১৭ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

গানেই কবিতা, কবিতায় গান

প্রকাশিত : ৩১ মে ২০১৯
  • আসাদুজ্জামান সোহান

বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী গায়কদের মধ্যে বব ডিলান অন্যতম। পৃথিবীর বুকে অনেক কালজয়ী সঙ্গীত শিল্পী এসেছে এবং কোটি কোটি মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়েছে। তবে তাদের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন মার্কিন কিংবদন্তি সঙ্গীত শিল্পী বব ডিলান। তিনি শুধু বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন না, একাধারে তিনি বিখ্যাত গীতিকার, সুরকার ও ডিস্ক জকি। একই সঙ্গে তিনি একজন কবি, লেখক ও চিত্রকর। এসব কিছুর বাইরে তিনি একজন বর্ণবাদ বিরোধী, অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী, প্রতিবাদী ও বিপ্লবী মানুষ। তিনি আজীবন অন্যায়, অবিচার, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে একজন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তিনি গানে গানে পৃৃৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের মাঝে বিপ্লবী সত্তা জাগিয়ে তুলেছেন। আবার গানে গানে পৃথিবীর বর্ণবাদী ও শোষক শ্রেণীর মানুষের মুখে চুনকালি মাখিয়েছেন। বলা হয়ে থাকে, গানই তার কবিতা, কবিতার মাঝেই গান। সঙ্গীত জগতে নতুন কাব্যিক ধারা সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বব ডিলান। এই বিখ্যাত নোবেলজয়ী কাব্যিক গানের বিপ্লবী শিল্পী ১৯৪১ সালের ২৪ মে আমেরিকার মিনেসোটার ডুলুথের সেন্ট মেরিজ হসপিটালে জন্ম গ্রহণ করেন।

তার পিতামাতা অ্যাব্রাম জিমারম্যান ও বেয়াট্রিস ছিলেন ডুলুথের ছোট্ট ইহুদী সমাজের সদস্য। ডিলানের পরিবার প্রদত্ত নাম ছিল রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান, যার ইহুদী নাম শাবতাই জিসেল বেন আব্রাহাম। তখন আমেরিকায় বর্ণবাদ ও শ্রেণীবৈষম্য ছিল প্রখর। তাই তিনি সঙ্গীত জগতে প্রবেশের সময় নিজের নাম পরিবর্তনের চিন্তা করেন। সেই সময় ইংরেজ কবি ডিলান টমাসের কবিতা পড়ে তিনি মুগ্ধ হয়ে ছিলেন। কবি ডিলান মারলাইস টমাস নামের সঙ্গে মিল রেখে পরিবার প্রদত্ত রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান নামটা বদলে নিজের নাম রাখলেন বব ডিলান। অল্প বয়সে এলভিস প্রিসলি, জেরি লি লুইস এবং লিটল রিচার্ডের মতো বিখ্যাত গায়কদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন ডিলান। ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটায় পড়ার সময় নিজের ব্যান্ড তৈরি করে স্থানীয় ক্যাফেতে বব ডিলান নামে গান করা শুরু করেন। ১৯৬০ সালে প্রথম বর্ষে থাকাকালীন কলেজ ত্যাগ করে নিউইয়র্কে পাড়ি জমান ডিলান। নিউইয়র্কের এক হাসপাতালে কিংবদন্তী ফোক গায়ক উডি গাথ্রি স্নায়ুতন্ত্রের দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি ছিলেন। ডিলান প্রতিদিন উডিকে দেখতে যেতেন, পাশাপাশি গ্রিনউইচ গ্রামের কফিহাউস এবং ফোক ক্লাবগুলোতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। সেখানে অন্যান্য মিউজিসিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাত হতো, তাদের কাছ থেকে গান লেখার রসদ যোগাড় করতেন ডিলান এবং খুব দ্রুত গান লেখা শুরু করেন। যার মধ্যে ‘সং টু উডি’ ছিল অন্যতম। ১৯৬১ সালে তার গাওয়া গান দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় ইতিবাচক সাড়া লাভ করে এবং কলাম্বিয়া রেকর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। এই পর্যায়ে ডিলান নিজের পদবি আইনতভাবে ডিলানে পরিবর্তন করেন।

১৯৬২ সালের ১৯ মার্চ কলাম্বিয়া রেকর্ডস কর্তৃক প্রকাশিত হয় বব ডিলানের প্রথম স্টুডিও এ্যালবাম। মূলত এই এ্যালবামের মাধ্যমেই বব ডিলান সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এই এ্যালবামে ফোক গানের পাশাপাশি দুটি মৌলিক গানও রয়েছে। মৌলিক গান দুটি হলো, ‘টকিন নিউইয়র্ক’ এবং ‘সং টু উডি’। ১৯৬২ সালের ডিসেম্বরে ডিলান যুক্তরাজ্যে তার প্রথম ট্যুরে যান। সেখানে তিনি ম্যাড হাউস অন ক্যাসেল স্ট্রীট নামক নাটকে অভিনয়ের অফার পান। নাটকে তিনি অভিনয় করেন এবং নাটকের শেষে ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’ গানটি পরিবেশন করেন। ১৯৬৩ সালে ডিলানের ২য় এ্যালবাম বের হয় এবং ততদিনে গায়ক এবং গীতিকার হিসেবে তার খ্যাতির প্রসার ঘটতে শুরু করেছে। এই এ্যালবামের বেশিরভাগ গান ছিল প্রতিবাদের গান। ‘দ্য ফ্রি হুইলিন: বব ডিলান’ এ্যালবামে আমেরিকান পপুলার মিউজিকের ইতিহাসে সবচেয়ে মৌলিক এবং কাব্যিক কণ্ঠ হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। তখন আমেরিকায় বব ডিলান জনপ্রিয়তায় তুঙ্গে ছিলেন। বছরে প্রায় দুই শতাধিক কনসার্টে অংশগ্রহণ করতেন। প্রতিবাদী আন্দোলনের গান লিখে, সুর করে, সেগুলো কনসার্টে গেয়ে গণজাগরণ সৃষ্টি করতেন। তখন তিনি গোটা আমেরিকায় বেশ প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। ১৯৬৪ সালে তিনি ‘এনাদার সাইড অব বব ডিলান’ শীর্ষক একটি এ্যালবাম বের করেন। তবে এটা ছিল অনেকটা ব্যক্তিগত, অন্তর্মুখী গানের সংকলন। ওই সময়ে ডিলানের গানের কথা ছিল মূলত রাজনীতি, সমাজ, দর্শন ও সাহিত্যিক প্রভাব সংবলিত। এগুলো তখনকার জনপ্রিয় ধারার কথিত নিয়মবহির্ভূত ছিল এবং প্রচলিত ধারার বিপরীত হিসেবে ধরা হতো। নিজস্ব সঙ্গীত ধারা প্রসারের পাশাপাশি তিনি আমেরিকার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেছেন। তিনি আমেরিকান লোকগীতি, কান্ট্রি, ব্লুজ, রক এ্যান্ড রোল, ইংরেজ, স্কটিশ, আইরিশ লোকগীতি, এমনকি জ্যাজ সঙ্গীত , সুইং, ব্রডওয়ে, হার্ডরক এবং গসপেলও গেয়েছেন।

১৯৬৬ সালের ২৯ জুলাই উডস্টক, নিউইয়র্কে বাড়ির কাছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হন বব ডিলান এবং এই দুর্ঘটনায় প্রাপ্ত আঘাত থেকে সেরে উঠতে সময় নেন প্রায় এক বছর। এরপর ডিলান প্রায় আট বছর কোন ট্যুরে যাননি, জনসমক্ষেও খুব কম উপস্থিত হতেন। ওই সময়ে জন ওয়েসলি হার্ডিং, আমেরিকান ওয়েস্ট এবং বাইবেলের আলোকে লেখা ছোট ছোট গানের রেকর্ডিং করেছেন। গানের লিরিকে ফুটে উঠেছিল জুডিও- ক্রিস্টিয়ান সংস্কৃতির ভাবগাম্ভীর্য, যা ডিলানের ১৯৬০-৬৪ সালের গানগুলো থেকে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৬ সালে ডিলান মডার্ন টাইমস নামে স্টুডিও এ্যালবাম বের করেন। ২০০৯ সালের এপ্রিলে তিনি প্রকাশ করেন টুগেদার থ্রু লাইফ এবং ‘ক্রিসমাস ইন দ্যা হার্ট’। ২০১০ সালে বের করেন এ্যালবাম উইটমার্ক ডেমোস, বব ডিলান : দ্য অরিজিনাল মোনো রেকর্ডিংস। বব ডিলান সর্বকালের জনপ্রিয় বেশ কিছু গানের জন্মদাতা। তার বিখ্যাত কিছু গান হলো- নট ডার্ক ইয়েট, এভ্রি গ্রেইন অব স্যান্ড, অল অ্যালং দ্য ওয়াচ টাওয়ার, সাবটেরানিয়ান হোমসিক ব্লুজ, ভিশন অব জোহানা, এ হার্ড রেইন’স আ-গনা ফল, ট্যাঙ্গেলড আপ ইন ব্লু, ইট’স অলরাইট-আই অ্যাম অনলি ব্লিডিং, লাইক এ রোলিং স্টোন এবং ব্লোয়িন ইন দ্য উইন্ড ইত্যাদি। উনার অধিকাংশ শ্রেষ্ঠ কাজ ষাট দশকে রচিত হয়েছিল। তিনি ষাট দশক থেকে পাঁচ দশকেরও অধিক সময় ধরে জনপ্রিয় ধারার মার্কিন সঙ্গীতের অন্যতম প্রধান পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

গানের পাশাপাশি কবিতা লেখায় সমানভাবে প্রতিভাবান বব ডিলান। তার লেখায় স্যামুয়েল টেইলর কোলেরিজ এবং উইলিয়াম ব্লেইকের মতো রোমান্টিক কবিদের প্রভাব লক্ষণীয়। ডিলানের কবিতায় প্রেম আছে, ধর্ম আছে, আছে প্রতিবাদ। তার লেখা বেশ কিছু বই ছাপা হয়েছে। গদ্য কবিতার বই টরেনটুলা, স্মৃতিকথা ক্রনিকেলস: ভলিউম ১, গানের লিরিকের পর কয়েকটি বই এবং নিজের চিত্রকর্র্র্মের কিছু বই। তার রচনা অনূদিত হয়েছে ফরাসী, স্প্যানিশ, জার্মান এবং সুইডিশ ভাষায়। অক্সফোর্ড আর কেম্ব্রিজের মতো নাক উঁচু প্রতিষ্ঠানের কবিতা সংকলনে তার কবিতার অন্তর্ভুক্তি আছে। তার অধিকাংশ প্রতিবাদী গানই প্রতিবাদী গীতিকাব্য হিসেবে স্বীকৃত। সেই ষাট দশক থেকে আজ পর্যন্ত তার প্রতিবাদী গীতিকাব্যগুলো নিপীড়িত মানুষের জাগরণের শক্তি ও আন্দোলনে প্রাণ সঞ্চার করেছে। বব ডিলানের পথ অনুসরণ করে অনেকেই হয়েছেন বিখ্যাত গীতিকবি ও সঙ্গীত শিল্পী। তাদের মধ্যে অন্যতম আমাদের উপমহাদেশখ্যাত গায়ক কবির সুমন, অঞ্জন দত্ত ও নচিকেতা। তারা প্রত্যেকেই বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, তাদের গানে বব ডিলানের ব্যাপক প্রভাব ছিল। বব ডিলানের প্রতিবাদী গীতিকাব্যগুলো থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতিবাদী ও সমাজ সংস্কারকমূলক গীতিকাব্য রচনা করেছিলেন। বব ডিলান সম্পর্কে কবির সুমন বলেছিলেন, ‘তিনি একজন কবি, যিনি গিটার হাতে গানের সুরে কবিতা পাঠ করতেন’। বব ডিলানকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেয়ার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে নোবেল কমিটি বলেছে, We are really giving it to Bob Dylan as a great poet – thats the reason we awarded him the pri“e. Hes a great poet in the great English tradition, stretching from Milton and Blake onwards. And hes a very interesting traditionalist, in a highly original way. Not just the written tradition, but also the oral one; not just high literature, but also lwo literature.

প্রতিদিন হাজার হাজার শিশু মারা যাচ্ছিল এবং মার্কিন সরকার পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠাচ্ছিল।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন বর্বর পাক হানাদার বাহিনীর হাতে বাংলাদেশ পুড়ছে, লাখে লাখে মানুষ মরছে। সেই আগুনের উত্তাপ ও রক্তের ছোপ গিয়ে পৌঁছায় সুদূর আমেরিকায়। নিরীহ, নিরস্ত্র জনগণের ওপর পাক বাহিনীর অত্যাচারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের সাহায্যার্থে আয়োজিত হয় কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। যার আয়োজক ছিলেন বিখ্যাত মার্কিন গায়ক জর্জ হ্যারিসন এবং বিশ্বশ্রেষ্ঠ সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশংকর। সেই সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকা শিল্পী ছিলেন বব ডিলান। তাদের ডাকে প্রথমে সাড়া দেন ফোক সঙ্গীতের কিংবদন্তী বব ডিলান এবং তিনি ছিলেন ওই কনসার্টের মূল আকর্ষণ। ১৯৭১ সালের ১ আগস্টে আয়োজিত এই কনসার্টে বব ডিলান তার জনপ্রিয় পাঁচটি গান পরিবেশন করেন। কনসার্টে মোট লোক সংখ্যা ছিল ৪০,০০০ এবং কনসার্ট থেকে ২৫০,০০০ ডলার উঠেছিল যা ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। ওই সময়ে এটা ছিল মানবতার তরে স্রোতের বিপরীতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কেননা, পাকিস্তানের প্রতি মার্কিন সরকারের সমর্থন ছিল এবং মার্কিন সরকারের পাঠানো অস্ত্র দিয়েই লাখে লাখে নিরীহ বাঙালী হত্যা করা হচ্ছিল। কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পী বব ডিলানের সেই অবিস্মরণীয় অবদানের কথা বাংলাদেশের মানুষ চিরকাল স্মরণ করবে।

প্রকাশিত : ৩১ মে ২০১৯

৩১/০৫/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

ঈদ আনন্দ সংখ্যা ২০১৯



শীর্ষ সংবাদ: