২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

জিডিপির আকার ১০০ বিলিয়ন ডলার হতে সময় লেগেছিল ৩৮ বছর ॥ এবার রেকর্ড প্রবৃদ্ধি


জিডিপির আকার ১০০ বিলিয়ন ডলার হতে সময় লেগেছিল ৩৮ বছর ॥ এবার রেকর্ড প্রবৃদ্ধি

আনোয়ার রোজেন ॥ সময় এখন আমাদের। সময় এখন বাংলাদেশের। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে সাফল্যে বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। চূড়ান্ত হিসাবে গত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে প্রাথমিক হিসাবে প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ হয়েছিল। অর্থাৎ প্রাক্কলিত প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। পরপর দুই বছর ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের নজিরও সাম্প্রতিক বিশ্বে বিরল। বাংলাদেশ ছাড়া কেবল কম্বোডিয়া আর ইথিওপিয়ার এই অর্জন রয়েছে। অন্যদিকে সাময়িক হিসাব থেকে ৮ ডলার বেড়ে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৪৬৫ ডলার। এ হিসাবে এক বছরে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৪৫ ডলার। বর্তমানে জিডিপির আকার ২৪৯ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। জিডিপির আকার ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে স্বাধীনতার পর ৩৮ বছর লেগেছিল। আর বর্তমান সরকারের আট বছরে জিডিপিতে যোগ হয়েছে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জিডিপি, প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়ের এই হিসাব করেছে।

প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের মানুষকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তিনি বলেন, এটি অর্জন সম্ভব হয়েছে দেশের সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষের যার যার অবস্থান থেকে অবদান রাখার কারণে। তাই সকলে মিলে কাজ করে গেলে আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব। প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দনের বিষয়টি জনকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা গত ৫ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছি। প্রতিবছর দেশে ২১ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের অভাব আছে, সেটা স্বীকার করি। তবে এটা সাময়িক। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এ চিত্র পাল্টে যাবে। কারণ বর্তমানে আমাদের ১৪শ’ প্রকল্প চলমান। এর মধ্যে বড় বড় অবকাঠামো সৃষ্টির প্রকল্প রয়েছে। আর অবকাঠামো হলো শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ভিত্তি। ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির কাজও দ্রুত গতিতে এগুচ্ছে। কাজ শেষ হলে কেবল এসব অঞ্চলে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। আর এসবই দৃশ্যমান। কাজেই প্রবৃদ্ধি নিয়ে কোন সন্দেহ-সংশয় থাকা উচিত নয়।

এর আগে সাময়িক হিসাব দেয়ার সময় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেয়। ওই সময় প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী জনকণ্ঠকে বলেছিলেন, বিশ্বব্যাংক বরাবরই রক্ষণশীল পদ্ধতিতে প্রবৃদ্ধির হিসাব করে। এ ক্ষেত্রে আমাদের তথ্য-উপাত্তও তারা ব্যবহার করে। আমরা স্বীকৃত রীতিনীতি মেনেই প্রবৃদ্ধির হিসাব করে থাকি। এতে লুকোছাপা বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোন সুযোগ নাই। বরং আমি বলব বিশ্বব্যাংক এবারই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে সর্বোচ্চ প্রাক্কলন করেছে। এবারই প্রথম তারা ৬ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলেছে। এটাকে আমরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি।

উল্লেখ্য, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সাত বছরে সারাবিশ্বে গড়ে জিডিপিতে ৬ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে মাত্র ১৭টি দেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘর (৭ দশমিক ১১) অতিক্রম করে। এর আগে প্রায় এক দশক দেশের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বৃত্তে ‘আটকে’ ছিল। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার অন্যতম লক্ষ্য ‘অর্থনৈতিক মুক্তির’ দিকে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সামষ্টিক অর্থনীতির অগ্রযাত্রা তারই বড় প্রমাণ। স্বাধীনতার পর ২০০৫-০৬ অর্থবছর পর্যন্ত মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৫৪৩ ডলার। এরপর গত এক দশকে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ডলারেরও বেশি বেড়েছে। এরমধ্যে বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল এক হাজার ৩১৬ মার্কিন ডলার। এর আগের দুই অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ১৮৪ ডলার এবং ১ হাজার ৫৪ ডলার। দেশ যে দ্রুত উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এটি তারই লক্ষণ। কিন্তু এই অর্জন ধরে রাখাকে চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স এ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরি। তিনি বলেন, আমাদের প্রবৃদ্ধিকে অনেকে ‘জবলেস গ্রোথ’ বলছেন। অর্থাৎ আমাদের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। যদিও জিডিপি আর কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি একই রকম হতে হবে- এমন কোন কথা নেই। তবে কর্মসংস্থান না বাড়লে শুধু আয় বাড়িয়ে টেকসই দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হবে না। এজন্য আমাদের এখন প্রবৃদ্ধির ‘কোয়ালিটি’ বাড়ানোয় মনোযোগ দিতে হবে।

চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপিতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রথমবারের মতো ৩০ শতাংশ অতিক্রম করেছে। এ বিষয়টিকে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে দেখছেন মোস্তফা কে মুজেরি। তিনি বলেন, ভারতসহ আরও কয়েকটি দেশে জিডিপিতে বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক আগেই ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের ঘরে পৌঁছেছে। আমরাও সেদিকে এগুচ্ছি। যদিও প্রত্যাশিত বেসরকারী বিনিয়োগের পরিমাণ কম। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে (এডিপি) ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ছে, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বেসরকারী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছে। উল্লেখ্য, জিডিপিতে এবার মোট বিনিয়োগের ২৩ দশমিক শতাংশ বেসরকারী খাতের, বাকি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ সরকারী বিনিয়োগ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জিডিপিতে বিনিয়োগের মোট পরিমাণ ছিল ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এর মধ্যে বেসরকারী বিনিয়োগ ছিল ২২ দশমিক ৯৯ ভাগ আর সরকারী বিনিয়োগ ৬ দশমিক ৬৬ ভাগ।

বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, গতবারের মতো এবারও সেবা এবং শিল্প খাতের ওপর ভর করে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। যদিও শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা কম হয়েছে। শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ২২ শতাংশ, যা ২০১৫-১৫ অর্থবছরে ছিল ১১ দশমিক ০৯ শতাংশ। সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত বছর কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলনের তুলনায় কমেছে। ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ হিসাব করা হলেও চূড়ান্ত হিসাবে এটি হয়েছে ২ দশমিক ৯৭ শতাংশ। চূড়ান্ত হিসাব মতে এখন বাংলাদেশের জিডিপির আকার ২৪৯ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫-১৬ বছরে জিডিপির আকার ছিল ২২১ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে এক বছরে জিডিপির আকার আর্থিক মূল্যে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।

সূত্র জানায়, গত অর্থবছরে সরকার ৭ দশমিক ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ঠিক করে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছে এবং ২০২০ সালে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষে শেষ বছরে প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে পৌঁছবে। অবশ্য পরিকল্পনামন্ত্রী বলছেন, যে গতিতে সরকার এগুচ্ছে তাতে ২০১৯ সালের মধ্যেই দেশের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ঘরে ছুঁবে।