১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

প্রকৃতি ও জীবনে হেমন্ত

প্রকাশিত : ১৪ অক্টোবর ২০১৯
  • শাকিল আহমেদ

ভোর থেকে হেমন্তের কুয়াশা নেমেছে মাঠে। বিন্দু বিন্দু শিশির জমে আছে ধান গাছের বুড়ো পাতায়। ক্ষেতের ওপর ওড়াউড়ি করছে গঙ্গাফড়িংয়ের দল। সোনা রং পাকা ধানের শীষে অলস বসে আছে সাদা রং প্রজাপতির মতো মথেরা বিন্দু বিন্দু শিশিরে ওদের ডানা ভেজা। ভেজা ডানায় ওরা ওড়ার ক্ষমতা হারিয়েছে। সোনালি ধানের ক্ষেত ডিঙিয়ে পূর্বদিগন্ত রাঙিয়ে উঠছে ভোরের সূর্য। হালকা শীত শীত ভোরের ভেতর মিষ্টি রোদের ওম, কি যে ভাললাগে!

ধীরে ধীরে কুয়াশা আর শিশির মিলিয়ে যেতেই দেখলাম, দিনাজপুর কাহারোলের পৌরিয়া গ্রামের এক মেঠো পথ বেয়ে কাস্তে হাতে দলবেঁধে ধান ক্ষেতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে একদল সাঁওতাল রমণী। দেখতে দেখতে ওরা নেমে পড়ল ধান কাটতে। মুঠো মুঠো ধানের গোছা, কচাৎ কচাৎ। সে ধান কাটার এক বিশেষ ছন্দ আছে। ধানের গোছা কেটে কেটে ক্ষেতেই শুইয়ে রাখা হচ্ছে। বাংলার অন্য গ্রামগুলোতেও হেমন্তে চলছে ঠিক একই দৃশ্য। কৃষক-কৃষাণীরা হেমন্তের দিনে যেন অন্য মানুষ। শ্রাবণের জলধারায় জমিন সিক্ত করে তারা শুধু ফসলই বোনে না, সেই সঙ্গে স্বপ্নও বুনে রাখে। সেসব স্বপ্নের ফসল কাটার দিন হলো হেমন্ত।

হেমন্ত ঋতুতে প্রকৃতি ও মানুষের রূপবদল বড় অপূর্ব। দিগন্ত বিস্তৃত মাঠজুড়ে কেবল হলুদ রঙের ধান আর ধান। দলে দলে মানুষজন সেসব ধান কাটে, আঁটি বাঁধে আর সেসব ধানের আঁটি বাগের দু’পাশে দাঁড়িপাল্লার মতো ঝুলিয়ে বাগ কাঁধে বাড়ি ফেরে। কোথাও বা সেসব ধানের আঁটি বোঝাই গরুরগাড়ি মেঠো পথের ক্যাচর ক্যাচর শব্দ তুলে গৃহস্থের বাড়ি বা ধানখোলার পথে চলে। গাড়িয়ালের মুখে থাকে ভাওয়াইয়া আর গরু তাড়ানোর আওয়াজ।

হেমন্তে গ্রামে আর একটি দৃশ্য চোখে পড়ে। গাছিরা কুয়াশা ভেঙে ধীরলয়ে হাঁটে, তর তর করে খেজুর গাছে ওঠে। ধারাল দা দিয়ে খেজুর গাছের মাথা চেছে রস নামানোর আয়োজন করে। হেমন্তের মাঝখান থেকেই শুরু হয় সেসব রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানানোর মহোৎসব। গাঁয়ের অনেক গৃহস্থ বাড়ির উঠানে বড় উনুন তৈরি করা হয়, তার ওপর তাপাল রেখে খেজুরের রস জ্বাল দেয়া হয়। রস জ্বালের ঘ্রাণে সারা গাঁ মৌ মৌ করে। এক সময় রস ঘন হতে হতে হয় খেজুরের গুড়, শেষে জমে হয় পাটালি। এক শ্রেণীর মানুষ খেজুরের গুড় তৈরি ও গুড় বিক্রিকে বেছে নেয় পেশা হিসেবে।

নতুন ধান ও চাল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে হেমন্তের হাত ধরে আসে শীতের আমেজ। গাঁয়ে গাঁয়ে শুরু হয় পিঠাপুলি বানানো। তাই শহরেও হেমন্তের মানুষেরাও সে স্বাদ থেকে বঞ্চিত থাকবে কেন? তাই শহরের পথে পথে শুরু হয় ‘স্ট্রিট কেক’ তথা ‘পথের পিঠে’ বানানো ও বিক্রির আয়োজন। এক শ্রেণীর মানুষ হেমন্ত থেকে শীত-বসন্ত পর্যন্ত জীবিকা হিসেবে বেছে নেয় পিঠে বানিয়ে বিক্রি করাকে। বলাবাহুল্য, সেসব পিঠার মধ্যে ভাপা আর চিতোই পিঠাই বেশি।

হেমন্ত এক মজার ঋতু। এ ঋতুর মধ্যেই যেন লুকিয়ে রয়েছে বাঙালী জীবনের সার্থকতা। কথায় বলে আমরা ‘মাছে ভাতে বাঙালী’। কথাটা হয়ত এককালে ঠিক ছিল। এখন উল্টে ভাতে মাছে বাঙালী বললেই ভাল মানায়। কেননা, মাছের চেয়ে ভাতই আমরা বেশি খাই। কথায় কি আসে যায়? হেমন্ত তো সেই মাছভাত খাওয়ারই ঋতু। দেশের অনেক বিল-ঝিল-হাওড়-বাঁওড় এ সময় শুকাতে শুরু করে। আর সেসব শুকাতে থাকা জলাশয়ে ধরা পড়তে থাকে মাছ। হেমন্তের অনেক মানুষ সেসব মাছ ধরতে নেমে পড়ে বিলে-ডোবায়। নানা রকম দেশী মাছে বাজার তেঁতে উঠে। আইড়, বোয়াল, চিতল, বাঘাইড়, পুঁটি, ট্যাংরা- কত রকমের মাছ যে ধরা পড়ে। হাওড়-বাঁওড়-বিলে তাই হেমন্তে রচিত হয় দলে দলে ধান কাটার পাশাপাশি মাছ ধরাও। একদিকে নতুন চালের গন্ধমাখা ভাত অন্যদিকে টাটকা দেশী মাছের ঝোল।

বিজ্ঞানের কল্যাণে এখন অনেক শীত সবজিও হেমন্তে উঠতে শুরু করেছে। আগাম বাঁধাকপি, ফুলকপি, পালংশাক, মুলা- কি নেই হেমন্তের বাজারে? একদিকে কৃষক ধান কেটে গোলায় তোলে, অন্যদিকে চৈতালি বা রবি ফসল বোনার কাজ শুরু করে। পাহাড়ের জুমিয়া কৃষকরা হেমন্তে শেষ করে তাদের জুমের কাজ, জুমের ধান কেটে চলে চাল বানানোর প্রক্রিয়া। এক কথায়, এক মহাব্যস্ততায় কাটে হেমন্ত কৃষকের দিনগুলো।

হেমন্ত যে শুধু নবান্নের ঋতু, তা ঠিক নয়। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ- এ দুই মাস মিলেই হেমন্তের ব্যাপ্তি। তবে এদেশে হেমন্ত যেন এক ক্ষণজন্মা ঋতু। কখন আসে কখন যায়- বোঝাই যায় না। বর্ষার জলকাদা শুকাতে দেখলেই টের পাই হেমন্ত এসে গেছে। কিন্তু এখন বর্ষা ঋতু ছাড়াই বৃষ্টি হচ্ছে, বৈশাখ মাস ছাড়াই ঝড় হচ্ছে। তবে হেমন্ত প্রকৃতির এ আচরণ শুধু একালেই নয়, সেকালেও ছিল।

হেমন্ত আসে, হেমন্ত যায়। হেমন্ত মানেই আমরা এখন অনেকেই ভাবি নবান্নের ঋতু। কিন্তু হেমন্ত যে এক বহুরূপী প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ এক ঋতু, সে কথা ভুলে যাই। খানিকটা ঠা া, খানিকটা গরম, অনেকটাই নাতিশীতোষ্ণ- এ রকম এক আবহাওয়ার ঋতু হলো হেমন্ত। কখনও ঝড়-মেঘ, কখনও কুয়াশা। সবুজ ধানক্ষেতগুলো ধীরে ধীরে সোনারঙে বদলে যাওয়া। অতিথি পাখিদের আগমন শুরু। গাঁয়ে গাঁয়ে খেজুর গুড় আর পিঠের ঘ্রাণ। ঝকমকে তাজা মাছে সাজানো জেলেদের ডালা। এই তো আমাদের অনেক রূপের হেমন্তের প্রকৃতি আর সে প্রকৃতির আশ্রয়ে আমরা একটু অন্যরকম হই হেমন্তের মানুষগুলো। কিন্তু ভয় হয়, যেভাবে পৃথিবীর জলবায়ু বদলাচ্ছে তাতে আগামীতে আমরা আমাদের এই আপন হেমন্তকে খুঁজে পাব তো!

প্রকাশিত : ১৪ অক্টোবর ২০১৯

১৪/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: