১৭ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

অপরাধী অপরাধীই ॥ আবরার ফাহাদ হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি

প্রকাশিত : ১০ অক্টোবর ২০১৯
অপরাধী অপরাধীই ॥ আবরার ফাহাদ হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ষ বুয়েট চাইলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে
  • গ্যাস নয়, এলপিজি এনে রফতানি করা হবে

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, অপরাধী যারা তারা অপরাধীই। অপরাধী কে কোন্ দলের, সেটা আমি কখনও দেখি না। অপরাধীদের বিচার হবেই। আর দেশে চলমান মাদক-সন্ত্রাস-অপকর্মের বিরুদ্ধে অভিযানও অব্যাহত থাকবে। বুয়েটের ছাত্র হত্যার সঙ্গে জড়িতদেরও যত রকমের সর্বোচ্চ শাস্তি রয়েছে তা দেয়া হবে। আমরা কখনও অতীত সরকারের মতো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেইনি, দেব না। শুধু বুয়েটেই নয়, সারাদেশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হলে হলে তল্লাশি করে কোথাও কোন ধরনের অপরাধমূলক কাজ হচ্ছে কি না, তা খুঁজে বের করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেন তিনি।

বুধবার গণভবনে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সফর পরবর্তী জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে এখন একটা ঘটনা ঘটেছে বলেই ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে হবে কেন? সামরিক স্বৈরশাসকরা এসেই ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতাসহ ছাত্ররাই সব আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকায় থাকে। আমিও ছাত্ররাজনীতি করেই এখানে এসেছি। তাই ছাত্ররাজনীতি বন্ধ নয়, তবে বুয়েটসহ কোন প্রতিষ্ঠান চাইলে নিজেরা সেটি করতে পারে। আর যেখানেই অন্যায় সেখানেই চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে। অন্যায়, সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে। যেখানে যেখানে সমস্যা রয়েছে, সেখানে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ভারতের সঙ্গে গ্যাস ও নদীর পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি নিয়ে বিএনপি নেতাদের সমালোচনার জবাবে তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, দেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করে দেবে, এটা কখনও হতে পারে না। আমরা বিদেশ থেকে এলপিজি গ্যাস এনে প্রক্রিয়াজাত করে ভারতে রফতানি করব। এটা প্রাকৃতিক গ্যাস নয়। অন্য পণ্য যেমন আমরা রফতানি করি ঠিক তেমন। এটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কিছু নেই। বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে ভারতকে ‘অত্যন্ত নগণ্য’ পরিমাণ পানি দেয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা যে পানি দিচ্ছি, তার পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। এটা নিয়ে কেন এত চিৎকার, আমি জানি না। যারা ক্ষমতায় থাকতে ন্যায্য হিস্যার দাবি করতে ভয় পায়, ভারত সফরে গিয়ে গঙ্গার পানি বণ্টনের কথা বলতেই ভুলে যায়, সেই বিএনপির মুখে এসব সমালোচনা মানায় না। সম্প্রতি ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফল নিয়ে অর্জিত সাফল্যগুলো তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হলেও প্রশ্নোত্তরপর্বে সাংবাদিকদের প্রশ্নে ঘুরে ফিরেই সম্প্রতি বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকা-, চলমান সন্ত্রাস-মাদকবিরোধী শুদ্ধি অভিযান এবং ছাত্ররাজনীতির বিষয়টিই প্রাধান্য পায়। তবে প্রতিবারের মতো এবারও সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নেরই হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁরা ছাড়াও সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনের আগে সাংবাদিকদের মধ্যাহ্ন ভোজে আপ্যায়িত করেন প্রধানমন্ত্রী।

যত রকমের উচ্চ শাস্তি আছে, এদের হবে ॥ বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকা- নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তাঁর কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করে বলেন, কেউ যদি কোন অপরাধ করে, সে কোন দল, কী করে না করে, আমি কিন্তু সেটা দেখি না। আমার কাছে অপরাধী অপরাধীই। আমরা অপরাধী হিসেবেই দেখি। এ নৃশংসতা কেন? এই জঘন্য কাজ কেন? এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। যত রকমের উচ্চ শাস্তি আছে সেটা দেয়া হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। দল-টল বুঝি না। অপরাধের বিচার হবেই।

আওয়ামী লীগের কেউ এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে, তা কখনই মেনে নেবেন না মন্তব্য করে সরকারপ্রধান বলেন, ঘটনা জানার পর তিনি সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগকে ডেকে বলেছেন, জড়িতদের যেন বহিষ্কার করা হয়। এখানে আমি বিবেচনা করব না কিসের ছাত্রলীগ। অপরাধী অপরাধীই। অন্যায় করেছে, সে অন্যায়কারী। তার বিচার হবে। কারও দাবি-টাবির অপেক্ষায় থাকি না। আগেই আমি নির্দেশ দিয়েছি জড়িতদের গ্রেফতার করতে।

ফুটেজ সংগ্রহে বাধা দিল কারা? ॥ সাংবাদিকদের এ সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বুয়েটে যে ঘটনা ঘটেছে, এ ঘটনা খুব সকাল বেলা জানার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলাম আলামত সংগ্রহ করার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলেছিলাম যে, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে। তারা সেখানে পৌঁছে যায়। আলামত সংগ্রহ করে এবং সিসিটিভি ফুটেজগুলো দীর্ঘসময় ধরে সংগ্রহ করে। কিন্তু আমার প্রশ্ন, ফুটেজ সংগ্রহে বাধা দিল কারা?

তিনি বলেন, যখন পুলিশ সিসি ক্যামেরা থেকে ফুটেজ হার্ডডিস্কে নিয়ে আসছে তখন তাদের ঘেরাও করা হলো। তাদের ফুটেজ নিয়ে আসতে দেয়া হবে না। আইজিপি (পুলিশ প্রধান) যোগাযোগ করে বলল, আমাদের লোকদের আটকে রেখে দিয়েছে। আলামত নিয়ে আসতে দিচ্ছে না। ফুটেজগুলো আনতে দেবে না কেন? আন্দোলনকারীরা নাকি বলছে, ফুটেজগুলো পুলিশ নষ্ট করবে! তিনি বলেন, পুলিশ গেছে আলামত সংগ্রহ করতে। ডেডবডির যাতে ময়নাতদন্ত হয়, সেই ব্যবস্থা করা হলো। ছাত্ররা রাস্তায় নামার আগেই জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া, কোন রুম, কোথায়, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, জড়িত সবকটাকে গ্রেফতার করতে নির্দেশ দেই। পুলিশ যে কটাকে হাতে পেয়েছে সবকটাকে গ্রেফতার করেছে।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় প্রশ্ন রেখে বলেন, পুলিশকে আসতে দেবে না, আলামত নিতে দেবে না কেন? আইজিপিকে বললাম- ‘বলা যায় না এর মধ্যে কী যারা ঘটনা ঘটিয়েছে তারা আছে? ফুটেজ পেলে পরে তারা ধরা পড়ে যাবে এজন্য কী তারা বাধা দিচ্ছে? পরে পুলিশ ফুটেজগুলো সংগ্রহ করে এবং একটা কপি কর্তৃপক্ষকে দিয়ে আসে। সেগুলো দেখে শনাক্ত করার দরকার ছিল, যেটা করা হচ্ছে এখন।

শেখ হাসিনা বলেন, কে ছাত্রলীগ, কে ছাত্রদল, কে কী করে আমি সেটা বিবেচনা করিনি। আমি বিবেচনা করেছি অন্যায়ভাবে একটা ২১ বছরের ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে দেখা গেছে, বাইরে অত ইনজুরি নেই, সমস্ত ইনজুরি ভেতরে। যে জিনিসটা আমার মনে পড়ল ২০০১ (বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে) সালে বহু নেতাকর্মীকে এমনভাবে পিটানো হতো। বাইরে থেকে ইনজুরি নেই, তারা মারা যেত। তাই স্বাভাবিকভাবেই এটা সন্দেহের বিষয়, এরা কারা? প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতায় থাকলে অনেকে দল করতে আসে। কিছু লোক তো আছে ‘পার্মানেন্ট গবর্মেন্ট পার্টি’। এরকম কিছু থাকে। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটায় তারা আমার পার্টির, এটাতো আমি কখনোই মেনে নেব না। কারা পুলিশকে ফুটেজ নিতে বাধা দিয়েছে, তা খুঁজে দেখতে তিনি বলেন, ফুটেজ হাতে পাওয়ার পর বেছে বেছে জড়িতদের বের করতে পুলিশের জন্য সুবিধা হয়েছে। কিন্তু এটা একটু খোঁজ করেন, কেন বাধা দেয়া হলো? তিনটে ঘণ্টা সময় কেন নষ্ট করল? আমি জানি না এর উত্তর আছে কিনা। আর আন্দোলনই বা কিসের জন্য? জড়িতদের বিচার হবেই।

ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করব কেন? ॥ সংবাদ সম্মেলনে সরকারীভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের বিপক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের জন্য ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করলে তাতে সরকার হস্তক্ষেপ করবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামরিক শাসকরা এসেই ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে। আর আমি নিজেও ছাত্ররাজনীতি করেই এ পর্যন্ত এসেছি। আমি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ কেন করব? তবে কোন প্রতিষ্ঠান চাইলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে। বুয়েটও চাইলে সেটি করতে পারে। তিনি বলেন, কোন কিছু হলেই ছাত্ররাজনীতি বন্ধের কথা ওঠে। এই যে বুয়েটে হত্যাকা- হলো, এখানে কী কোন রাজনীতি আছে? যারা অপরাধ করেছে তারা কে কোন দল সেটি আমি বুঝি না।

ছাত্রলীগের রাজনীতি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ছাত্রলীগ সব সময় একটা আলাদা স্বাধীন সংগঠন ছিল। তবে মূল দল ছাত্রলীগকে নির্দেশনা দেয়। ছাত্রদের নষ্ট পলিটিক্স জিয়াউর রহমান চালু করেছিলেন। আমাদের গঠনতন্ত্র দেখলে দেখবেন ছাত্রলীগ আমাদের অঙ্গ সংগঠন না। আর এই যে সন্ত্রাসী কর্মকা- ঘটেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে সংগঠন করা নিষেধ আছে। বুয়েট যদি মনে করে তারা করতে পারে।

তিনি বলেন, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ এটা তো সামরিক স্বৈরাচারদের কথা। আমাদের দেশের অসুবিধা হলো সামরিক স্বৈরশাসকরা এসে তাদের (ছাত্র) লোভী করে গেছে। সেটি আসলে নষ্ট রাজনীতি হয়ে গেছে। সেখান থেকে আমরা স্বাভাবিক অবস্থায় ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনছি। তিনি বলেন, একটা ছাত্রের পেছনে সরকার কথা টাকা ব্যয় করছে একটু হিসাব করে দেখুন। স্বাধীনতা ভাল, কিন্তু সেই স্বাধীনতা বালকের জন্য নয়। যে স্বাধীনতার মর্যাদা দিতে পারবে তার জন্য স্বাধীনতা ভাল।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, দেখা গেছে একটা রুম নিয়ে কেউ মস্তানি করছে। দশ-বিশ-ত্রিশ টাকা ভাড়া দিয়ে রুম দখল করে মস্তানি করছে। কিন্তু জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করা হচ্ছে তাদের (ছাত্র) পেছনে। এটি আমি মানব না। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সার্চ (তল্লাশি) করার নির্দেশনা আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দেব। তল্লাশি করে অপরাধীদের খুঁজে বের করা হবে। কোন দল-টল আমি বুঝি না।

মানুষের ভাল-মন্দ দেখার দায়িত্ব আমার ॥ দেশকে, দেশের মানুষকে আপন বলে মনে করেন বলেই কখন, কোথায়, কী ঘটছে তা কঠোরভাবে নিজ দায়িত্বে নজরদারি করেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আমি মনে করি এই রাষ্ট্র, এই দেশ আমার। এই দেশের মানুষ আমার মানুষ। তাদের ভাল-মন্দ দেখার দায়িত্ব তো আমারই। আমি যতক্ষণ পারি, সেই দায়িত্ব পালন করি। এটা নিয়ে এত প্রশ্ন কেন, সেটা আমার বোধগম্য নয়।

সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, কোন অপরাধ ঘটলে অপরাধীদের ধরতে প্রধানমন্ত্রীকেই কেন নির্দেশনা দিতে হয়? কিংবা ছাত্রলীগের কেউ অপরাধ করলে তাকে বহিষ্কার করতেও কেন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই নির্দেশ আসতে হয়?

এ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি বুঝি না, কেন বারবার এ প্রশ্ন সামনে আসে। আমি সরকারপ্রধান, দেশের কোথাও কিছু ঘটলে অবশ্যই তা দেখার দায়িত্ব আমার আছে। আমি তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না। তিনি বলেন, মাথা থাকলে মাথাব্যথা থাকবেই। আমি সরকারপ্রধান। ফলে কোথায় কী ঘটছে, সেদিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখা আমার কর্তব্য। আমাকে তো এটা কেউ চাপিয়ে দিচ্ছে না। আমি নিজের অনুভূতি ও কর্তব্যবোধ থেকেই এটা করি। কখন কে কী বলবে, ওই চিন্তা কখনও করি না। দেশের জন্য সবসময় ভাবি বলেই সব কাজ করি। এ সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, এর আগে একজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, ১২টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে রাতে ব্যস্ত হতেন। এগুলো দেখে আপনাদের (সাংবাদিক) বদঅভ্যাস হয়ে গেছে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ রাষ্ট্র চালানো দেখেছেন আপনারা, তাই অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে, আমার এটাই মনে হচ্ছে। আমি সবদিকে নজর না রেখে যদি খালেদা জিয়ার মতো এখন বলতাম পানির কথা বলতে ভুলেই গেছি, তাহলে নিশ্চয় খুশি হতেন। আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না।

দেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করে না ॥ ভারতের সঙ্গে গ্যাস দেয়ার চুক্তি হয়েছে, এতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষা হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এলপিজি গ্যাস আমাদের দেশে উৎপন্ন হয় না। এখন এটা আমদানি করছি। রান্নায় এলপিজি ভরে সিলিন্ডার সরবরাহ করছি। আগে স্বল্প পরিমাণে আমাদের এলপিজি উৎপাদন হতো। আমদানিকৃত গ্যাস গ্রামে বিভিন্ন কোম্পানি সরবরাহ করছে। আগে ১০ কেজির সিলিন্ডার ১৬শ’ টাকায় দামে বিক্রি হতো। বাজার উন্মুক্ত করে দেয়ায় এখন তা কমে ৯শ’ টাকা হয়েছে। এখন অনুমোদিত ২৬টি কোম্পানি কাজ করছে।

দিচ্ছি সেটি এলপিজি। আমাদের দেশে যেমন সরবরাহ করছি সেটিই ত্রিপুরায় দিচ্ছি। যারা এর বিরোধিতায় সোচ্চার মানে বিএনপিকে ২০০১ সালের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। তখন আমেরিকা গ্যাস বিক্রির জন্য বলেছিল, আমি বলেছিলাম দেশের চাহিদা মিটিয়ে, ৫০ বছরের রিজার্ভ রাখার পর যদি উদ্বৃত্ত থাকে আমরা তারপর বিক্রি করব। যে কারণে ২০০১ সালে আমরা ক্ষমতায় আসতে পারিনি। আর এখন যারা গ্যাস বিক্রি করে দিচ্ছে বলে নানা কথা বলছে, তারাই তখন গ্যাস দেবে বলে মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সঙ্গে আমরা বসেছিলাম। আমি গ্যাস বিক্রি করতে রাজ হইনি বলে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু খালেদা জিয়া সেখানে থেকে তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও আমাকে গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমাকে আমেরিকায় দাওয়াত নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানেও আমি একই কথা বলেছিলাম। আমি তখন বলেছিলাম বিএনপি গ্যাস দিতে পারবে না। কারণ আমাদের অত গ্যাস ছিল না। সেটিই পরে প্রমাণ হয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের কথা যাদের মনে আছে তারা জানেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা আমাদের একটা ঘাঁটি ছিল। সেখানে বিপুল পরিমাণ আমাদের শরণার্থীকে তারা আশ্রয় দিয়েছিল। সেখান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করা হতো। ত্রিপুরা আমাদের শক্তি ছিল। তিনি বলেন, আমরা বড় আকারে এই এলএমজি গ্যাস আমদানি করছি। এরপর ভ্যালু এ্যাড করে সেটি রফতানি করছি। আমাদের যে রফতানি আয় সেখানে নতুন আরেকটি খাত যোগ হলো। দেশের স্বার্থ বিক্রির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে সেটি হতে পারে না। বরং যে যে সমস্যাগুলো ছিল সেগুলো একে একে সমাধান করেছি। তাঁর সফরে ভারতের সঙ্গে যেসব চুক্তি হয়েছে, তার সব জায়গায় বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে।

ভারতকে নগণ্য পরিমাণ পানি দেয়া হচ্ছে ॥ বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে ভারতকে ‘অত্যন্ত নগণ্য’ পরিমাণ পানি দেয়া হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যে পানি দিচ্ছি, তার পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। এটা নিয়ে কেন এত চিৎকার, আমি জানি না।

এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল খাগড়াছড়ি। এটা খাগড়াছড়ি থেকে মাটিরাঙ্গা হয়ে ভারতের সীমান্তবর্তী নদী। ওখানকার ৪০ কিলোমিটার বাংলাদেশের অংশে, একটি অংশ সোনাগাজী হয়ে সাগরে চলে গেছে। এর বড় অংশ বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তে। সীমান্তবর্তী নদীতে দুই দেশের সমান অধিকার থাকে। পদ্মা, মাতামুহুরীসহ এমন সাতটি সীমান্তবর্তী নদী আছে। আমরা আলোচনা করেছি, যৌথভাবে এসব নদী ড্রেডিং করব। আমরা এই নদী নিয়ে কাজ করছি। ফেনী নদীর পানি ভারতকে দেয়া প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ভারতের রামগড়ের সাবরম এলাকায় খাবার পানির খুব অভাব। তারা আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে পানি তোলে। ভারতের সঙ্গে খাবার পানির চুক্তি হয়েছে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, পাহাড়টার নাম ভগবান টিলা। এটি বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তে অবস্থিত। আমরা যে পানি দিচ্ছি, তার পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। এটা নিয়ে কেন এত চিৎকার, আমি জানি না। কেউ যদি পানি পান করতে চায়, আমরা যদি তা না দিই, সেটা কেমন হবে?

বিএনপি নেতাদের কাছে প্রশ্ন রেখে শেখ হাসিনা বলেন, ‘খালেদা জিয়া যখন ভারত গিয়েছিলেন, তখন কি তারা গঙ্গা চুক্তি করতে পেরেছিলেন? ফিরে আসার পরে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করল, খালেদা জিয়া বলেছিলেন যে, ভারতে গিয়ে গঙ্গার পানির কথা বলতে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। যে দল দেশের স্বার্থের কথা ভুলে যায়, তারা এত বড় কথা বলে কীভাবে?’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্থলসীমান্ত চুক্তি করলেন, তখন পত্রিকা পড়লে দেখবেন অনেকে বলেছে, দেশ বেঁচে দিল। কিন্তু তিনি আইন পাস করলেন। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর আমরা সীমানা নির্দিষ্ট করলাম। আমার প্রশ্ন, তারা (বিএনপি) কেন সীমানা নির্দিষ্ট করেনি? আমার স্বাধীন দেশ, আমার সীমানা নির্দিষ্ট থাকবে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আমার প্রক্রিয়া শুরু করি। ভারতের সংসদে এ নিয়ে সর্বসম্মতভাবে আমাদের পক্ষে একটি আইন পাস হয়েছে। আমরা সীমানা নির্দিষ্ট করেছি। তারা তো ক্ষমতায় থাকতে ভোগবিলাস আর নিজেদের আখের গোছানো ছাড়া দেশের জন্য কিছুই করেনি।

চলমান শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত থাকবে ॥ নিজের ঘর থেকে শুরু করে সন্ত্রাস-মাদক ও বিতর্কিত কর্মকা-ের বিরুদ্ধে চলমান শুদ্ধি অভিযানের কম্পন কতদিন স্থায়ী হবে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে। যেখানেই অনিয়ম হবে, সেখানেই ধরব। তবে এই অভিযান কতদূর পর্যন্ত যাবে, তা এখনই বলা যাবে না। অন্যায়-অবিচার ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে। যেখানে যেখানে সমস্যা আছে, সেখানে অভিযান চলবে। যারাই অন্যায় করবে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ অভিযান সম্পর্কে কৌতুক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকের নাকি ক্যাসিনো খেলার অভ্যাস আছে। আমরা একটা দ্বীপে ব্যবস্থা করে দিতে পারি, সেখানে ক্যাসিনো খেলা হবে। ভাসানচরেও এটার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বিশাল সংগঠন। অনুপ্রবেশ-কারীদের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে, এদের পরিহার করতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা গত ১০ বছরে দেশের যে পরিমাণ উন্নয়ন করেছি, তা আন্তর্জাতিভাবেও স্বীকৃত। কিন্তু বিএনপি সরকারের নীতিই ছিল ক্ষমতায় থেকে দুর্নীতি-লুটপাট, সন্ত্রাস, বিদেশে অর্থ পাচার এবং মানুষ খুন। গত ১০ বছর কোথায় ছিলেন, এখন কোথায় আছেন, দেশের বদলে যাওয়া সার্বিক প্রেক্ষাপট তুলনামূলক বিচার করার জন্য গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভারত থেকে আমরা পাইপ লাইনে করে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছি, যাতে আমদানি খরচ অনেক কমে যাবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার নিজের মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস আছে। যা করি দেশের মানুষের কল্যাণ ও দেশের স্বার্থেই করি। আমরা বাবা দেশকে স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। দেশের মানুষকে একটি ভাল জীবন দেবেন, এটাই ছিল জাতির পিতার স্বপ্ন। আমি তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণে কাজ করে যাচ্ছি। মনের তাগিদ থেকেই দেশের মানুষের কল্যাণে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। তবে সমালোচকরা সমালোচনা করেই যাবে। আমরা কিন্তু অন্যায়কারীদের কোন সতর্কবার্তা দেইনি, বরং সরাসরি এ্যাকশনে গেছি।

প্রকাশিত : ১০ অক্টোবর ২০১৯

১০/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: