১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

বদলে যাবে উপকূলীয় চরের জীবন ॥ বিনামূল্যে হাঁস মুরগি ভেড়া দেয়া হবে

প্রকাশিত : ১৯ অক্টোবর ২০১৯
  • চট্টগ্রাম ও বরিশালের সুফলভোগী ৬৮ ইউনিয়নের মানুষের পুষ্টি চাহিদা মিটবে, হবে কর্মসংস্থান

ওয়াজেদ হীরা ॥ সারাদেশের মতো উপকূলীয় চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দৃষ্টি দিয়েছে সরকার। গরিব মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পরিবারে বিনামূল্যে দেয়া হবে হাঁস, মুরগি, ভেড়া। তাদের পালনের জন্য ঘরও করে দেবে সরকার। এতে চরের গরিব মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, স্বচ্ছলতার পাশাপাশি হবে কর্মসংস্থান। এছাড়া ক্ষুদ্র খামার স্থাপন করে ডিম ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করবে। পাশাপাশি নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আরও এগিয়ে যাবে দেশ। পাল্টে যাবে উপকূলীয় চরের সংগ্রামী জীবনও। ঊপকূলের মানুষের জীবনচিত্র একটু ভিন্ন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি এখানে আবহাওয়া কখনও কখনও বৈরী আচরণ করে। এতে উৎপাদনে নানামুখী প্রভাব ফেলে। উপকূলের অনেকেই কাজের অভাবে অলস সময় কাটায়। এতে গরিব পরিবার আরও গরিব হয়। এই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে সবাইকে কাজের মধ্যে রাখতে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে পিছিয়ে থাকা দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় অর্ধলাখ গরিব পরিবারের মুখে ফুটবে হাসি। উপকূলীয় চরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি, মৎস্য ও পশুপাখি পালন নির্ভর। কিন্তু প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা এসব এলাকায় এখনও প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতা কাক্সিক্ষত মাত্রায় হয়নি। চরাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এসব মানুষের পুষ্টি ও আমিষের চাহিদা পূরণ এবং নারীদের স্বনির্ভর করে তুলতে তিন বছর মেয়াদী একটি প্রকল্প হাতে নেয়া সরকার। ’১৯ সালের মে মাসে শুরু এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯৫ কোটি ৩৪ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের সাত জেলার ১৬ উপজেলার মোট ৬৮ ইউনিয়ন। সুফলভোগীর সংখ্যা ৩৪ হাজার ৪০৮ পরিবার।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরের গণযোগাযোগ কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে উপকূলের দরিদ্র পরিবারগুলোর কর্মসংস্থান হবে। পুষ্টি চাহিদা মিটবে। দরিদ্রতাও কমে আসবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাছাই করা এসব দরিদ্র পরিবার বিনামূল্যে কাউকে হাঁস, কাউকে মুরগি আবার কাউকে ভেড়া দেয়া হবে। পাশাপাশি হাঁস, মুরগির জন্য ৬৫ দিনের খাবার ও ভেড়ার জন্য ৮০ দিনের খাবারও বিনামূল্যে দেয়া হবে। এসব প্রাণি রাখা ও প্রতিপালনের জন্য বিনামূল্যে ঘর তৈরি করে দেয়া হবে। চিকিৎসাও ফ্রি করে দেবে সরকার।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু জনকণ্ঠকে বলেন, চরের জীবন একটু ভিন্ন অভিজ্ঞতার। চরের মানুষ যাতে সবসময় কর্মমুখর থাকে সেজন্য সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও এসব প্রকল্পের বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন। চরের মানুষকে স্বাবলম্বী করা অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবে তারা যেন সুখে থাকে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারে। সেজন্য সরকার তাদের কাজের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। বিনামূল্যে হাঁস, মুরগি, ভেড়া দেবে। ঘর তৈরি করে দেবে, যাতে তাদের আয় হয়। সমতলের জন্যও আমরা প্রকল্প নিয়েছি। আমাদের মন্ত্রণালয় সেসব বাস্তবায়ন করছে। আশা করছি, এসব প্রকল্পে চরের গরিব মানুষের অনেক উপকার হবে।

এ প্রকল্পের আওতায় যারা সুফল পাবে তাদের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজারের মহেশখালী, নোয়াখালীর কবিরহাট, ফেনীর সোনাগাজী, লক্ষ্মীপুরের লক্ষ্মীপুর সদর, কমলনগর ও রামগতি উপজেলা। বরিশাল বিভাগের বরগুণার বেতাগী, পাথরঘাটা, তালতলী, বরগুনা সদর, পটুয়াখালীর কলাপাড়া, গলাচিপা, রাঙ্গাবালী এবং ভোলার চরফ্যাশন, দৌলতখান ও লালমোহন উপজেলা। সুবিধাভোগী ৩৪ হাজার ৪০৮ পরিবারের মধ্যে ১৭ হাজার পরিবারকে বিশটি করে হাঁস, হাঁসের ঘর ও হাঁসের ৬৫ দিনের খাবার, ১০ হাজার ২শ’ পরিবারকে বিশটি করে মুরগি, মুরগির ঘর ও মুরগির ৬৫ দিনের খাবার, ৬ হাজার ৮শ’ পরিবারকে তিনটি করে ভেড়া, ভেড়ার ঘর ও ভেড়ার ৮০ দিনের খাবারের পাশাপাশি এক বছর পর্যন্ত চিকিৎসা, ভ্যাকসিন ও মেডিসিন বিনামূল্যে দেয়া হবে। ৬৮ পরিবারকে কবুতর পালন বিষয়ক প্রশিক্ষণ, কবুতরের ঘর করে দেয়া হবে। এছাড়া ৩৪০ জনকে উন্নতমানের নেপিয়ার ঘাস চাষের জন্য ৭ হাজার করে টাকা দেয়া হবে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোর সুফলভোগী বাছাই কার্যক্রম শেষ হয়েছে। বর্তমানে প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে। বর্তমানে দেড় হাজার জনের প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ হয়েছে। আরও ২ হাজার জনের প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে। প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা পরিবারগুলোকে আগামী নবেম্বরে প্রকল্প সামগ্রী হস্তান্তর করা হবে।

সুফলভোগীদের প্রদেয় উপকরণের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রকল্পভুক্ত প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে মোট ৬৮ কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তারা কৃষকদের মাঝে সর্বক্ষণিক সেবা দেবেন। প্রতি ইউনিয়নে সর্বোচ্চ বিশটি গ্রুপে ৫শ’ সুফলভোগী পরিবার প্রকল্পভুক্ত হবে। এর মাঝে ২৫০ পরিবার ১৮ স্ত্রী হাঁস, দুটি পুরুষ হাঁস, ১৫০ পরিবার ১৮ মুরগি, দুটি মোরগ, একশ’ পরিবার দুটি ভেড়ি, একটি ভেড়া, একটি পরিবারকে কবুতর পালন বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও একটি কবুতরের ঘর এবং ৫ জনকে উন্নতমানের নেপিয়ার ঘাস উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ দেয়া হবে।

অন্যদিকে ভেড়া, মুরগি, হাঁস, কবুতর ও ঘাসের প্রদর্শনী প্লট এই ৫ প্যাকেজের আওতায় সুফলভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে হাঁস ও মুরগি পালনকারীদের মধ্যে শতভাগ এবং ভেড়া পালনকারীদের মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। নারীর কর্মসংস্থান ও আয়ের উৎস সৃষ্টির মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ হবে।

প্রকল্প পরিচালক ডাঃ নিতাই চন্দ্র দাস জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা হাঁস, মুরগি, ভেড়া যা দিচ্ছি, এর আগে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। গত অর্থবছরে ৩৭৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আর এই অর্থবছরে প্রথম তিন মাসের জন্য ৫ হাজার প্রশিক্ষণার্থীর বাজেট দিয়েছি। অন্যান্য কার্যক্রমও চলছে। প্রশিক্ষণ শেষ হলে হাঁস-মুরগি, ভেড়া বা প্রয়োজনীয় ওষুধসহ আনুষঙ্গিক প্রয়োজনীয় উপকরণ দেয়ার কাজ শেষ করব। আশা করছি, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই এসব বিতরণ করতে পারব। তিনি বলেন, এখানে কোন ইউনিয়নে পাঁচ শ’ পরিবার আছে সুফলভোগী। ফলে এখান থেকেই একটা বিপ্লব ঘটে যাবে। আমরা যা দিচ্ছি তাতে উৎপাদন বাড়বে। এই আয় দিয়েই তারা ভবিষ্যতে এগিয়ে যাবে। ডাঃ নিতাই দাস বলেন, চরের জীবন মূল ভূখ- থেকে অনেকটাই আলাদা। স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা, জীবন জীবিকা, অন্যান্য সেবা ও সুযোগ থেকে চরের লাখো মানুষ কার্যত বিচ্ছিন্ন। উপকূলীয় চরাঞ্চলে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে চরাঞ্চলে প্রায় ৩৫ হাজার গরিব পরিবারের উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রকাশিত : ১৯ অক্টোবর ২০১৯

১৯/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: