২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১০ ফাল্গুন ১৪২৪, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

দ্রুত কার্যকর হোক

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

গত বছরের ২৫ আগস্ট টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় একটি গণপরিবহনে রূপা খাতুনের গণধর্ষণ ও নির্মম-নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাটি সারা ফেলেছিল দেশে। অনুরূপ ঘটেছিল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের সন্নিকটে ধর্ষিত তনু হত্যার ক্ষেত্রেও। যা হোক, অত্যন্ত আশার কথা এই যে, তনু হত্যার কোন কূল-কিনারা অদ্যাবধি না হলেও গণধর্ষিত ও নিহত রূপা হত্যা মামলার রায় পাওয়া গেছে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ১৪ দিনের শুনানিতে। টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আবুল মনসুর মিয়া গত সোমবার এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে একটি বহুজাতিক কোম্পানির কর্মী রূপা খাতুনকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত আসামি পাঁচ পরিবহন শ্রমিকের মধ্যে চারজনকে ফাঁসিতে মৃত্যুদ-ের আদেশ দেয়া হয়। একজনকে দেয়া হয়েছে সাত বছরের কারাদ-সহ এক লাখ টাকা জরিমানা। এ ছাড়া যে বাসটিতে রূপাকে গণধর্ষণ করা হয়, সেটির মালিকানা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে রূপার পরিবারকে। রায়ে আপীলের সুযোগ থাকলেও যত দ্রুত এই রায় কার্যকর হয়, ততই মঙ্গল।

গণধর্ষিত রূপার নৃশংস নির্মম হত্যাকা- আমাদের ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিল্লীতে ফিজিওথেরাপির ছাত্রী নির্ভয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। চলন্ত বাসে সেই বহুল আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ভারত জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠেছিল। পরে অবশ্য ধর্ষকদের মৃত্যুদ-সহ কারাদ- প্রদান করা হয় আদালত কর্তৃক। অনুরূপ একাধিক ঘটনা ঘটে বাংলাদেশেও। ২০১৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জে শুভেচ্ছা পরিবহনের বাসে, ২০১৫ সালের ১২ মে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে চলন্ত বাসে এক পোশাক কর্মীকে, রাজধানীতে মাইক্রোবাসে এক গারো তরুণীকে, গত বছর ২৩ জানুয়ারি বরিশালে সেবা পরিবহনের এক বাসে দুই বোনকে, ওই বছর ১ এপ্রিল টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী থেকে ঢাকাগামী বিনিময় পরিবহনের বাসে এক পোশাক কর্মী গণধর্ষণের শিকার হন। এসব ঘটনায় ধরপাকড়সহ মামলাও হয়েছে। তবে এতে স্বভাবতই গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। এই ধরনের ন্যক্কারজনক ও ঘৃণ্য তৎপরতা জনমনে পরিবহন খাত সম্পর্কে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে। অন্যদিকে পরিবহন মালিকদের ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সে অবস্থায় ধৃতদের দ্রুত বিচারের স্বার্থে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নিষ্পন্ন করা বাঞ্ছনীয়। থানা-পুলিশকেও নিশ্চিত করতে হবে যে, আসামিরা যেন আইনের ফাঁক গলে জামিনে বেরিয়ে যেতে না পারে। তদুপরি ঘাতক ও ধর্ষকদের সর্বোচ্চ সাজাই প্রত্যাশিত। যেমনটি ঘটেছে রূপা খাতুনের ক্ষেত্রে।

এটিকে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। পত্রপত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায়, প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণ বা গণধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। আর ঘটনাটি কেবল ধর্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্ষিতাকে হত্যা করা হচ্ছে নির্মমভাবে। অথবা ধর্ষিতা পরিবার সমাজ ও লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যা করছে। তদুপরি তথাকথিত সামাজিক বিচারের রায়ে ধর্ষকের পরিবর্তে শাস্তি দেয়া হচ্ছে ধর্ষিতাকে। উৎপীড়িত পরিবারটিকে করা হচ্ছে একঘরে। তবে সর্বাধিক আলোচিত ছিল সোহাগী জাহান তনুর ঘটনা। কুমিল্লায় সেনানিবাস সংলগ্ন সংরক্ষিত এলাকায় ঝোপের মধ্যে পাওয়া যায় ধর্ষিত তনুর লাশ। দুই দফা ময়নাতদন্তে শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয় যে, হত্যার আগে তনুকে অন্তত তিনজন ধর্ষণ করেছিল। তবে এত মাস পরও তনু হত্যা মামলার অগ্রগতির কোন খবর নেই। যদিও তনু হত্যার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে সারাদেশের মানুষ।

নারীর ক্ষমতায়নসহ অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উন্নয়নে বাংলাদেশের নারী সমাজ বিশ্বে ঈর্ষণীয় পর্যায়ে এগিয়ে থাকলেও পিছিয়ে আছে এদিক থেকে। অবশ্য নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ইত্যাদি প্রতিরোধে দেশে যথেষ্ট ভাল আইন রয়েছে। তবে দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করতে হয় যে, বিস্তৃত পরিসরে এর প্রয়োগ সীমিত ও সীমাবদ্ধ। অবশ্য এর জন্য নিম্ন আদালতসহ থানা-পুলিশও কম দায়ী নয় কোন অংশে। যেখানে ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ আছে বিস্তর। বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীর অভিগম্যতা সীমিত। আর সেজন্য শুধু আইন থাকলেই হবে না, এর পাশাপাশি সর্বত্র স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

১৫/০২/২০১৮ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: