৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

মুক্তিযুদ্ধ ও তানভীর মোকাম্মেলের চলচ্চিত্র

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৯
  • সাজ্জাদ কাদির

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ। যে ঘটনাটিকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে কল্পনাও করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধ এমনই একটি বিষয় যেটি যত বেশি উপলব্ধি করা যাবে ততই আমরা দেশপ্রেমে আরও উদ্বুদ্ধ হব এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যাবে। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এত বড় ত্যাগের বিনিময়ে পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম দেশই স্বাধীনতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ স্থান পেয়েছে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায়। শুধু দেশেই নয়, বিদেশী সাহিত্যেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ স্থান পেয়েছে। দেশে-বিদেশে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য চলচ্চিত্র, নাটক, সঙ্গীত, শিল্পকর্র্ম ইত্যাদি। বাংলাদেশেও এ যাবত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পূর্ণদৈর্ঘ্য, স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং প্রামাণ্যচিত্র মিলিয়ে আনুমানিক প্রায় দেড় থেকে দুই শ’ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এছাড়া বহির্বিশ্বেও বেশ কিছু প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে।

বাংলাদেশে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অত্যন্ত জীবন ঘনিষ্ঠ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার ও লেখক তানভীর মোকাম্মেলের অংশগ্রহণ রয়েছে অত্যন্ত জোরালোভাবে। তার কাজের অন্যতম প্রধান বিষয় মুক্তিযুদ্ধ। তানভীর মোকাম্মেল এমন একজন ব্যক্তিত্ব যার চলচ্চিত্র ভাবনাটি সম্পূর্ণ আমাদের এই মাটিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ বিভাগ এবং মুক্তিযুদ্ধ তার চলচ্চিত্রে বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে। শুধু তাই নয়, তার লেখা প্রবন্ধ, কবিতা এবং উপন্যাসেরও প্রধানতম বিষয় এগুলো।

তানভীর মোকাম্মেলের জন্ম দেশ বিভাগ পরবর্তী প্রথম দশকে। আর বেড়ে উঠেছেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক ধ্বংসস্তূপের মাঝে। ভাষা-সংস্কৃতি এক এবং অভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র ধর্মের কারণে মানব সভ্যতার ইতিহাসের বৃহত্তম দেশান্তরি ঘটে আমাদের এই উপমহাদেশে। সাতচল্লিশে সবচেয়ে বড় পারাপারটি ঘটলেও এটি জোরেশোরে অব্যাহত ছিল ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত। আর ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এক চূড়ান্ত পরিণতি। যার মাধ্যমে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ, একটি ভূখ-, একটি মানচিত্র। সময়ের পথপরিক্রমায় সীমান্তে কাঁটতারের বেড়া উঠেছে। আর এই বিষয়গুলো খুব কাছ থেকে দেখতে দেখতেই বেড়ে উঠেছেন তিনি। সেই সঙ্গে এই মাটির কান্না হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন এবং ঘটনাগুলো চলচ্চিত্রের মতো বিশাল ক্যানভাসে হৃদয়স্পর্শিভাবে চিত্রায়ণ করেছেন।

তানভীর মোকাম্মেল এ যাবত মোট ৬টি পূর্ণদৈর্র্ঘ্য, ১টি স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনী চলচ্চিত্র ও ১৫টি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। দেশভাগের উপর নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনী চলচ্চিত্র ‘রূপসা নদীর বাঁকে’ নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এছাড়া সামনে পরিকল্পনা করছেন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রাণ পুরুষ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের। এ যাবত মুক্তিপ্রাপ্ত ৬টি কাহিনী চলচ্চিত্রের মধ্যে ৩টিই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এবং ১৫টি প্রামাণ্যচিত্রের মধ্যে অনেকগুলো মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে। মুক্তিযুদ্ধ যে আমাদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সেটি তার কাজের ক্ষেত্রে আমরা বারবার খুঁজে পাই। এখানে তানভীর মোকাম্মেল নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ৩টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনী চলচ্চিত্র ‘নদীর নাম মধুমতি’, ‘রাবেয়া’ ও ‘জীবনঢুলী’ নিয়ে কথা বলতে চাই। ভবিষ্যতে কোন নিবন্ধে তার নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্রগুলো নিয়ে লেখার আশা রাখছি।

‘নদীর নাম মধুমতি’

তানভীর মোকাম্মেল নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাহিনী চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে প্রথমে নির্মিত হয়- ‘নদীর নাম মধুমতি’ চলচ্চিত্রটি। এটির পুরো কাহিনী ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ। মধুমতি নদীর পাড়ের এক গ্রামের অবস্থাপন্ন মোতালেব মেম্বার। বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর মোতালেব তার স্ত্রীকে বিয়ে করে। বাচ্চু নামে বড় ভাইয়ের এক সন্তান আছে। ধ্যান-ধারণা চিন্তা চেতনায় বাচ্চু মোতালেবের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা প্রকৃতির। বাচ্চুর উপর গ্রামের মুক্ত চিন্তার স্কুল শিক্ষক অমূল্য চক্রবর্তীর প্রভাব তীব্র। তারা একসঙ্গে গল্প করে, আড্ডা দেয়, দেশের স্বাধীনতার কথা বলে। এই আড্ডার সার্বক্ষণিক সঙ্গী বাচ্চুর থেকে বয়সে বড় গ্রামের আর এক যুবক আখতার। অমূল্য মাস্টার, বাচ্চু ও আখতার তিনজনের বয়সের পার্থক্য তিন রকম হলেও ভাবের আদান-প্রদান করতে কিংবা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে কোন সমস্যা হয়নি। কারণ তিনজনই চেতনাগত দিক থেকে এক। চিন্তা চেতনা যদি এক থাকে যে কোন বয়সী মানুষেরই বন্ধুত্ব হতে পারে এই তিনজনের সম্পর্ক তাই প্রমাণ করে। অমূল্য চক্রবর্তীর মেয়ে শান্তি বিধবা হওয়ার পর থেকে বাবার বাড়িতেই থাকে এবং বৃদ্ধ বাবার দেখাশোনা করে।

কাহিনীর শুরুতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ দর্শককে নড়েচড়ে বসতে সাহায্য করে। সেই সঙ্গে বাচ্চু এবং আখতার বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনে গেরিলা বাহিনীতে যোগদানে উদ্বুদ্ধ হয়। আখতারের পরামর্শে বাচ্চু তার সৎ বাপ মোতালেবের পাখি মারা বন্দুক এবং কিছু টাকা নিয়ে গেরিলা বাহিনীতে যোগদান করে। অন্যদিকে মোতালেব মেম্বার শান্তি কমিটিতে যোগ দেয়। এরই মধ্যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়ে যায়। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। মানুষ দেশ ছেড়ে ওপারে চলে যাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। বিশেষ করে অমুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সবচেয়ে বিপদের মুখে পড়ে। এ রকম একটি পরিস্থিতে অমূল্য মাস্টারের এক নিকটজন অনন্ত এসে মাস্টারকে ভারতে চলে যাওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু মাস্টারের একই কথা সে তার স্কুল এবং ছাত্রদের ছেড়ে কিছুতেই এই মাটি ছেড়ে যাবে না। মাস্টারের মুখে উচ্চারিত সংলাপ, ‘সাতচল্লিশে যাই নাই, পঞ্চাশ সালে যাই নাই, চৌষট্টির রায়টের সময়েও যাই নাই। স্কুলটা আছে। আসবে, কোন এক অর্জুন একদিন আসবে, তুর্যধন বধ হবে। স্কুলটা আছে, ছাত্ররা আছে, আমার যাওয়াটা হবে না অনন্ত, তোমরাই যাও।’ দর্শক হিসেবে এই সংলাপকে আমার কাছে দেশপ্রেমের এক অমর কাব্য মনে হয়েছে। অমূল্য মাস্টারের মতো অসংখ্য মানুষ শত প্রতিকূলতায়ও নিজের বাপ-দাদার ভিটা-মাটি ছেড়ে ওই কঠিন সময়েও চলে যায়নি। বিনিময়ে কী হয়েছে? আখতারে জীবন বিলিয়ে দিতে হয়েছে। এই চলচ্চিত্রেও অমূল্য মাস্টারকে জীবন দিয়ে মাটির দায় শোধ করতে হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের নানা নৃশংসতায় সিনেমার কাহিনী এগিয়ে যায়। বাচ্চু পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অত্যাচারের ভয়বাহতা দেখে দিশেহারা হয়ে পড়ে। আর এক দিকে তার বাবা শান্তি কমিটিতে যুক্ত থাকায় তাকে কোন গুরু দায়িত্ব দেয়া হয় না। এরই মধ্যে গ্রামে মোতালেব মেম্বারের সাগরেদরা শিক্ষক অমূল্য চক্রবর্তীকে হত্যা করে এবং তার মেয়ে শান্তিকে মোতালেব বিয়ে করতে বাধ্য করে। ছবিতে যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে গেরিলাদের রায়ে রাজাকারদের মৃত্যুদ- দেয়ার বিধান করা হয়। কিন্তু মোতালেব বাচ্চুর বাবা হওয়ায় কমান্ডার কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। একদিন বাচ্চু নিজে সিদ্ধান্ত নেয় যে রাজাকরা রাজাকারই সে যদি তার বাবাও হয় তারপরেও তাকে ছাড় দেয়া যাবে না। সেই মোতাবেক বাচ্চু তার বাবাকে নিজ হাতে শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মিশন সম্পন্ন করার জন্য ডিঙ্গি ও রাইফেল নিয়ে মধুমতি নদী পার হয়ে বাচ্চু বাড়িতে আসে এবং তার বাবাকে নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করে দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার শাস্তি প্রদান করে। এক কথায় মুক্তিযুদ্ধের এক অসাধারণ স্ক্রিপ্ট এটি।

চলচ্চিত্রটি ১৯৯৫ সালে মুক্তি পায়। এর কাহিনী, সংলাপ, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন তানভীর মোকাম্মেল। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন তৌকির আহমেদ, আলী যাকের, রাইসুল ইসলাম আসাদ, সারা যাকের, আবুল খায়ের, কেরামত মওলা, আমিরুল হক চৌধুরী প্রমুখ। প্রত্যেকেই এদেশের মঞ্চ এবং টিভি পর্দার সাড়া জাগানো অভিনয়শিল্পী। এই চলচ্চিত্রেও তাদের সকলের সেরা অভিনয়টাই দেয়ার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে। সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন সৈয়দ সাবাব আলী আরজু। দৃশ্যায়নের সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো দেশাত্মবোধক গান ব্যবহার করা হয়েছে। যা মুক্তিযুদ্ধের আবহ তৈরিতে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। চিত্রগ্রহণ করেছেন আনোয়ার হোসেন। তিনি দৃশ্যায়নের ক্ষেত্রে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। ছবির গল্প অনুযায়ী বেশির ভাগই আউটডোর দৃশ্য। দিগন্তজোড়া নীলাকাশ, ধানক্ষেত, নদীর বুক চিরে বয়ে চলা নৌকা, পাখি সবই তার ক্যামেরার কাজে সুনিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। সব মিলিয়ে দুই যুগ আগে তানভীর মোকাম্মেল এক অসাধারণ চলচ্চিত্র আমাদের উপহার দিয়েছেন। আর সে কারণে এই চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ কাহিনী ও সংলাপ রচনায় তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। সেই সঙ্গে ছবির শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে সাইদুর রহমান বয়াতিও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

‘রাবেয়া’

‘একখান পাচন দিয়ে বিশখান ষাঁড় সামলানো যায়। একটা লাশ দেখায়ে এক শ’ মানুষরে ভয় পাওয়ায়ে রাখা যায়।’ এই চলচ্চিত্রে এ রকম একটি সংলাপ আছে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান এমদাদ কাজীর জবানীতে। চলচ্চিত্রটি শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার খালেদের লাশ দাফন করতে না দেয়ার ঘোষণার মাধ্যমে। আমাদের এই উপমহাদেশে যুগে যুগে লাশের রাজনীতি এক চরম নির্মম বাস্তবতা। বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধের সময় এমনকি আজকের আধুনিক সময়েও যেন আমরা এই লাশের রাজনীতির উর্ধে উঠতে পারিনি। এখনও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সুযোগ পেলেই লাশের রাজনীতিতে মেতে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ের প্রেক্ষাপটে একটি লাশকে কেন্দ্র করে একটি গ্রামীণ জীবনের নানা সঙ্কট; নানা টানাপোড়েন নিখুঁতভাবে এক বিশাল ক্যানভাসে রচিত হয়েছে এই চলচ্চিত্রে।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রাবেয়া। বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার খালেদ ইব্রাহীমপুর গ্রামের বাঁধে পাকিস্তানী বাহিনীর দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয় এবং পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন ও স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান এমদাদ কাজীর যোগসাজশে গ্রামের মানুষের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির জন্য সেই লাশ কবর দেয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সেই সঙ্গে ঘোষণা দেয়া হয় লাশ যে কবর দিতে যাবে তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে। এ রকম ঘোষণায় লাশের ছায়া মাড়ানোর সাহসও কেউ পায় না। কিন্তু বোন রাবেয়া সব কিছুকে তুচ্ছ করে রাতের অন্ধকারে একাকী ভাইয়ের লাশ দাফন করতে যায়। কিন্তু পাহারারত রাজাকারদের কারণে ব্যর্থ হয়। বাঁধের উপর লাশ পড়ে থাকে। গ্রামটি হয়ে ওঠে এক আতঙ্কের জনপদ।

আতঙ্কিত একটি জনপদের নানা ঘটনায় কাহিনী এগিয়ে যায়। বোন রাবেয়া আবারও সুযোগ বুঝে ভাইয়ের লাশ দাফন করতে যায়। রাজাকার এমদাদ কাজীর সাঙ্গোপাঙ্গরা তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। এখানে উল্লেখ্য যে, কমান্ডার খালেদ এবং তার বোন রাবেয়া শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান এমদাদ কাজীর প্রয়াত সম্বন্ধীর ছেলে মেয়ে এবং একই বাড়িতে তাদের বসবাস। সাঙ্গোপাঙ্গরা রাবেয়াকে ধরে নিয়ে আসে এমদাদ কাজীর সামনে। ধরে আনার আগে চৌকিদারের কণ্ঠে ঘটনা প্রসঙ্গে সংলাপ, ‘চেয়ারম্যান সাব ধরা পড়িছে। জিন ভূত না, মানুষ। মানুষ না, মেয়ে মানুষ।’ এমন একটি সংলাপ আমাদের কাছে এক নারীবিদ্বেষী সমাজের নিগূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরে। যা থেকে আমরা এখনও বের হতে পারিনি। এখনও একটি স্বার্থান্বেষী মহল নারীকে মানুষ মনে করে না। আবার রাবেয়া যখন ধরা পড়ে তার ফুফা এমদাদ কাজীর সামনে এসে নানা যুক্তি দিয়ে তাকে একের পর এক কুপোকাত করতে থাকে ঠিক তখন সেখানে উপস্থিত হুজুরের কণ্ঠে আমরা শুনতে পাই, ‘এই জন্যই কিতাবে কয় মাইয়া মানুষরে বেশি লেখাপড়া শিখাইতে নাই।’ যে সংলাপটি আজকের এই সময়ে এসেও আমাদের সমাজে, রাষ্ট্রে কোন না কোন ফতোয়াবাজ মানুষের কণ্ঠে বারবার উচ্চারিত হয়। ছবির বিভিন্ন সিকোয়েন্সে রাবেয়া চরিত্রটিকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় যে, তুমি মানুষ না; মেয়ে মানুষ। পুরুষ মানুষ যেটি করতে পারে, তুমি সেটি করতে পার না। ছবির গল্পে এমদাদ কাজী রাবেয়ার যুক্তিতে যখনই হার মানে ঠিক তখনই ধর্মের দোহায় দিয়ে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। মেয়ে মানুষ এবং ধর্ম এই দুটো অস্ত্র যুগে যুগে আমাদের সমাজে যে কী নির্মমভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে তা ছবিতে এক দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন নির্মাতা। আর এই সবকিছুর বিরুদ্ধে রাবেয়া চরিত্রের মধ্যে ছবির শেষ দৃশ্য পর্যন্ত এক লড়াকু মানুষকে আমরা খুঁজে পাই। ছবির শেষ দৃশ্যে জীবন দিয়ে তার এই লড়াকু জীবনের অবসান ঘটায় রাবেয়া।

সব মিলিয়ে এক দারুণ সমাজ সচেতনতামূলক একটি কাহিনী চলচ্চিত্র এটি। রাবেয়া চরিত্রের মাধ্যমে কাহিনীকার সমাজের নির্মম ক্ষতগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। ঘটনা আজ থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে মুক্তিযুদ্ধ সময়কালের হলেও সমাজের এই প্রতিটি ক্ষত আমরা আজও বয়ে বেড়াচ্ছি। চলচ্চিত্রটি ২০০৮ সালে মুক্তি পায়। এর কাহিনী, সংলাপ, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন তানভীর মোকাম্মেল। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন আলী যাকের, বন্যা মির্জা, তৌকীর আহমেদ, আরমান পারভেজ মুরাদ, জ্যোতিকা জ্যোতি, গীতশ্রী চৌধুরী, কেরামত মওলা, আব্দুল আজিজ, মাসুম আজিজ, আমিনুল হক, সাইদুল ইসলাম বাবু, উত্তম গুহ, আবুল হায়াত, চিত্রলেখা গুহ প্রমুখ। প্রতিটি চরিত্র সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন অভিনয়শিল্পীরা। বিশেষ করে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান এমদাদ কাজী চরিত্রে আলী যাকের অনবদ্য অভিনয় করেছেন। রাবেয়া চরিত্রে বন্যা মির্জা রাবেয়াকে পুরোপুরি ধারণ করতে পেরেছেন। শিল্প নির্দেশনায় মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরতে উত্তম গুহ বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পর যাতে আমরা সেই সময়ে ফিরে যেতে পারি সৈয়দ সাবাব আলী আরজুর সঙ্গীত আয়োজনটি ছিল তেমনই। মহাদেব শী’র সম্পাদনা আমাদের কাহিনীর পর কাহিনী বুঝতে সহজ করে দিয়েছে। সিনেমাটোগ্রাফিতে বরাবরের মতোই আনোয়ার হোসেন সার্থক। সব মিলিয়ে এই ছবির টিম লিডার হিসেবে তানভীর মোকাম্মেল এক দারুণ টিম ওয়ার্ক আমাদের উপহার দিয়েছেন।

‘জীবনঢুলী’

বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামই যেন মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য কাহিনীর আধার। তেমনি বাগেরহাট জেলার ফকিরহাটের একটি গ্রাম পরানপুর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এই গ্রামের সংখ্যালঘু প্রান্তিক মানুষের উপর চলা গণহত্যা ও নির্যাতনের এক অকাট্য দলিল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনী চলচ্চিত্র ‘জীবনঢুলী’। যাদের কথা খুব একটা আলোচিত হয় না; পাদপ্রদীপের আলোয়ও আসে না। এই চলচ্চিত্রে নি¤œ বর্ণের দরিদ্র ঢোল বাদক জীবন কৃষ্ণ দাস এবং ওই গ্রামের মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার কাহিনী সুনিপুণ মুন্সিয়ানায় ফুটে উঠেছে। এদেশের মানুষের জীবনে মুক্তিযুদ্ধ যে কতটা বিভীষিকাময় ছিল এই চলচ্চিত্র দেখে আজকের প্রজন্ম খানিকটা হলেও অনুধাবন করতে পারবে। আমি নিজে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্ম হওয়ার কারণে মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে শুনেছি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পড়েছি এবং নাটক-চলচ্চিত্রে দেখেছি। এই চলচ্চিত্র দেখতে গিয়ে আমি বারবার চোখের জলে ভেসেছি।

সুন্দর ছবির মতো সাজানো একটি গ্রাম এবং গ্রামে মানুষের জীবন। প্রতিদিন নিয়ম করে সন্ধ্যা হয় আবার সকালও হয়। মানুষ পূজা-অর্চনা করে, উৎসব করে। সেই গ্রামে হঠাৎ করে একদিন পাকিস্তানী বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালিয়ে মুহূর্তেই সব কিছু ল-ভ- করে দেয়। গ্রামের নারী, পুরুষ, শিশু কেউ রেহায় পায় না। পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয়। ছবিতে এমন দৃশ্যও চোখে পড়ে মা মারা গিয়েছে; বেঁচে আছে শুধু ছোট্ট দুধের শিশু। ঘরবাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এমনকি গ্রামের এক পাগল গফুর। তার জরাজীর্ণ ছোট্ট ছনের ঘরটিও আগুনের হাত থেকে রক্ষা পায় না। বিপন্ন মানুষ দিশেহারা।

পাঠক, একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো যে আপনার বাড়ি ঘরে বর্বরোচিত হামলা হয়েছে আর তার প্রেক্ষিতে বাড়িঘর ছেড়ে এক কাপড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিতে হচ্ছে। আপনি জানেন না কোথায় যাবেন? আমি নিশ্চিত আজকের এই সময়ে এসে আপনি ভাবতেই পারবেন না। অথচ ১৯৭১ সালে এ রকম ঘটনায় ঘটেছে আমাদের এই ভূখ-ের মানুষের জীবনে। আর সেই হৃদয়স্পর্শী ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। ছবিতে সবাই যে যার মতো গ্রাম ছেড়ে দেশান্তরি হতে যায়। সকলের মতো জীবন জীবনঢুলীও তার পরিবার-পরিজন নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়। পথিমধ্যে আবারও পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বরোচিত হামলা। ওই হামলায় স্ত্রী-সন্তান পরিবারের সবাইকে হারিয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়ে গ্রামে ফেরে জীবনঢুলী। নানা নাটকীয়তায় কাহিনী এগিয়ে যায়। গ্রামে ফিরে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজাকার বাহিনীর সঙ্গে ঢাকের পরিবর্তে ড্রাম বাজানোর কাজ পায়। রাজাকারদের ভাষ্য মতে, ঢোল বাজানো যাবে না কারণ ঢোল জিনিসটা হিন্দুদের আর ড্রাম বাজায় মুসলিম বিহারিরা। এ জন্য জীবনকে ড্রাম এনে দেয়া হয়। ছবিতে প্রতিনিয়ত টানটান উত্তেজনা। সব সময় যেন হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে ঘুরতে হয় মানুষকে। যেকোন মুহূর্তে মারা পড়তে হতে পারে। যুদ্ধকালীন সুযোগসন্ধানী মানুষের চরিত্রও ফুটে ওঠে দারুণ দক্ষতায়। যেমন ওই সঙ্কটকালীন সময়ে বিপন্ন মানুষের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে পোষা প্রাণী, ঘরের বাসনকোসন কেনা এক কুচক্রী শ্রেণীকে আমরা দেখতে পাই ছবিতে। আবার সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় হলে যেন বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই এ রকম পরিস্থিতি আমরা বারবার দেখতে পাই। একটি দৃশ্যে একদল বিপদাপন্ন মানুষের নৌকা আক্রমণ করে রাজাকার বাহিনী এবং সেখানে সম্মিলিত নারী কণ্ঠে, ‘সিঁদুর মোছ, সিঁদুর মোছ’ সংলাপটি অনেক বড় তাৎপর্য বহন করে। আমাদের ভাবনার জগৎকে নাড়া দিয়ে যায়। রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের মৃত লাশ থেকে স্বর্ণালঙ্কার টোকানো, কিংবা জীবিত মানুষের কাছ থেকে স্বর্ণালঙ্কার খুলে নেয়া ওই সময়ের চরম বাস্তবতা তুলে ধরে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি অন্যতম বর্বরোচিত ঘটনা নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন। নারী নির্যাতনের নির্মম কাহিনী এই চলচ্চিত্রে অত্যন্ত করুণভাবে ফুটে উঠেছে। আবারও বলছি একজন দর্শক হিসেবে পর্দায় দৃশ্যগুলো দেখে আমি আমার চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি।

২০১৪ সালে মুক্তি পায় চলচ্চিত্রটি। যথারীতি এই চলচ্চিত্রেরও কাহিনী, সংলাপ, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন তানভীর মোকাম্মেল। পরিচালক দর্শককে মুক্তিযুদ্ধের এক দুর্দান্ত সাহসী শক্তিশালী গল্পের এক চলচ্চিত্র উপহার দিতে শতভাগ সার্থক হয়েছেন। এই ছবিতে অভিনয় করেছেন শতাব্দী ওয়াদুদ, জ্যোতিকা জ্যোতি, রামেন্দু মজুমদার, প্রাণ রায়, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, রাফিকা ইভা, পাভেল ইসলাম, চিত্রলেখা গুহ, উত্তম গুহ, রিয়াজ মাহমুদ জুয়েল, মৃণাল দত্ত, পরেশ আচার্য্য, তবিবুল ইসলাম বাবু, সৈয়দ সাবাব আলী আরজু প্রমুখ। প্রত্যেক অভিনয় শিল্পী ছবির সেই গ্রামের সঙ্গে শতভাগ মিশে গিয়েছেন এবং তারা প্রত্যেকেই সার্থক হয়েছেন। ছবিটির চিত্রগ্রহণ করেছেন মাহফুজুর রহমান খান। তিনি অসংখ্য কালজয়ী চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রাহক।তার চিরাচরিত কাজটিই করেছেন এই চলচ্চিত্রে। শিল্প নির্দেশনা ও প্রধান সহকারী পরিচালক উত্তম গুহ বরাবরের মতোই মুক্তিযুদ্ধের আবহকে ফুটিয়ে তুলতে যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন সেটি দর্শক হিসেবে অনুধাবন করতে কষ্ট হয়নি। সেই সঙ্গে তিনি গফুর পাগলার চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন। ছবির সম্পাদনার কাজটি চমৎকারভাবে করেছেন মহাদেব শীল। এই ছবিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে ছবির সঙ্গীতায়োজন। যে কটি গান ব্যবহার করা হয়েছে প্রত্যেকটি হৃদয়ে দোলা দেয়ার মতো। তানভীর মোকোম্মেলের বাণী, সৈয়দ সাবাব আলী আরজুর সুরারোপ, আবু বক্কর সিদ্দিক, চিত্রলেখা গুহ ও মৃণাল দত্তের কণ্ঠের গানগুলো দর্শকের কছে যথেষ্ট উপভোগ্য ছিল একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তানভীর মোকাম্মেল তার চলচ্চিত্র ভাষার মাধ্যমে অনেক সযতেœ মুক্তিযুদ্ধের দায় মুক্তির চেষ্টা করে যাচ্ছেন যে, এ বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। এমনকি আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের এক অস্থির সময় অর্থাৎ যে সময়টিতে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলা যেত না, মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর কথা বলা যেত না, মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করা যেত না, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস শিখানো হতো সেই সময়টিতে দাঁড়িয়েও তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক বয়ান তুলে ধরেছেন। এজন্য তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে চলচ্চিত্রে তানভীর মোকাম্মেলের এই মুক্তিযুদ্ধ যাত্রা অব্যাহত থাকবে সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৯

২৬/০৩/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

স্বাধীনতা দিবস বিশেষ আয়োজন ২০১৯



শীর্ষ সংবাদ: