২২ নভেম্বর ২০১৯, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

তারুণ্য ॥ নয় হারবার- নয় পথ হারাবার

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৯
  • আকিল জামান ইনু

দুর্ভাগ্য অথবা এর অন্য যে কোন প্রতিশব্দ ব্যবহার করি না কেন, সত্য এই যে ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই স্বাধীনতাবিরোধী মহলের ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার শুরু। আর এই ষড়যন্ত্রের মূল টার্গেট ছিল বাংলাদেশের তরুণ সম্প্রদায়। একটি ধ্বংসপ্রায় স্বাধীন দেশে যখন দলমত নির্বিশেষে সবার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ার লড়াইয়ে লিপ্ত হবার কথা এবং সে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয়ার কথা তরুণ সম্প্রদায়ের। ঠিক তখনই আমরা দেখলাম এই তরুণদের মাঝে কিছু ভ্রান্ত মতবাদ প্রচার করে তাদের ঠেলে দেয়া হলো বিভ্রান্তির চোরাগলিতে। যতই বৈজ্ঞানিক তন্ত্র-মন্ত্রের দোহাই দেয়া হোক সে ষড়যন্ত্র আমাদের জাতীয় জীবনে রেখে গেছে এক গভীর ক্ষত। তরুণ এবং অনাগত প্রজন্মকে লক্ষ্য করে দ্বিতীয় ষড়যন্ত্রটি আরও ভয়াবহ যার তাৎপর্যও সুদূরপ্রসারী। সেটি হলো- ইতিহাস বিকৃতি। পাকিস্তানী প্রেতাত্মা ভর করা কিছু জ্ঞানপাপী চেয়েছিল দেশকে পাকিস্তানী ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ তুলতে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভুলিয়ে দিয়ে এক বিভ্রান্ত আগামী প্রজন্ম গড়ে তুলতে তারা আশ্রয় নেয় ইতিহাস বিকৃতির। যেমন বলছিলাম, স্বাধীনতাবিরোধীদের সব চক্রান্তের মূল টার্গেট হয়েছে আমাদের তরুণ সম্প্রদায়। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে আমাদের কিছুটা অতীতে ফিরে যেতে হবে।

‘হাত মে বিড়ি মুখ মে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগান দিয়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সৃষ্টি ছাড়া রাষ্ট্র পাকিস্তানে স্বপ্নভঙ্গ হতে খুব বেশি দেরি হয়নি অন্তত পূর্ব পাকিস্তানীদের জন্য। পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক মনোভাব আঁচ করে তার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল তরুণরাই প্রথম। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বাধীনতা যে তামাশা হতে যাচ্ছে এটি প্রথম যে ক’জন অনুভব করেছিলেন তৎকালীন তরুণ ছাত্র-জননেতা শেখ মুজিব তাদের একজন। সেই অনুভূতি তাকে তাড়িত করে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম সংগঠনে। প্রসঙ্গত বলতেই হয় তখনও অনেক প্রতিষ্ঠিত বাঘা বাঘা নেতা ‘পেয়ারা পাকিস্তানে’র স্বপ্নে বিভোর। ভাষাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সফল গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল এই তরুণরাই। ভাষার দাবিতে গর্জে ওঠা এই তরুণরা যে কেবল মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছিল তা নয়, জাতির সামনে উন্মোচিত করেছিল পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের গণবিরোধী চরিত্র। এও সত্যি তরুণদের গড়ে তোলা সেই ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই শুরু আমাদের স্বাধীনতার পথযাত্রা। এরপর ৫৮, ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭০-এর গণআন্দোলনের প্রতিটি ধাপে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে তরুণ সমাজ। প্রবীণ নেতৃত্ব আপোসের চোরাগলিতে পথ হারালেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে এই তরুণ সম্প্রদায় তাদের লক্ষ্যে ছিল অটল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীনও আমরা দেখেছি সব যড়যন্ত্র মোকাবিলা করে জাতীয় চার নেতার নেতৃত্বে দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে এই তারুণ্যের অসামান্য ভূমিকা। সার্বিক বিবেচনায় স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও তাদের আন্তর্জাতিক প্রভুদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য যে হবে আমাদের তরুণ সমাজ এতে অবাক হবার কিছু নেই। সেটাই হয়েছে।

আদর্শিক বিভ্রান্তির পর ইতিহাস বিকৃতির ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে যে পথ পাড়ি দিয়েছে আমাদের তারুণ্য সেটি আরও ভয়াবহ। বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকাকালীন এই চক্রান্তের নায়কেরা ঘাপটি মেরে থাকলেও ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট তার নির্মম হত্যাকা-ের পর এটি ডালপালা মেলে। মাঝখানে উল্লেখ করতেই হয় বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বিশাল সংগঠন নিয়ে আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ নেতাই যখন হতবিহ্বল তখন প্রতিবাদের, সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রথম আহ্বানটিও এসেছিল এই তরুণদের মধ্য থেকেই। তারা কতটা সফল হয়েছিল সে প্রশ্নে না গিয়েই বলা যায়, তাদের এই প্রতিবাদ জাতিকে প্রতিবাদহীনতার কলঙ্ক থেকে মুক্তি দিয়েছে। জাতির জীবনে নেমে আসা ক্রান্তিকালে ইতিহাস বিকৃতির সেই ধারাটি বেগবান হলো জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে। রাষ্ট্র তার সর্বশক্তি নিয়োগ করল মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস আড়াল করে রাজাকার পুনর্বাসনে। আমরা এও দেখেছি মেধাবী তরুণদের বিভ্রান্ত করতে জিয়াউর রহমানের জাহাজ ভ্রমণের অপচেষ্টা। সে অন্ধকার দিনগুলোতে আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে তরুণরাই। আর্থিক প্রলোভন, উচ্চপদ, সব উপেক্ষা করে একদল তরুণ বুকের গভীরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে চষে বেড়িয়েছে বাংলার মাঠ-ঘাট। জিয়া পরবর্তী এরশাদের স্বৈরাচারী শাসন রুখতে আমাদের তরুণরা পথে পথে গড়েছে ব্যারিকেড। গণতন্ত্রের দাবিতে বুকের তাজা রক্তে রাঙ্গিয়েছে রাজপথ- সেলিম, দেলোয়ার, তিতাস, বসুনিয়াসহ অসংখ্য নাম জানা-অজানা তরুণর উৎসর্গ করেছে জীবন। তরুণ নূর হোসেন তো আজও জাতির কাছে সাহসের আরেক নাম। দীর্ঘ নয় বছরে তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করতে এরশাদ শাহীর সব চেষ্টাই জলে গেছে। বিভ্রান্তি, পদস্খলন হয়তো ছিল কিন্তু সেসব কাটিয়ে এই তরুণেরাই সামনের কাতারে থেকে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে। এরশাদ পরবর্তী গণতন্ত্রের নতুন যাত্রার শুরুতেই আবারও ধাক্কা খেয়েছে তারুণ্যের স্বপ্ন। জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি ক্ষমতায় এসে পুরনো রাজাকার পুনর্বাসন প্রকল্প চালু করলে প্রতিবাদে শহীদ জননীর নেতৃত্বে রাজপথ কাঁপিয়েছে তারুণ্য। স্বাধীনতাবিরোধীদের রুখে দেয়ার সেই প্রচেষ্টা তৎকালীন বাস্তবতায় পুরোপুরি সফল না হলেও এর প্রভাব আমরা দেখব দু’দশক পর আরেক জাগরণে। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গণতন্ত্র যাত্রায় ২০০১ পরবর্তীতে কষ্টের শরবিদ্ধ বুকে তরুণ প্রজন্ম দেখল ঘাতকের গাড়িতে জাতীয় পতাকা। আমাদের তারুণ্য প্রত্যাখ্যান করেছে সে শাসন। ওয়ান ইলেভেনের সারাটা সময় জুড়ে এই তারুণ্য ঝড় তুলেছে রাজপথে এবং অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা রায় দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির পক্ষে।

২০০৯-এ নবগঠিত সরকারের যে উন্নয়নযাত্রা সে যাত্রার মূল শক্তি হিসেবে আবির্ভূত আজ আমাদের তরুণ সমাজ। মনে রাখতে হবে তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাবে ততদিনে বদলাতে শুরু করেছে পৃথিবী। এই তথ্যপ্রযুক্তিকে ধারণ করে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অগ্রসৈনিক আজ আমাদের তরুণরা। তারা যেমন সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অবদান রাখছে তেমনি আত্মকর্মসংস্থানে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে অসামান্য অবদান রাখছে জাতীয় অর্থনীতিতে। নিজের পাশাপাশি আরও অনেকের কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখছে। দেশে বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছেন আমাদের তরুণ উদ্ভাবকরা। কৃষি খাতে, খামারশিল্পে আজ আমরা যতটুকু এগিয়েছি তার পেছনেও একদল নিবেদিতপ্রাণ তরুণের অবদান অনস্বীকার্য। একদল মেধাবী তরুণ কর্মকর্তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকে নিয়ে কাজ করছেন প্রশাসনে যারা বদলে দিতে চলেছেন পুরনো আমলাতান্ত্রিক ধারণা। পরিবেশ এবং প্রকৃতি রক্ষায় আমাদের তরুণরা আজ অনেক বেশি সচেতন। যে কোন মানবিক আবেদনে সাড়া দিয়ে তারা থাকছেন সামনের সারিতে। ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে এই তরুণরা। আজ আমরা গর্ব করে বলতে পারি তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমাদের তরুণরা দেশের প্রতিটি অঞ্চলে গড়ে তুলেছেন এমন কিছু সংগঠন যা আগামী দিনগুলোতে আমাদের উপহার দেবে অনেক বেশি এক মানবিক বাংলাদেশ। পাশাপাশি তারা চেষ্টা করছে এই তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিদেশ নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে। আমাদের তরুণদের অদম্য মনোবলের ওপর ভরসা রেখে একথা নিশ্চিত করেই বলা যায় সেদিন খুব দূরে নয় যেদিন আমরা এ বিষয়ে বিদেশ নির্ভরতা কাটিয়ে উঠব। এতদিন আমরা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানির বিলিয়নিয়র মালিকদের গল্প শুনেছি আজ গর্ব করে বলতে পারি আমাদের আছে ‘পাঠাও’ এর- ইলিয়াস। ভিন্ন গ্রহে প্রাণ খুঁজতে নাসার প্রধান ভরসা এখন বাঙালী তরুণ মাহমুদা সুলতানা। মাত্র নয় বছরের বাঙালী বিস্ময় বালক আজ আমেরিকার মাটিতে বসে সদর্পে সে দেশের প্রেসিডেন্ট হবার স্বপ্নের কথা জানায়। তার সেই ঘোষণাকে হেসে উড়িয়ে দেবার মতো লোকও পাওয়া যাবে না। তার মেধার পক্ষে অসম্ভব নয় কিছুই। বাঙালী তরুণ আজ হিমালয়ের চূড়া ছুঁয়েছে। অস্কারের মঞ্চে আমাদের নাফিস বিন জাফরের সদর্প বিচরণ। ৮৫ বছর আগের তত্ত্বকে বাস্তবে রূপ দিয়ে ভরহীন কণা আবিষ্কার করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তরুণ বাঙালী পদার্থবিদ জাহিদ হাসান। গণিত অলিম্পিয়াডে আমাদের তরুণদের সাফল্য বলে দেয় অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তারা পিছিয়ে নেই মোটেই। শিল্প-সাহিত্যাঙ্গনে যে খরা তা এই তরুণদের হাত ধরে কেটে যাবে বলে বিশ্বাস। ক্রীড়াঙ্গনে টিম টাইগারদের কথা তো বলাই বাহুল্য। তরুণ ক্রিকেটাররা বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশকে দিয়েছে অনন্য পরিচিতি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ উন্নয়নের মহাসড়কে আমাদের যে যাত্রা তার প্রধান শক্তি তরুণেরা। তা সত্ত্বেও তারা কিন্তু সত্য, সুন্দর, ন্যায়ের জন্য তাদের প্রতিবাদী চরিত্র হারায়নি। নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসা তারুণ্য চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে সড়ক ব্যবস্থার অসঙ্গতি। আর ঘাতক দালালদের বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসা তারুণ্য ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ থেকে দিয়েছে একটি বার্তা। সেটি হলো- যত ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তই করা হোক না কেন স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী কিংবা তাদের মিত্রদের ঠাঁই হবে না। তারুণ্য জানিয়ে দিয়েছে তারা হারবার নয়, তারা পথ হারায়নি।

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৯

২৬/০৩/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

স্বাধীনতা দিবস বিশেষ আয়োজন ২০১৯



শীর্ষ সংবাদ: