১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

মেধা ও মননের তীর্থস্থান বুয়েটে মধ্যযুগীয় নৃশংসতা

প্রকাশিত : ১১ অক্টোবর ২০১৯
  • নাজনীন বেগম

এই মুহূর্তে দেশে চলছে বিক্ষোভ, আন্দোলন। এক অনাকাক্সিক্ষত দুর্যোগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চ শিক্ষার পাদপীঠই নয় অসংখ্য, উদীয়মান তরুণের স্বপ্নের পবিত্র অঙ্গনে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা যে এত তীব্র হতে পারে সেটা সত্যিই এক মর্মস্পর্শী হৃদয় বিদারক অনুভব। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার রায়ডাঙ্গা গ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান আবরার চির নিদ্রায় শায়িত হলো উন্মত্ত সহিংসতার নৃশংস ছোবলে। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার মেধা ও মননের অভাবনীয় যোগ্যতায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে দামী বিষয় ত্রিপলিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। একজন দক্ষ প্রকৌশলী হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা নিয়ে যারা এখানে ভর্তির যোগ্য বিবেচিত তারাও জাতির সুযোগ্য সন্তান এ কথাও বলার অপেক্ষা রাখে না। যেখানে শুধু পড়াশোনা আর জ্ঞানচর্চায় নিজেকে নিঃশর্তে সমর্পণ করার কথা সেখানে এত অরাজকতা, পৈশাচিকতা, মধ্যযুগীয় বর্বরতার নজির উঠে আসবে তাও এই পবিত্র শিক্ষাঙ্গনটির এক অশনি সঙ্কেত। দেশের ভাবী প্রজন্মের জীবন গড়ার এই তীর্থ ভূমিটি কোন্ অশুভ ছায়ায় তার সমস্ত মাঙ্গলিক শক্তিকে হারাতে বসেছে সেটা যথার্থভাবে খতিয়ে দেখতে দেরি করলে আরও ভয়ঙ্কর মহাবিপদ ভবিষ্যতে মোকাবেলা করা ছাড়া অন্য কোন পথও থাকবে না। দেশাত্ম বোধের চেতনা যদি জীবন গড়ার প্রয়োজনীয় সময়ে অঙ্কুরিত হতে দেরি করে তাও কোন জাতির জন্য শুভসঙ্কেত নয়। তাই সুস্থ এবং সচেতন স্বদেশ প্রেমের রাজনীতির বোধ কেন আজ দিশেহারা, পথভ্রষ্ট, অমানবিকতার নৃশংস চক্রব্যূহে আবদ্ধ? দুষ্ট ও নষ্ট রাজনীতির চর্চা, লালন আর শিকার হওয়ার মতো মহাদুর্যোগ থেকে কিভাবে মেধা ও মননকে সুস্থ আর মানবিক বোধের দিকে স্বচ্ছন্দ গতিতে নিয়ে যাবে তা ভাবার সময় এসে গেছে। কোন শিক্ষার্থীরই শুধু নয় অভিভাবকেরও স্বপ্ন আর আকাক্সক্ষার জায়গায় বুয়েটের স্থান যে কোন শীর্ষে তা নতুন করে বলারও কিছু নেই। লেখাপড়ার প্রতি নিবেদিত একজন নিষ্ঠাবান ছাত্র মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে নিতে কোন এক সমৃদ্ধি শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশের নিশ্চয়তা পেতে যে মাত্রায় মনোসংযোগ করে তেমন সাধনায় কাউকে অন্য কোন দিকে নজর দেয়ার সুযোগও থাকে না। সারাদেশ থেকেই শুধু নয় অন্যান্য জায়গা থেকেও অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে মেধা ও মননের সুষ্ঠু প্রতিযোগিতায় বুয়েটে জায়গা করে নেয়া সেও এক অসাধারণ প্রাপ্ত। যোগ্যতম বিবেচনায় প্রথম সারিতে উঠে যাওয়ার অনন্য কৃতিত্বও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর অভাবনীয় সাফল্য। এমন মর্মান্তিক ঘটনার পর জানা যায় আবরার শুধু বুয়েটেই প্রথম সারিতে উঠে আসেনি ঢাকা মেডিক্যালেও ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল। বাংলাদেশের আর এক অনন্য চিকিৎসালয় ঢাকা মেডিক্যালও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের এক অনবদ্য পীঠস্থান। বিদ্যা অর্জনের এমন সব উচ্চতর পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার পরিবেশ যে কোন্ মাত্রায় তাও বলার অপেক্ষা রাখে না।

উচ্চ শিক্ষার পবিত্র অঙ্গনগুলো শুধু ব্যক্তিক সফলতা নয় পুরো জাতি গঠনের এক সম্ভাবনাময় আলোকিত জগত। তেমন উদ্ভাসিত ভবনকে কি মাত্রায় কলুষিত করা হচ্ছে তা ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়।

মেধাবী ছাত্র নৃশংসভাবে খুন হওয়া আবরার তার নিজস্ব বোধ আর চেতনায় যেভাবেই নিজেকে তৈরি করুক সেটা তার ব্যক্তিক এবং একান্তই আপনার। যে কোন মানুষ নিজের মনন আর মেধায় একটি আদর্শিক বোধ লালন করে। সেখানে ভাল-খারাপ একেবারে আপেক্ষিক। শুধু তাই নয় কোন চেতনার ব্যাপারে সে তার যৌক্তিক মতামতও খাড়া করে, যা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আবরার তার ফেসবুক পেজে যে মন্তব্যটি করেছিল তা কতখানি সহনীয় সে পর্যায়ে না গিয়েও বলা যায় সেখানে অন্য আর একজনের দ্বিমত থাকা শুধু স্বাভাবিকই নয় নাগরিক অধিকারও বটে। যে স্বাধীনতা আবরারেরও থাকা বাঞ্ছনীয়। ন্যায়-অন্যায় বিষয়টি যদি সামনে আনতে হয় তাহলে মানবিক আর যৌক্তিক অভিব্যক্তিতেও তা সমাধান অসম্ভব ছিল না। যেটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের নেতাদের এক আলোচনায় বলতে দ্বিধা করেননি। ভিন্ন মতের কারণে তাকে নৃশংসভাবে অত্যাচার করে মেরে ফেলতে হবে। এমন অমানবিক ব্যাপারকে কোনভাবেই মেনে নেয়া যাবে না। ঘটনাটা শোনার পর প্রধানমন্ত্রীর তাৎক্ষণিক নির্দেশে জড়িতদের আটক করা হয়। শুধু তাই নয় উপযুক্ত শাস্তিও নিশ্চিত করা হবে বলে তাঁর দৃঢ় অভিমত প্রকাশ পায়। দুঃখ-বেদনায় শোকাহত প্রধানমন্ত্রী বলেন- আমি শুধু প্রধানমন্ত্রীই নই একজন মা হিসেবেও এই কষ্টকর অনুভবকে অনুধাবন করছি। তোলপাড় হওয়া এমন নৃশংস ঘটনায় উপাচার্যের অনুপস্থিতিকেও তিনি মেনে নেননি। একজন ছাত্রের এমন কষ্টকর অপমৃত্যুর চাইতে অন্য কোন প্রয়োজনীয় কাজ ভিসির থাকতে পারে কিনা তেমন প্রশ্ন ছাত্রছাত্রী থেকে সারা দেশকে উত্তাল করে তোলে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ভালভাবে নেননি প্রায় ৪০ ঘণ্টা পর ভিসির ঘটনাস্থলে আসাটা।

ভিসি নিজেও বিব্রতকর অবস্থায় এমন প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। অত্যন্ত দুর্বল যুক্তিতে ছাত্রছাত্রীদের জন্যই কাজে ব্যস্ত ছিনেন এমন বক্তব্যে শিক্ষার্থীরা আরও ক্ষুব্ধ আর উত্তাল হয়ে ওঠে। উপাচার্য, প্রক্টর আর প্রভোস্টের বিনা অনুমতিতে ক্যাম্পাসে দাঙ্গা পুলিশের অনুপ্রবেশও সবাইকে হতবাক করে দেয়। যদিও দাঙ্গা পুলিশ কোন তাৎক্ষণিক কার্যক্রমে যায়নি। সাধারণত সাংঘর্ষিক কোন অস্থিরতায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আবেদনে দাঙ্গা পুলিশ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করার অনুমতি পায়। তবে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও এই দাঙ্গা পুলিশের ব্যাপারে কোন ধরনের মন্তব্য আসেনি। বর্বরোচিত সহিংস আক্রমণগুলো মানুষের পশুবৃত্তির এক উন্মত্ত উল্লাস। যা শুধু বিচার, শাস্তি, বিক্ষোভ, আন্দোলন আর প্রতিবাদ প্রতিরোধে জেগে ওঠে না। ভেতরের অন্তর্নিহিত মানবিক বোধ, পরমতসহিষ্ণুতা, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, ন্যায়-অন্যায় বিচারে সহজাত প্রবৃত্তি তার চেয়েও বেশি ব্যক্তিক সচেতন শুভশক্তির নিয়ত চর্চা সবই অত্যন্ত জরুরী।

ক্ষত-বিক্ষত যন্ত্রণায় কাতর মমতাময়ী জননীর করুণ আর্তি ছেলের অন্তিম শয়ানের কাছে- আমার বাবা, ওরা তোমায় কোথায় মেরেছে? কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেলা? এমন বুকভাঙ্গা আর্তনাদে ছেলের শবযাত্রার শেষ লগ্নে আকাশ বাতাস কেঁপে ওঠে মায়ের আহাজারিতে। যে সম্ভাবনাময় মেধাবী সন্তানকে তিল তিল করে বড় করেছেন তার আকস্মিক ও সহিংস শেষ যাত্রাকে কিভাবে সামাল দেবেন সদ্য পুত্রহারা এই স্নেহময়ী জননী। অপরাধীরা আটক হলো, রিমান্ডে গেল, নিজের দল থেকে বহিষ্কারের লাঞ্ছনাও কপালে জুটল- তার পরেও সন্তান শোক ভোলানোর মতো শক্তি কিসের বিনিময়ে আসবে জানি না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সফর শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে গ্যাস ও পানি নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলাপ আলোচনার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তবে সবাইকে আশ্বস্ত করা হয় গ্যাস নয় এলপিজি বিদেশ থেকে এনে ভারতে রফতানি করা হবে। তবে সাম্প্রতিক বুয়েটে ঘটে যাওয়া পাশবিক ঘটনাকেই অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে স্পষ্ট করেন। দৃঢ় কণ্ঠে বলেন অপরাধী যেই হোক সর্বোচ্চ শাস্তি থেকে কেউই রেহাই পাবে না। ছাত্র রাজনীতির ব্যাপারে নিজের মত ব্যক্ত করতে গিয়ে বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন ও মুুক্তিযুদ্ধসহ অন্যান্য ঐতিহাসিক সংগ্রামে সময়ের ছাত্রদের যে আদর্শিক লড়াই তাকেও ভুলে গেলে চলবে না বলে মন্তব্য করেন। তবে যদি কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনে ছাত্র রাজনীতিকে বন্ধ করতে চায় সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। আর এভাবে বুয়েটও সিদ্ধান্ত নিতে কোন আপত্তি থাকার কথা নয়। সব ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য ছিল তিনি নির্বিকার ও নির্লিপ্ত হয়ে দেশ চালান না। জনগণও দেশের স্বার্থ নিয়ে তিনি সব সময়ই সজাগ এবং উদগ্রীব। সচেতন দায়বদ্ধতা, সার্বক্ষণিক নজরদারি সব মিলিয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দিতে তাঁর কোন অসুবিধাই হয় না। বর্তমানে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মাদক ও ক্যাসিনোর ব্যাপারে যে শুদ্ধি অভিযান তা চলতে কোন বাধা বিপত্তিকে তোয়াক্কা করা হবে না। অপরাধী হিসেবে প্রত্যেককেই তার সর্বোচ্চ শাস্তি মেনে নেয়া ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা থাকবে না। একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে সব ধরনের কর্মপ্রকল্প তার সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে এগিয়ে নিতে তার অবস্থান থাকবে দৃঢ় অনমনীয়।

লেখক : সাংবাদিক

প্রকাশিত : ১১ অক্টোবর ২০১৯

১১/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: