২১ জানুয়ারী ২০১৮,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

শ্রদ্ধাঞ্জলি ॥ চট্টগ্রামের লৌহমানব মহিউদ্দিন চৌধুরী


শ্রদ্ধাঞ্জলি ॥ চট্টগ্রামের লৌহমানব মহিউদ্দিন চৌধুরী

আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে যিনি এক নামে পরিচিত। চট্টগ্রামের বাইরে তিনি চট্টগ্রামের মহিউদ্দিন নামেই পরিচিত। বহুকষ্টে গড়া তাঁর জীবন। ১৯৪৪ সালের ১২ ডিসেম্বর রাউজানের গহিরার সম্ভ্রান্ত বক্স আলী পরিবারের হোসেন আহমদ চৌধুরীর ঔরসজাত ও বেদুরা বেগমের গর্ভজাত তিনি। ছোটকাল থেকেই ছিলেন ডানপিটে। লেখাপড়ায় ছিলেন মাঝামাঝি। কিন্তু তাঁর মেধা ছিল তীক্ষè। বাইরে তিনি ভীষণ কঠোর প্রকৃতির ছিলেন। বাক্যে ছিলেন অমৃতচারী। প্রয়োজনে অতি রূঢ়ভাষীও ছিলেন তিনি। তার পরও চট্টগ্রামবাসীর কাছে ছিলেন অতি প্রিয়জন। যেখানে আন্দোলন, যেখানে সংগ্রাম, যেখানে মানবিক বিপন্নতা, যেখানে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, যেখানে বেওয়ারিশ লাশ- সেখানেই মহিউদ্দিন চৌধুরীর উপস্থিতি ছিল অনিবার্য।

বহু অভিধায় অভিষিক্ত তিনি। চট্টগ্রামের মানুষ তাঁকে চট্টলবীর, চট্টল গৌরব, চট্টল বন্ধুসহ নানা নামে ডাকতেন। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই গরিব ও মেহনতি মানুষের বন্ধু। পায়জামা-পাঞ্জাবি ও মুজিব কোট এবং মাথায় সাদা টুপি নিয়েই তাঁর অবয়ব। সারা বাংলাদেশে কে না জানে তাঁর নাম। চট্টগ্রামের মহিউদ্দিন বললেই ভেসে ওঠে সংগ্রাম ও প্রতিবাদমুখর একটি চেহারা। এভাবেই মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজেকে নেতৃত্বের পাদপীঠে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। জীবনের সাত দশকেরও বেশি সময় কাটিয়ে তিনি শুক্রবার এই সুন্দর পৃথিবীকে চির বিদায় জানিয়েছেন। চলে গেছেন পরপারে। কিন্তু রেখে গেছেন অগণন স্মৃতি, বর্ণাঢ্য কর্মকা-, আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী হার না মানা এক নেতার অবয়ব।

তিনি চট্টগ্রামের শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত ও সহায়হীন মানুষের বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের স্মরণীয় ও কীর্তিমান পুরুষদের অন্যতম একজনে পরিণত হতে সক্ষম হয়েছিলেন তাঁর বহুমুখী কর্মযজ্ঞের কারণে। টানা ১৭ বছর চট্টগ্রামের মেয়র পদে আসীন থাকাকালে এবং এর পরবর্তী সময়ে ক্ষমতা না থাকার পরও তিনি স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং রাজনীতিতে যে অবদান রেখে গেছেন তা চট্টগ্রামের স্বার্থে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের প্রথম সারির নেতা। নেতৃত্ব দিয়েছেন মাউন্ট ব্যাটালিয়নের। মুক্তিযুদ্ধে বার বার তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে নানা অসুখ-বিসুখ তাঁকে কম তাড়া করেনি। কিন্তু অদম্য মহিউদ্দিন চৌধুরী বরাবরই জনমানুষের আন্তরিক দোয়ার কারণে ফিরে এসেছেন। কিন্তু ৭৪ বছরে পা দেয়ার পর তিনি শেষ পর্যন্ত জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে বাধ্য হয়েছেন। চলে গেলেন চট্টগ্রামবাসীকে কাঁদিয়ে।

তাঁর মৃত্যুতে চট্টগ্রামবাসী কাঁদছে। কাঁদছে বাংলাদেশ এবং রাজনৈতিক অঙ্গন। গেটওয়ে অব বাংলাদেশ নামে পরিচিত চট্টগ্রাম একজন প্রকৃত অভিভাবককে হারিয়েছে। সুফী সাধক পীর আউলিয়ার পদধূলিধন্য এই চট্টগ্রাম। বারো আউলিয়ার চট্টগ্রাম। পীর বদরের চাটি নামেও চট্টগ্রামের পরিচিতি রয়েছে। সাগর, পাহাড় ও নদীঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে মহিউদ্দিন চৌধুরীর জীবন যৌবন। প্রাকৃতিক পার্লারের সৌন্দর্যের আধার এই চট্টগ্রামেই মহিউদ্দিন চৌধুরীর সকল স্বপ্ন রচিত। নিযুত স্বপ্ন তিনি দেখেছেন। অযুত স্বপ্ন তিনি বাস্তবায়ন করেছেন। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অকুতোভয়ে যুদ্ধ করেছেন। সেই যুদ্ধে তিনি বাঙালী জাতির বিজয় ছিনিয়ে আনা সেনাদের নেতৃত্বদানকারীদেরও অন্যতম।

চট্টগ্রাম ও মহিউদ্দিন চৌধুরী এক অবিচ্ছদ্য নাম। তাঁর চেতনার গভীরে যে আলোটি অনির্বাণ তা হচ্ছে বাঙালী জাতির মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা। বাঙালীর বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে তাঁর জন্ম। ডিসেম্বরে বাঙালীর বিজয় অর্জন। আর এই ডিসেম্বরেই এই মায়াময় পৃথিবীকে তিনি বিদায় জানিয়েছেন শুক্রবার ভোর রাতে। ডিসেম্বর মাসটি যেন তাঁর জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আর প্রিমিয়ার শব্দটিও তাঁর অতি প্রিয়। যেখানে তিনি মেয়র থাকাকালে প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রিমিয়ার নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রিমিয়ার টেকনোলজি নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রিমিয়ার নামের ল্যাপটপ এ্যাসেম্বলিং করে তা বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালীর জাতির সংগ্রামী ইতিহাসকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা। এই বিজয়মেলার রূপকারদের স্বপ্ন এগিয়ে নিতে মহিউদ্দিন চৌধুরী গত কয়েক দশক ধরে এর মূল আয়োজকদের অন্যতম ভূমিকায় নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। এই বিজয়মেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের লোমহর্ষক স্মৃতিচারণই এর মূল আকর্ষণ। পাশাপাশি রয়েছে মেলা।

মহিউদ্দিন চৌধুরী মূলত ছাত্র রাজনীতি থেকে শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পরিচিতির পাদপীঠে উঠে আসতে সক্ষম হন। এরপর আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পর পর টানা তিনবার চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচিত হয়ে হ্যাটট্রিক গৌরব অর্জন করেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও তিনি ছিলেন মূলত সর্বদলীয় নেতা। রাজনীতিতে তাঁর মতবিরোধ থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল সকলের সঙ্গে। তাই তিনি সকলের কাছে মহিউদ্দিন ভাই নামে পরিচিত। আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি সব কর্মকা- পরিচালনা করে গেছেন। সফলতাও অর্জন করেছেন। তাই তো তাঁর নামে বার বার স্লোগান উঠেছে ‘সুখের দিন-দুঃখের দিন, পাশে থাকে মহিউদ্দিন।’

চট্টগ্রাম বন্দরের দুর্নীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি আমৃত্যু প্রতিবাদী। বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের চালিকাশক্তি হিসেবে তিনি নিজেকে অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এছাড়া তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠার অবদান তারই কারণে। চট্টগ্রামকে তিনি বড্ড বেশি ভালবাসতেন। মূলত চট্টগ্রামই যেন তাঁর হৃৎপি- ছিল। চট্টগ্রাম ছিল তাঁর নিশ্বাসে। আর চট্টগ্রামবাসী ছিল তাঁর বিশ্বাসে। চট্টগ্রামবাসীও মহিউদ্দিনকে সবকিছু উজাড় করে দিয়েছে। মেয়র নির্বাচনে একবার পরাজিত হলেও এখনও চট্টগ্রামের মেয়র বলতে তার নামটিই মানুষের মনে জাগ্রত হয়। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মাধ্যমে তিনি যে দুঃসাহসিক তৎপরতা দেখিয়ে গেছেন তা ছিল লড়াকু। আর এ লড়াকু মানসিকতা তাঁকে নিয়ে গেছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। যে কারণে তিনি অলিখিতভাবে চট্টগ্রামের লৌহমানবের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

১৯৯৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার চট্টগ্রাম বন্দর আন্দোলন থামাতে মহিউদ্দিনকে দমাতে একবার গ্রেফতার করে। তাঁর এ গ্রেফতারের বিপরীতে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে চট্টগ্রামবাসী। পুরো চট্টগ্রাম রীতিমতো জ্বলেছে। তিনদিন অচলাবস্থায় ছিল এই বাণিজ্যিক নগরী। তাঁর গ্রেফতারের ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি বিশ্ব মিডিয়াকেও আকর্ষণ করেছে। মূলত তিনি আপদমস্তক একজন রাজনীতিক। রাজনীতিই ছিল তাঁর ধর্ম, রাজনীতিই ছিল তাঁর কর্ম। অপরাজনীতিকে তিনি ঘৃণা করতেন। তিনি বৈরিতাকে রাখতেন উর্ধে।

দীর্ঘদেহী শ্যামবর্ণের হলেও তিনি পাহাড়ঘেরা চট্টগ্রামের বুনোগন্ধে মাতোয়ারা এক সাদাফুল হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। ‘ডু ইট নাউ’ ও ‘ডু অর ডাই’ তাঁর ছিল অন্তরের স্লোগান। সে লক্ষ্য নিয়ে তিনি শুধু এগিয়েছেন। এগিয়ে গিয়ে পৌঁছেছেন শিকড় থেকে শিখরে। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের নেতা হলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তাঁর মতামত নেয়ার ব্যাপারটি গ্রহণযোগ্যতা পেত। তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজগুণে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়ে তিনি খ্যাতির চরমে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছেন। চট্টগ্রামের এই লৌহমানবের মৃত্যুতে চট্টগ্রাম যে প্রকৃত একজন অভিভাবক হারিয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে সময় থেমে থাকে না। সময় এগিয়ে যায়। দেশও এগিয়ে যাবে। রাজনীতিও এগিয়ে যাবে। আগামীতে হয়ত তাঁর মতো বা তাঁর চেয়ে বেশি গুণের নেতার আবির্ভাব হতে পারে। তবে মহিউদ্দিন চৌধুরীর যে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন তাঁর সমান গৌরবের অধিকারী হওয়ার বিষয়টি সন্দেহের আবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকবে। কারণ কেউ কারও সমান হতে পারেন না। তবে কম-বেশি গুণাগুণ থাকে। এ কথা নিশ্চিত যে, চট্টগ্রামে আরেকজন মহিউদ্দিন চৌধুরী জন্ম কখনও নেবে না।