১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

আইলো অঘ্রান খুশিতে নাচে প্রাণ...


আইলো অঘ্রান খুশিতে নাচে প্রাণ...

মোরসালিন মিজান ॥ আইলো অঘ্রান খুশিতে নাচে প্রাণ/ চাষি কাচিতে দিলো শান/ কাচি হাতে কচ কচা কচ কাটে চাষি পাকা ধান...। পাকা ধান কাটার সময় এসেছে। গ্রামীণ জনপদে উৎসবের আমেজ। সোনালি ফসল ঘরে তোলার পালা। চৈত্র মাসে সিলেট অঞ্চলের হাওড়গুলো পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। বিপুল সেই ফসলহানির পর এসেছে সমৃদ্ধির অগ্রহায়ণ। আজ বুধবার ১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ। নতুন মাসের প্রথম দিন উদযাপিত হবে ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসব। ফসলকেন্দ্রিক সবচেয়ে প্রাচীন এবং প্রধান উৎসবে মাতবে গ্রামবাংলা। নতুন চালে হবে নবান্ন। ঘরে ঘরে চলবে পিঠাপুলির আয়োজন। রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য শহরেও আয়োজন করা হবে নবান্ন উৎসবের। প্রাকৃতজনের জীবন ও লোক চেতনায় উদ্ভাসিত হবে নগর। অসাম্প্রদায়িক উৎসবে যোগ দেবে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষ। নিজের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হবে নতুন প্রজন্ম।

নবান্ন মানে নতুন অন্ন। নতুন চালের রান্না উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবটি নবান্ন নামে পরিচিতি পায়। সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান পাকার পর এ উৎসব শুরু হয়। ইতিহাস বলে, হাজার হাজার বছর আগে কৃষিপ্রথা চালু হওয়ার পর থেকেই নবান্ন উৎসব পালন হয়ে আসছে। তখন থেকেই ঘরে ফসল তোলার আনন্দে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। কৃষিজীবী সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যে সকল আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়, নবান্ন সেগুলোর অন্যতম।

অবশ্য বর্তমানে সারাবছরই কোন না কোন ফসল উৎপন্ন হয়। সিলেট অঞ্চলের কথাই যদি ধরা যায়, ভাটি অঞ্চলের কৃষকরা বৈশাখে সোনালি ধান ঘরে তোলেন। তবে এবারের মৌসুমটা বড় বেদনার ছিল। ফসল কাটার আগ মুহূর্তে সুনামগঞ্জের ফসল রক্ষা বাঁধগুলো ভেঙ্গে যায়। ১৪০টি ছোট-বড় হাওড়ের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেলার দুই লাখ ২৩ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, পাহাড়ী ঢলে হঠাৎ বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় ৮২ শতাংশ ফসলই নষ্ট হয়েছে। সিলেটের হবিগঞ্জহসহ অন্য হাওড়গুলোতেও একই কারণে ভয়াবহ ফসলহানির ঘটনা ঘটে। এ অবস্থায় অগ্রহায়ণ নতুন করে আশা জাগাচ্ছে বৈকি!

প্রতিবারের মতো এবারও অগ্রহায়ণের শুরুতে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে দেখা দিয়েছে পাকা ধান। হেমন্তের মৃদুমন্দ বাতাসে খেলা করছে পাকা ধানের শীষ। আপন মনে হেলছে। দুলছে। দেখে মন ভরে যায়। সোনালি ফসলের দিকে তাকিয়ে নতুন নতুন স্বপ্ন বুনছেন কৃষক। ধান কাটার কাজও শুরু হয়ে গেছে বিভিন্ন অঞ্চলে। লোককবির ভাষায়Ñ এই হেমন্তে কাটা হবে ধান/আবার শূন্য গোলায়/জাগবে ফসলের বান...। বান এসেছে ফসলের। নতুন ধান ঘরে তোলার পর আয়োজন করা হবে নবান্ন উৎসবের। বিভিন্ন অঞ্চলে ফসল কাটার আগে বিজোড়সংখ্যক ধানের ছড়া কেটে ঘরের চালে বেঁধে রাখা হয়। বাকি অংশ চাল করে সে চালে পায়েস রান্না করা হয়।

আজ নবান্ন উৎসবের দিনে বাংলার কৃষকের ঘরে হরেক পদের রান্না হবে। এক সময় কুড়ি থেকে চল্লিশ পদের তরকারি করা হতো, তার কিছু হলেও দেখা যাবে আজ। তালিকায় থাকবে সব ধরনের শাক। ভর্তা ভাজি। আর পিঠাপুলি পায়েসের কথা তো বলাই বাহুল্য। আজ এর শ্রেষ্ঠ সময়। ঘরে ঘরে পিঠাপুলি পায়েস হবে। ধুম পড়বে নেমন্তন্ন খাওয়া ও খাওয়ানোর।

সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, নবান্ন উৎসবের সঙ্গে ধর্মীয় কিছু আনুষ্ঠানিকতাও যোগ করা হয়। হিন্দুরা নতুন ধান উৎপাদনের সময় পিতৃপুরুষের অন্ন প্রার্থনা করে থাকেন। পার্বণ বিধি অনুযায়ী হয় শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। শাস্ত্রমতে, নবান্ন শ্রাদ্ধ না করে নতুন অন্ন গ্রহণ করলে পাপের ভাগি হতে হয়। কে চায় অমন পাপ করতে!

অমুসলিম রীতিতে, নবান্ন অনুষ্ঠানে নতুন অন্ন পিতৃপুরুষ, দেবতা, কাক ইত্যাদি প্রাণীকে উৎসর্গ করে। আত্মীয়স্বজনকে পরিবেশন করার পর গৃহকর্তা ও পরিবারবর্গ নতুন গুড়সহ নতুন অন্ন গ্রহণ করেন। নতুন চালের তৈরি খাদ্যসামগ্রী কাককে নিবেদন করা বিশেষ লৌকিক প্রথা। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কাকের মাধ্যমে ওই খাদ্য মৃতের আত্মার কাছে পৌঁছে যায়। এই নৈবেদ্যকে বলে ‘কাকবলি’। অতীতে পৌষসংক্রান্তির দিনও গৃহদেবতাকে নবান্ন নিবেদন করার প্রথা ছিল। কাকবলির আগে আরও তিনটি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার নিয়ম রয়েছে। সেগুলো হলোÑ লক্ষ্মীপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ ও বীরবাশ। বীরবাশের প্রথা মূলত বরিশাল অঞ্চলের। এর নিয়ম অনুযায়ী, বাড়ির উঠানের মাঝখানে একটি গর্ত করা হয়। তার চারপাশে পিটুলী দিয়ে আলপনা আঁকা হয়। এর পর গর্তে জ্যান্ত কই মাছ ও দুধ দিয়ে একটি বাঁশ পোঁতা হয়। ওই বাঁশের প্রতি কঞ্চিতে বাঁধা হয় ধানের ছড়া। নবান্ন উৎসবে কাকবলি, লক্ষ্মীপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ হয়ে গেলে সবাই একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেন। এর আগে কেউ কিছু মুখে নেন না। বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া গ্রামে এখনও নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়। এবারও মহানন্দে উৎসব উদযাপন করবে বাংলার কৃষক। নতুন চালে পিঠাপুলির আয়োজন করা হবে। আছে আরও অনেক প্রাচীন রীতি। সেগুলো মেনেই হবে নবান্ন উৎসব।

অবশ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে অনেক কিছু। বর্তমানে সারাবছরই কোন না কোন ফসল উৎপন্ন হয়। সনাতন মাড়াইপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। যন্ত্রযুগে প্রবেশ করেছে গ্রাম। এখন শহুরে মানসিকতার কাছে মার খাচ্ছে গ্রামীণ মূল্যবোধ। আধুনিকতার ঠমক আর অন্যের চর্চায় অভ্যস্ত বাঙালী নিজের অনেক কিছুই খুইয়েছে। বর্তমানে আগের মতো বিপুল আয়োজনে হয় না নবান্ন উৎসব। তবে শেকড়ের সংস্কৃতি হারিয়ে যায়নি একেবারে। আজ এতিহ্যবাহী আচার উৎসবে মাতবে বাঙালী। নাগরিক জীবনে নতুন ধান বা চালের কোন অস্তিত্ব নেই। নেই বললেই চলে। রাজধানী শহর ঢাকায় বসে শুধু অনুভব করা যায়। শেকড় সন্ধানী মানুষ চিরায়ত ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করে। ঘরে ঘরে উৎসব আয়োজনের সুযোগ নেই। তাই বলে খিল এঁটে কেউ ঘরে বসে থাকবেনÑ এমন নয়। বরং শহরে নগরে ভিন্ন আঙ্গিকে উদযাপিত হয় নবান্ন উৎসব। আজ মনের আনন্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসবেন শেকড় সন্ধানী মানুষ। শহরজুড়ে থাকবে হরেক আনুষ্ঠানিকতা। ফসলকেন্দ্রিক সবচেয়ে প্রাচীন এবং বড় উৎসবের স্বরূপটি তুলে ধরা হবে নাচ-গানসহ বর্ণাঢ্য পরিবেশনায়।

রাজধানীতে বর্ণাঢ্য আয়োজন ॥ ঢাকায় প্রতিবারের মতোই মূল আয়োজনটি থাকছে চারুকলার বকুলতলায়। এখানে বর্ণাঢ্য উৎসবের আয়োজন করেছে জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদ। সকালে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। বাঙালীর সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগ্রামকে বাঁচিয়ে রাখতে, এগিয়ে নিতে বিপুল ভূমিকা রেখে চলা পুরোধা সাংবাদিক তোয়াব খানের এ বর্ণাঢ্য উৎসব উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।

অনুষ্ঠানমালার সূচনা করা হবে সকাল ৭টা ১ মিনিটে। নাগরিক কোলাহলের বিপরীতে বাাঁশর সুরে জেগে উঠবে প্রকৃতি। নৃত্য, সঙ্গীত, আবৃত্তি, নবান্নকথন, ঢাক-ঢোলের বাদন, যন্ত্রসঙ্গীতের পরিবেশনায় মূর্ত হবে নবান্নের সংস্কৃতি। নড়াইলের শিল্পী নিখিল চন্দ্র ও তার দলের পটগান, নেত্রকোনার কেন্দুয়ার দিলু বয়াতি ও তার দলের মহুয়ার পালা, মানিকগঞ্জের চানমিয়া ও তার দলের লাঠিখেলা, খুলনার ধামাইল গানের পরিবেশনায় ফুটে উঠবে গ্রামীণ ঐতিহ্য। সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হবে নবান্ন শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রার পরপরই উৎসব প্রাঙ্গণে নবান্ন শীর্ষক আর্ট ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হবে। আর্ট ক্যাম্পে প্রবীণ শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আবদুল মান্নান, আবদুশ শাকুর শাহসহ ২০ জন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী অংশ নেবেন। এসবের পাশাপাশি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য পিঠাপুলির মাধ্যমে আপ্যায়ন করা হবে আগতদের। থাকবে মুড়ি-মুড়কি, বাতাসাও। দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠান চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত।

একই রকম উৎসবের আয়োজন করা হবে ধানম-ি রবীন্দ্র সরোবর মুক্তমঞ্চে। বিকেল থেকে এখানে উৎসব শুরু হবে। সকল আয়োজন থেকে লোক-মানসের প্রচার ও প্রকাশ ঘটানো হবে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: