২২ নভেম্বর ২০১৯, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

আসছে পাতাল মেট্রোরেল ॥ যানজট নিরসনে আরেকটি পদক্ষেপ

প্রকাশিত : ১৫ অক্টোবর ২০১৯
  • বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত হবে এই রেলপথ
  • ব্যয় হবে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা
  • আগামী বছর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ’২৬ সালের মধ্যে শেষ হবে
  • এমআরটি-এক প্রকল্পটি আজ একনেকের বৈঠকে তোলা হবে

রাজন ভট্টাচার্য ॥ রাজধানীবাসীর জন্য আরেকটি সুখবর। তা হলো দেশের প্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড বা পাতালরেল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ লাইনের কাজ শেষ হবে ২০২৬ সালের মধ্যে। প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা হবে নির্মাণ ব্যয়। ইতোমধ্যে প্রকল্পের নক্সার কাজও চূড়ান্ত হতে চলেছে। দ্রুতই নির্মাণ কাজ উদ্বোধনের তারিখ চূড়ান্ত হতে পারে। অর্থাৎ আগামী বছর আনুষ্ঠানিক নির্মাণ কাজ শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে সয়েল টেস্ট। এমআরটি-এক প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আজ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে তোলা হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের অন্যান্য উন্নত শহরের আদলে প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

কাজ শেষ হলে বদলে যাবে গোটা ঢাকা শহরের চিত্র। এখন যা সত্যিই কল্পনার জায়গায় তা সত্যি হয়ে সামনে আসবে কয়েক বছরের মধ্যেই। এক সময় আন্ডারগ্রাউন্ড রেললাইন নির্মাণের জন্য সরকার কাজ শুরু করলেও ইউটিলিটি সার্ভিসের কারণে তা থেকে সরে আসে।

সোমবার রাজধানীর কুড়িল বসুন্ধরা বাড্ডাসহ আশপাশের এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে এমআরটি-এক প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চলছে মাটি পরীক্ষার কাজ। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক নির্মাণ কাজ শুরুর আগে মাটি পরীক্ষা চলছে। অন্যান্য প্রকল্প থেকে এটি ব্যতিক্রম। তাই গভীর পর্যন্ত মাটি পরীক্ষা করা হবে। ধারাবাহিকভাবে চলবে মাটি পরীক্ষার কাজ।

কর্মকর্তারা জানান, যানজট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের বেশকিছু কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এরমধ্যে নক্সা, জমি অধিগ্রহণ, মাটি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন কাজ চলমান। একনেকে ওঠার আগে এসব কাজ করতে কোন বাধা নেই।

দুই ভাগে প্রকল্পের অবস্থান ॥ ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি)-এক এর আওতায় ৩১ দশমিক ২৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইনের দুটি অংশ রয়েছে। এর একটি বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার। এই লাইনে স্টেশন সংখ্যা হবে ১২টি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল-৩, খিলক্ষেত, যমুনা ফিউচারপার্ক, নতুন বাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা, হাতিরঝিল, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ ও কমলাপুর। নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত অপর লাইনের দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৩৬৯ কিলোমিটার। এই লাইনে নয়টি স্টেশনের মধ্যে রয়েছে নতুন বাজার, যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা, পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি, মাস্তুল, পূর্বাচল সেন্টার, পূর্বাচল সেক্টর-৭ ও পূর্বাচল ডিপো।

নক্সা শেষ পর্যায়ে ॥ প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এমআরটি-এক বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করেন, দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে ঢাকার যানজট নিরসন সম্ভব হবে না। তেমনি শহরের উপর মানুষের চাপও কমবে না।

এরই মধ্যে এই রুটের সম্ভাব্যতা যাচাইসহ বিভিন্ন সার্ভে শেষ হয়েছে। মূল নক্সা প্রণয়নের ৭০ ভাগের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ রুটের নির্মাণ কাজ শেষ হবে ২০২৬ সালের মধ্যে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৫১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। রুটের একটি অংশের ৩ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকার ঋণ চুক্তি গত ২৯ মে জাপান সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পাতাল রেল নির্মাণে তারা ভারতসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চায়। এরমধ্যে সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। ৫০ ফুটের বেশি গভীরে প্রতিটি টার্মিনাল হবে দৃষ্টিনন্দন। মাটির নিচে তিন তলার বেশি জায়গা নেয়া হবে। ওঠা-নামার জন্য থাকবে এসকালেটর ও লিফটের ব্যবস্থা। স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হবে ট্রেনের দরজা। আসা-যাওয়ার সুবিধার জন্য থাকবে পৃথক পৃথক প্লাট ফরম। র‌্যাপিড পাসের মাধ্যমে যাত্রীরা সপ্তাহ কিংবা মাসিক ভিত্তিতে টিকেট সংগ্রহ করতে পারবেন। উপস্থিত যাত্রীদের জন্য থাকবে আলাদা টিকেটের ব্যবস্থা।

এক কামড়া থেকে অপর কামড়ায় যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকবে ট্রেনে। থাকবে এসির ব্যবস্থা। মূল কথা হলো আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন লাইন হওয়ার কারণে প্লাট ফরম থেকে ট্রেনের প্রতিটি কামড়ায় থাকবে এসির ব্যবস্থা। স্টেশনের বাইরের অংশের দু’পাশে থাকবে দেয়াল। দেয়ালজুড়ে থাকবে লাইটের ব্যবস্থা। সিনিয়র সিটিজেন, নারী যাত্রী, প্রতিবন্ধী, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পৃথক আসন রাখার চিন্তা করা হচ্ছে। প্রতি স্টেশনে ট্রেন থামবে সর্বোচ্চ ৩০ সেকেন্ড। বিদ্যুত চালিত এই ট্রেনে ২০ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে সময় লাগবে সর্বোচ্চ ২০ মিনিট।

জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, শুধু পাতাল রেল এমআরটি লাইন-এক বা উড়াল মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই যানজট শেষ হবে না। যানজট নিরসনে প্রস্তাবিত ছয়টি এমআরটি লাইনের পুরোপুরি কাজ শেষ করতে হবে। এজন্য আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এরই মধ্যে উড়াল পথের পাশাপাশি পাতাল পথও থাকছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এর পুরো কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আশা করি সবকটি লাইনের কাজ শেষ হলে নগরীর যানজট সমস্যা অনেকটাই সমাধান হবে।

জানতে চাইলে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ সিদ্দিক বলেন, ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসন এবং সক্ষমতা বাড়াতে ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রোরুট সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী মেট্রোরেল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এসব মেট্রোরেলের রুটের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। উড়াল মেট্রোরেল নির্মাণের পাশাপাশি পাতাল মেট্রোরেলও নির্মাণ করা হবে। এমআরটি লাইন ১, ২, ৪ ও ৫-এ উড়াল পথের পাশাপাশি পাতাল পথও থাকছে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ আশীষ কুমার দে সরকারের যানজট নিরসনে পাঁচটি উড়াল ও পাতাল সড়ক নির্মাণের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আধুনিক এই সেবা দেয়া ছাড়া নগরীর যানজট সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনবহুল সিটিগুলোতে মেট্রো ও পাতাল রেল নির্মাণের মধ্য দিয়ে যানজট কমেছে। আমরাও আশাবাদী ২০৩০ সালের মধ্যে যদি সব প্রকল্পের কাজ শেষ হয় তাহলে যানজটের যন্ত্রণা থেকে সবাই মুক্তি পাবে। তবে ঢাকামুখী মানুষের ¯্রােত কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরী ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান তিনি।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকা মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার যানজট নিরসন ও পরিবেশ উন্নয়নে বর্তমান সরকার ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৬টি মেট্রোরেল সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পর্যায়ক্রমে সব প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হলে ঢাকার যানজট অনেকাংশে কমে আসবে। আমরা আশাকরি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে এসব প্রকল্প যতই ব্যয়বহুল হোক তা বাস্তবায়ন না করার কোন বিকল্প নেই।

পরামর্শক নিয়োগ ॥ গত বছরের অক্টোবর মাসে পাতাল মেট্রোরেল (এমআরটি-১) প্রকল্পে কারিগরি সহায়তার জন্য পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। জাপানের নিপ্পন কোই কোম্পানির নেতৃত্বে সাতটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কারিগরি সহায়তায় চুক্তি করেছে মেট্রোরেলের বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। তারা রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত পাতাল রেলপথ নির্মাণে পরামর্শক হিসেবে কাজ করবে।

জানা গেছে, জাপানের দুটি, ভারতের তিনটি, ফ্রান্স ও বাংলাদেশের একটি করে প্রতিষ্ঠান এমআরটি-১ প্রকল্পের বিস্তারিত নক্সা প্রণয়ন ও দরপত্র কাজে সহায়তা করবে। চুক্তিমূল্য ৫১৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এমআরটি-১-এর আওতায় কুড়িলের যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে দিয়ে বিমানবন্দর এবং পূর্বাচল; এ দুটি পথে মেট্রো রেলপথ নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিমানবন্দর রুটটি নির্মাণ করা হবে মাটির নিচে। পূর্বাচল রুটটি থাকবে মাটির ওপরে উড়াল সেতুর ওপর।

চুক্তি সই অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এমআরটি-১ নির্মাণ হলে রাজধানীর যানজট কমে আসবে। ওবায়দুল কাদের বলেন, ঢাকা একটি জনবহুল নগরী। যানজট প্রকট আকার ধারণ করেছে। পাতার রেল হলে যানজট কিছুটা কমে আসবে, যাত্রীদের সময় বাঁচবে। এমআরটি-১-এর আওতায় ১৬ দশমিক ৪০ কিলোমিটার রেলপথ আন্ডারগ্রাউন্ডে নির্মিত হবে।

ইতোমধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিল হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত যাচ্ছে মেট্রোরেলের কাজ দৃশ্যমান। যানজট নিরসনে সবচেয়ে আশার প্রকল্প এটি। কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রায় ২১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ প্রকল্পের উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে ৪৬ শতাংশ। চলতি মাসেই শুরু হচ্ছে এর বৈদ্যুতিক কাজ, নবেম্বরে বসবে চীন থেকে আসা রেললাইন। ইতোমধ্যে উত্তরাসহ বিভিন্ন অংশে শুরু হয়েছে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কাজ। দিয়াবাড়ি এলাকায় ডিপো ও ভূমি উন্নয়নের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক তিন সাত কিলোমিটার ভায়াডাক্ট এ স্টেশন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৫৫ শতাংশ। প্রকল্পটি উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ছিল। যার পরিধি বাড়িয়ে কমলাপুর পর্যন্ত করা হয়েছে। এটি এমআরটিÑছয় আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো রেলের সঙ্গে যুক্ত করার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকাশিত : ১৫ অক্টোবর ২০১৯

১৫/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: