২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে কড়াকড়ি


হাসান নাসির/এইচএম এরশাদ ॥ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতন বন্ধ হওয়ার পরও রোহিঙ্গাদের সীমান্ত অতিক্রমের কোন কারণ আর দেখছে না উখিয়া-টেকনাফের বাসিন্দা। একই মনোভাব এখন প্রশাসনেরও। রাখাইনে এখন সীমিত আকারে ত্রাণ তৎপরতাও চলছে। কিন্তু তারপরও রোহিঙ্গা ¯্রােত যেন বাঁধভাঙ্গা। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে তারা জড়ো হয়ে আছে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায়। তবে প্রশাসন এখন কড়াকড়ি আরোপ করেছে। রোহিঙ্গা পারাপার বন্ধে কঠোর অবস্থান এখন অনেকটাই দৃশ্যমান। সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে রোহিঙ্গা বহনকারী ট্রলার, নৌকার মালিক ও মাঝিমাল্লাকে গ্রেফতারের। রোহিঙ্গা আনার নেপথ্যে কোন এনজিও কিংবা জনপ্রতিনিধির ভূমিকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে, খানিকটা কড়াকড়ির মধ্যেও রোহিঙ্গাদের আগমন অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ শুক্রবারও শাহপরীরদ্বীপ দিয়ে এসেছে সহ¯্রাধিক রোহিঙ্গা। অনেকক্ষণ আটকে রাখার পর শেষ পর্যন্ত তাদের ঢুকতে দেয়া হয়েছে। অনেকেই সাঁতরে এবং বিভিন্ন কৌশলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। এখন যারা আসছে তারা নিজেরাও স্বীকার করছেন যে, রাখাইনে এখন নির্যাতন বন্ধ। কিন্তু খাদ্যভাবসহ নানা প্রতিকূল অবস্থার কারণে তারা সেখানে থাকতে পারছেন না। তাছাড়া অনেকের স্বজন আগেই বাংলাদেশে পাড়ি দিয়েছে। ওপারের কষ্টকর জীবনের বিপরীতে এপারে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এবং সাহায্যনির্ভর জীবন তাদের হাতছানি দিচ্ছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার এবং দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার নানা উদ্যোগের খবর চলে যাচ্ছে ওপারে। সে কারণে বাংলাদেশকে তারা বসবাসের জন্য অনুকূল ভাবতে শুরু করেছে।

টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ ॥ রোহিঙ্গা পারাপার নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। কেননা, ওই রুটে নৌযান চলাচলের সুবাদে অনেক মাঝিমাল্লা রোহিঙ্গাদের পরিবহনের সুযোগ নিচ্ছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসকের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। টেকনাফ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, ইতোপূর্বে গৃহীত এ সিদ্ধান্ত পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। নৌযান চলাচল পুনরায় শুরুর ব্যাপারে কোন নির্দেশনা এখনও আসেনি। সে নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এ রুটে নৌকা ও ট্রলার চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে পর্যটন মওসুম চলে আসায় এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। এদিকে, নৌযান চলাচলের ওপর কড়াকড়ি থাকলেও রাখাইন প্রদেশ থেকে অনেক রোহিঙ্গাই এদেশে আসছে ভেলা ভাসিয়ে এবং নানা কৌশলে।

রোহিঙ্গাতে এখন শাহপরীরদ্বীপ ও সাবরাং দিয়ে ॥ প্রশাসন ও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী রোহিঙ্গারা এখন সবচেয়ে বেশি আসছে টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ এবং সাবরাং হয়ে। শাহপরীরদ্বীপের নয়াপাড়া দিয়ে একটিসহ মোট তিনটি ভেলায় ২০০ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে বৃহস্পতি ও শুক্রবার। অনুপ্রবেশকারীর মধ্যে ১০৪ শিশু, ৬০ নারী ও ৩৬ পুরুষ রয়েছে। টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বুধ থেকে শুক্রবার পর্যন্ত নতুন করে ৮৫২রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। সেনাবাহিনী এদের উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিয়েছে। ভেলায় অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গারা বলেন, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসার জন্য নৌকা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তারা প্লাস্টিকের তৈরি তেলের কন্টেনার, কাঠের তক্তা ও রশি দিয়ে ভেলা বানিয়ে পার হয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তে অপেক্ষমাণ হাজারো রোহিঙ্গা ১৫ থেকে ২০টি নতুন ভেলা তৈরি করছে। একেকটি ভেলায় এত বেশি রোহিঙ্গা বোঝাই হচ্ছে যে তা ভাসমান হওয়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এসএম আরিফুল ইসলাম বলেন, শাহপরীরদ্বীপে দুটি ও সাবরাংয়ে একটিসহ মোট তিনটি ভেলায় নারী-শিশুসহ ১৮০ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। ঘটনার শুরু থেকে কিছু নৌকার মালিক, মাঝি ও দালালের যোগসাজশে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গা পারাপার করতে গিয়ে রোহিঙ্গাবোঝাই নৌকাডুবিতে নাফনদী ও সাগর তীরবর্তী এলাকা থেকে দুই শতাধিক শিশু, নারী ও পুরুষের লাশ উদ্ধার করা হয়। কড়াকড়ি আরোপিত হওয়ায় রোহিঙ্গারা রাতের আঁধারে নৌকায় বাংলাদেশে আসতে থাকে। গত কয়েকদিনে নৌকা মালিক ও মাঝি-মাল্লার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। এখন নৌকা না পাওয়ায় রোহিঙ্গারা ভেলার আশ্রয় নিয়েছে। মানবিক বিবেচনায় ভেসে আসা রোহিঙ্গাদের জড়ো করে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে উখিয়ার বালুখালীতে পাঠানো হচ্ছে। সাবরাং হারিয়াখালী সেনা ত্রাণ কেন্দ্রে জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি ও টেকনাফ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আলমগীর কবির জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ১৬০পরিবারের ৭৩১ রোহিঙ্গাকে ত্রাণসামগ্রী দিয়ে উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যা¤েপ পাঠানো হয়েছে।

নাফ নদীর বালুচরে অপেক্ষমাণ ১০ হাজার রোহিঙ্গা

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় রাখাইনে নাফ নদীর বালুচরে অবস্থান করছে অন্তত ১০ হাজার রোহিঙ্গা। নৌকা চলাচলে কড়াকড়ি আরোপিত হওয়ায় তাদের ভরসা এখন নিজেদের তৈরি ভেলা। আটকে থাকা রোহিঙ্গাদের খাদ্য, জ্বালানি ও পানিসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছে একটি সংস্থা। শুধু তাই নয়, কাঁটাতার অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করার চেষ্টাও রয়েছে। রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, তারা যেন আর নিজ গ্রামে ফিরতে না পারে তার জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট উগ্র মগরা। তবে তাদের এ তথ্যে আস্থা রাখছেন না টেকনাফ-উখিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তারা মনে করছেন, এসব অজুহাত মূলত এপারে অনুপ্রবেশের জন্য সহানুভূতি আদায় করা।

রোহিঙ্গা পারাপারে কঠোর ব্যবস্থা ॥ নাফ নদী ও সাগরপথে রোহিঙ্গা প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কক্সবাজার প্রশাসন। রোহিঙ্গা আনলেই ট্রলার মালিক ও মাঝিমাল্লাকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা বহনের সঙ্গে কোন এনজিও, জনপ্রতিনিধি বা সরকারী কর্মকর্তা জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে প্রশাসন। নৌ ও সাগরপথে রোহিঙ্গাবোঝাই ট্রলারডুবি রোধে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার রাতে আয়োজিত এক যৌথ জরুরী সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ আলী হোসেনের সভাপতিত্বে এ সভায় বক্তব্য রাখেন- ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মানজুরুল হাসান খান, পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেন, কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, কক্সবাজার জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান প্রমুখ। রোহিঙ্গা সেলের প্রধান ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খালেদ মাহমুদ, টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক, টেকনাফ থানার ওসি মাইন উদ্দিন খান, টেকনাফ পৌরসভার মেয়র মোঃ ইসলাম, কোস্টগার্ডের প্রতিনিধি রোকনুজ্জামান, জনপ্রতিনিধি, নৌকা এবং ট্রলার মালিক সমিতির নেতা এবং বিভিন্ন সরকারী দফতরের কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

কক্সবাজারের হিল ডাউন সার্কিট হাউসে আয়োজিত যৌথ জরুরী সভায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ আলী হোসেন বলেন, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন সাড়ে ৬ লাখ ছাড়িয়েছে। কিন্তু, এরপরও রোহিঙ্গা স্রোত ঠেকানো যাচ্ছে না। স্থলপথে রোহিঙ্গা আসা বন্ধ হলেও নৌপথে রোহিঙ্গা আসছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের একশ্রেণীর নৌকার মালিক ও মাঝি-মাল্লা সিন্ডিকেট করে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা নিয়ে আসছে। নৌকায় নাফ নদী বা উত্তাল সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকাডুবিতে এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা অন্তত ২শ’। সামগ্রিক দিক বিবেচনায় রোহিঙ্গা বোঝাই জলযান চলার ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। জরুরী এ সভায় নাফ নদীর মোহনায় কোস্টগার্ড ও বিজিবির টহল বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়।

লক্ষাধিক পিস ইয়াবাসহ রোহিঙ্গা আটক ॥ টেকনাফে সাড়ে ৩ কোটি টাকা মূল্যের ১ লাখ ১৩ হাজার ৯৩০ পিস ইয়াবাসহ এক রোহিঙ্গাকে আটক করেছে বিজিবি। এ সময় ইয়াবা চোরাচালানে ব্যবহৃত একটি নৌকাও জব্দ করা হয়েছে। ধৃত রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু পেরামপ্রু গ্রামের বাসিন্দা মৃত জামাল হোসেনের পুত্র মোঃ সর্দার হোসেন। সে আমদানি নিষিদ্ধ ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রির উদ্দেশে অবৈধভাবে বাংলাদেশে নিয়ে আসছিল। বৃহস্পতিবার রাতে টেকনাফের নেটংপাড়া রেস্ট হাউজ বরাবর বরফকলের পার্শ্ববর্তী কেওড়া বাগান এলাকায় বিজিবি এ অভিযান চালায়।

নাফ নদী পথে এলো আরও ১০ ভেলা ॥ বিভিন্ন পয়েন্টে কড়াকড়ির মধ্যে রোহিঙ্গারাও বেছে নিচ্ছে নানা কৌশল। রাখাইন রাজ্যের মংডু সীমান্তের দংখালী থেকে রোহিঙ্গাবোঝাই হয়ে এসেছে আরও ১০টি ভেলা। প্রথমে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও জুমার নামাজের পর তারা টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপে মিস্ত্রিপাড়া ও জালিয়াপাড়া পয়েন্ট এবং সাবরাং নয়াপাড়া পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ করে। এ দশ ভেলায় আসে সহ¯্রাধিক রোহিঙ্গা। ভেলাগুলোতে ভেসে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার দলে থাকা রাখাইনের চিহ্নিত একাধিক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীও রয়েছে বলে ওপার থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার রাতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নাফ নদীতে নৌকা-ট্রলার নিষিদ্ধকরণের ব্যবস্থা গ্রহণের খবর পেয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে তাড়াহুড়া করে ভেলা ভাসিয়ে দিয়েছে।

নৌকা বোঝাই রোহিঙ্গা আটক ॥ উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইমামের ডেইল পয়েন্ট থেকে শতাধিক রোহিঙ্গা বহনকারী একটি নৌকা ও মাঝিকে আটক করেছে পুলিশ। বঙ্গোপসাগরের ইনানী সমুদ্র উপকূল হয়ে ওসব রোহিঙ্গাকে কূলে ভিড়িয়ে দিচ্ছিল দালাল চক্র। শুক্রবার বিকেলে ওই নৌকাসহ রোহিঙ্গাদের আটক করা হয়। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ আফরুজুর হক টুটুল বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মিয়ানমার থেকে শতাধিক রোহিঙ্গা নিয়ে জালিয়াপালং ইমামের ডেইল পয়েন্ট দিয়ে নৌকাটি কূলে ভেড়াবার খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। অভিযানে নৌকাসহ মাঝিকে আটক করা হয়। ওই নৌকায় আসা রোহিঙ্গাদের পুলিশী জিম্মায় রাখা হয়েছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: