১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

নিরাপদ সন্তান প্রসবে ছুটে যান ধাত্রী জহিরন

প্রকাশিত : ৫ অক্টোবর ২০১৯
  • ৪৪ বছর সাইকেলে ছুটছেন গ্রামের পথে পথে

জহিরন বেওয়া। বয়স প্রায় ৯৫ বছর। তিনি দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে বাইসাইকেল চালিয়ে গ্রামের অসহায় মানুষের সেবা দিয়ে আসছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এতটুকু উদ্যম, সাহস ও কর্মদক্ষতা কমেনি তার। অদম্য এই সংগ্রামী নারীর দরিদ্র মানুষের শান্তির আশ্রয় স্থল হয়ে উঠেছেন। জহিরন বেওয়া মূলত একজন প্রশিক্ষিত ধাত্রী। দীর্ঘ জীবনে তার হাত দিয়ে গ্রামের শত শত মহিলার নিরাপদে সন্তান প্রসব করিয়েছেন। সেইসঙ্গে গ্রামের সাধারণ দরিদ্র পরিবারগুলোকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন বিনামূল্যে। মানব সেবার মহৎ প্রাণ মানুষটি আদিতমারীতে যেন একজন মাদার তেরেসা। দিনরাত বাইসাইকেলে চেপে ছুটছেন মানব সেবায়। ব্যক্তিজীবনে কোন চাওয়া পাওয়া নেই। অসুস্থ মানুষের সেবাই করা যেন তার ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানব সেবায় ছুটে চলছে গ্রামের পথে পথে। বাড়ি বাড়ি।

জহিরন বেওয়ার বাড়ি লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ভারত সীমান্ত ঘেঁষা তালুক দুলালী গ্রামে। স্বামী সায়েদ আলী মারা গেছেন ১৯৬৮ সালে। স্বামীর অকালমৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়েনি এই সংগ্রামী নারী। শোককে শক্তিতে পরিণিত করেছেন। সময় পাড় করেছেন অসুস্থ মানুষের সেবা করে। দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে। এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে শারীরিক ও মানুষিকভাবে আরও দৃঢ়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মানুষের কল্যাণে সেবা চালিয়ে যাবেন জহিরন বেওয়া। সংগ্রামী এই নারীর তিন ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে সংসার। আট বছর আগে বড় ছেলে দানেশ আলী ৬৮ বছর বয়সে মারা যান। ছোট ছেলে তোরাব আলীর বয়স ৫৯। ৯৫ বছর বয়সেও সংসারে এই সংগ্রামী নারী এখনও সচল, সজাগ আর কর্মউদ্যমী হয়ে বেঁচে আছেন। বাইসাইকেল চালিয়ে ছুটছেন গ্রামের পথে পথে।

প্রতিদিন প্রায় ৭০টি বাড়িতে তিনি যান। কোন অসুস্থ মানুষ আছে কিনা খোঁজ খবর নেন। এ বয়সে তার বাড়ির বারান্দায় কিংবা কোন গাছের ছায়ায় বসে নাতি-নাতনিদের গল্প শোনানোর কথা। কিন্তু তিনি প্রতিদিন ছুটে বেড়াচ্ছেন গ্রামের পর গ্রাম মাইলের পর মাইল। কারও অসুস্থতার সংবাদ পেলেই নাওয়া-খাওয়া ভুলে বাইসাইকেলে চড়ে ছুটে যান। সেই রোগীর বাড়িতে। সেবা দিতে।

কথা হয় জহিরন বেওয়ার সঙ্গে, মেয়ে মানুষ গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াবে। মানুষের বাড়ি বাড়ি যাবে। ৭০ দশকে এটা কল্পনা করা যায়নি। সে সময় গ্রামে মেয়েদের বাড়ির বাহিরে যাওয়া এক রকম নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু তিনি সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি ভেঙ্গে ১৯৭৩ সালে সরকারের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচীর অধীনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নেন। খুব মনোযোগ দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে ৬ মাসের প্রশিক্ষণ শেষ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে চুক্তিভিত্তিক মাসিক মজুরিতে কাজে যোগ দেন। নিজ গ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে সাইকেল চালিয়ে গ্রামবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা দিতেন।

পরিবার ছোট রাখার পরামর্শ দিতেন। সঙ্গে ধাত্রীর কাজ করতেন। প্রশিক্ষিত ধাত্রী হিসেবে তার সুনাম ছিল। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে শুরুতে ১শ’ পরে ৩শ’ অবশেষে ৫শ’ টাকা মাসিক মজুরি পেয়ে ছিল। ১০ বছর চাকরি করেন। পরে অবসরে যান জহিরন। চাকরি বাদ দিলেও মানব সেবা বাদ দেননি জহিরন। অর্জিত অভিজ্ঞতা দিয়ে মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসা ও ধাত্রীর কাজ করে গেছেন। প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিতে কোন পয়সা নেননি। তবে ধাত্রী বিদ্যার কাজে মানুষ যা দিয়েছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। মানব সেবা তাকে এমনি ভাবে পেয়ে বসেছিল চাকরি ছাড়ার পরেও বসে থাকতে পারেনি।

-জাহাঙ্গীর আলম শাহীন, লালমনিরহাট থেকে

প্রকাশিত : ৫ অক্টোবর ২০১৯

০৫/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: