১৮ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

স্বাধীনতার সূর্য-কিশোর

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৯
  • বর্ণিক বৈশ্য

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কোন রূপকথার কল্পকাহিনী নয়। বাংলাদেশ কারও করুণার দানও নয়। আমাদের দেশমাতৃকার মাটির প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে যুগ যুগ ধরে নিপীড়িত, নির্যাতিত বাঙালীর করুণ আর্তনাদ আর তাজা লাল রক্তের পবিত্র স্রোতধারা।

আজ এমন একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধার কথা লিখছি, যিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। যাঁর মৃত্যুর পর শরীরের কোন অঙ্গই আর অক্ষতভাবে পাওয়া যায়নি। ফুটফুটে, কোমল শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল বধ্যভূমির সবুজ মাটিতে। তাঁদের সেই রক্তই তো একাত্তরে প্রদীপ্ত সূর্যের মতো জ্বলে উঠে যক্ষপুরী থেকে এনে দিয়েছিল আমাদের চির আকাক্সিক্ষত স্বাধীনতাকে। এমন একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধার নাম শহীদ মাজহারুল মুনির (সবুজ)। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন ঢাকার স্বনামধন্য বিদ্যাপীঠ গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের নবম শ্রেণির মানবিক শাখার ছাত্র। আমি নিজেও গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের ছাত্র ছিলাম। ছাত্রাবস্থায় জানতে পারি বিদ্যালয়ের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কথা। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই তাঁদের জীবনী সংগ্রহের চেষ্টা শুরু করি। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে তাঁর প্রতিকৃতি ও ব্যবহৃত দ্রব্যাদি সংরক্ষিত দেখে এবং সেই সূত্র ধরে বিভিন্ন বইপত্র ঘেঁটে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে জানার চেষ্টা চালাই। যাই তাঁর গ্রামের বাড়ি, তাঁর নামে সংরক্ষিত বিদ্যাপীঠ ও সেই বধ্যভূমিতে, যেখানে তিনি শহীদ হন। তাঁর সহোদর কে.এম. সিরাজুল মুনির টিপু, মামাতো ভাই আলহাজ্ব রেজাউল মতিন স্বপন, সহযোদ্ধা আবদুল মতিনের সঙ্গে কথা বলে আমি আবিষ্কার করার চেষ্টা করি আমার বিদ্যাপীঠের সেই কিশোর মুক্তিযোদ্ধাকে, ছাত্রাবস্থায় যাঁর অস্পষ্ট ছবিটি দেখেছি বিদ্যালয়ের স্মরণিকায়।

১৯৫৫ সালের ৭ ডিসেম্বর শহীদ মাজহারুল মুনির জন্মগ্রহণ করেন লক্ষ্মীপুর জেলার সদর উপজেলার আলীপুর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম কে. এম. ছিদ্দিক উল্যাহ এবং মাতা খুরশীদ আরা। তাঁর পিতা ছিলেন ঢাকা নিউমার্কেট বণিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি এবং একজন ওষুধ ব্যবসায়ী। নিউমার্কেটে ‘খান ফার্মেসি’ নামে তাঁর একটি ঔষধালয় ছিল। এছাড়াও তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগ নিউমার্কেট শাখার সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধপূর্ব উত্তাল দিনগুলোতে তাঁর ‘খান ফার্মেসি’র পেছন দিকের করিডোরে প্রায়ই আওয়ামী লীগ নেতাদের গোপন বৈঠক হতো। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ ফজলুল হক মণিসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও সেখানে মাঝে মাঝে আসতেন। কাজেই ছোটবেলা থেকেই সবুজের মনে বিপ্লব ও স্বাধিকার আন্দোলনের বীজ দানা বাঁধে, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক তাঁর মতো একজন কিশোরকেও টেনে নেয় মুক্তিযুদ্ধের দিকে।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের উত্তাল সময়ে উত্তপ্ত ঢাকার পাড়ায়, মহল্লায় ও রাজপথে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন মিটিং মিছিলে অংশগ্রহণ করতেন শহীদ মাজহারুল মুনির সবুজ। সাতই মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ভাষণ দিবেন। সবুজ তখন পরিবারের সাথে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে বসবাস করতেন। ঐদিন সবুজ রেকর্ড প্লেয়ার হাতে কাঁটাবন বস্তির মাঝ দিয়ে রেসকোর্স ময়দানে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বজ্রকণ্ঠের ভাষণ সাতকোটি বাঙালীর মতো তাঁর কিশোর মনেও বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করল। ২০ মার্চ সবুজ পরিবারের সাথে লক্ষ্মীপুরে গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। এদিকে পঁচিশে মার্চ বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী সারাদেশে গণহত্যা শুরু করেছে। এই গণহত্যার খবর লক্ষ্মীপুরে পৌঁছে যায় নিমেষেই।

সবুজ মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য আকুল হয়ে উঠেছিলেন। ছেলের জেদ দেখে বাবা তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবদুস সাত্তার মাস্টারের হাতে সবুজকে তুলে দেন। সেদিনই দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলে সবুজ পরিবারের থেকে শেষ বিদায় নেয়। এরপর সবুজ, আবদুল মতিন, শাহ আলম হাওলাদার, আবদুস সাত্তার মাস্টার ভারতের উদ্দেশে রওনা দেন যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে। কিন্তু বয়সে ছোট হওয়ায় প্রথমে তাঁকে ট্রেনিং এ নিতে চায়নি। কিন্তু যখন সবুজ চিৎকার করে কেঁদে বলে উঠলেন, ‘যদি যেতে হয় তবে পতাকা হতেই যাব’- তখন কেউ তাঁকে না করতে পারল না। তাঁকে পাঠিয়ে দেয়া হলো ‘মেলাঘর ট্রেনিং ক্যাম্পে’। ট্রেনিং শেষ করে সবুজ জুন মাসে দেশে ফিরে আসেন এবং ২ নং সেক্টরের ‘সি’ জোনের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের বিভিন্ন গেরিলা আক্রমণে অংশগ্রহণ করে সাহসিকতার পরিচয় দেন।

সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখে ‘সি’ জোনের মুক্তিযোদ্ধাদের চারটি ট্রুপ রাজগঞ্জের চর্তুদিকে পাকবাহিনীকে মোকাবেলা করার জন্য ওঁৎ পেতে থাকে। এদিকে ক্যাম্পের দূষিত পানি ও অপরিচ্ছন্ন খাবারের কারণে সবুজ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। বর্ষাকালে কোমর সমান পানি ঠেলে তাঁকে যুদ্ধ করতে হয়েছে। রাস্তার উত্তরে গঙ্গা প্রসাদ ভূঁইয়ার বাড়িতে মাজহারুল মুনির সবুজসহ তাঁদের গেরিলা দলটি অবস্থান নেয়। সিদ্ধান্ত হয় পাকিস্তানী সৈন্য ও রাজাকাররা রাজগঞ্জ বাজারে আসলে রাজগঞ্জ থেকে মাইজদী ফেরার রাস্তায় দু’দিক থেকে সামনে পেছনে আক্রমণ করা হবে। মূল যুদ্ধ হয় হোসেনপুর গ্রামে। সে সময় পাকিস্তানী হানাদারদের কাছে ছিল মেশিনগানসহ উন্নত সমরাস্ত্র। আর সবুজদের কাছে ছিল অনুন্নত এল.এম.জি.। তাই তাঁরা এ্যামবুশ করে আক্রমণ করে টানা আটদিন। টানা আটদিন বর্ষাকালে ঝুম বৃষ্টির সময় এ্যামবুশ করে আক্রমণ করা সহজ কথা ছিল না। এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা হাইড আউটে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। হাইড আউট মানে যুদ্ধের ময়দানে পরাজয় নিশ্চত জেনে পূর্বের অবস্থানে ফিরে যাওয়া। সবাই চলে গেলেও সবুজ একা বাংকারে থাকেন এবং গুলি ও গ্রেনেড নিক্ষেপ করে একার প্রচেষ্টায় আটজন মিলিটারি ও রাজাকারকে গুলিবিদ্ধ করেন। বাংকারে এক পর্যায়ে খাবার ও গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলে সবুজ উত্তর দিকের একটি দীঘির পাড়ে যান। রাজাকাররা পাকবাহিনীকে খবর দিলে তারা সবুজকে ধরে নিয়ে যায়। টানা তিনদিন তাঁকে ক্যাম্পে আটকে রেখে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। আর্মি অফিসাররা টানা তিনদিন সবুজ, অপর কিশোর মুক্তিযোদ্ধা রবীন্দ্রকুমার সাহা এবং শফি উল্লাহ এই তিন মুক্তিযোদ্ধাকে ট্রাকের ওপর আড়াআড়িভাবে বাঁশ বেঁধে, বাঁশে ঝুলিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে থাকে এবং মাইজদী শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ট্রাকে ঘুরিয়ে মাইকে ঘোষণা করে যেন সাধারণ জনগণ এই ধরনের কচি যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে না পাঠায়। কারও সন্তান যদি মুক্তিযুদ্ধে যায় তবে তাদের পরিণতিও এমন হবে। শত-শত মানুষ সেদিন কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর বর্বরোচিত নির্যাতন দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। নির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধাদের করুণ আর্তনাদ এবং আর্তচিৎকারে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। এখনও যাদের মনে পাকিস্তানের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শিত হয়, যারা এখনও কথায় কথায় পাকিস্তানকে সমর্থন করে তাদের কানে কি সবুজের মতো কিশোরযোদ্ধাদের আর্তচিৎকার প্রতিধ্বনিত হয় না? বীর মুক্তিযোদ্ধারা, যাঁরা নির্যাতনের মুখেও শত্রুর কাছে মাথা নত করেননি। বিশ্ববিবেক সেদিন স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল।

অতঃপর ২৩ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১১টার দিকে মাইজদী জেনারেল হাসপাতালের উত্তর-পূর্ব কোণে পুকুর পাড়ে তাঁর শরীরে গ্রেনেড ফিট করে দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। সবুজের মৃত্যুর পর তাঁর মা খুরশীদ আরা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই আশায় বুক বেঁধেছেন যে তাঁর সবুজ একদিন তাঁর বুকে ফিরে আসবেই। এই শহীদ জননীকে রত্মগর্ভা মা হিসেবে পুরস্কৃত করে গ্রান্ড আজাদ।

সবুজের মামার বাড়িতে হাজী আবদুল মতিন ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘পিয়ারাপুর শহীদ মাজহারুল মনির উচ্চ বিদ্যালয়’। এছাড়া ভবানীগঞ্জ থেকে মাইজদী যাওয়ার সড়কের নামকরণ এই বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে করা হয়। এছাড়া তাঁর স্মৃতি ও বীরত্ব গাঁথা খুব বেশি সংরক্ষিত হয়নি। তাঁর গ্রামের বাড়ি এলাকার নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না তাঁর আত্মত্যাগের কাহিনী। অথচ সবুজের মতো ত্রিশ লক্ষাধিক মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে বাঁচি। আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এই বীর শহীদদের পবিত্র পদধ্বনি।

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৯

২৬/০৩/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

স্বাধীনতা দিবস বিশেষ আয়োজন ২০১৯



শীর্ষ সংবাদ: