১৮ জানুয়ারী ২০১৮,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

৪৬ বছরেও শহীদ বুদ্ধিজীবীদেও পূর্ণাঙ্গ তালিকা না হওয়ায় ক্ষোভ


৪৬ বছরেও শহীদ বুদ্ধিজীবীদেও পূর্ণাঙ্গ তালিকা না হওয়ায় ক্ষোভ

জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ স্বাধীনতা অর্জনের ৪৬ বছর পরও মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি হয়নি। এ সময়ের মধ্যে অনেকেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। বারবার প্রতিশ্রুতির পরেও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা তৈরি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী সন্তান ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা। তারা বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে শুধু ঘটা করে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। কিন্তু সেদিন দেশ যাদের হারিয়েছে তাদের অধিকাংশের পরিবার কেমন আছে তার খোঁজ রাখেনি কেউ। অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে দিন পার করছে। কেউ তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। শুধু গুটি কয়েক বুদ্ধিজীবীর পরিবার ও তাদের সন্তানদেরই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয় জেনে বাঙালী জাতিকে মেধাশূন্য করতে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার ছক কষে ঘাতকরা। তারা এ দেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তালিকা তৈরি করে। সেই তালিকা ধরে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে পাকহানাদার বাহিনী।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, সরকারীভাবে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কোনো তালিকা তৈরি করা হয়নি। সরকারের ওপর ভরসা করে কোনো লাভ হবে না। অনেক সংগঠন ও ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে তালিকা করেছেন। তারা আরও বলেন, এ বিষয়ে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। তবে সরকারীভাবে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের একটি তালিকা থাকা উচিত, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে সে সময় জাতি কাদের হারিয়েছিল।

শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের সন্তান প্রজন্ম ৭১’র সভাপতি শাহীন রেজা নূর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ১৯৭১ সালে ঘাতকদের কাছে বুদ্ধিজীবীদের তালিকা ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এটাই সত্য যে, সরকারের কাছে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই। মাত্র ৬১ জনের একটি তালিকা তাদের কাছে আছে। তিনি বলেন, সারা দেশে শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা খুব বেশি হবে না। সর্বোচ্চ কয়েকশ’ নাম এ তালিকায় আসতে পারে। তাদের অন্তর্ভুক্ত করে সরকার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে পারছে না। এ অবস্থায় অবিলম্বে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের দুই সংগঠন ‘প্রজন্ম-৭১’ ও ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিরক্ষার বিষয়ে ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির সভাপতি মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ড. এম এ হাসান বলেন, একাত্তরে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের একটি অংশ ছিলেন বুদ্ধিজীবী। এই বুদ্ধিজীবীরা মূলত পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের দোসরদের টার্গেট কিলিংয়ের শিকার। স্বাধীনতার পর এই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সেভাবে স্মরণ করা হয়নি। অবশ্য কয়েকজন শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্মৃতিরক্ষায় কিছু উদ্যোগ সাম্প্রতিক সময়ে নেয়া হয়েছে, সেগুলোও করা হয়েছে শহীদ পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়-স্বজনের উদ্যোগে। ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক শহীদ বুদ্ধিজীবীর নাম পাওয়া গেছে, যারা আজও পাদপ্রদীপের বাইরে আছেন। সরকারের উচিত সেসব বুদ্ধিজীবীর তালিকা প্রণয়ন ও স্মৃতি সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা ও আপীল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, সরকারী-বেসরকারী কোনো পর্যায়েই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধে তাদের আত্মত্যাগ ভুলে যাবে। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযোদ্ধাসহ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ইতিহাস তুলে ধরার জন্য প্রত্যেকের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাইয়ের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে মামলার কারণে আপাতত তা স্থগিত। এটি শেষ হলে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা তৈরির কাজে হাত দেয়া হবে।

শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা ॥ মুক্তিযুদ্ধে কতজন বুদ্ধিজীবী শহীদ হয়েছেন, এমন পূর্ণাঙ্গ তথ্য কোথাও নেই। তবে ১৯৭২ সালে জাতীয়ভাবে প্রকাশিত বুদ্ধিজীবী দিবসের সংকলন, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ বিশ্নেষণ করে আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন ‘নিউজ উইক’র সাংবাদিক নিকোলাস টমালিন এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছিলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা মোট এক হাজার ৭০ জন। ১৯৭১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গঠিত শহীদ বুদ্ধিজীবী তদন্ত কমিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘রাও ফরমান আলী এ দেশের বিশ হাজার বুদ্ধিজীবীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এ পরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যাযজ্ঞ চালানো সম্ভব হয়নি। ফরমান আলীর টার্গেট ছিল শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের গবর্নর হাউসে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে হত্যা করা।’

এ ছাড়া ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্মিত ‘বাংলাদেশ’ নামক প্রামাণ্য চিত্রে বলা হয়, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধে ৬৩৭ জন প্রাইমারি স্কুলশিক্ষক, ২৭০ জন মাধ্যমিক স্কুলশিক্ষক এবং ৫৯ জন কলেজশিক্ষক শহীদ হয়েছেন।’ তবে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটিসহ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে হাজারো শহীদ বুদ্ধিজীবীর তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ৯৯১ জন শিক্ষাবিদ, ১৩ জন সাংবাদিক, ৪৯ জন চিকিৎসক, ৪২ জন আইনজীবী, ৯ জন সাহিত্যিক ও শিল্পী, ৫ জন প্রকৌশলী এবং অন্যান্য ২ জন।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সংশ্নিষ্ট বুদ্ধিজীবী পরিবারগুলোর কাছে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৮৪ সালে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত লেখা নিয়ে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারকগ্রন্থ’ প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নাম সংগ্রহের জন্য তখন বাংলা একাডেমি সব জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়। এরপর বাংলা একাডেমি সিদ্ধান্ত নেয়, শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিল্পী, চলচ্চিত্রকার, প্রকাশকসহ বিশেষ বিশেষ পেশাজীবীরা ‘বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে বিবেচিত হবেন। ওই নীতিমালা অনুযায়ী ১৯৮৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর ২৫০ জনের তালিকা নিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া ৩২৫ জনের মতো শহীদ বুদ্ধিজীবীর নাম সংগ্রহ করে পরে তাদের নিয়ে ‘স্মৃতি ৭১’ প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি। ১৯৯৭ সালের ৪ ডিসেম্বর সবশেষ দশম খন্ডে ‘স্মৃতি ৭১’ প্রকাশিত হয়। এর পর আর ‘স্মৃতি ৭১’ প্রকাশ করা হয়নি। এ বিষয়ে শহীদ ডাঃ আলীম চৌধুরীর স্ত্রী শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলে বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা সম্ভব। নয়তো উদ্যোগ শুধু আলোচনার মধ্যে থাকবে। কাজের কাজ কিছু হবে না।