধীনে ৩৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ভূমি অধিগ্রহণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ পরিকল্পনা শীর্ষক চার বছর মেয়াদী এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পের উপস্থাপনায় বলা হয়, দেশব্যাপী ৩ হাজার ৪৬৫.৫০ কোটি টাকার যে চলমান জরুরী নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ২য় পর্যায়ে চলছে, তার একটি অংশ হিসাবে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের কম্পোনেন্টের মধ্যে রয়েছে সড়ক উন্নয়ন, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ, ভূমি অধিগহণ ও পুনর্বাসন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাল খনন, পাড় বাঁধানো, পুকুর সংস্কার, বৃক্ষরোপণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস ও পরিবেশগত উন্নয়ন সাধন। এই উন্নয়ন কার্যক্রমগুলোর টুঙ্গিপাড়ার অংশে রয়েছে শেখ রাসেল শিুশু পার্ক, টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতির খালের সৌন্দর্য বর্ধন, পাটগাতি ও টুঙ্গিপাড়া কাঁচাবাজার নির্মাণ, বহুতল ভবন নির্মাণ ও টুঙ্গিপাড়ার নতুন বাসস্ট্যান্ড নির্মাণ।

প্রধানমন্ত্রী গ্রাম উন্নয়ন ভাবনা তথাকথিত প্রথার বাইরে গিয়ে এক নতুন জানালার উন্মোচন করেছেন, যা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দর্শনেরই অংশ। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গ্রাম বলতে সেই গ্রাম আর থাকবে না এবং শহরের সুবিধা সেই গ্রামে পৌঁছাতে হবে, যা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮ ইশতেহার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতির কাছে অঙ্গীকার করেছিল। যার মধ্যে ছিল আগমী পাঁচ বছরে দেশের ২৮ লাখ যুব গোষ্ঠীকে উৎপাদশীল শক্তিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা ও প্রতিটি গ্রামকে শহরের মতো উন্নীত করার অঙ্গীকার। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার ছিল, একটি বাড়ি একটি খামার, আশ্রয়ণ, গৃহায়ন, আদর্শ গ্রাম, ঘরে ফেরা ইত্যাদি কর্মসূচীর বাস্তবায়ন করা। ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লিখিত ছিল, অর্থনীতি অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়নের কথা। অর্থাৎ ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্র্যন্ত যে তিনটি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছিল, তার প্রথম দুটির (২০০৮-২০১৪) অগ্রগতি দৃশ্যত আশাব্যঞ্জক। যেমন- মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯১০ মার্কিন ডলার, প্রবৃদ্ধি ৮.২ শতাংশ, দারিদ্র্য দূরীকরণ হার ২৩.৮ শতাংশ, শিুশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৮ জন, মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ১৩ জন, মূল্যস্ফীতির হার ৫.৫৬ শতাংশ, মানব উন্নয়ন সূচকে ১৩৬, যা পাকিস্তান ও ভারতের চেয়ে ওপরে রয়েছে।

উন্নয়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিকতার প্রয়োজন, যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মালয়েশিয়ার প্রায় ২২ বছর ক্ষমতায় থাকা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের শাসনকাল, ভারতের কংগ্রেস নেত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর শাসনকাল। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ক্রমাগত ধারাবাহিকতায় দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, যা বহির্বিশ্বের কাছে অনেকটা রোল মডেল। বাংলাদেশ প্রায় ৪২ বছর স্বল্প উন্নত দেশের তালিকায় ছিল এবং বিগত ১৬ মার্চ ২০১৮ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে, যা চূড়ান্ত রূপ নেবে ২০২৪ সালে। দেশের উন্নয়ন বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, সরকারের ধারাবাহিকতার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য প্রণীত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের গতি পেয়েছে এবং বিগত দশ বছরের বাজেটগুলোতে কৃষি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন, সমবায় ও দারিদ্র্য বিমোচন খাতে মোট বাজেটের শতকরা ৩০ ভাগ বরাদ্দ পেয়েছে। যার ফলে কৃষিতে রূপান্তর ঘটেছে। বিশেষত শস্য, গবাদি পশু, হাস-মুরগি পালন, মৎস্য ও বনায়নে। দেশ ধান-চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং চাল বিদেশে রফতানি হচ্ছে। অর্থাৎ গ্রামীণ অর্থনীতির সাম্প্রতিককালে যে সকল রূপান্তর ঘটেছে, তার অভিজ্ঞতার আলোকে উন্নয়ন ভাবনায় এসেছে নতুন মাত্রা। বর্তমান সরকার দেশের সুষম উন্নয়নে বিশ্বাসী। কারণ দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে ৮৭ হাজার ৩১৬টি গ্রাম, যার মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি এবং বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম। এই গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য যেমন- সমতল, হাওড়, জলাভূমি, পাহাড় পর্বত, বনাঞ্চল, চরাঞ্চল, বরেন্দ্র অঞ্চল, নতুন ছিটমহল, সাগরের তটরেখা, ভাসমান জনপদ ইত্যাদি।

দেশের এই বৈচিত্যময় অঞ্চলগুলোর স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি, জীবন-জীবিকা ও মূল্যবোধের মধ্যেও পার্থক্য বিদ্যমান হলেও সরকার সকলকে নিয়ে উন্নয়নের সুফল ফলাতে চায়, যা দেশের জন্য একটি গৌরবের বিষয়। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক (বিবিএস)-এর ২০১৮ সালের তথ্যমতে, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ জন যার মধ্যে ১২ কোটিরও বেশি লোক বসবাস করে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ঘেরা অঞ্চল বেষ্টিত গ্রামগুলোতে, যা মোট জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশের মতো। বিগত দশ বছরে এই অঞ্চলগুলোতে হারিকেন আলোর বদলে বিজলি বাতির সরবরাহ বেড়েছে এবং দেশের ৯০ শতাংশ লোক বিদ্যুত ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। ১৪ শতাংশ মানুষ সৌর বিদ্যুত ব্যবহার করছে। ৬০ শতাংশ মানুষ গড়ে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানাসহ প্রায় শতভাগ বাসস্থানের ও পানীয় জলের সুবিধা পেয়েছে। টেলিভিশনসহ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিনোদন রেড়েছে। সাক্ষরতা তথা শিক্ষার হার বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৭৩.২১ শতাংশ। রেমিটেন্স প্রবাহ ১৭৪৮.১৬ মার্কিন ডলার (২০১৯ মে পর্যন্ত )। প্রজনন হার হ্রাস তথা ছোট পরিবারের প্রাধান্য ইত্যাদি। গ্রামীণ জনপদের রূপান্তরের অন্যতম অনুঘটক হলো অবকাঠমো উন্নয়ন-যেমন সেচ সুবিধা, রাস্তা-ঘাট, সেতু-ব্রিজ, গ্যাস সংযোগ ইত্যাদি। যার ফলে গ্রাম-শহরের ব্যবধান হ্রাস পেয়েছে, উৎপাদন ও উপকরণ বিনিময় সহজ তথা ব্যবসাশ্রয়ী হয়েছে এবং সম্প্রসারিত হয়েছে অভিবাসন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উন্নয়ন ধারণায় যুক্ত হয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিজি) মূলমন্ত্র, যেখানে বলা হয়েছে কাউকে পেছনে ফেলে নয়, সবাইকে নিয়ে উন্নয়নের চিন্তা করতে হবে। সেখানে রয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধামুক্ত, স্বাস্থ্য, সুপেয় পানি, পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা, মানসম্মত শিক্ষা, উপযুক্ত কাজের সুবিধা, টেকসই বন ব্যবস্থাপনা, মরুকরণ রোধ, ভূমিক্ষয় প্রভৃতি বিষয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা।

প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি আরও বলেছেন, আমাদের সমুদ্র সম্পদ (ব্লু ইকোনমি ), নদী সম্পদ, বন সম্পদ ও মানবসম্পদের যে ঐশ্বর্য বয়েছে, সেগুলোকে কাজে লাগাতে হবে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যবহারের মাধ্যমে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ঐক্য ও সরকারের সার্বিক সহযোগিতায়। বিগত দশ বছরে গ্রামাঞ্চলের যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তাতে মানুষ চাকরি শেষ করে বাকি জীবনটুকু গ্রামে কাটাতে ভরসা পাবে। কারণ শহরের সকল সুবিধা, আচার আচরণ, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ গ্রামের সঙ্গে মিশে একটা নতুন জগতের সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত একটি বাড়ি একটি খামার উন্নয়ন প্রকল্পের ফসল মাত্র। তাছাড়াও আবাদি জমির কথা মাথায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে এবং পরিবেশ সহনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এখন মধ্যম কিংবা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হিসাবে প্রতিটি উপজেলায় ১টি করে সরকারী স্কুল কিংবা কলেজ, খেলার মাঠ বর্তমানে শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্র, শিশু পার্ক ইত্যাদি বাস্তবায়িত হচ্ছে। তারপরও প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যে বার বার জীববৈচিত্র্য বা জীবনের বৈচিত্র্য রক্ষা ও নাগরিক সুবিধার কথাটি উঠে এসেছে হয়ত এই কারণে যে, পরিবেশের বিষয়টি এখন দেশীয় ও বৈশ্বিকভাবে খুবই অগ্রাধিকারের বিষয় বিশেষত উন্নয়ন পরিকল্পনায়। সরকারি সংজ্ঞা মতে, যে সকল উপজেলা ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক স্থানীয় উন্নয়ন নিয়ন্ত্রিত, তাকে গ্রাম বলা হয়। যেগুলো মিউনিসিপেলিটি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত সেগুলোকে শহর বলা হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে সিটি কর্পোরেশন ১১টিসহ মিউনিসিপেলিটি রয়েছে ৩১৭টি বিধায় শহরের সংখ্যা ৩১৭টি। বাংলাদেশে উপজেলার সংখ্যা ৫৪৪টি এবং সেখান থেকে ৩১৭টি উপজেলা বাদ দিলে থাকে ৩২৭ উপজেলা, যার আওতায় ইউনিয়নের সীমারেখায় যে জায়গা রয়েছে সেগুলোও গ্রামাঞ্চল বলে খ্যাত। বাংলাদেশে মোট ইউনিয়নের সংখ্যা ৪৫৪৩টি, যা সার্বিক গ্রামেরই প্রতিনিধি। এখানে আরও উল্লেখ্য, গ্রাম হলো একটি সীমানা (Teritorry) ও সামাজিক ইউনিট, যা কেবল প্রশাসনিক ও প্রতিনিধিত্ব উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি ওয়ার্ড হয় এবং ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে ১টি ইউনিয়ন পরিষদ হয়, যা স্থানীয় সরকার (local government) বলে খ্যাত।

বিবিএসের তথ্যমতে একটি গ্রামে গড়ে ২৩২টি গৃহস্থালি বসবাস করে। কথায় বলে, গ্রাম প্রকৃতির সৃষ্টি আর শহর মানুষের সৃষ্টি বিধায় সৃষ্টির তারতম্যের কারণে গ্রামে প্রকৃতির প্রভাব বেশি। যেখানে আছে পশু-পাখি, গাছ-গাছালি, বনাঞ্চল, নদীনালা, হাওড় বাঁওড় আর বনশিউলির ঘ্রাণ। বিভূতি ভূষণের পথের পাঁচালীতে নিশ্চিন্তপুর গ্রামের এ রকম একটি ছবি ফুটে উঠেছিল এক জজমানি ব্রাহ্মণের জীবনকে ঘিরে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে হরিরামপুরের কুবের মাঝি, অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে গোকর্নঘাট গ্রাম, সত্যেন সেন ও ক্ষীতি মোহন সেনের স্মৃতি বিজড়িত বিক্রমপুরের সুনারং গ্রাম, রাজেন তরফদার পরিচালিত পালঙ্ক চলচ্চিত্রের মকবুল আর শঙচিলের ইছামতি বেষ্টিত সেই সীমান্তবর্তী গ্রাম আমদের গ্রামীণ জীবনের সেই সোনালি দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যা সাহিত্য কি সঙ্গীত, কবিতা কি উপন্যাসে, যা এক কথায় অপূর্ব। ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের ময়মনসিংহ গীতিকার বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিশেষ নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার যে সম্ভার সৃষ্টি করেছিল, তা এখনও অদ্বিতীয় হয়ে রয়েছে। এখন প্রধানমন্ত্রী যে গ্রামীণ সমাজ কিংবা অঞ্চলের কথা বলেছেন, তা আমাদের জীববৈচিত্র্য, স্বকীয়তা তথা প্রাকৃতিক পরিবেশ অভিন্ন রেখে করতে হবে, যা হলো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের গ্রাম বাংলা। কারণ তিনি যে অঞ্চল থেকে উঠে এসেছিলেন, তা ছিল একটি দারিদ্র্য পীড়িত পশ্চাদপদ গ্রাম। যেখান থেকেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর গ্রামীণ সমাজের সংস্কারের কর্মসূচী শুরু, যা তিনি সারা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে চান। এখন এই সৃজনশীর চিন্তার সফল বাস্তবায়ন কিভাবে হবে এবং প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামোতে কতটুকু সম্ভব, না কি কোন বিকল্প কাঠামোর প্রয়োজন হবে, তা নিয়ে উন্নয়ন চিন্তাবিদদের অনেক ভাবনা আছে পরিবেশ কিংবা ব্যয় কিংবা টেকসই সাশ্রয়ী নিয়ে। কেউ কেউ মনে করেন সরকারী কাঠামোতে প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন কৌশল, যা বর্তমানে টুঙ্গিপাড়ায় বাস্তবায়নাধীন। তাতে সামাজিক-সংস্কৃতির উপদানগুলো কতটুকু স্থান পাবে, যার সঙ্গে দেশের চিরায়ত বাঙালী কালচারের যোগসূত্র রয়েছে। অর্থাৎ পরিবর্তন যাই আসুক গ্রামাঞ্চলের চিরায়িত রীতিনীতিকে অভিন্ন রেখেই তা করতে হবে। তাই যদি হয় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার আদি রূপ, তাহলে গ্রামীণ সমাজকে উন্নয়ন চিন্তার অগ্রভাগে নিয়ে আসতে হবে সমাজভিত্তিক চিন্তাধারায় যার বর্তমান সমাজে খুবই কম রয়েছে- বিশেষ করে বাজার অর্থনীতির পদচারণায়। অথচ ১৯৭৫ সালের আগস্ট প্রথম ভাগে ঢাকায় এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রশাসনিক সংস্কারের কথা, যার সঙ্গে দেশের ৬৮ হাজার গ্রামে বাধ্যতামূলক উৎপাদনমুখী গ্রাম সমবায়ের কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু ’৭৫ পরবর্তী সময়ে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁরই উত্তরসূরি সুযোগ্যা কন্যা জননেত্রী দেশের প্রধানমন্ত্রী সেই গ্রাম সমবায়ের মাধ্যমে পল্লী অর্থনীতির রূপান্তরের কথাটি ভাবতে পারেন।

এক : গ্রামে দ্বি-স্তর বিশিষ্ট সমবায় সমিতিগুলোকে আরও উৎপাদনমুখী করার তাগিদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেয়া যেতে পারে। যেমন কৃষি উৎপাদনমুখী বিপণন সমবায় ব্যবস্থা, যা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বয়েছে। কৃষি ক্ষেত্রে বর্তমানে সমস্যা উৎপাদন নয় বিপণন, যেখানে কৃষক প্রতিনিয়তই ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী সম্প্রদায় লাভবান হচ্ছে। একটি সমবায় সমিতি কেবল খাদ্য উৎপাদন কিংবা বিপণন দেখবে না, বিধায় সার্বিক সামাজিক উন্নয়নের দায়িত্বে থাকবে, যেমন বিচার শালিস, নিরাপত্তা ইত্যাদি। বাজার অর্থনীতিতে সমবায়কে একটি কেবল ব্যবসায়ী সংগঠন হিসাবে দেখা হয়। অথচ সমবায়ের মূলমন্ত্রই হলো সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্রের মধ্যে একটি সমঝোতা। কিন্তু বর্তমানে অর্থনৈতিক নীতিমালায় সমবায় তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। গবেষণায় দেখা যায় যে, গ্রাম কিংবা শহরের কেউই এক সঙ্গে সমাজবদ্ধভাবে থাকতে আগ্রহী নয় কেবল মাত্র বিশ্বাস ও আস্তার অভাবে। অথচ অতীতে সামাজিক পরিবেশের ভরসার জায়গাটি ছিল বিশ্বাস। কিন্তু তাই বলে কি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান হিসাবে সমবায়কে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না, যেমন- জাপান, চীন ও মেক্সিকোতে সম্ভব হয়েছে;

দ্বিতীয়ত : জীববৈচিত্র্য ও নাগরিক সুবিধা সংরক্ষণ বর্তমান সরকারের একটি অগ্রাধিকার বিষয়, যা বিনষ্ট করে গ্রামের উন্নয়ন টেকসই হবে না। পরিবেশ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ এই চিন্তা করে পরিবেশবাদীরা বিশেষত জঙ্গল, বনভূমি, খাল-বিল, নদীনালা রক্ষায় জোর দেন, যেগুলো দেশের প্রাকৃতি সম্পদ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, দেশের প্রবহমান নদীর সংখ্যা ৪০৩টি, যার অনেকগুলো এখন দখল-দূষণের কবলে পড়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি দেশের মোট এলাকাতে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকতে হবে, অথচ বাংলাদেশে রয়েছে ১০ শতাংশেরও কম, যা পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রতিকূল। সরকারীভাবে সংরক্ষিত বন্যাঞ্চলগুলো এখন ক্ষীণ হয়ে আসছে আর দেশের গর্ব সুন্দরবনও তার সৌন্দর্য হারাতে বসছে। সুন্দরবন হলো বাংলাদেশের ফুসফুস। স্থানীয় সরকারের সহযোগিতায় আইন কি করা যায় না যে, ব্যক্তি মালিকানায় গাছ-গাছালি ভোগ করার অধিকার মালিকের থাকবে, কাটার নয়। যদি কাটতে হয় স্থানীয় সরকারের অনুমতি লাগবে, নতুবা আইন অনুযায়ী শাস্তি পেতে হবে;

তৃতীয়ত : বাংলাদেশের হাওড় বেষ্টিত ৭টি জেলায় প্রায় চল্লিশটি উপজেলা ও পার্বত্য তিন জেলার উপজেলাগুলোতে প্রাকৃতিক সমতল অঞ্চলগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ায় উন্নয়ন কৌশল বিশেষত অর্থনৈতিক কর্মকা-ের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্নতর হবে। হাওড় এলকায় এক ফসলি জমি (বোরো মৌসুম)। যেখানে পাহাড়ী ঢলে আগাম বন্যার সম্ভাবনা থাকায় সেভাবেই প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর বিশেষ করে বাঁধ ও গ্রামীণ সংযোগ তৈরি করে যাচ্ছে এবং বছরের অর্ধেক সময়ের বেশি সময় যেখানে পানি থাকে বিধায় জল ঢেউ সহিষ্ণু প্রযুক্তি ব্যবহার অপরিহার্য। আবার পাহাড়ী জনপদে উপজাতি সম্প্রদায়ের জীবনাচারণ ভিন্ন হওয়ায় তাদের সংস্কৃতি তথা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের পার্থক্য রয়েছে, যা বিবেচনায় রেখেই পরিবর্তন ঘটাতে হবে;

চতুর্থত : জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে সমৃদ্ধির অগ্রাযাত্রায় বাংলাদেশ শীর্ষক আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ আছে, প্রতিটি গ্রামে আধুনিক শহরের সুযোগ সুবিধা সম্পসারিত করা হবে এবং টেকসই লক্ষ্যেই ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে গ্রাম বাংলার কৃষি বিপ্লব বিদ্যুত ব্যবস্থা, কুটির শিল্প সহযোগী শিল্পের বিকাশ, শিক্ষা, যোগাযোগ, জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের মাধ্যমে আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছিলেন, যা বাস্তবায়িত হচ্ছে তাঁর সুযোগ্যা কন্যার হাত ধরে। বিগত দশ বছরে সরকারের সাফল্যের অন্যতম হলো বিদ্যুতের প্রাপ্তি গ্রামের ঘরে ঘরে, যার সঙ্গে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির বিষয়টি জড়িত। গ্রাম-গঞ্জে এখন এজেন্ট ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট সংযোগ সহজলভ্য হয়েছে, যা তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী অধ্যায়;

পঞ্চমত : প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন কৌশল, যা ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়, যা সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি) আওতায় প্রকল্প এলাকায় বাস্তবায়িত হয় বিশেষত গ্রামভিত্তিক বিভিন্ন উপদানে, যা নির্দিষ্ট মেয়াদভিত্তিক এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে তার প্রভাবগুলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। এই অবস্থায় উন্নয়ন কৌশল হতে হবে তৃণমূল থেকে ওপরদিকে (Bottom up) সংগঠন তৈরির মাধ্যমে, যার সফল উদাহরণ রয়েছে জেপি নারায়ণের সর্বোদয় আন্দোলন, গান্ধীর আশ্রমভিত্তিক অহিংস আন্দোলন, আখতার হামিদ খানের কুমিল্লা সমবায় আন্দোলন, এম এ চাষীর স্বনির্ভর আন্দোলন, নোবেল বিজয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক ক্ষুদ্র ঋণ মডেল, গুরু সদয় দত্তের ব্রতচারী আন্দোলন ও এনজিও সংগঠনগুলো। এই সকল প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব থাকে পেশাজীবীভিত্তিক গোষ্ঠীর যেমন- কামার, কুমার, জেলে, মুচি, নরসুন্দর, কলুই, যোগী, তাঁতি, চাষী, ক্ষেতমজুর, শিল্পী, সুতার প্রভৃতি। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, এই সকল পেশাজীবী পরিবারগুলো সময়ের আবর্তে তাদের পেশাগুলোকে ধরে রাখতে না পেরে অন্যত্র চলে যাচ্ছে, গ্রামীণ সমাজের একটি চিরায়ত রূপ এবং টেকসই উন্নয়ন যদি গ্রামে আনতে হয়, তা হলে উল্লিখিত জায়গাগুলোতে রূপান্তর আনতে হবে, বিশেষত ব্যাংকভিত্তিক অর্থয়নের মাধ্যমে মূলধন যোগানে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এরাই গ্রামীণ জনপদের অলঙ্কার, রেমিটেন্স থেকে আহরিত প্রান্তজনের অর্থ যাতে উৎপাদনশীলতার খাতে ব্যয়িত হয়, তার জন্য মোটিভেশন কার্যকর করতে হবে। বাংলাদেশ গ্রাম গবেষণার দিকপাল বলে খ্যাত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একডেমি (বার্ড) তাদের গবেষণার গুণগত মান নিয়ে সমসাময়িক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম হচ্ছে না, কেবল মাত্র প্রশাসনিক উদাসীন্যতার অভাবে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানটি ষাটের দশকে সৃষ্টি হয়েছিল প্রশিক্ষণ ও গবেষণার জন্য, যার ফলগুলো সরকরের পরিকল্পনা কমিশন নীতি নির্ধারণে ব্যবহার করবে।

সবশেষে বলা যায়, গ্রামের উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন প্রতিটি উপজেলায় উন্নয়ন পরিকল্পনা বিভাগ। এখন অপরিকল্পিত আবাসন ও স্থাপনা না করে স্থানীয় জনসংখ্যা ও প্রাধিকারের প্রেক্ষাপটে নিতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, যা হবে ব্যয় সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব এবং শ্রম ঘন। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাঙালী সংস্কৃতির গ্রামীণ চিরায়ত সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক চাহিদাগুলোতে অক্ষুণ্ণ রেখেই গ্রহণ করতে হবে গ্রামীণ পরিকল্পনা।

লেখক : ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সিটি ইউনিভর্সিটি

প্রকাশিত : ২১ অক্টোবর ২০১৯

২১/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: