১৪ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

যুদ্ধাপরাধের দায়ে সার্ব নেতা ম্লাদিচের যাবজ্জীবন


যুদ্ধাপরাধের দায়ে সার্ব নেতা ম্লাদিচের যাবজ্জীবন

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেন এক সময়ের দাপুটে শাসক ‘বসনিয়ার কসাই’খ্যাত সাবেক সার্ব কমান্ডার রাতকো ম্লাদিচ। গণহত্যার অভিযোগে সাবেক যুগোসøাভিয়ার জন্য গঠিত ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ বসনিয়ান সার্ব বাহিনীর প্রাক্তন সামরিক কমান্ডার রাতকো ম্লাদিচকে গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে। ওই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে তাকে যাবজ্জীবন কারাদ-ে দ-িত করা হয়। ইউরোপের সাবেক রাষ্ট্র যুগোশ্লাভিয়ায় যুদ্ধাপরাধ তদন্তে গঠিত জাতিসংঘের ট্রাইব্যুনাল বুধবার স্রেবরেনিত্সায় গণহত্যার রায় ঘোষণা করে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার পূর্বাঞ্চলীয় ছোট্ট পার্বত্য শহর স্রেবরেনিত্সায় গণহত্যা চালানোর দায়ে অভিযুক্ত হলেন সাবেক বসনিয়ান সার্ব কমান্ডার রাতকো ম্লাদিচ।

ট্রাইব্যুনাল বলেছে, ১৯৯০র দশকের গোড়ার দিকে স্রেব্রেনিৎসায় সামরিক সংঘাতের সময় হাজার হাজার বসনিয়ান মুসলিমের গণহত্যা সংঘটিত করতে চেয়েছিলেন রাতকো ম্লাদিচ।

সারায়েভোতে বোমাবর্ষণের ক্ষেত্রেও রাতকো ম্লাদিচ ব্যক্তিগতভাবে সেই বোমা ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে চেম্বার প্রমাণ পেয়েছে। এই রায় পড়া শুরু হওয়ার আগে রাতকো ম্লাদিচকে অবশ্য আদালত কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যেতে হয়। নিজের উচ্চ রক্তচাপের যুক্তি দেখিয়ে রাতকো মøাদিচ আদালতের শুনানি বন্ধ করার জন্য দাবি জানাচ্ছিলেন, কিন্তু সেই প্রতিবাদে ট্রাইব্যুনাল কান দেয়নি। খবর বিবিসি অনলাইন ও এএফপির।

‘বসনিয়ার কসাই’খ্যাত ম্লাদিচের বিচারের রায়ের মাধ্যমে বিশেষ এই ট্রাইব্যুনাল যুগোসøাভিয়ায় যুদ্ধাপরাধ নিয়ে কাজ শেষ করল। এটাই ট্রাইব্যুনালের শেষ রায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সংঘটিত সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যার দায়ে ৭৪ বছর বয়সী ম্লাদিচের যাবজ্জীবন কারাদ-ের রায় হয়। ম্লাদিচের বিরুদ্ধে ১১টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়, যার মধ্যে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার পাশাপাশি সারায়েভো অবরোধ করে হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার অভিযোগও আছে।

খবরে বলা হয়, ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসের ওই ঘটনায় অন্তত ৮ হাজার নিরস্ত্র মুসলিম পুরুষ ও বালককে হত্যা করা হয়েছিল, ম্লাদিচ ওই হত্যাকা-ের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে তদন্ত কর্মকর্তাদের অভিযোগ।

১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সার্ব বাহিনী সারায়েভো অবরোধ করে রেখেছিল। তাদের নিক্ষেপ করা গোলা ও স্নাইপারদের গুলিতে প্রায় ১১ হাজার বেসামরিকের মৃত্যু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ম্লাদিচ সব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। গণহত্যার জন্য অভিযুক্ত হলে তিনি আপীল করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

বসনিয়া যুদ্ধের সময় জাতিসংঘ সার্বিয়া সীমান্তের কাছে অবস্থিত স্রেব্রেনিৎসাকে ‘নিরাপদ এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। হালকা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর ডাচ সদস্যরা এলাকাটির নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল। ১৯৯৫ সালের ১১ জুলাই ম্লাদিচের বাহিনীর আচমকা আক্রমণে হতবিহ্বল ডাচ শান্তিরক্ষীরা আত্মসমর্পণ করে।

সার্ব বাহিনী এরপর শহরটির পুরুষ ও বালকদের নারীদের কাছ থেকে আলাদা করে। পুরুষদের বাসে করে সরিয়ে নিয়ে কিংবা দূরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

পরদিন ব্রোঞ্জের বর্ম পরা ম্লাদিচ স্রেব্রেনিৎসার শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। ক্যামেরার সামনে তিনি শিশুদের মাঝে চকোলেট ও মিষ্টি বিলি করেন বলে জানান স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায় ছেলে ও স্বামী হারানো মুনিরা সুবাসিচ। ক্যামেরার সামনে তিনি (ম্লাদিচ) বলছিলেন কিছুই হবে না এবং আমাদের ভয় পাওয়ারও কারণ নেই।

ক্যামেরা চলে যাওয়ার পর তিনি তার সৈন্যদের যাকে যাকে হত্যা করা যায় তাদের হত্যা করতে, যাকে যাকে ধর্ষণ করা যায় তাদের ধর্ষণ করার নির্দেশ দেন। সবশেষে আমাদের বলেন, স্রেব্রেনিৎসা থেকে পালিয়ে যেতে, যেন তিনি সেখানে ‘জাতিগতভাবে শুদ্ধ’ একটি শহর প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, বলেন মুনিরা।

ইন্টারন্যাশনাল কমিশন ফর মিসিং পার্সনের (আইসিএমপি) কর্মীরা পরে স্রেব্রেনিৎসার গণকবর থেকে মুনিরার ছেলে নারমিন ও স্বামী হিলমোর দেহাবশেষ উদ্ধার করে। গণকবরগুলোতে পাওয়া দেহাবশেষের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে ৭ হাজার নিহতের পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

ম্লাদিচের আইনজীবীদের ভাষ্য, সার্ব বাহিনী ও তার মিত্রদের গণহত্যা এবং বেসামরিকদের ওপর ‘জাতিগত নির্মূল অভিযানে’ ম্লাদিচের জড়িত থাকার অকাট্য প্রমাণ মেলেনি, যে কারণে অভিযুক্ত হলেও তাকে ১৫ বছরের বেশি কারাদ- দেয়ার সুযোগ নেই।

গণহত্যার দায়ে ম্লাদিচের বিচার চললেও যুগোশ্লাভিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মুসলিম-ক্রোয়াটদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দ্রুতগতিতে সার্বদের হয়ে বসনিয়ার ৭০ শতাংশ দখলে নেয়ায় এখনও অনেকের চোখেই তিনি ‘নায়ক’।

মুসলমান নিয়ন্ত্রিত বসনিয়া সরকারী বাহিনীর ঘাঁটি হওয়ায় সারায়েভো সার্ব বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু ছিল এবং এ কারণেই শহরটি দীর্ঘদিন ধরে অবরোধ করে রাখতে হয়েছিল বলে জানান ম্লাদিচের আইনজীবীরা। সার্ব বাহিনী যখন স্রেব্রেনিৎসায় গণহত্যা চালায় তখন ম্লাদিচ সেখানে উপস্থিত ছিলেন না এবং পরে ঘটনা শুনে মর্মাহত হন বলেও দাবি তাদের।

ম্লাদিচের ছেলে ডার্কো বলেন, ট্রাইব্যুনাল তার বাবাকে ছেড়ে দেবে বলেই তিনি প্রত্যাশা করছেন।

এর আগে যুগোশ্লাভিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিটিওয়াই) ম্লাদিচের চার অধঃস্তনকে গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে যাবজ্জীবন দিয়েছিল। বসনিয়ার সার্ব নেতা রাদোভান কারাদজিচ ও সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট শ্লোবোদান মিলোসেভিচ মিলে ম্লাদিচ বসনিয়া থেকে মুসলমানদের সরিয়ে ‘বৃহত্তর সার্বিয়া’ প্রতিষ্ঠা করতে স্রেব্রেনিৎসায় গণহত্যার পরিকল্পনা করেন বলেও ভাষ্য তদন্ত কর্মকর্তাদের। তদন্ত কর্মকর্তা অ্যালান তিয়েগার আদালতে বলেন, (ম্লাদিচের) যাবজ্জীবন ছাড়া অন্য যে কোন রায় হলে তা হতো নিহতদের জন্য অপমান, ন্যায় বিচারের জন্য অপমান ।

গণহত্যার পর ১৯৯৫ সালে কারাদজিচের সঙ্গেই অভিযুক্ত হন ম্লাদিচ। ২০১১ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। কারদজিচকে ২০১৬ সালে ৪০ বছরের কারাদ- দেয় আইসিটিওয়াই।

আর নিজেকে নির্দোষ দাবি করা মিলোসেভিচ ২০০৬ সালে বিচার চলাকালে জেলের মধ্যেই মারা যান। বসনিয়া যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আইসিটিওয়াই বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, মন্টিনিগ্রো ও কসোভোর ১৬১ জনের বিচার করেছে। এর মধ্যে ৮৩ জনই দোষী সাব্যস্ত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই জাতিগতভাবে সার্ব।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: