১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

আসেম পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে চাপে পড়বে মিয়ানমার


তৌহিদুর রহমান ॥ রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে এশিয়া-ইউরোপ মিটিং (আসেম) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে মিয়ানমারের ওপর নতুন করে চাপ আসছে। আগামী ২০-২১ নবেম্বর নেপিডোয় অনুষ্ঠেয় সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো রোহিঙ্গা সঙ্কটকেই প্রাধান্য দেবে। সম্মেলন শেষে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক চেয়েছে বাংলাদেশ। এদিকে মিয়ানমারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এই সম্মেলনে অংশ নেয়ার আগেই ঢাকায় আসছেন চীন, জাপান, জার্মানি ও সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

সূত্র জানায়, নেপিডোয় আসেম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে ৫৩ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অংশগ্রহণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে অংশ নিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বক্তব্য রাখবেন। এই সম্মেলন থেকেই রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আরাও চাপ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

আসেম পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নেয়ার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীকে ইতোমধ্যেই আমন্ত্রণ জানিয়েছে মিয়ানমার। তিনি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন। তবে এই সম্মেলনের আগেই বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছে মিয়ানমার। মিয়ানমারের এই প্রস্তাবে বাংলাদেশ রাজি নয়। কেননা, এই সময়ে বাংলাদেশে আসছেন চারটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তারা বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবে। এখান থেকেই তারা মিয়ানমারে আসেম পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দেবেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী নেপিডোয় আগামী ২২-২৩ নবেম্বর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তাব করেছেন। বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে চায়। আগামী ৩০ নবেম্বরের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করার প্রস্তাব দেয়া রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল মিয়ানমার সফরে এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী মিয়ানমারে আসেম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে যোগদান শেষে দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করতে চান।

এদিকে মিয়ানমারে আসেম সম্মেলনে যোগ দেয়ার আগেই বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ওয়াং আই, জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কনো, জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গ্যাব্রিয়েল ও সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারগট ওয়ালস্টার আসেম সম্মেলনে যোগ দেবেন। এই সম্মেলনে যোগ দেয়ার আগে আগামী ১৮ নবেম্বর বাংলাদেশে আসবেন চীন, জার্মানি ও সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ১৯ নবেম্বর ঢাকায় আসবেন জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন। এছাড়া রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন। এখান থেকে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি ভালভাবে জেনে যোগ দেবেন আসেম সম্মেলনে। সেখানে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন।

সূত্র জানায়, এশিয়া ও ইউরোপের সদস্য দেশের সমন্বয়ে আসেম একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংগঠন যার উদ্দেশ্য হলো এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা। ১৯৯৬ সালে আসেম ১৫টি ইইউ সদস্য দেশ, ৭ টি আসিয়ান সদস্য দেশসহ চীন,জাপান, কোরিয়া এবং ইউরোপীয় কমিশনের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। আসেম শীর্ষ সম্মেলন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি, ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশের সংস্থার (আসিয়ান) মহাসচিবের সমন্বয়ে প্রতি দুবছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয়। গত বছর মঙ্গোলিয়ায় আসেম শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৮টি দেশসহ ইউরোপের ৩০টি, এশিয়ার ২১টি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আসিয়ান সচিবালয়সহ সর্বমোট ৫৩ সদস্যবিশিষ্ট সংগঠন আসেম। আসেম বিশ্ব জনসংখ্যার ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ, বৈশ্বিক জিডিপির ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৬০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। আসেম ১৯৯৩ সালে ইইউভুক্ত ১৫ দেশ ও আশিয়ান ৭টি দেশ ছাড়াও চীন, জাপান, কোরিয়া ও ইউরোপিয়ান কমিশন নিয়ে যাত্রা করে। বাংলাদেশ ২০১২ সালে আসেমের ৯ম সম্মেলনে অফিসিয়াল সদস্য পদ লাভ করে।

মিয়ানমারে আসেম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে রোহিঙ্গা সঙ্কট ছাড়াও এশিয়া ও ইউরোপের উন্নয়ন, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযান, অভিবাসন সঙ্কট মোকাবেলা, কানেকটিভিটিসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় আলোচিত হবে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে আসেমের ভবিষ্যত কাজের পদ্ধতি নির্ধারণসহ জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে।

বতর্মান রোহিঙ্গা সঙ্কট তুলে ধরার জন্য বাংলাদেশের জন্য আসেম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন অত্যন্ত কার্যকর একটি ফোরাম বলে সরকারের নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন। কেননা, এই সম্মেলনের আয়োজন করছে এবার মিয়ানমার। সে কারণে এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সঙ্কট বিভিন্ন দেশের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি বহুবিধ সুবিধা অর্জন করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের রফতানির একক বৃহত্তম বাজার এবং অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। আসেম প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে এশিয়ার দেশসমূহের সম্মিলিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ইউরোপীয় দেশসমূহের সঙ্গে তার স্বার্থ সমুন্নত রাখার কাজটি করতে পারে। আসেম অন্যান্য দেশের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে মতবিনিময় করার পর্যাপ্ত সুযোগ প্রদান করে যা বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: