২১ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

পতাকার লালবৃত্ত জুড়ে আছে লক্ষ বধ্যভূমি

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৯
  • আসাদ মান্নান

[চৌধুরী শহীদ কাদের, তপন পালিত, মামুন সিদ্দিকী, আহম্মেদ শরীফ,

মিথুন, বৃষ্টি, রেহানা প্রমুখ এ প্রজন্মের সাহসী যোদ্ধাদের]

‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ’ শীর্ষক

একটা অপূর্ব সেমিনারে কাল সারাদিন আমি

আরও বহু প্রিয়জনসহ গভীর বেদনা বুকে

শুনেছি সেসব মানুষের জীবন দানের কথা

মূলত ছিলেন যারা আমাদের পূর্বজ পুরুষ

অতি সাধারণ, এতটা গরিব আর খেটে খাওয়া

হতশ্রী এসব মানুষের মতো দীনহীন জরাজীর্ণ

জনগোষ্ঠী পৃথিবীতে অন্যদেশে খুব বেশি নেই;

অথচ হায়েনাগুলো আমাদের একান্ত স্বজন

অসহায় সেই পূর্বপুরুষদের নির্বিচারে

হত্যা করে লাশগুলো ফেলে রাখে খালেবিলে।

কাল সারাদিন অই সেমিনারে এই প্রজন্মের

এক ঝাঁক গবেষক কী দারুণ উদ্দীপনা বুকে

স্মৃতির কোদালে কত হাজার হাজার বধ্যভূমি

এবং গণকবর খুঁড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের

হাড় ও কঙ্কাল শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরে

হৃদয় বিদীর্ণ করা সেই সব কাহিনীতে দেখি:

শিয়ালে- কুকুরে মিলে অভিন্ন ক্ষুধায় মাকে খায়,

পিতার কঙ্কালে বাসা বাঁধে তেলাপোকা, আরশোলা

নাম- না- জানা কত কীট! এখানে ওখানে নর্দমায়

ডোবায় হাত-পা বাঁধা গুলিবিদ্ধ মস্তকবিহীন

লাওয়ারিশ কত লাশ, কত কত লাশ পড়ে থাকে,

কেউ তার প্রকৃত হিসাব কোনদিন রাখে নাই,

এখনো জানে কি কেউ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে কত

শহীদ হয়েছে? জীবন গিয়েছে কত? কত শত

মা-বোনকে দিতে হয় বিসর্জন আপন সম্ভ্রম!

এ তথ্য জানার প্রয়োজন আগে কেউ কখনো দেখেনি।

কী করে সবাই দেখবে! না চাওয়ার আগে সব পেয়ে

সকলে বিজয়ানন্দে এতকাল ধরে এত বেশি

মগ্ন ছিলো, পরাজিত দস্যুদের চতুর দোসর

ঘাতক দালাল খুনী কী নিপুণ দক্ষতায় খায়

মুক্তিযুদ্ধে বাঙালীর গৌরবের সমূহ অর্জন!

অতীতের দিকে হেঁটে লাভ কী! বরং সামনে হাঁটো।

কালের পাথরে চাপা বেদনার গাথা ও কাহিনী

যখন তরুণ প্রজন্মের অই সাহসী যোদ্ধারা

একে একে সেমিনারে গভীর আবেগ নিয়ে বলে,

তখন অনেককে দেখি, বিষণœ বদনে দু’চোখের

জল মুছতে; অশ্রুঝরা প্রহরের দীর্ঘশ্বাসগুলো

আকাশের মর্মে ঢুকে ভেদ করে বাতাসের বাহু;

এক ধরনের ভয় আর আতঙ্কের ছায়া মনে

কেবলই লতিয়ে ওঠে পাঁজরের শিরদাঁড়া বেয়ে।

প্রিয় সঙ্গিনীকে শিকারীর হাতে ফেলে দিয়ে

হরিণী যেভাবে কাঁদে অনুরূপ কান্নার ভাষায়

সতত গোপনে কাঁদে বাংলাদেশ, সন্তানের শোকে

মা যেমন সারাক্ষণ বেদনায় আকীর্ণ থাকেন

তেমন যন্ত্রণা বুকে দেখি তিনি একা একজন

বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক ডক্টর মুনতাসীর মামুন

নিয়ত অস্থির চিত্তে ভালোবেসে এ মা ও মাটিকে

সারা দেশ ঘুরে ঘুরে একটা বিষয় জানাচ্ছেন,

মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয়ের ইতিহাস আছে

আছে তার জয়গাথা, নতমুখো আমীর আবদুল্লা

নিয়াজীর পরাজয়ে যদিও আমরা লাভ করি

স্বাধীনতা, চারদিকে উড়ছে বিজয় পতাকা; কিন্তু

সবাই কেন যে বেমালুম ভুলে গেছে এ সত্য যে,

পতাকার লালবৃত্ত জুড়ে আছে লক্ষ বধ্যভূমি।

মুনতাসীর মামুনের বক্তৃতা শোনার পর আমি

বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধতার অতলেই ডুবে থাকি;

যখন সম্বিত ফিরে পাই, অই সেমিনার কক্ষ ছেড়ে

আমি বাতাসে নিশ্বাস নিতে চাই। দু’কদম হেঁটে

দেখি অদূরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, এ উদ্যানে

প্রতি বিন্দু ধূলি কণা গৌরবের স্মৃতি চিহ্ন নিয়ে

আমাকে তাকিয়ে দ্যাখে, আর দ্যাখে সুউচ্চ টাওয়ার,

টাওয়ারে একজোড়া শাদা কবুতর বসে আছে।

এই সব দৃশ্যাবলি দেখতে দেখতে আমি অবচেতনে

বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে

আবার প্রবেশ করি আমি একা-ক্লান্ত অবসন্ন।

কেন জানি মনে হলো আমাকে অনেকগুলো বধ্যভূমি

এবং গণকবর জড়িয়ে রেখেছে। আমি ভয়ে

অজ্ঞান অবশ হয়ে থাকি মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে।

যখন আমার জ্ঞান ফিরে আসে তখন হঠাৎ

কেন জানি মনে হলো, গণহত্যা-বধ্যভূমি

এবং গণকবর এ তিনটি শব্দ আজ আর

কোনও শব্দ নয়, আমাদের চেতনার মূল অস্ত্র:

এ অস্ত্র পাহারা দেবে সারাক্ষণ আমার তুমিকে।

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৯

২৬/০৩/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

স্বাধীনতা দিবস বিশেষ আয়োজন ২০১৯



শীর্ষ সংবাদ: