১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২ পৌষ ১৪২৬, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

স্বাধীনতা দিবসে আমাদের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার কথা

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৯
  • অনাবিল আনন্দের
  • শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী

প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস এক অসাধারণ দ্যোতনা নিয়ে বাঙালীর জীবনকে আলোড়িত করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় স্বাধীনচেতা বীর বাঙালী পদানত থাকতে চায় না। হাজার বছর ধরে বহুবার এ জাতি নিজেদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। লড়াই করেছে। অবশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা পেয়েছি মহান স্বাধীনতা। প্রাণভরে স্বাধিকার অর্জনের ক্ষণটুকু উপভোগ করি। কিন্তু এবারের অনুভূতি সব ছাপিয়ে আকাশছোঁয়া ব্যঞ্জনায় জ্বলজ্বল করছে আমাদের মনপ্রাণজুড়ে। এবার আমরা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীমুক্ত সংসদ এবং মন্ত্রিসভা পেয়েছি। বাংলার মানুষ ওদের ভোট দেয়নি। ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। যারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে ছিল ওদের জামানত বাজেয়াফত হয়েছে।

গত আটচল্লিশ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেকে নানাভাবে জামায়াতীদের ভয়ঙ্কর চরিত্র এবং দেশবিরোধী কর্মকা- নিয়ে কথা বলেছেন। আন্দোলন করেছেন, লেখালেখি করেছেন। এসব কথা জামায়াত-শিবির-বিএনপি আমলে নেয়নি। বিশ্বাস করেনি যুদ্ধাপরাধীরাও। ওরা ভেবে নিয়েছিল বাংলাদেশে এমন কোন ‘বাপের বেটা’ নেই যে ওদের কেশাগ্র স্পর্শ করে। বিচার ও ফাঁসি তো বহুদূরের কথা। জিয়াউর রহমান, এরশাদ ও খালেদা জিয়া এই স্বাধীনতার শত্রুদের দীর্ঘ একুশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। ধনে-জনে-শক্তিতে বাড়তে বাড়তে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে ওদের বাড়বাড়ন্ত এত বেশি হয়েছিল যে, ‘তুড়ি দিয়ে সব উড়িয়ে দেয়ার’ মনোভাব ওদের মধ্যে জন্মেছিল। ওরা সেই অন্ধকার সময়ে হেন দুষ্কর্ম নেই যা করেনি। আমাদের সব সহ্য করতে হয়েছে, কিন্তু পাশার দান একদিন উল্টে গেল। ওদের বিচার হলো। প্রথম সারির জামায়াত নেতাদের ফাঁসি হলো। অদম্য সাহসী নেতা দেশরতœ শেখ হাসিনা ওদের বিচার করে বিশ্বের কাছে প্রমাণ কেরেছেন যে, ওরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধ করেছিল। লজ্জাহীন জামায়াতীদের নিষ্ফল-আস্ফালন এখনও চলছে। মীর কাসেম আলীর অঢেল সম্পদ দিয়ে ওর সন্তান, বন্ধু-স্বজনরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে ২০১৮-এর নির্বাচনকে প্রভাবিত, প্রশ্নবিদ্ধ ও বানচাল করতে। ওদের সঙ্গে সব অপকর্মে যুক্ত আছে সাজাপ্রাপ্ত বিশ্বচোর তারেক রহমান, বাংলাদেশের অভিশাপ।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে এই অপপ্রচার জনমনে বিশ্বাসযোগ্য করাতে ওরা প্রচারণার চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। ঐক্যফ্রন্টের ফন্দিবাজ নেতাদের গলা ফাটানো চিৎকার এবং অফুরান মিথ্যাচারে ভয় পেয়ে মানুষ আসন্ন নির্বাচনে ওদেরই ক্ষমতার শীর্ষে নিয়ে আসবে এই বিশ্বাস ওদের হয়েছিল। এমনকি ওরা সময়ও বেঁধে দিয়েছিল দিন-ঘণ্টা বলে যখন আওয়ামী লীগ ভয়ে পালিয়ে যাবে। এই স্বপ্নে বিভোর ঐক্যফ্রন্ট বসে গিয়েছিল পদ বণ্টনের হিসেব-নিকেশে। ত্রিশ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ‘সাইলেন্ট মেজরিটি’ তাদের সে আশা ‘গুড়ে বালি’ করে দিয়েছে। পৌষের কনকনে শীত উপক্ষো করে লাইনে দাঁড়িয়ে তারা তাদের ‘অন্তরের অন্তস্তলে যার আসন’ তাকে ভোটখানা দিয়ে নীরবে বাড়ি ফিরে গেছে। গভীর অমানিশা ভেদ করে পরের দিন বাংলার আকাশে উঠেছে জ্বলজ্বলে নতুন সূর্য যাঁর নাম শেখ হাসিনা। তাঁর আলোর বিচ্ছুরণে ঐক্যফ্রন্টের জ্ঞানপাপীরা টের পেয়েছে বঙ্গন্ধুর সোনার বাংলা ওদের চরম অবজ্ঞায় নর্দমায় ফেলে দিয়েছে। বুঝিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশে ওদের ঠাঁই নেই। আর গভীর মমতায় বুকে টেনে নিয়েছে কল্যাণময়ী বিশ্বমাতা শেখ হাসিনাকে।

বাংলার মানুষ কি করে ভুলবে বিএনপি-জামায়াতের নারী, শিশু, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে যানবাহন, গাছপালা, পশুপাখি পর্যন্ত পুড়িয়ে ধ্বংস এবং মারার মহোৎসব? ওদের সৃষ্ট মধ্যযুগীয় বর্বরতায় শত শত পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছে। ওরা থাকলে এ দেশে জয়বাংলা থাকে না, মুক্তিযুদ্ধ হারিয়ে যায়, বঙ্গবন্ধুকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। পরিবর্তে নেমে আসে বাংলাভাই, আবদুর রহমান, হাওয়া ভবনের সন্ত্রাস, লুটপাট, হত্যা, নির্যাতন। দেশ এক কদমও এগোয় না, বরং পিছিয়ে যায় পঞ্চাশ বছর।

অপরপক্ষে মানুষ নিজের চোখে দেখছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে দেশ দ্রুত এগিয়ে যায়। উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে অগ্রসরমান জাতি দেখছে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা বহুমুখী সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রেলপথসহ বঙ্গবন্ধু সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র, রামপাল পাওয়ার প্রজেক্ট, মাতারবাড়ি পাওয়ার প্রজেক্ট, মহেশখালী টার্মিনাল, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট, দেশজুড়ে অসংখ্য নয়নাভিরাম উড়াল সেতু। অসংখ্য স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, সংখ্যাতীত কমিউনিটি ক্লিনিক, ত্রিশ রকম বিনামূল্যের ওষুধ, অসহায় সুবিধা বঞ্চিতদের নানা রকম ভাতা, বিধবা ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তাদের ভাতা, স্কুলে বিনামূল্যে কোটি কোটি বই বিতরণ, নারীর ক্ষমতায়নে অসংখ্য প্রজেক্ট। কৃষক, মুক্তিযোদ্ধা, অতিদরিদ্র, ছিন্নমূল শিশু, নারী, স্কুল শিক্ষার্থী, এমনকি ভিক্ষক পর্যন্ত দশ টাকা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলে, দুর্গম ‘হাওড় দ্বীপ ও চর’ ভাতা চালু। শত শত প্রকল্পের সঙ্গে যোগ হয়েছে খাদ্যশস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য। যে কৃষকরা খালেদার কাছে সার চেয়ে গুলি খেয়ে মরেছে সেই তারা এখন বিভিন্ন রকম সহায়তা পেয়ে ধান উৎপাদনে দক্ষিণ এশিয়ার ধান উৎপাদনকারী সব দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। এক সময়ের খাদ্য ঘাটতির দেশ এখন খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। তদুপরি রয়েছে চব্বিশ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ। আমাদের এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারে থাকতে হয় না। বাংলাদেশের গণমানুষ জীবনে কখনও এত প্রাপ্তির কথা ভাবতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আরও আগে দেশ উন্নত দেশের কাতারে যাবার যোগ্যতা অর্জন করত। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা তাঁকে হারিয়েছি। কিন্তু এখন অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং মেধাবী বঙ্গবন্ধু কন্যা পিতার সেই স্বপ্ন পূরণের দায়ভার মাথায় নিয়ে এ দেশকে নিয়ে চলেছেন সম্মুখপানে যেখানে অপেক্ষমাণ জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলার শতভাগ রূপায়ণ। আমাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পঁচাত্তরের পর যা ছিল অচিন্ত্যনীয়। চলেছিল দেশ বিদেশের গভীর চক্রান্ত বিচার বানচালের। অনমনীয় নেতা শেখ হাসিনা ছিলেন নিজের কর্তব্যে অবিচল। ওদের বিচার হয়েছে এবং এখনও চলছে। বিচার হয়েছে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের, চার জাতীয় নেতার খুনীদের। ২১ আগস্টের হত্যাকা-েরও বিচার দেশবাসী দেখেছে। বিচারহীনতার সংস্কৃৃতি থেকে দেশ আজ মুক্ত। আইনের শাসন এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। অনেক দুঃখ-কষ্টের দুর্গম পথ অতিক্রম করে বাংলাদেশের মানুষ আজ সুখের মুখ দেখেছে। এর কারণ শুধুমাত্র নেতা শেখ হাসিনা। আমরা তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশকে ভাবতে পারিনি।

কথা তবু থাকে। নিশ্চিন্ত নির্ভাবনার অবস্থানটি সম্পূর্ণ শঙ্কামুক্ত নয়। বাংলাদেশ রাজাকারমুক্ত হয়নি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে কিন্তু ওদের পাহাড়সম সম্পত্তি বাজেয়াফত হয়নি। সব দেশেই তা হয়েছে দল হিসেবে এখনও জামায়াত ইসলাম নিষিদ্ধ হয়নি। ওরা রীতিমতো সরকার চাকরিতে বহাল তবিয়তে আছে। এমনকি নতুন করে চাকরিও পাচ্ছে নামে-ছদ্মনামে। বাংলাদেশ জুড়ে ওদের শত শত স্থাপনা, ব্যবসাকেন্দ্র, মিল ফ্যাক্টরি, হাসপাতাল, ব্যাংক, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববদ্যালয় পুরো দমে চলছে। ওদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হয় না। জাতীয় পতাকা ওড়ে না জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না। মুক্তিযুদ্ধের নাম-নিশানা নেই। বাংলাদেশের সংস্কৃৃতিকে বদলে দিতে ওরা অত্যন্ত সক্রিয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মহিলা, যুবতী ও কিশোরীদের ধর্মান্ধতার দিকে আকৃষ্ট করে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ওদের প্রভাবিত করছে। বদলে দিচ্ছে ওদের আচার-আচরণ পোশাক পরিচ্ছদ।

এখনই সময় ওদের শাস্তি দেয়ার। দল হিসেবে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি ব্যক্তি জামায়াত শিবিরকেও চিহ্নিত করে ওদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। কারণ ওরা বিষাক্ত শাপ ওদের সমূলে উৎপাটিত করতে না পারলে এদেশে কখনও শতভাগ শান্তি স্থাপন করা যাবে না। ওরা তা হতে দেবে না। আমাদের ভবিষ্যত নিষ্কণ্টক করতে হলে জামায়াত-শিবির মুক্ত দেশ হতে হবে। ওরা সন্ত্রাসী এবং দেশদ্রোহী। দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ অপরাধেই ওদের নাগরিকত্ব বাতিল করতে হবে। ওদের অত্যাচারে জর্জরিত হয়েছে এ দেশের মানুষ দীর্ঘ ৪৮ বছর ধরে। কেন আমরা নিজের দেশে ওদের ভয়ে চিরকাল ভীতসন্ত্রস্ত থাকব? এর একটা স্থায়ী সমাধান সময়ের দাবি।

স্বাধীনতা দিবসের অফুরান আনন্দ উপভোগ করতে চাই জামায়াত-শিবির ও ওদের আশ্রয় প্রশ্রয়দানকারীদের প্রভাবমুক্ত অমলিন পরিবেশে। ভোটের যুদ্ধে ওদের পরাজিত করেছে বাংলার মানুষ। এবার দেশকে ওদের কবল থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব নেয়ার পালা।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী যেন আমরা জামায়াত-শিবির রাজাকার মুক্ত দেশে পালন করতে পারিÑ এই হোক আজকের অঙ্গীকার।

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৯

২৬/০৩/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

স্বাধীনতা দিবস বিশেষ আয়োজন ২০১৯



শীর্ষ সংবাদ: