২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

খালেদার মুক্তি আন্দোলন কি টেনে নিতে পারবে বিএনপি? -স্বদেশ রায়

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

খালেদা জিয়া যে খুব শীঘ্রই জেল থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না সেটা বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা তাঁর জেল হওয়ার কয়েকদিন আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। এমনকি তাদের মহাসচিবও বিষয়টি না বোঝার বাইরে ছিলেন না। তাদের আইনজীবী নেতা খোন্দকার মাহবুব হোসেন আগেই বলেছেন, এ মামলার জামিনের আগে তাকে অন্য মামলায় শ্যোন এ্যারেস্ট দেখানো হবে।

বিএনপি ও বিশ দলের সিনিয়র নেতাদের এই বিষয়টি বোঝার কারণ প্রধানত দুটি : এক. তাদের অভিজ্ঞতা। দুই. সরকারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ। সরকারের সঙ্গে এই যোগাযোগ দোষের কিছু নয়। সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের এ ধরনের যোগাযোগ থাকে। তাছাড়া বিএনপি এখন অনেকটা অস্তিত্ব সঙ্কটে। এমতাবস্থায় তাদের অনেক বুদ্ধিমান নেতা খুব স্বাভাবিকই সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেই চলবেন। অন্যদিকে বিএনপি ছাড়া বিশ দলীয় জোটের অন্য দলের নেতারা এক্ষেত্রে আরও বেশি এগিয়ে থাকবে। তারা এখন যত বেশি পারবে ততই সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে। ইতোমধ্যে তাদের অনেকে সেটা শুরুও করেছেন। তারাও বুঝতে পেরেছেন- বেগম জিয়া খুব শীঘ্রই মুক্তি পাচ্ছেন না। এমনকি তিনি আগামী নির্বাচনের পরে কবে যে মুক্তি পাবেন তা নিয়েও অনেকে এখন ভাবছেন।

বেগম জিয়া জেলে যাওয়ার পরে বাস্তবতা যে এখানে গিয়ে দাঁড়াবে তা দলের সিনিয়র নেতারা বুঝেছিলেন বলেই তারা একটি কাজ খুব ভালভাবে করতে পেরেছেন। খালেদা জিয়াকে দিয়ে হোক আর নিজেদের বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে হোক একটি ঘোষণা তাঁরা বেগম জিয়ার নামে তাদের কর্মীদের কাছে দিতে পেরেছেন, বেগম জিয়া শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে বলে গেছেন। তারা সেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনই করছে। বাস্তবে বিএনপি যতটুকু আন্দোলন এখন করছে এর থেকে বেশি কিছু করার ক্ষমতা বিএনপির নেই। রাজপথে দল হিসেবে বিএনপি কখনই এ শক্তি রাখে না। বিএনপির এই শক্তির ওপর বিএনপির বুদ্ধিজীবী সমর্থকদেরও যে ভরসা নেই তার একটি উদাহরণ, বেগম জিয়া গ্রেফতার হওয়ার আগের দিন বিএনপি-জামায়াত সমর্থক একজন সম্পাদক ও বিদেশী ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেন এমন একজন বাঙালী প্রফেসর তঁাঁদের আলোচনায় এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, সরকার বেগম জিয়াকে জেলে পাঠাবে না। কারণ তাঁকে জেলে পাঠালে দেশে সামরিক শাসন আসবে। অর্থাৎ তাঁরা বিএনপির ওপর ভরসা করেননি- তাঁদের ভরসা ছিল অবৈধ কোন পথ। তাঁদের যে এখানেই ভরসা এ কথা মাত্র কয়েকদিন আগেই শেখ হাসিনা পার্লামেন্টে বলেছিলেন।

যা হোক, আদালতের নির্দেশে বেগম জিয়াকে জেলে পাঠানোর পরে এদেশে সামরিক শাসনও আসেনি, বিএনপিও রাজপথ কাঁপাতে পারেনি। তারা অনেকটা অনুগত একটি বিরোধী দলের মতোই আন্দোলন করছে। অন্যদিকে গত কয়েক দিনেই তাদের সমর্থক ওই সব সম্পাদক হতাশ হয়ে গেছেন। বিএনপির মধ্যম সারির যারা নেতা তাদের ফেসবুকের পোস্ট লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে, কয়েক শ’ বা হাজারখানেক মানুষ দেখেই তারা সন্তুষ্ট হচ্ছেন। আবার কখনও হতাশ হচ্ছেন। অর্থাৎ একটা অনিশ্চয়তা তাঁদের মনের ভেতর কাজ করছে।

বাস্তবে খালেদা জিয়ার জেলের বিষয়টি বিচার বিভাগের। তার নামে ৩৬টি মামলা আছে। মামলাগুলো তার নিজস্ব গতিতে চলবে। এখানে সরকারের খুব বেশি কিছু করার নেই। এ বিষয়ে সরকারী দলের নেতা নূহ আলম লেনিন একটি বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দিয়েছেন সাংবাদিকের প্রশ্নের। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা তো প্রধানমন্ত্রী, তিনি তো প্রধান বিচারপতি নন। তাই বিচার বিভাগ কী করছে সেটা তো সরকারের বিষয় নয়। সরকার এখানে শুধু বিচার বিভাগ যাতে তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারে সেই কাজে সহায়তা করবে। আর খালেদার মামলাগুলোর বিচার দ্রুত করার জন্য সরকারী পক্ষের আইনজীবীকে তাগাদা দেবে। দ্রুত বিচার শেষ হলে মানুষ যে খুশি হয় তা তো টাঙ্গাইলে রূপা গণধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে দেখা গেল। মাত্র ১৪ কার্য দিবসে ওই মামলা শেষ হয়েছে। এতে শুধু তার পরিবার খুশি হয়নি, এলাকার মানুষও খুশি হয়েছে। তাদের পরিবার আশা করেছে, সব হত্যার মামলা যেন বাংলাদেশে এমন দ্রুত শেষ হয়। এখান থেকে বোঝা যায়, যে পরিবার একজন স্বজন হারায়, তাঁরা বিচারটি দ্রুত পাওয়ার জন্য কতটা আকুল থাকে। তাঁদের বেদনা আসলে সাধারণে বুঝতে পারে না।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যার হুকুমের মূল আসামি হিসেবে মামলা আছে। বাস্তবে তিনি পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যার মূল হোতা। ২০১২, ১৩ ও ১৫তে খালেদা জিয়ার হুকুমে এই দেশে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। যে পরিবার থেকে ওই মানুষগুলো মারা গেছে সে পরিবারগুলোর আকুতি ও কান্না নিশ্চয়ই রূপার পরিবারের মতো। তাই এখানে মানুষ খালেদার পাশাপাশি সরকারকেও দোষারোপ করবে। ঘটনা ঘটেছে ২০১২, ১৩ ও ১৫তে । আজ ২০১৮- এখনও অবধি সরকারী প্রশাসন এই মামলাগুলো যাতে দ্রুত শেষ হয় তারা জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করতে কেন পারল না? এই পরিবারগুলো কি রূপার পরিবারের মতো একটু স্বস্তি পাবে না! তাঁদের পরিবারের যাকে হত্যা করা হয়েছিল পেট্রোলবোমায় পুড়িয়ে- তারা অন্তত তাঁদের পরিবারের ওই সদস্যের হত্যাকারীর বিচার তো পেতে চায়! আর এই হত্যাকারীর হুকুমের আসামি তো শুধু খালেদা জিয়াই নন, মির্জা ফখরুল, খোন্দকার মোশারফ, রিজভী, শিমুল বিশ্বাস, দুদু সকলেই। তাদের হুকুমেই তো সারাদেশে পেট্রোলবোমা মেরে গাড়ি, বাস, ট্রাক এগুলো পুড়িয়ে যাত্রীদের হত্যা করা হয়েছে। ২০১২, ১৩ ও ১৫তে যে অপরাধগুলো বিএনপি-জামায়াত ঘটিয়েছে এগুলো বাস্তবে ’৭১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধের সমান। তাই এগুলো দ্রুত বিচার আদালত থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধ আদালতে ট্রান্সফার হবে কিনা সেটাও বিচার বিভাগকে ভাবতে হবে। কারণ, কোন দেশে এতবড় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার না হলে ওই দেশে কখনও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ২০১২, ১৩ ও ১৫তে বিএনপি-জামায়াত যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, এগুলোর বিচার মানবতাবিরোধী অপরাধ আদালতে করার দাবি নতুন প্রজন্মের ভেতর থেকে, দেশের মানুষের কাছ থেকে আসছে। এখন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা যাদের আছে, তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে।

যা হোক, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে নির্বাহী বিভাগের যতটুকু দায়িত্ব তারা সেটা করবে বলেই দেশের সচেতন মানুষ মনে করে। অন্যদিকে বিচার বিভাগও তাদের বিজ্ঞ সিদ্ধান্ত দেবেন। তবে এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি রাজপথে আন্দোলনের নামে সরকারের সঙ্গে যে দাবা খেলবে, এ খেলাটা কেমন হবে? দাবা খেলায় মোটেই পারদর্শী ছিলাম না। তাই খেলার উদাহরণ বেশি দিতে পারব না। তবে একটা কথা বলা যায়, প্রথম কিস্তি মাত সরকারই করেছে। খালেদা জিয়া বলতে এতদিন যে একটা রানী রানী ভাব বাংলাদেশে ছিল, সেই কিস্তি সহজেই সরকার মাত করেছে। বিএনপির জন্য এখানে হতবাক হওয়া ছাড়া কিছুই করার নেই। সরকার প্রমাণ করে দিয়েছে, খালেদা জিয়া এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের কোন শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নয় বা খালেদার এমন কোন শক্তি নেই যে, তাকে জেলে নিতে সরকারকে চিন্তা করতে হবে। তিনি এখন সরকারের কাছে অতি সাধারণ একজন। বরং বিএনপি দেখতে পেল তারা কতটা ক্ষুদ্র হয়ে গেছে যে, খালেদা জেলে গেলেও নির্বাহী বিভাগকে তেমন চ্যালেঞ্জ পোহাতে হয়নি। শুধুমাত্র খালেদাকে জেলখানায় নেয়ার আগে মগবাজারে তার গাড়ি বহরে কিছু মানুষ এসেছিল। এখানে নতুন পুলিশ প্রধান দায়িত্ব নেয়ার পরে তাঁর প্রথম এ্যাসাইনমেন্টে কিছুটা ব্যর্থ হয়েছেন বলে ধরে নিতে পারেন। আগে থেকে সাংবাদিকদের কাছে সংবাদ ছিল ছদ্মবেশে বিএনপি-জামায়াতের কিছু কর্মী পথে থাকবে। তাই এটা পুলিশ প্রধানকে ভাবতে হতো। ভাবতে হতো মগবাজার এলাকাটা জামায়াত অধ্যুষিত এলাকা। তিনি সেভাবে পরিকল্পনা করতে পারেননি। যা হোক, তার পরেও পুলিশ প্রশাসন খুব সফলভাবে তাকে আদালত ও জেলে নিয়ে গেছে।

এই লেখা যখন লিখছি তখন বিএনপির পঞ্চম দিনের আন্দোলন চলছে। পঞ্চম দিনে দলের অফিসের সামনে অল্প কিছু মানুষ অবস্থান নিয়েছিল। আর এই পাঁচ দিন কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে তৃতীয় দিনে তাদের ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে বসতে হয়েছে। বিশ দলীয় জোট নিজে থেকে আন্দোলনে আসেনি। বরং এই পাঁচ দিনে তারা সরকারের সঙ্গে অনেক বেশি যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে। আগামী নির্বাচন ডিসেম্বরের শেষে। এখনও প্রায় ৩শ’ দিন বিএনপিকে আন্দোলন করতে হবে আগামী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত। পাঁচ দিনেই তাদের বিশ দলের সঙ্গে বৈঠক করতে হয়েছে। পঞ্চম দিনের আন্দোলনে ঢাকায় অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে তিনবার। এসব মিলে ৩শ’ দিন বা ২শ’ ৮০ দিনের আন্দোলন টেনে নেয়ার ক্ষমতার জোরটা বিএনপি দেখাতে পারেনি। আর দিনের প্রথম সূর্য ওঠা দেখেই বলা যায় দিনটি কেমন যাবে? তাদের ৩শ’ দিন রাজপথে থাকার মতো কোন শক্তি তারা দেখাতে পারেনি। তবে প্রথম দিন বেগম জিয়ার গাড়ি বহরে ঢুকে যাওয়া থেকে একটা বিষয় প্রমাণ করেÑ তারা এখন যাই করুক না কেন, চোরাগোপ্তা হামলার পথে তারা যাবেই। সরকার কতটা সজাগ থেকে সেটা মোকাবেলা করতে পারবে সেটা আগামীতে দেখার বিষয়। পাশাপাশি খালেদা জিয়াকে সহজে জেলে নেয়ার ভেতর দিয়ে খালেদা জিয়া এখন আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় কোন বিষয় নয়। তেমনি আরেকটি বিষয় এখানে প্রমাণিত হয়েছে তা হলো, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসকে সকলেই অপছন্দ করে। যে কারণে খালেদার গ্রেফতারের পরে বিদেশেও কোন প্রতিক্রিয়া হয়নি। জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া বলে যেটা এখানকার কাগজে ছাপা হয়েছে, তার পুরো বিবরণী জোগাড় করে দেখেছি, বাস্তবে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে দু’জন জামায়াতী সাংবাদিকের মিথ্যাচারে ভরা প্রশ্নের এক ধরনের তাৎক্ষণিক মামুলি উত্তর দিয়েছেন জাতিসংঘের ওই কর্মকর্তা। এটা তাদের ব্রিফিংয়ের কোন বিষয় ছিল না। এ কারণে এটা স্পষ্ট- দুর্নীতি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে খালেদা কোন আন্তর্জাতিক সহায়তা পাবে না। এমতাবস্থায় নিঃসঙ্গ বিএনপি রাজপথে কতদিন উঁকি-ঝুঁকি মারে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

১৫/০২/২০১৮ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: