১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

মানবসেবায় সদাপ্রস্তুত ‘চাঁদের হাসি’

প্রকাশিত : ৫ অক্টোবর ২০১৯
  • ফেসবুকে খুঁজে বের করা সহপাঠীদের নিয়ে গ্রামে বহুমুখী কার্যক্রম

চিকিৎসা সেবা নিতে আসা গরিব রোগীদের অপেক্ষায় থাকাকালীন সুবিধা রাখা হয়েছে। প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দ্ইু কার্যক্রম চালু আছে। বেকার কর্মঠ তরুণদের প্রযুক্তির আওতায় এনে ‘আউট সোর্সিংয়ের’ ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। বগুড়ার গ্রামে শুরু হওয়া সামাজিক উন্নয়নের এমন কর্মসূচীর অগ্রযাত্রায় যমুনার নিভৃত চরে চিকিৎসা সহায়তার ভিলেজ হাসপাতাল গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। বিষয়গুলো সাদা চোখে ‘অস্বাভাবিক’ মনে হতে পারে। তবে মোটেও তা নয়। সদিচ্ছা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকলে কঠিন কাজও যে সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব তার প্রমাণ দিয়েছে বগুড়া সরকারী আজিজুল হক কলেজের ১৯৮৯ সালের উচ্চ মাধ্যমিক ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রতিটি কর্মসূচী বিনা মূল্যের। বলা যায় ভলান্টারি।

ওই ব্যাচের অনেক শিক্ষার্থী উচ্চতর পাঠ শেষ করে কেউ দেশে কেউ বিদেশে নানা পেশায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। তাদের কেউ প্রকৌশলী, কেউ চিকিৎসক, কেউ আমলা, উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী কেউ সফল ব্যবসায়ী। বছর কয়েক আগে ফেসবুকে সফল জীবনের কয়েক বন্ধু সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সাধারণের কল্যাণে ‘কিছু একটা’ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে স্টেটাস দেন। তারা প্রায় ৩০ বছর আগের দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত (প্রবাসী) সহপাঠীদের খুঁজে বের করেন। কি করা যায় এমন পরামর্শ এবং অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান। এরপর শতভাগ ইতিবাচক সাড়া। তারপর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে মাঠে নামা। থেমে নেই এই অগ্রযাত্রা।

বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার পূর্বের গাবতলি উপজেলার বালিয়াদীঘি ইউনিয়নের কলাকোপা সুবাদবাজারের ছোট্ট একটি ঝুপরি সামাজিক উন্নয়ন যাত্রার আঁতুর ঘর। ব্যাচের শিক্ষার্থীর একজন আরিফ রেহমান জানালেন সেদিন ছিল ২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। সামজিক মাধ্যমে যোগাযোগের কয়েক বন্ধু ওই ঘরে একত্রিত হয়ে মানব সেবার ব্রতে কার্যক্রম শুরু করেন। ওই বছর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সামগ্রী ও বন্যার্তদের খাবারের জোগান দেন। কয়েক জেলেকে জাল কিন দেন। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সাধ্য অনুযায়ী আর্থিক ও উপকরণ সহায়তা দেন। নারীদের কর্মসংস্থানের সেলাই মেশিন কিনে দেন। মানব উন্নয়নের এমন ধারা শুরুর পর স্বাস্থ্য সেবায় এগিয়ে আসে বন্ধুরা। একটি নামকরণ করা হয় ‘মুন লাইট ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি’ (এমডিএস)। সমাজকল্যাণ অধিদফতরে নথিভুক্ত হয়।

ওই গ্রামেই স্থাপিত হয় স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র। বন্ধু চিকিৎসক, পরিচিত চিকিৎসকদের দরিদ্র রোগীদের সেবা দেয়ার সহযোগিতা চায় সংগঠনটি। সাড়া মেলে। নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আন্তরিকতায় সেবা দিতে আসেন বিএমএ সভাপতি মোস্তফা আলম নান্নু, স্বাচিপ সভাপতি ডাঃ সামির হোসেন মিশু, ডাঃ রেজাউল আলম জুয়েল, চক্ষু বিশেষজ্ঞ পল্লব কুমার সেন, ডাঃ ওয়াদুদ তুহিন, হাসান আলী, রোকানুজ্জামান সোহাগ, মুছাব্বির হাসান, মাহবুবা আক্তার তানিয়া, জলি আফরোজসহ অন্তত ৪০ জন বিভিন্ন বিষয়ের চিকিৎসক। কেন্দ্রে প্যাথলজি বিভাগও আছে। দূরের গ্রামের রোগীরা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থাকে। তাদের ক্ষুধা নিবারণে আপ্যায়নের ব্যবস্থা রাখা আছে। চিকিৎসার পাশপাশি কিছু ওষুধ সরবরাহ করা হয়।

চলতি বছর জুলাই মাস পর্যন্ত চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন ৭ হাজারের বেশি নারী, পুরুষ ও শিশু। রেজিস্ট্রেশন রোগী প্রায় ৫ হাজার। ৫৮৩ জন চক্ষু রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। ডাঃ পল্লব কুমার সেন চোখ অপারেশন করেছেন ৭৫ জনের।

অর্থপেডিক, ইএনটি গাইনী চিকিৎসা দিয়েছেন চিকিৎসকগণ। শারীরিকভাবে পিছিয়ে পড়া অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশু কিশোরদের শিক্ষার জন্য গড়ে তোলা হয় স্কুল ঘর। যেখানে প্রতিবন্ধীদের সুবিধার বাথরুম স্থাপিত হয়েছে। বর্তমানে ৬০ জন শিক্ষার্থীকে লেখাপড়ার পাশাপশি ফিজিও থেরাপি ও উপযোগী কর্মের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। পোশাক টিফিন ও শিক্ষা উপকরণ প্রতি ঈদে নতুন কাপড় ও পরিবারের উন্নত খাবার দেয়া হয়। স্কুল ভ্যানে করে তারা আসে যায়। সরকারী প্রতিবন্ধী তালিকায় যারা বাদ পড়েছে তাদের লিপিবদ্ধে সহায়তা দেয়া হয়। গ্রামে সুপেয় পানির টিউবওয়েল স্থাপন, পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষ রোপণ, যমুনার চরে চক্ষু ক্যাম্পে ছানি অপারেশন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, জাতীয় দিবস, ঋতুভিত্তিক দিবসে শিশু কিশোরদের জন্য বিশেষ আয়োজন করা হয়।

মুনলাইটের ভূমিকা অনেকটাই চাঁদের আলোয় হাসি ফোটানোর মতো। এমনটি জানিয়ে সংগঠনের সভাপতি জান্নাতুল বাকিয়া ও সাধারণ সম্পাদক আরিফ রেহমান অভিজ্ঞতার আলোকে বললেন, মানব কল্যাণে একটি পদক্ষেপের সঙ্গে কখন যে সহায়তার অনেক পদক্ষেপ যুক্ত হয় তা মাঠে নেমেই বুঝতে পেরেছেন। দেশের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ এমন মহৎ কাজে এগিয়ে এসে নানাভাবে সহযোগিতা দিচ্ছেন। যাদের মধ্যে কলেজের সহপাঠী ছাড়াও আছেন জন প্রশাসনের উপসচিব, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, উর্ধতন পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রবাসী বন্ধু। আরিফ রেহমান বললেন, কেউ লাভবান হওয়ার জন্য নয় নিজেদের মানসিক প্রশান্তি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো মূল উদ্দেশ্য। যে কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের একত্রিত করে মুন লাইট ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি গড়ে তোলা হয়েছে।

-সমুদ্র হক, বগুড়া থেকে

প্রকাশিত : ৫ অক্টোবর ২০১৯

০৫/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: