২১ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নারীর অভাবনীয় অর্জন

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৯
  • নাজনীন বেগম

৩০ লাখ শহীদ আর অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমহানিতার বিনিময়ে যে লাল-সবুজের পতাকা পুরো জনগোষ্ঠীর অধিকার অর্জনকে সম্ভাবনার দ্বারে পৌঁছে দিয়েছিল, মাত্র সাড়ে ৩ বছরের ক্রান্তিকাল পার করতে না করতেই তা আবার ন্যক্কারজনকভাবে ভূলুণ্ঠিত হতে সময় লাগেনি। সুবর্ণজয়ন্তীর ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে টানা ২১ বছরের দুঃসহ স্মৃতি যেমন সামগ্রিক বিজয় আর অর্জনকে নির্মমতার যাঁতাকালে পেষণ করে যায়, সেখান থেকে নবোদ্যমে দেশটিকে গন্তব্যে ফিরিয়ে আনা সেও এক কঠিন আর দুর্গম পথযাত্রার দুঃসাহসিক পরিক্রমা। ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশ নতুনভাবে তার কণ্টকাকীর্ণ আর অভিশপ্ত ঘটনা পরম্পরাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে অনেক বাধাবিপত্তিকেও অদম্য চেতনায় অতিক্রম করা সেও যেন ইতিহাসের দায়বদ্ধতা। ২০২১ সালে আমরা মুখোমুখি হবো অবিস্মরণীয় ৫০ বছর পূর্তির শুভক্ষণে। কিন্তু হরেক রকম আবর্জনা ও বিকৃত বিধ্বংসী ইতিহাসের পালাক্রমকে আঘাত করা সময়ের গতিপ্রবাহের এক অনন্য অভিযাত্রা। তারপরেও সময় লেগেছে, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির সমস্ত কূটকৌশল ভেদ করে মুক্তিকামী জাতির সঙ্কটাপন্ন যাত্রাপথ নির্বিঘ্ন করতে অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল সাফ করাও সময়ের দাবি হয়ে যায়। ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশ যে নতুন পথযাত্রাকে অবারিত করতে শুভ উদ্যোগ গ্রহণে জাতিকে যথার্থ ইতিহাসে ফেরাতে মনোনিবেশ করা হলেও ৫ বছরের মাথায় আবারও ছন্দপতন ঘটে, ইতিহাস বিকৃতির ধারা যথার্থ অভিযাত্রার প্রতিপক্ষ হতেও সময় নিল না। পাঁচ বছরে আবারও সারাদেশ অন্ধকারে পথ হারাল। মৌলবাদের উত্থান, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানো, জঙ্গীবাদকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া সব মিলিয়ে এক বিভীষিকাময় রাজত্ব কায়েম জাতির জন্য এক ঘোরতর অমাবস্যা নেমে এলো। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যে অরাজক পরিস্থিতি আর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দেশকে হোঁচট খেতে হচ্ছিল, সেখান থেকে পরিত্রাণের সহজ এবং স্বাভাবিক পথ প্রায়ই অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে কোন রকম বেগ পায়নি। তার সঙ্গে যুক্ত হয় সামরিক সমর্থন। সেনাসমর্থিত এই সরকার ১.১১.২০০৭ থেকে যে শাসনভার তাদের হাতে নেয়, সেখানে টানা ২ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে শেষঅবধি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্বভার অর্পণ করতে বাধ্য হয়। ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাস। সেই থেকে বাংলাদেশের যে নবযাত্রা শুরু হয় তার গতিধারা সময়ের ¯্রােতে নিয়তই বয়ে চলেছে। পরিবারসহ বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিচারসহ যুদ্ধাপরাধীদের ঘৃণিত অপকর্মের দ- দেয়া থেকে শুরু করে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার তদন্ত সাপেক্ষে আইনী প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা এক যুগান্তকারী কার্যক্রম। জাতিকে শুধু অভিশাপমুক্ত করা নয়, পাশাপাশি সার্বিক উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে যে অভাবনীয় উদ্যোগ নেয়া হয় সেখান থেকে দেশ অনুন্নত পর্যায় থেকে উন্নয়নশীল অভিযাত্রায় উত্তরণে সর্ববিধ কর্মযজ্ঞে আপন শক্তি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়। তারই অবধারিত অগ্রগতিতে ২০১৫ সাল থেকে বিশ্ব প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান দৃশ্যমান হতে থাকে। বাংলাদেশ যখন অগ্রগতির সমৃদ্ধ ধারায় প্রতিনিয়তই আন্তর্জাতিক সীমানায়ও নিজেকে যোগ্যতম প্রমাণ করে যাচ্ছে, তখন অর্ধাংশ নারী জাতি কতখানি অংশীদারিত্ব দেখাতে পারছে সেটাও বিবেচনার বিষয়। নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার একটি স্মরণীয় বার্তা এখানে উল্লেখ্যÑ সমাজের দুটো চাকা যদি সমানভাবে চলতে না পারে একটি যদি কোনক্রমে পিছিয়ে পড়ে তাহলে সমাজ যথার্থভাবে এগিয়ে যেতে ব্যর্থ হবে। আর তাই দেশ যখন নিজের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব পরিসীমায় সদর্পে অবস্থান জানান দিচ্ছে তা হলে বুঝতে হবে নারীরাও এগিয়ে প্রায়ই সমান তালে। ২০১৭ সালে বিশ্ব উন্নয়ন সংস্থা অর্থনৈতিক ফোরাম সমতাভিত্তিক সমাজ তৈরিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে ৪৭তম ঘোষণা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় একেবারে শীর্ষে। উন্নয়নের চারটি সূচকে বাংলাদেশে বিশ্বে এক নম্বর। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ আরও অনেক পিছিয়ে। রাজনৈতিক কর্তৃত্বে ক্ষমতাধর নারীর আসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের ১০০ জনের মধ্যে ২০১৭ সালে ছিলেন ৩০তম আর ২০১৮ সালে ২৬তম। প্রধানমন্ত্রী নিজেই তার অবস্থানকে নিয়তই জোরদার করছেন দেশ ও বৈশ্বিক পরিসীমায়। শুধু তাই নয়, দেশের অর্ধেক এই অংশকেও প্রতিনিয়ত উৎসব-উদ্দীপনা আর কর্মপ্রকল্পের সহায়তায় তাদের জীবনমান উন্নয়ন করতে অনুপ্রাণিতও করছেন। শুধু তাই নয়, উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সর্বমানুষের দ্বারে যেভাবে অবারিত করা হচ্ছে সেখানে নারীরাও তার অংশীদার হচ্ছে।

রক্ষণশীল সমাজের গতানুগতিক মূল্যবোধ একসময় নারীদের যেভাবে পরিবারে ক্ষুদ্র গ-িতে আটকে দিয়েছিল যুগের প্রয়োজনে, সময়ের দাবিতে আজ তারা সেখান থেকে বৃহত্তর আর্থ-সামাজিক আঙিনায় তাদের সামনে চলার পথকে বেশ এগিয়েও নিয়েছে। কূপকম-ূকতার গ-ি পেরিয়ে সামনে যাবার যাত্রাপথ নিশ্চিত আর নিরাপদ ছিল না। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শ্রেণীবৈষম্যই শুধু নয় নারী- পুরুষের ফারাকও দৃষ্টিকটু ভাবে দৃশ্যমান। সুতরাং পশ্চাৎপদ একটি সমাজে অসহায় এবং নির্বিত্ত শ্রেণী সব সময়ই শোষণ আর বঞ্চনার শিকার হয়। অপেক্ষাকৃত দুর্বল আর পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠী হিসেবে নারীর জীবন হয় আরও বিপন্ন আর কঠিন বেড়াজালে আবদ্ধ। তবে একবিংশ শতাব্দীর শুভযাত্রায় উদ্দীপ্ত নারীরা সব ধরনের বাধাবিঘœ পেরিয়ে উন্নয়নের সমস্ত সূচকে তাদের অভিগামিতাকে যে মাত্রায় দৃশ্যমান করে তুলছে সেখান থেকে আরও অদম্য গতিতে সামনে এগিয়ে চলাই কালের যৌক্তিক চাহিদা। তথ্যপ্রযুক্তির অবিস্মরণীয় গতিপ্রবাহে সামাজিক অবয়বে যে বৈজ্ঞানিক উদ্যম আর শক্তি সেখানেও নারীর যাত্রা অবারিত আর নিরন্তর। একজন নাগরিকের ৫টি মৌলিক চাহিদা অর্জনে ব্যক্তি যেমন তার অধিকার পায়, পাশাপাশি উন্নয়নের সূচকগুলোতেও এর অবধারিত কর্মপ্রক্রিয়া প্রবৃদ্ধির নিয়ামক। দেশের সার্বিক অগ্রযাত্রার নির্ণায়ক শক্তি সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাঙ্গনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকই শুধু নয়, সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এমনকি চিকিৎসা সেবায় উৎসর্গীকৃত বিভিন্ন উর্ধতন কর্মকর্তাসহ আরও অনেকের মূল্যবান শ্রম বিনিয়োগ দেশকে তার লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছে দিচ্ছে। সেখানে নারী শ্রমও তার যুগান্তকারী ভূমিকা পালনে কিছুমাত্র পিছপা হচ্ছে না।

কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতিতে উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রান্তিক নারীদের যে অংশগ্রহণ তা এখন কোন পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় কম নয়। ধান, সবজি, ফল, ফুল এবং মাছ উৎপাদনে কৃষিজ পণ্যের যে আন্তর্জাতিক অবস্থান, সেখানে নারী শ্রমিকরা যে পরিমাণ শ্রম বিনিয়োগ করে তা বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত এবং সংবাদ মাধ্যমে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশ্ব জরিপে ধান, সবজি, মাছ, ফল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন নজরকাড়া। সুতরাং এখানে নারীদের অনন্য ভূমিকায় দেশ আজ বিশ্বসীমায় নিজেকে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা যদি বাংলাদেশের অবকাঠামোর উন্নয়নকে সামগ্রিকভাবে অনুধাবন করি সেখানেও নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে নারী শ্রম আজ আবশ্যকীয় শক্তি। তবে মজুরিতে পার্থক্য করাতে নারী-পুরুষের ব্যবধান অসহনীয় হয়ে ওঠে। সমৃদ্ধ ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে যে পরিমাণ বহুতল ভবন, নয়নাভিরাম সেতু, কালভার্ট নির্মাণ, সড়ক-মহাসড়কে নতুন সময়ের সমস্ত ব্যবস্থাপনা সংযোগ সব মিলিয়ে অবকাঠামো বিস্তারের যে মহাপরিকল্পনা সেখানে নারী শ্রমের প্রয়োজনীয় সম্পৃক্ততা দেশকে সমৃদ্ধির জোয়ারে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর শিল্প কারখানায় আমাদের দেশের নারীদের যে মাত্রায় অংশীদারিত্ব সেখানে তারা মূলত নির্ণায়কের প্রধান শক্তি। বিশেষ করে পোশাক শিল্পে নারী শ্রমের সম্পৃক্তকরণ সেখান থেকে উৎপাদিত পণ্যের যে আন্তর্জাতিকীকরণ তাতে সংশ্লিষ্টদের অভাবনীয় অবদান অস্বীকার করার পথ নেই।

আর শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীদের দুঃসাহসিক অভিযাত্রা আজ দেশকে এমন সূচকে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে। প্রাথমিক আর মাধ্যমিকে মেয়েদের অংশগ্রহণ প্রায় ছেলেদের সমান। বিস্ময়করভাবে অভিভূত হওয়ার ব্যাপার এবারের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার ফলে মেধাতালিকায় মেয়েরা দ্বিগুণভাবে এগিয়ে ছেলেদের তুলনায়। ক্ষুদ্র বালিকাদের অভাবনীয় সাফল্য তো বটে। এটা যেমন ব্যক্তিক যোগ্যতা আর সক্ষমতা পাশাপাশি এই অঙ্গনটির অসামান্য বিজয়ও বটে মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে এগিয়ে নেয়ার জন্য। স্কুল-কলেজের সংখ্যা বাড়াই শুধু নয়, সরকারীকরণের নতুন পরিকল্পনাও শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের হাতের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। বিত্তের ফারাক যেমন শিক্ষাকে স্পর্শ করতে বেগ পাচ্ছে, তেমন ছেলেমেয়ের ব্যবধানও এমন পবিত্র আঙিনা থেকে অপসৃত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, শিক্ষার আলো বালিকা থেকে কিশোরী, তারপর তরুণী পর্যায়ে এগিয়ে দিতে যে মাত্রায় দ্যুতি বিকিরণ করছে, সেখান উদ্দীপ্ত তারণ্য বাল্য বিয়েকে প্রতিরোধ করতে বিস্ময়কর ভূমিকাও রাখছে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আগে ‘বিবাহ’ নামক শক্ত বাঁধনকে দৃপ্ত চেতনায় পরিহার করতে নিজেদের সংহতও করছে। অনেক বালিকা তাদের বিয়েকে ভেঙ্গে দিয়ে সংবাদ মাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সময় আর যুগের চাহিদায় এখন কিছু মেয়ে নিজেরাই তাদের সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করতে সাবলীলভাবে এগিয়ে আসছে। যদিও সংখ্যায় এখনও তারা নিতান্ত কম। যতই সময় যাবে এমন সংখ্যা আরও বাড়বে। উন্নয়নের গতিধারার স্বাবলম্বী নারীদের অংশগ্রহণও ততই দৃশ্যমান হবে। নারীরা এক সময় শিক্ষকতার পেশাকে সর্বোত্তম হিসেবে বিবেচনায় এনে অংশগ্রহণকে যতই অবারিত করুক একেবারে শীর্ষে চলা নারীদের সংখ্যা ছিল না বললেই চলে। যেমন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনুষদের ডিন কিংবা উপ-উপাচার্য আর উপাচার্য আসনে মেয়েরা সেভাবে উঠে আসতে পারেনি। কিন্তু এখন কম হলেও সেটা স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য মহিলা ছিলেন যদিও তিনি এখন প্রয়াত। আর দেশের প্রথম মহিলা উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. ফারজানা ইসলাম এখনও তার সম্মানিত পদটি অলঙ্কৃত করে প্রশাসনিক কার্যক্রমকে চালিয়ে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে ডাঃ সাহানা রহমান নিজেকে প্রমাণ করেছেন। এমন সম্মানজনক পদে সফল নারীদের অবস্থান সমতাভিত্তিক সমাজ তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

সামরিক বাহিনীতে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হওয়া ডাঃ সুশানে গীতি বাংলাদেশে নারী অগ্রযাত্রার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সামরিক বাহিনীতে নারীর অংশগ্রহণ দেশ ও জাতির এগিয়ে যাওয়ার এক অন্যতম সূচক।

এখন সামরিক নারীরা বিদেশেও শান্তির রক্ষা মিশনে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীতেও মহিলাদের সফল অভিযোজন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এগিয়ে দিচ্ছে। বিসিএস পরীক্ষায় মেয়েরা তাদের পেশা নির্বাচনে ‘পুলিশের’ কলামে টিক চিহ্ন দিচ্ছে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পুলিশের কঠিন কঠোর প্রশিক্ষণে সম্পৃক্ত হচ্ছে। সেখান থেকে সফলতা অর্জন করে পেশায় নিজেদের যোগ্যতম প্রমাণও করছেন। কোনভাবেই তার পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় পিছিয়ে থাকছে না। বিভিন্ন ট্রাফিক সঙ্কেতগুলোতে অনেক মহিলা সার্জেন্ট যাত্রী, পথচারীও দর্শনার্থীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

নারীরা আজ বিমানও চালাচ্ছে। ‘সোর্ড অব অনারে’ ভূষিত হয়ে আকর্ষণীয় পদমর্যাদায় অভিষিক্ত হচ্ছে। বিমানবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে নারীদের সাবলিক পথপরিক্রমা যাতায়াতের এই গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। বিমানের অভ্যন্তরে যাত্রী সেবায় নিয়োজিত বিমানবালাদের আন্তরিক অভ্যর্থনা যে মাত্রায় ভ্রমণকারীদের বিমুগ্ধ করে তাও দেশের অর্ধাংশ এই গোষ্ঠীকে অনন্য অনুভবে স্পষ্ট করে তোলে। সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এক সময় পুরুষের একাধিপত্যে দেশের প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে কর্তৃত্বের চাবিকাঠি তাদের হাতেই রেখে ছিল। সেই রুদ্ধদ্বার কোন এক সুবর্ণ অধ্যায়ে নারীদের দৃপ্ত পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। চিকিৎসক হিসেবে নারীদের সামরিক বাহিনীতে ক্যাপ্টেন, মেজর পদ অলঙ্কৃত করতে খুব বেশি সময় লাগে না। দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় মেয়েরা আজ তেমন সম্মানজনক পদমর্যাদায় নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে। নারীদের এমন সাফল্যও সামগ্রিক অগ্রযাত্রাকে নিয়ত শাণিত করছে।

প্রশাসনিক কার্যক্রমে নারীর যুগান্তকারী ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে, জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিশিষ্ট পদে অধিষ্ঠিত হয়ে দাপটের সঙ্গে নিজেদের প্রমাণ করে যাচ্ছে। বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার বাসনা মেয়েদের বহুদিনের। সেই লক্ষ্যে মেয়েরা অনেক আগেই প্রশাসনিক কর্মযজ্ঞকে নিজের আয়ত্তে আনতে তৈরিও হয়েছে। সেখান থেকেই আজ তারা নির্বাহী কর্মকর্তা থেকে ধাপে ধাপে উত্তীর্ণ হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব পদেও আসীন হতে সমর্থ হয়েছে। উপসচিব, যুগ্ম সচিব অতিরিক্ত সচিব এবং সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ সচিবের মর্যাদায় কিছু নারীর চাকরি জীবনের সুবর্ণ অধ্যায় পার হয়েছে। যদিও সংখ্যায় তা একেবারে হাতেগোনা। উন্নয়ন দশকের নিরন্তর অভিযাত্রায় নারীদের অবিস্মরণীয় অর্জন দেশ ও জাতির নিয়ামক শক্তি।

বিভিন্ন কর্পোরেট পেশায় মেয়েরা যে পরিমাণ সফলতা অর্জন করে যাচ্ছে সেটাও অগ্রগতির ধারাকে আরও শক্তিশালী করছে। বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে নারীদের শীর্ষ পদ দখল এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তথ্যপ্রযুক্তিতেও মেয়েদের সক্ষমতার প্রমাণ সবার সামনে উদ্ভাসিত। নব নব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে সারা পৃথিবী যেমন প্রযুক্তিগত সফলতাকে উন্নয়নের নিয়ামক শক্তি বিবেচনায় এনেছে বাংলাদেশও কোনভাবেই তার ব্যতিক্রম নয়। বিজ্ঞান যাত্রার এক অবিস্মরণীয় যুগে নারী-পুরুষের মিলিত শক্তি পৃথিবীব্যাপী উন্নয়নের জোয়ার এনেছে। সেখানে নারীরা এখন মানুষের কাতারে। তাই মানুষ হিসেবে কোন দিক থেকে তারা পিছিয়ে থাকতে চায় না।

নতুন নতুন শিল্প উদ্যোক্তা তৈরিতেও নারীরা পুরুষের পাশাপাশি সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে।

‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা’ কিংবা ‘নারী দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবসা-বাণিজ্যে মহিলাদের সম্প্রসারিত অভিযোজন দেশকে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় নারী উদ্যোক্তাদের দর্শনীয় স্টল দর্শনার্থীর উপচে পড়া ভিড়ে এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। বোঝাই যায় আমাদের দেশের মেয়েরা কতখানি উদ্যম আর সাহসের সঙ্গে ঝুঁকিপুর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্যকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণই শুধু করেনি, সফলতার মাত্রায় প্রমাণ করতেও পিছপা হয়নি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপণ্যে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা পুরুষের তুলনায় ২/৩ অংশ, বিস্ময়কর হলেও এটাই সত্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি পণ্য তৈরির ব্যবসায় নারীদের আগ্রহ অনেক বেশি, সুতরাং অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশের সোনালি আঁশ পাটশিল্প মেলায়ও নারীরা দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় তাদের পুঁজি বিনিয়োগ করতে ভাবতে হয়নি।

একুশের বইমেলায়ও নারী সাহিত্যিকদের পদচারণায় মেলা প্রাঙ্গণ উৎসব আনন্দে ভরে ওঠে। শুধু কি গ্রন্থ রচয়িতা হিসেবে? প্রকাশক হিসেবেও নারীরা দাপটের সঙ্গে নিজেদের অভাবনীয় অবদান জনসমক্ষে নিয়ে আসছে। যা সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ গড়তে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে নারীর অগ্রগামিতার যে অভাবনীয় যোগসাজশ তাতে স্বাদীনতা দিবস পূর্ণ মর্যাদায় ঐতিহ্যিক বৈভবকে সমুন্নত রেখে সুনির্দ্দিষ্ট লক্ষ্য মাত্রায় আরও এগিয়ে যাবে। আধুনিক ও অনন্য বাংলাদেশ তৈরি করতে নারী-পুরুষের মিলিত কর্মযোগ দেশের সমৃদ্ধির সোপান।

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৯

২৬/০৩/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

স্বাধীনতা দিবস বিশেষ আয়োজন ২০১৯



শীর্ষ সংবাদ: