১৪ নভেম্বর ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

ঘুরতি

প্রকাশিত : ৭ আগস্ট ২০১৯
  • শাদমান শাহিদ

[গল্পটি অদ্বৈত মল্লবর্মণের কালজয়ী উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এর প্লট, চরিত্র এবং ঘটনাসমূহের পরিণতি অবলম্বনে রচিত।]

বেশ কিছুদিন ধরেই মনটা বড়ো আনচান। কেবলই মনে হচ্ছে নারকেলডাঙার ষষ্ঠীতলার নির্জন বাড়ির ভাঙা দরজটায় পিয়ন রহমত এসে ঠক ঠক করে বলছে, ‘বাবু, আপকা চিঠি আ গিয়া, বাবু, আপকা চিঠি আ গিয়া’। চিঠি তো কোনো কালেই আসে নাই, তাছাড়া চিঠি লিখবেই বা কে, এমনকি কেউ তিনকুলে আছে! তারপরও কেনো যেনো মনে হচ্ছে, চিঠি আসছে, কেউ একজন ডাকছে...এদিকে সাপ্তাহিক পত্রিকা কাজের যে চাপ...অন্যদিকে দেশভাগ আন্দোলন, ফাগুনের বাতাসের মতো এলোমেলো খবর, গান্ধী-নেহেরু-জিন্নাহ। হচ্ছে, হবে। কী হবে! বিহ্বল অপেক্ষা বাঙালীর। যদি ঠুস করে একটা কিছু হয়ে যায়! তখন দেশে ফিরতে গিয়ে না জানি কোন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়... তার আগেই যদি একটা ঘুরতি দিয়ে আসা যায়...শরীরের অবস্থাও ক্রমান্বয়ে যেভাবে বেঁকে আসছে, কাশির বাড়াবাড়ি দেখে তো মনে হচ্ছে, বড় ধরনেরই কিছু একটা হয়ে যাচ্ছে, ডাক্তারের কাছে যাই যাচ্ছি করে আর যাওয়া হচ্ছে না...উপন্যাসটারও একটা কূল-কিনারা এখন পর্যন্ত করা গেলো না।

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ফাল্গুনের এক বাতাসবহুল বিকেলে কাঁধে একখান পাটের ঝোলা ঝুলিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন এসে নেমে পড়লো। তারপর পায়ে হাঁটা। পুনিয়াউট, উলচাপাড়া, যাত্রাবাড়ির ভেতর দিয়ে সোজা তিতাসপাড়। গোদারা পার হলেই গোকর্ণঘাট, নিজেদের গ্রাম। গ্রামে যদিও জ্ঞাতি গোষ্ঠীর কেউ নেই। তিতাসের সাথে সাথে তারাও কালের পাটাতনের ফাঁক দিয়ে হারিয়ে গেছে। তারপরও কেনো যেনো মনটা এতো উতলা হয়ে উঠেছিলো...

সামনের চুলগুলো ডানদিকে এলানো, শ্যামল শরীরে ধবধবে শাদা পাঞ্জাবি-পাজামা আর কালোরঙা পাম্পসুতে বেশ মানিয়েছে। আকাশের দিকে তাকায়। ফাল্গুনের আকাশ। কোথাও কৃত্রিমতা নেই। সূর্যটা ডিমের কুসুমের মতো লাল হয়ে এলেও বোঝা যাচ্ছে সন্ধ্যা হতে এখনো ঢের বাকি। নৈশাব্দিকতার সবকটা নিয়ম রক্ষা করে, চুপি চুপি এসে জল ঘেঁষে দাঁড়ায়। ‘কতোদিন পর নিজের কাছে ফেরা। পৃথিবীর মানুষ পর হয়ে যায় কিন্তু প্রকৃতি? নদী-খাল-বিল-হাওড়-বাঁওড়, সহজিয়া বাতাস আর সবুজ চোখের অবাক তাকানো। এসব কখনো পর হয় না।’ বিড়বিড়িয়ে কথাগুলো উচ্চারণ করে। উদাসী চোখ নদীর এপারওপার ছুঁয়ে যায়। নদীর নিথরদেহে তার দীর্ঘ ছায়া। ছায়ার স্পর্শেই টের পেয়ে যায় মুমূর্ষু। এসে গেছে সে। যার প্রতীক্ষায় সে দিন গুনে। একটু নড়ে চড়ে ওঠার চেষ্টা। অবশ শরীর। নড়াচড়ার শক্তি নেই। চিকিৎসাও নেই। উজানে বড় বড় সব নদীতে বাঁধ। জল হলো নদীর রক্ত। সে রক্ত আটকে রাখে মানুষ। সন্তান হয়ে মাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র! এই ক্লিষ্টতা নদী কারো কাছে প্রকাশ করতে চায় না। এমনকি তাঁর কাছেও না। কারণ সে জানে, তার এ সন্তান মায়ের কষ্ট সইতে পারে না। তার সন্তানদের পেটে খাবার নেই, এ দৃশ্যে তাঁর অন্তর ফেটে যায়। এজন্যে নদীও তার শতো দীনতা তার সামনে ঢেকে রাখার চেষ্টা করে। মালোপাড়ার আর দশজন মায়ের মতো যেনো ছেঁড়া ত্যানায় বুক-পিঠ ঢাকতে ঢাকতে বলে, ‘আমার জন্যে ভাইববো না, আমার যা অইবার অইবই। তুমি একলা ভাইববা কিছু করতে পারবা না। নিজের শরীরের যতœ নিও। মালোদের মুখে হুনলাম, তোমার নাকি শইল খারাপ, কী অইছে!’ এসময় একটা গুতুম মাছ আর তিনচারটে দারকানা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ছোট একটা কুচুরিপানাকে হালকা নাড়িয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়াস চালায়। বোঝাতে চায়, অতো ভাইববো না, এখনো যথেষ্ট মাছ আছে। মালোরা না খাইয়া মরতো না।

গুতুম মাছ তো আষাঢ়ের বাদলার অপেক্ষায় কাদার তলানীতে যেয়ে কম্ভুকর্ণের মতো ছয় মাসের জন্য ঘুমিয়ে থাকে। এ সময় কিছুতেই তার জাগার কথা নয়। নিশ্চয় নদীর কাজ, নিজে উঠতে না পেরে আঙুলের গুঁতোয় জাগিয়ে দিয়েছে। সে মনে মনে হাসে। তার চোখে জল।

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাম দিকে তাকায়। রসুলপুর, আমিপুর, যাত্রাবাড়ি, নাড়ই নোয়াগাঁও, বিরামপুর, গ্রামগুলো পেরিয়ে দৃষ্টি আরো দূরে প্রসারিত। নদীটাকে মনে হয়, সবুজ ধানক্ষেতের ফাঁকে কুমারীলতার মতো কী যেনো একটা শুয়ে আছে। জল দেখা যায় না, সবটাই কুচুরিপানায় ঠাসা। দশবছর আগেও মোটামুটি সোজা ছিলো নদীটা। চর পড়ে যাওয়ায় কৃষকদের লাঙলের গুঁতো আর কোদালের কোপ খেতে খেতে কী দশাই না হয়েছে... একসময় এমন দিনগুলোতে দুপাড়ে সারি সারি খরাজাল চোখে পড়তো। এখনো দুয়েকটা দেখা যাচ্ছে বটে কিন্তু কোনোটাতেই জাল নেই। পরস্পরে বেশ দূরত্ব বজায় রেখে কাকতাড় য়ার মতো শুধু খুঁটিগুলো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ডাঙায় উঠিয়ে রাখা ডেঙিগুলোর অবস্থাও বর্ণাতীত। রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে থাকতে থাকতে ফেটে চিরচির। কীভাবে যে মেরামত করে সেগুলো জলে নামাবে...। ডানে তাকায়। সেদিকেও একই দৃশ্য। নদীটা চাবুকের ডগার মতো চিকন হতে হতে মেদেনীপুরে যেয়ে হারিয়ে গেছে। কুচুরিপানার উপর দিয়ে লক্ষ্যহীন হাঁটে বিহ্বল দৃষ্টি। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপর ঝোলাটা ডান কাঁধ থেকে বাঁ কাঁধে নিয়ে পশ্চিম দিকে পা বাড়ায়।

সামনে শ্মশানঘাট। বট অশত্থ অর্জুন বরুণ মিলিয়ে বেশকিছু বৃক্ষলতাগুল্ম নির্জীব স্থানটাকে সরব রাখায় ব্যস্ত। একটু ভৌতিক ভৌতিক পরিবেশ মনে হলেও গাছগুলো না থাকলে স্থানটা আরো নিষ্ঠুর-রুক্ষ হয়ে উঠতো। মঠের কাছে যেতেই একদলা সুগন্ধময় বাতাস ঘিরে ধরে। বনমালি দা’কে এখানেই দাহ করা হয়েছিলো। ভাগ্যিস ওদিনেই গ্রামে আসা হয়েছিলো। ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ার সময় একদিন বনমালি দা’র কাছেই মালোদের বিপন্ন জীবনের বৃত্তান্ত শুনে বুকটা কেঁপে উঠেছিলো। ছুটে এসেছিলো ত্রাণ নিয়ে। আর ভগবানেরও কী ইচ্ছে, ঐদিনই বনমালি দা স্বর্গের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। সেদিনই বুঝেছিলো, অকৃতদার লোকটা তার কোন জায়গাটা দখল করে রেখেছিলো এতোদিন। জন্ম থেকেই কতো ঝড়ঝঞ্ঝায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে, কোনোদিন আবেগে ভেঙে পড়েনি। কিন্তু সেদিন আর পারলো না। উপস্থিত সকলকে অবাক করে দিয়ে জীবনের সব কান্না একদিনেই শেষ করে দিয়েছিলো। অকৃতদার লোকটাও বোধহয় শিথানে কানবার লোক পেয়ে, ‘সব পায়া গেছি, ভগবানের কাছে আর কোনো চাওয়ার নাই’ এমন একটা আত্মতৃপ্তি নিয়ে চিতাদহের অপেক্ষায় মঠের কাছে চাটাইয়ে শুইয়ে রইলো। সবাই বলাবলি করতে লাগলো, তোমার হাতের মুখাগ্নির আশায়-ই অতোদিন ধইরা বিছনায় পইড়া আছিলো।

কথাগুলো যতোই তারা উচ্চারণ করছিলো ততোই কল্পনায় একটা মুখ উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলো। সেটা কার মুখ জানা নেই। মা কোনোদিন বলেনি, তোর বাবার মুখখানা ইমুন আছিলো, শইলডা অমুন আছিলো...। ডেঙি করে এখানে ওখানে যাতায়াত পথে এ লোকটাই কতোকিছু যে বলতো...কীভাবে মানুষকে ভালোবাসতে হয়। বিপদে-আপদে কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। বলতো, ‘মানুষরে কখনোই জাতপাত দিয়া বিচার করবা না। মানুষের কুনু জাত নাই। ধর্ম নাই। মানুষের ধর্ম একখানই। মানুষ। জান দিয়া পরান দিয়া মানুষরে ভালোবাসবা।’

মঠের ভেতর উঁকি দিতেই তক্তার উপর ভাঁজ করা একটা শাদাধুতি চোখে পড়ে। বোধহয় এটাই সেই ধুতি। যা পিসি বাসন্তির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় মালোপাড়ার লোকেরা চাঁদা উঠিয়ে কিনেছিলো। পরে শুনলো, তিনি নাকি দিব্যি দিয়ে বলে গিয়ে ছিলেন, অনন্ত তাঁকে যে শাড়িটা দিয়েছিলো ওটা পরিয়েই যেনো চিতায় ওঠানো হয়।

ভেতরে ঢুকে ধুতিটা হাতে নেন। এসময় অজান্তেই চোখ বেয়ে টপটপ করে কফোঁটা অশ্রু মুক্তার দানার মতো গড়িয়ে যায়। তিনি কাপড়াটা ভাঁজ খুলে একটা হ্যাচকা ঝারা দিয়ে পুনরায় ভাঁজ করে যথাস্থানে রেখে দিলো।

হাঁটতে হাঁটতে যাত্রাবাড়িতে চলে আসে। ততোক্ষণে চারপাশ হালকা কালো করে সন্ধ্যা নেমে আসে। কাসার টুনটুনানি, শঙ্খফুঁ, উলুধ্বনি সন্ধ্যারতি শেষ হতে না হতে মাটির তলের পোকামাকড়গুলো ডাকাডাকি শুরু করে দিচ্ছে। শেয়াল না বাগডাশ কী যেনো একটা ডান থেকে বামে দৌড়ে গেলো। সেদিকে তাকাতেই চুলে খোপার মতো এক টুকরো জঙ্গল চোখে পড়ে। জঙ্গলটার ভেতর একটা ভিটেও দেখা যায়। কার হতে পারে ওটা! মানুষ গরু নেই, একদম নিরিবিলি। হ্যাঁ, মনে পড়ছে সরদার রামপ্রসাদের ভিটে। জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেলেন মালোদের সমস্যাটা কোথায়। সেদিন যদি মালোরা তার পাশে গিয়ে দাঁড়াতো...আরেকটু এগিয়ে যায়। ঘরের চাল নেই, শুধু চারপাশের মাটির দেয়ালগুলো কী যেনো একটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভিটেটার সামনে যেয়ে দাঁড়াতেই কে যেনো পেছন থেকে হাঁক দেয়।

‘ক্যাডা...’

তাকিয়ে দেখে হরিপদ। দশ বছর আগে গ্রামে গ্রামে ত্রাণ বিতরণের সময় লোকটা বেশ শ্রম দিয়েছিলো। কালচে অন্ধকারে আবার সন্দেহও লাগছে। হরিপদ হলে তো এতো তাড়াতাড়ি হাতে লাঠি লওয়ার কথা নয়।

ক্যাডা আন্নেÑ লাঠি ভর করে টকটক করে এগিয়ে আসছে।

হ্যাঁ, হরিপদই তো।

হরিপদ, তোমার এই অবস্থা কেনো, বয়স তো তেমন না। এখনই লাঠি!

আর কইয়ো না। পেডের কামড় সহ্য করতে না পাইরা একদিন গিন্নী কইলো, বাজারে গিয়া দেহ না কুনু কামকাইজ নি পাও। তারপর গেলাম জগতবাজার। বজরা থিকা পাটের গাইট গুদামে ওডানোর কাম। একেকটা ওজন কি রে দাদা, মাথায় ওডানোর মাত্তর ঘাড়টা মট্টত দা ওডে। একদিন বজরা থিকা নামতে গিয়ে গাইট সুব্দা পইড়া গেলাম। সেই থিকা পিঠে চ্যুট। অপুষ্টির শইল আর নি ভালয়..। তয় আন্নে রে তো চিনবার পারলাম না...।

আমি অনন্ত।

অনন্ত! আমরার গোকনঘাডের অনন্ত! কৈ আছিলা এদ্দিন? আও, বাড়িত আও।

এটা রামপ্রসাদ সরদারের ভিটে না?

হ। সরদারেরই তো আছিল।

এভাবে বলছো কেনো? কোনো সমস্যা!

এদ্দিন পর গেরামে আইছো, কদ্দিন থাহো, সবই বুঝতে পারবা।

কী হয়েছে, বলো না?

আমি মুকখো মানু, কাউরে চিনি না। শহর থিকা এক লোক আইয়া মাপজোক কইরা গেলো। কী নাকি করবো।

কী করবো মানে! তোমরা বাধা দাও না?

বাদা দিবো যে গেরামে মানু আছে নি? আইছো, থাহো কয়দিন, তাইলেই সব আন্দাজ করতে পারবা।

দুই

সে আর দাঁড়ায় না। হরিপদের হাতে টাকা কটা গুঁজে দিয়ে বড় বড় পা ফেলে সোজা চলে আসে গোদারাঘাট। ঘাটে মানুষ নেই। ভাগ্যিস ডেঙিটা এপারেই বাঁধা ছিলো। সে ওঠে লগি দিয়ে দুটো ভর দিতেই পেরিয়ে এলো। ডাঙায় পা ফেলতেই টের পেলো পা দুটো যেন অসম্ভব ভারি। মনে হচ্ছে কেউ দুপায়ে বড়ো বড়ো দুটো লোহার গোলক বেঁধে দিয়েছে। পাড়ে উঠতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ডাঙায় উঠে কী হবে। কার ঘরে গিয়ে উঠবে। দশ বছর আগে যারা চিনতো, ভালোবাসতো, আজ কেউই বেঁচে নেই। এখন যারা আছে তিতাসের উপর ভরসা ছেড়ে দূর-দূরান্তের গ্রামে-গঞ্জে কামলা দিয়ে বেড়ায়। তারা কি তাকে চিনবে! আর যদি চিনেওবা, তারা কি দুটোদিন বেড়ানোর জন্যে ডেকে ঘরে তুলবে। একজন শহুরে লোককে ঘরে স্থান দেয়ার মতো সামর্থও তো থাকতে হবে, নাকি? যতোই ভাবছে ততোই পা দুটো অবশ হয়ে আসছে। একবার ভাবলো সাদেকপুরেই চলে যাই, ওখানে চেনাজানা কেউ না কেউ থাকতে পারে। বনমালি দা’র ভিটে কারা বসত করছে, অন্তত এটাতো জানা যাবে। আর কোনো কূল না পেলে মন্দিরে গিয়ে উঠবো। যদ্দূর মনে পড়ছে, কার কাছে যেনো শুনেছিলো গোঁসাই বাবাজীর ছেলে হরনাথ নাকি মন্দিরের উত্তরকোণে তমাল তলায় টুল খুলেছে। গ্রামের ছেলেমেয়েদের নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখায়। কথাটা সত্যি হয়ে থাকলে, বলতে হয়, দারুণ কাজটাই করছে। গোকনঘাট তো গোকনঘাটই রয়ে গেলো। কালো অক্ষরের জাদু কোনোকালেই মালোদের টানতে পারেনি। গ্রামে একটা স্কুল খুলতে মাতবর রামপ্রসাদ কতো চেষ্টাই না করেছিলেন। গুরুত্ব দিলো না কেউই। দেবে কেনো, তারা তো চেনে কেবল জল জাল ডেঙি। এই তিনেই তাদের জীবন, এই তিনেই তাদের পৃথিবী। এর বাইরে যে বিশাল জগত পড়ে আছে তা কোনোদিন মালোরা কল্পনা করতে চায়নি। এখন হয়তো কেউ কেউ ক্ষুধায় কাতর রাতে বিছানায় এপাসওপাস করতে করতে ভাবে... কিন্তু সঙ্গতি কোথায়? এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে পাড়ে ওঠে বাঁ দিকে মোড়া নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মালোপাড়া পেরিয়ে আরো অনেক পথ এগিয়ে এসেছে, খেয়াল করতে পারেনি। কোথায় এসেছে, খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দিকটা ঠিক করে নিতে চায়। তখন খেয়াল হয়, অন্ধকারের ভেতর কালো অজগরের মতো সামনে যে গোপাটটা দেখা যাচ্ছে, ওটা দিয়ে আধা ঘণ্টা হাঁটলে গোঁসাইপুর। তার পরেই শালগাঁও-কালিসীমা।

একবার ভাবলো গোঁসাইপুর গেলেও মন্দ হয় না। সেই ত্রাণ বিতরণের সময় দুজন ব্রাহ্মণ ডেকে গৌরাঙ্গ-নিত্যানন্দ দাদুদের শ্রাদ্ধের জন্যে সতীশের হাতে কিছু টাকা দিয়ে এসেছিলো। নিতে চায়নি, এক প্রকার জোর করেই দিতে হয়েছিলো। খুব ভালো ঘরের সন্তান। অল্প বয়সে বাপ স্বর্গবাসী হওয়ায় লেখাপড়া নাইন থেকেই শেষ করে দিয়ে সড়কবাজারে বাবার গড়া চাউলের আড়তে গিয়ে বসতে হয়। সহপাঠী হিসেবে অতোটা অন্তরঙ্গ না হলেও একেবারে দূরেরও ছিলো না। কোনো কারণে সড়কবাজারের দিকে গেলেই দেখা হতো, ডেকে নিয়ে কাছে বসাতো, এটাওটা সেধে খাওয়াতো, তখন কোনোভাবেই মনে হতো না, এই সেই হাবাগোবা সতীশ, যে পড়া শিখে আসতো না বলে পিছনের বেঞ্চিতে চুপচাপ বসে থাকতো। কারো সাথে অন্তরঙ্গ হয়ে মিশতোও না, প্রাণ খুলে হাসতোও না। এখন নিশ্চয়ই বাজারের বড়ো আড়তদার হয়ে গেছে। গোঁসাইপুর গেলেই ভালো হয়, এতোদিন পর আবার দেখা হলে রাতটা কোনোমতে ওর ওখানে কাটানো যায়, ভোর হলেই শুকদেবপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেবো। ওখানে বাঁশিরাম মোড়ল কিংবা তাঁর গিন্নি কেউ না কেউ নিশ্চয়ই এখনো জীবিত আছেন, তাঁদের কাছেই জানা যাবে মা’র বৃত্তান্ত। ওটা জানতে পারলেই আসলটাও জানা যাবে।

তিন

রাই জাগো গো, আমার ধনী জাগো গো

বৃন্দাবন বিলাসিনী, রাই জাগো গো।

গানের কথাগুলো আর মন্দিরা টুঙটাঙ ধ্বনি দৈববাণীর মতো ঘুমের পর্দা ভেদ করে চৈতন্য স্পর্শ করতেই ঘুমের তার কেটে যায় অনন্তর। কণ্ঠটা খুব চেনা চেনা লাগছে। কিছু ভাববার আগেই দ্রুত দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ে। ততোক্ষণে মন্দিরার ধ্বনিটা যথেষ্ট ক্ষীণ হয়ে আসে। একেবারে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই লোকটাকে ধরে ফেলে সে। দেখে রাধামাধব। দাদা, তুমি এখনো!

ধনুকের মতো বাঁকা লোকটাকে দাদা সম্বোধন করতেই তিনি টান টান সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। বয়সের ভারে হয়তো ঠিক মতো দেখতেও পান না। তাকে চিনতে পেরেছেন কি পারেননি, বোঝা যাচ্ছে না। তবে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে নিজে থেকেই পরিচয় দিলো। বললো, আমি অনন্ত। বনমালি দা’র ঘরে থাকতাম। পরিচয় দিতেই বুড়ো হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলো। ‘ভগবান রাখছে দাদা। জাল্লাদের সিদ্দতের শেষটা দেখবার লাগি ভগবান অখনো রাখছে।’

কেঁদো না। সাদেকপুরে যাওয়া পড়ে তো? কার কী অবস্থা, জানো কিছু!

কী কমু রে দাদা, হগ্গলে পলাইছে। কেউ আসামে কেউ তিপরায়। আর দ্যাশের ভিত্তে যারা দূর গেরামে গিয়া আশ্রয় লইছে, তাগোরও কুনু খোঁজ-খবর নাই। মন্দিরা হাতে কতো গেরামে ঘুইরা বেড়াই, কাউরে চোক্ষে পড়ে না।

বনমালি দা’র ভিটেটে কে বসত করছে গো?

বনমালির ভিডায় তার ছোট বইন আসমানতারার এক পোলা আইয়া পরিবার লইয়া থাহে।

বড়বাড়ির সকলেই কি দেশ ছেড়ে চলে গেছে?

গেছিলো। কেউ কেউ আবার ফিইরাও আইছে।

দেশের টান বলে কথা, আসতে তো হবেই।

দ্যাশের কথা কইওনা। পাষাণী কাউরেই ডাহে না। ঠেলাৎ পউড়া আউন লাগছে। আমিও গেছিলাম, থাকতে পারলাম না।

সম্প্রতি অসমীয়রা বাঙালীদের সহ্য করতে পারছে না। এ ধরনের বেশকিছু সংবাদ কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায়ও প্রকাশ হয়েছে। তবে গান্ধী জি যেহেতু এখনো বেঁচে আছেন, তখন এতো ভাববার কিছু নেই। কিছু একটা হবেই। মনে মনে ভেবে নিয়ে জানতে চাইলো, বড়বাড়ির কে কে ফিরে এলো গো?

ক্ষতিমোহন মারা যাওয়ার পর তার গিন্নি মেয়ে অনন্তবালাকে নিয়া দেশে ফিইরা আইছিলো। আইয়াও শান্তি পাইলো না। গতবছর বসন্তে মারা গেলো গিন্নি মা। এখন পড়ছে অনন্তবালা। কয়দিন থাহে ঠিক নাই।

অনন্তবালা! নামটা শোনামাত্র আমূল কেঁপে উঠলো শরীরটা। নিজেকে কোনো রকম সংযত রেখে জানতে চাইলো, কী হয়েছে অনন্তবালার!

উলা ওঠা, এইবার বহুত লোক নিছে রাক্ষুসী।

তুমি এখন কোথায় যাচ্ছিলে?

কই আর যামু। গেরামে গেরামে ঘুইরা বেড়াই। কেউ দুটো দিলে খাই, না পাইলে উপোস করি।

সাদেকপুর যাবা?

লও যাই।

তাহলে দাঁড়াও, কাপড় পরে আসি, আমিও যাবো।

চার

দীর্ঘ দশ বছর পর সে বড়বাড়িতে ঢুকলো। আগে যেমন সাজানো-গোছানো সারিবদ্ধ ঘর ছিলো, এখনও ঠিক তেমনই আছে। তবে সবকটা ঘরই শ্রীহীন। দীর্ঘদিন অযতেœ থাকায় দেয়ালগুলোয় শ্যাওলা পড়েছে। কোনো কোনো ঘরের অবস্থা আরো খারাপ। দেয়াল ফেটে গিয়ে ধসে পড়ার উপক্রম।

বাড়ির উঠোনে উঠেই রাধামাধব মধ্যবয়সী একজন বিধবাকে ডেকে কী যেনো বললো, তারপর আঙিনার দক্ষিণ কোণের দিকে একটা পরিত্যক্ত দালান দেখিয়ে রাধামাধব মন্দিরের দিকে চলে গেলো। সে দেখলো, মহিলাটি একবার ঘরের ভেতর যেয়ে মিনিট খানেক পরেই বেরিয়ে পড়লো। কাছে এসে জানতে চাইলো, আপনি বুঝি অনন্ত!

জি, আজ্ঞে।

যান, ভেতরে যান। দিদি আপনাকে চিনতে পেরেছে।

দিদি আপনাকে চিনতে পেরেছেÑ ভাবতেই শরীরটা পুনরায় কেঁপে উঠলো। ঘরের ভেতর ঢুকেই সে দেখলো বাম দিকে পালঙ্কে মশারির ভেতর ধবধবে শাদা বিছানায় শুইয়ে আছে অনন্তবালা। অনন্তবালা যে এতো সুন্দর, এতো সুগঠিত শরীর কখনো এভাবে দেখার সুযোগ হয়নি।

আর কাছে এসো না। ওখানেই কপাটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকো। মরণব্যাধি তোমাকেও কামড় দিয়ে বসবে অনন্ত।

আজ আর বাধা দিয়ো না। আমাকে কিছু বলতে দাও অনন্তবালা। বলতে বলতে পালঙ্কের একেবারে কাছে চলে গেলো সে। মশারির বাইর থেকেই অনন্তর কোমর বরাবর পালঙ্কে বসে পড়লো। যেদিন বুঝলাম, তিনকুলে আমার কেউ নেই, কোনো সহায় সম্পত্তি নেই, এমনকি নিজের পিতৃ পরিচয়টা পর্যন্ত স্পষ্ট করে কারো কাছে বলতে পারি না। তখনই মনে হলো এ জন্মে স্বাভাবিক জীবন-যাপনের অধিকার আমি হারিয়ে ফেলেছি। সে কষ্টে শুধু তোমার কাছ থেকে নয়, দেশ থেকেও নিজেকে দূরে ঠেলে দিয়েছি। আজ বুঝতে পেরেছি, কেনো কদিন ধরে মনটা এমন আনচান করছে। কেনো এখানে ছুটে আসার জন্যে এক বিমূর্ত টান চালান দেয়া বাটির মতো অস্থির করে তুলছে। আজ বুঝতে পেরেছি, আর কিছু নয় অনন্ত। তোমার ভালোবাসাই আমাকে এতো দূর নিয়ে এসেছে। আমাকে ক্ষমা করে দাও। আজ তুমি একাই মরতে বসোনি, কাশির ধকল দেখে মনে হচ্ছে আমিও তোমার পথ যাত্রী। হয়তো তোমার কাছে আসবো বলেই এখনো বেঁচে আছি।

তোমার মনে আছে অনন্ত, পদ্ম পুরাণের দিন আমি তোমার গলে মালা পরিয়েছিলাম।

হ্যাঁ, বেশ মনে আছে। এটা কি ভুলে যাবার বিষয়!

সেদিন থেকেই আমি লোকচক্ষুর আড়ালে সে মালাবদলের নিয়ম রক্ষা করে এসেছি। এক মুহূর্তের জন্যও ব্যত্যয় ঘটেনি। এই দেখো আমার শাখা-সিঁদুর। যদি আমার টানেই এসে থাকো, তাহলে আর দ্বিধা কেনো অনন্ত! কপালের সিঁদুরটা কি একটু ছুঁয়ে দেয়া যায় না!...!

পাঁচ

জীবনে এই কোনো নারী তাকে আহ্বান করছে। কীভাবে হাত বাড়াতে হয়, সে কী জানে? হাত দিয়ে স্পর্শ করলেই কি ছোঁয়া হয়ে যায়? ভাবছে আর এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। না, ঘরের ভেতর আর কেউ নেই। হয়তো অনন্তই ভেতরে প্রবেশ করতে বাড়ির সবাইকে নিষেধ করে দিয়েছে। তখন কাঁপা কাঁপা হাতটা মশারির ভেতর ঢুকে অনন্তবালার হাত স্পর্শ করে। একি অনন্তবালা, তোমার হাত এতো ঠা-া কেনো! জ্বর হলে তো মানুষের শরীর গরম থাকে। নরম থাকে। তোমার হাত তো ঠাণ্ডা আর...।

প্রকাশিত : ৭ আগস্ট ২০১৯

০৭/০৮/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: