১৩ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

রংপুরে সংঘর্ষের ঘটনায় গ্রেফতার শতাধিক


রংপুরে সংঘর্ষের ঘটনায় গ্রেফতার শতাধিক

নিজস্ব সংবাদদাতা, রংপুর ॥ রংপুর সদর উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের শলেয়াশাহ ঠাকুরবাড়ি গ্রামে সংঘটিত শুক্রবারের সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ এ পর্যন্ত ১০০ জনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের অধিকাংশই জামায়াত শিবিরের নেতা-কর্মী বলে দাবি করেছেন রংপুরের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান।

তিনি বলেন, এ হামলা, লুটপাট, অগ্নি সংযোগে যারা অংশ গ্রহন করেছে পুলিশের ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করা হচ্ছে। এই ঘটনার পিছনে যারা পরিকল্পনাকারী ও ইন্ধনদাতা, যারা লাউড স্পীকারে বক্তব্য দিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করেছে, মসজিদের মাইক ব্যবহার করে ধর্ম রক্ষার নামে মানুষকে সংঘর্ষের পথে ঠেলে দিয়েছে তাদের প্রত্যেকের নাম, ঠিকানা পুলিশ সংগ্রহ করেছে। তাদের প্রত্যেককে গ্রেফতার করা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলে জানান তিনি।

ফেইসবুকের বিষয়ে এসপি বলেন, ওই ফেইসবুক আইডি নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। ওই ফেইসবুক আইডিধারী টিটু রায়কে খুঁজে বের করার জন্য সিআইডি, ডিএসবি, ডিবি এবং সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্ট এর লোকজন নারায়ণগঞ্জে কাজ করছে।

এ ঘটনা তদন্তকারী দলের প্রধান অতিরিক্ত জেলা মেজিষ্ট্রেট আবু রাফা মো. আরিফ জানান, তদন্ত কমিটির সদস্যগণ ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার প্রাথমিক আলামত সংগ্রহ করেছে। তারা ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। বেঁধে দেয়া সাত দিনের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেবেন। ফেইসবুকের বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বিপিএম, পিপিএম বলেছেন, দুবৃত্তরা যে দলেরই হোক না কেন তাদের দলীয় পরিচয় নয় একজন আসামী হিসেবে গ্রেফতার করে আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে। রবিবার দুপুরে রংপুরের পাগলাপীর ঠাকুরবাড়ি গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘরে হামলা, ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্থ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে কমিউনিটি পুলিশিং রংপুর জেলা সমন্বয় কমিটির পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা প্রধান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রেঞ্জ ডিআইজি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আমরা এই মামলাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি এবং মামলার প্রধান আসামী টিটু রায়কে গ্রেফতার করার রংপুর জেলা পুলিশের কয়েকটি দল নারায়নগঞ্জে গিয়েছে। টিটু রায়কে গ্রেফতার করা হলেই প্রকৃত বিষয়টি উম্মোচিত হবে।

ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, পরিবেশ পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত এই এলাকায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করে হিন্দু সম্প্রদায়ের জানমাল ও বাড়িঘরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ বদ্ধ পরিকর। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির দেশ। এখানে সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলাকারীদের স্থান নেই। যে কোন মুল্যে প্রতিহত করা হবে বলে ডিআইজি জানিয়েছেন।

কমিউনিটি পুলিশিং রংপুর জেলা সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব সুশান্ত ভৌমিক বলেছেন, কমিউনিটি পুলিশিং সদস্যরা আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতা করার পাশাপাশি মানবিক কার্যক্রমও পরিচালনা করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সদস্যরা আজ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে সহযোগিতা প্রদানে এগিয়ে এসেছে। তিনি জানান, প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে বাড়ি-ঘর নির্মাণে ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেয়া হলো। আগামীতে সবার কল্যানে কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করে যাবে বলে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, ১০টি পরিবারকে মোট ৫০হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে।

রংপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান পিপিএম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) ফজলে এলাহী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) এবিএম জাকির হোসেন,কোতয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ বাবুল মিয়া, গঙ্গাচড়া থানার অফিসার ইনচার্জ জিন্নাত আলী, কমিউনিটি পুলিশিং রংপুরের আরিফ হোসেন টিটো, আব্দুল কাদের দিদার, এস এম রেজাউল করিম,সদর উপজেলার সভাপতি আব্দুল ওহাব মিঞা সহ কমিউনিটি পুলিশিং জেলা উপজেলা ইউনিয়ন পর্যায়ের ও জেলা পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ক্ষতিগ্রস্ত ধীরেন্দ্র নাথ রায় বলেন, আমরা এখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা অনেকদিন থেকেই আতঙ্কে আছি। কারণ আমাদের কানে আসছিল যে ওরা আমাদের বাড়িতে হামলা চালাবে। তাই হলো। আমরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছি।

ধীরেন্দ্র নাথ বলেন, টিটুল রায় অপরাধ করলে তার বিচার হবে। আমরা যারা নিরপরাধী তাদের ওপর কেন হামলা হবে।

শ্রী দিনেশ চন্দ্র রায় বলেন, আমার বাড়ি ভেঙে গেছে। আমরা রাতে যে যেখানে পারি পালিয়ে ছিলাম। আতঙ্কে আছি। রাতে সরকার থেকে খিচুড়ি দিয়েছে। সেই খিচুড়ি আমরা সবাই খেয়েছি। আমরা আমাদের ক্ষতিপূরণ চাই।

ঘটনাস্থলে থাকা ওয়াহেদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ঠাকুরপাড়ায় আমার গোডাউন আছে। আমি সেই গোডাউনে ছিলাম। কয়েক দিন থেকেই শোনা যাচ্ছিল এমন ঘটনা ঘটবে। তবে পুলিশ প্রথম থেকে সহযোগিতা করেছে। রংপুর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুর রহমান জানান, এই ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তিনি এ বিষয়ে কাউকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের আমরা পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছি।

জ্বালিয়ে দেয়া ঘর গুলোতে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যেগে রোববার থেকে নতুন টিন দিয়ে ও বাঁশের খুটি লাগিয়ে দিয়ে ঘর তুলে দেবার কাজ শুরু করা হয়েছে। রোববারই ঘর নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জিয়াউর রহমান জানিয়েছেন।

তবে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার গুলো অভিযোগ করেছে, তাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেয়া ছাড়াও মালামাল গরু ছাগল টাকা সবই লুট করে নিয়েছে সন্ত্রাসীরা। ফলে শুধু ঘর তৈরী করে তো সমস্যার সমাধান হবেনা। তারা খাবে বি তার কোন ব্যবস্থা নেই। হাড়ি পাতিল নেই যে রান্না করবো। এমনি অবস্থায় তাদের আর্থিক ভাবে সহায়তা না করলে তারা বিপাকে পড়বে।

ক্ষতিগ্রস্থ মসনি বালা জানান, তার ৩টি ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। মালপত্র সব লুট করে নিয়ে গেছে। বাড়িতে আধা মনের মতো চাল ছিলো তাও পুড়ে গেছে। কাথা বালিশ চাদর চৌকি কিছুই নেই। ২টি গরু একটি ছাগল ছিলো তাও নিয়ে গেছে । ফলে ঘর তৈরী করে পাশাপাশি তাদের পুনর্সবাসনের ব্যবস্থা না করলে পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।

একই কথা জানালেন নরেন চন্দ্র। তিনি জানান, তার ২টি ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, দুটি ছাগল ছিলো তাও লুট করে নিয়ে গেছে। বাড়িতে আগুন দেবার কারনে ঘরে থাকা কোন মালামাল রক্ষা করতে পারেননি তিনি। এমনি অবস্থায় ঘর তৈরী করে দেবার পাশাপাশি তাদের পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সরজমিন ঠাকুরপাড়া গ্রামে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা সকলেই সহায় সম্বলহীন। তাদের বেশীরভাগ ক্ষেত মজুরী। বিভিন্ন ছোট ব্যবসা করে কোন রকমে সংসার চলে তাদের। সন্ত্রাসীরা তাদের গ্রামে যে তান্ডব চালিয়েছে তা শুধু ঘর তৈরী করে সমস্যার সমাধান হবেনা। সকলকেই স্থায়ী পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে বলে জানালেন তারা।

এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি মেম্বার অনিল চন্দ্র জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন করে ঘর বাড়ি তৈরী করে দেয়া হচ্ছে । রোববারের মধ্যেই সকলেই বাড়ি নির্মাণ কাজ শেষ করা সম্ভব হবে আশা প্রকাশ করেছেন । তিনি আরো জানান, ইতিমধ্যে ক্ষগ্রিস্থ পরিবসার গুলোকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ ৩ হাজার টাকা, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পরিবার পিছু ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেয়া হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোকে স্থায়ী পুর্নবাসনের জন্য আরো পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

এদিকে রবিবার দুপুরে ঠাকুপাড়া গ্রামে তান্ডবের ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি প্রধান রংপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আবু রাফা মোহাম্মদ আরিফের নেতৃত্বে তদন্ত প্রতিনিধি দল ঘটনা স্থল পরিদর্শন করেন। তারা জ্বালিয়ে দেয়া ও মালামাল লুট করে নিয়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোর সাথে কথা বলেন তাদের জবানবন্দি গ্রহন করেন একই ভাবে তারা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথেও কথা বলেন এবং তাদের জবানবন্দি রের্কড করেন।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: