১৮ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

কোম্পানির তালিকাচ্যুতি নিয়ে ডিএসইকে হুঁশিয়ারি

প্রকাশিত : ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ০৬:৫১ পি. এম.
কোম্পানির তালিকাচ্যুতি নিয়ে ডিএসইকে হুঁশিয়ারি

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ পুঁজিবাজারের কোম্পানিকে তালিকাচ্যুতির বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গত বছরের দুই কোম্পানিকে তালিকাচ্যুতি নিয়ে ঢাকা স্টক একচেঞ্জের স্বেচ্ছাচারিতায় শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রবণতা বাড়ার কারণে এবার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে কমিশন। তাই পুনরায় নতুন করে তালিকাচ্যুতি নিয়ে ডিএসইকে হুঁশিয়ারি উচ্চারন করেছে সংস্থাটি। সবার আগে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ রহিমা ফুড ও মডার্ন ডাইং নামের কোম্পানি দুইটিকে তালিকাচ্যুতি করেছিল। তবে অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক একচেঞ্জ যথারীতি কোম্পানি দুইটির লেনদেন চালানোর পক্ষে ছিল। তালিকাচ্যুতির পরদিন আর ডিএসইতে লেনদেন হয়নি। এমনকি ওটিসি মার্কেটেও কোম্পানি দুইটি স্থান হয়নি। হঠাৎ করেই দুটি কোম্পানির বিনিয়োগকারীরা নি:স্ব হয়ে যায়। তাদের বিনিয়োগের টাকা কিভাবে ফেরত পাবে সেটাও ডিএসই থেকে স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে রাতারাতি পথে বসে যায় দুই কোম্পানির বিনিয়োগকারী। কোম্পানি তালিকাচ্যুতি হলেও সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় উদ্যোক্তারা। তাই বিনিয়োগকারীদের নি:স্ব করে ডিএসই কর্তৃপক্ষ পক্ষান্তরে উদ্যোক্তাদের বাজার থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদের শেয়ারধারী দুই পরিচালকের একান্ত ইচ্ছাতেই তালিকাচ্যুতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দুই পরিচালকের একজন বর্তমান আওয়ামী সরকার বিরোধী মতবাদে বিশ্বাসী হলেও তিনি নির্বাচিত হওয়ার পরই পরিচালনা পর্ষদে প্রভাবশালী হয়ে উঠেন। সরকারদলীয় আরও একজন প্রভাবশালী পরিচালকও তাতে সমর্থন দেন। তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় বিপুল উৎসাহ নিয়ে দুই কোম্পানিকে তালিকাচ্যুতি করা হয়। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোকে নিয়ে আতঙ্ক বেড়ে যায়। দুই কোম্পানিকে তালিকাচ্যুতি করেই ডিএসই থেমে থাকেনি। আরও ১৪টি কোম্পানি পরিচালনা পর্ষদের সদস্য নির্বাচিত করেন। কোম্পানিগুলোকে বারবার সতর্কবাতা প্রদান করেন। সবমিলেও জেড ক্যাটাগরির শেয়ারধারীদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে সার্বিক শেয়ারবাজারে। আজও যার রেশ রয়ে গেছে শেয়ারবাজারে।

পরবর্তীতে কোম্পানির তালিকাচ্যুতি নিয়ে বিএসইসিতে প্রতিবেদন জমা দেয় ডিএসইর পরিচালনা পষর্দ। বাজার পরিস্থিতি ও ডিএসইর প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিএসইর কাছে বিস্তারিত জানতে চায়। আর যেনতেনভাবে তালিকাচ্যুতির বিপক্ষে মত দেন।

এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি তালিকাচ্যুতির পূর্বে বিনিয়োগকারীর স্বার্থে প্রয়োজনীয় আইনগুলো আগে পরিপালনের নির্দেশ দেয় বিএসইসি। পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক আইনের আওতায় একটি সংশোধিত প্রস্তাব আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে জমা দিতেও বলেছে ডিএসইকে।

ডিএসইর পক্ষ থেকে তালিকচ্যুতির জন্য চিহ্নিত কোম্পানিগুলো হচ্ছে Ñ শ্যামপুর সুগার মিলস, ঝিলবাংলা সুগার মিলস, বেক্সিমকো সিনথেটিকস, শাইনপুকুর সিরামিকস, সোনারগাঁও টেক্সটাইল, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল, তুং-হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইং, দুলামিয়া কটন, সমতা লেদার কমপ্লেক্স, জুট স্পিনার্স, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক ইন্ডাস্ট্রিজ, ইমাম বাটন ইন্ডাস্ট্রিজ এবং সাভার রিফ্র্যাক্টোরিজ লিমিটেড।

এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর ১৪টি কোম্পানিকে কোন যুক্তিতে ভিত্তিতে ডিএসই তালিকাচ্যুত করতে চায়Ñ এর আইনি ব্যাখ্যা চেয়েছিল ‘বিএসইসি’। এরপর ১৫ সেপ্টেম্বর ডিএসই ওই চিঠির জবাব দেয়। ডিএসই’র জবাবের ভিত্তিতে বিএসইসি উপরোক্ত নির্দেশনা দেয়।

বিএসইসি বলছে, লিস্টিং আবেদনের শর্ত অনুযায়ী কোম্পানিগুলোতে কোনো ধরনের অসঙ্গতি বা ঘাটতি কিংবা কোনো আইনের লঙ্ঘন হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তারপর ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু ডিএসই ‘সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স ১৯৬৯’-এর ধারা ৯-এর (৪) অনুযায়ী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে এবং তাদের পরিচালকদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির সময়ে করা লিস্টিং চুক্তির ব্যতয় হলে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা কোনো মনোনীত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ‘স্টক এক্সচেঞ্জ লিস্টিং রেগুলেশন ২০১৫’-এর ৭ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা। তবে ডিএসই এ ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে।

ডিএসই লিস্টিং রেগুলেশনস এর ৫১ (২) ধারা অনুযায়ী ট্রেড সাসপেন্ডের পরিবর্তে যদি কোনো কোম্পানির অপারেশন বন্ধ থাকে, তবে স্টক এক্সচেঞ্জ সেই কোম্পানির সার্বিক অবস্থা ৬ মাস মনিটর করবে। তবে ডিএসই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে এ আইন পরিপালন করেনি।

বিএসইসি আরও বলছে, ডিএসই ১৪ কোম্পানির মধ্যে গোয়িং কন্সার্ন থ্রেড বা ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে বলে উল্লেখ করেছে। তবে বাকি কোম্পানির ক্ষেত্রে এ আইন পরিপালন করেনি ডিএসই। এছাড়া বিএসইসির কাছে প্রতীয়মান হয় যে, স্টক এক্সচেঞ্জ এবং ইস্যুয়ার কোম্পানির সাথে করা লিস্টিং চুক্তিতে আইনগত ঘাটতি রয়েছে। ফলে লিস্টিং চুক্তির শর্ত ভঙ্গের পরও ইস্যুয়ার কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না স্টক এক্সচেঞ্জ।

বাজা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোনো কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করলে কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের লাভ বেশি হয়। আর বেশি ক্ষতি হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীর। তবে ডিএসই সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ প্রাধান্য না দিয়ে কাদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বা তালিকাচ্যুত করে কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের কেন লাভবান করছেন, সেটা বিএসইসিকে খতিয়ে দেখতে হবে।

প্রকাশিত : ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ০৬:৫১ পি. এম.

১৭/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: