১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

সাবধান ছিনতাই ডাকাতি, চাঁদাবাজিতে ভুয়া ডিবি পুলিশ


শংকর কুমার দে ॥ সাবধান! ভুয়া ডিবি পুলিশের উৎপাত বেড়ে গেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভুয়া ডিবি পুলিশ ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, প্রতারণাসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। ভুয়া ডিবি পুলিশের সঙ্গে সাদা পোশাকের ডিবি, র‌্যাব ও পুলিশ পরিচয়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে এ ধরনের অপরাধ বন্ধে বিধিনিষেধ করা আছে। পুলিশ সদর দফতর ও ডিএমপি সদর দফতরের এ ধরনের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই সাদা পোশাকে কখনও ডিবি পুলিশ, কখনও র‌্যাব আবার কখনও পুলিশ পরিচয়ে সহজ-সরল নিরীহ-নিরপরাধ মানুষজনের সঙ্গে প্রতারণাপূর্বক অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। মানুষজন বুঝতেই পারছেন না কোনটা আসল ডিবি পুলিশ আর কোনটা নকল ডিবি পুলিশ। নকল ডিবি পুলিশ আসল ডিবি পুলিশ সেজে দিব্যি ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, প্রতারণা করে বেড়াচ্ছে। এ ধরনের সাদা পোশাকের ডিবি পুলিশ পরিচয়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে সাবধান ও সতর্ক থাকার জন্য নির্দেশ দিয়ে ভুয়া ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর ও ডিএমপি সদর দফতর। পুলিশ সদর দফতর সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, বুধবার রাজধানীর কমলাপুরের রবি হেয়ার ড্রেসার সেলুনের সামনে অভিযান চালিয়ে ভুয়া ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে অস্ত্র-গুলিসহ আটজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। একই দিন সকালে আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকা থেকে শিল্প পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মকবুলকে আটক করেছে পুলিশ। মকবুলের নেতৃত্বে এক ব্যক্তিকে জিম্মি করে তার মায়ের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাত করা হয়েছিল। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়। তার সহযোগী আরও তিন ভুয়া ডিবি পুলিশকে আটক করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। কিছুদিন আগেও রাজধানীর রামপুরা থেকে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ভুয়া ডিবি পুলিশ পরিচয়ের ১৬ জনকে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে অপরাধী চক্র ছাড়াও এক ধরনের অপরাধী মাঠে নামার খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান শুরু করেছে। ভুয়া ডিবি পুলিশের প্রতারণা ঠেকাতে ইতোমধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযানে নেমেছে।

পুলিশের সদর দফতরের উর্ধতন একাধিক কর্মকর্তার এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তারা বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি করার জন্য দাবড়ে বেড়াচ্ছে ভুয়া ডিবি পুলিশ। তাদের কাছে থাকে ডিবি লেখা জ্যাকেট, ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাফ, সিগন্যাল লাইটসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহৃত সরঞ্জাম। প্রথমে তারা ডিবি পুলিশ পরিচয় দেয়। তার পরই হয়ে যায় ডাকাত দল, ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসী। বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করে বেড়ায় ভুয়া ডিবি পুলিশ। রাজধানী ঢাকাসহ ভুয়া ডিবি পুলিশের অপরাধ প্রবণতার উৎপাত বেড়ে যাওয়ার খবর পেয়ে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

বুধবার রাজধানীতে ভুয়া ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে অস্ত্র-গুলিসহ আটজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেফতারকৃতরা হলোÑ হাজী মোজাম্মেল হোসেন (৪২), নূরুল ইসলাম (২৯), মোঃ হানিফ (৩৫), মোঃ মাসুম (২৪), মোঃ তানভীর (২৪), শাহ আলম (২৬), বাবুল (৩২) ও মোঃ সোহেল (২৫)। বুধবার সন্ধ্যায় ডিবি (পূর্ব) বিভাগের মতিঝিল জোনাল টিম উত্তর কমলাপুরের রবি হেয়ার ড্রেসার সেলুনের সামনে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা মাইক্রোবাস নিয়ে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শোরুম ও ব্যাংকে ডাকতি করত বলে স্বীকার করেছে। কমলাপুরের রবি হেয়ার ড্রেসার সেলুনের সামনে গাড়ি থামিয়ে তাদের দেহ তল্লাশি করে একটি পিস্তল, এক রাউন্ড গুলি, একটি ওয়াকিটকি, এক জোড়া হ্যান্ডকাফ, ডিবি পুলিশের পোশাক ও দুটি বেতের লাঠি উদ্ধার করা হয়। সেই সঙ্গে ডাকাতিতে ব্যবহৃত একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে শাহজাহানপুর থানায় অস্ত্র ও ভুয়া ডিবি পুলিশ সেজে ডাকাতি প্রস্তুতির জন্য পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

অপরদিকে একই দিন সকালে আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকা থেকে শিল্প পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মকবুলকে আটক করেছে পুলিশ। মকবুলের নেতৃত্বে এক ব্যক্তিকে জিম্মি করে তার মায়ের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাত করা হয়েছিল। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়। তার সহযোগী আরও তিন ভুয়া ডিবি পুলিশকে আটক করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। এ ঘটনায় মকবুলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এএসআই মককুলের বিরুদ্ধে বিভাগীয়ভাবে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

গত ২৫ অক্টোবর ভোরে টেকনাফে ব্যবসায়ী আব্দুল গফুরকে জিম্মি করে ১৭ লাখ টাকা আদায় করার পর একটি মাইক্রোবাসে কক্সবাজারে যাওয়ার পথে চেকপোস্টে তল্লাশির সময় টাকাসহ সাত পুলিশ সদস্যকে আটক করেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এ সময় ডিবি পুলিশের এক এসআই পালিয়ে যান। উদ্ধার করা টাকা ওই ব্যবসায়ীকে ফেরত দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় জেলা পুলিশ তাদের সাময়িক বরখাস্ত করে এবং পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ডিবি পুলিশের অভিযুক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করার পর তাদের কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

গত ১৯ মে রাতে রাজধানীর রামপুরা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় ১৬ ভুয়া ডিবি পুলিশকে। গ্রেফতারকৃতরা হলো মোঃ জুয়েল রানা, মোঃ ইয়াসিন, মোঃ বাদল, মোঃ মোমেন আলী, মোঃ শহিদুল ইসলাম, মোঃ ফিরোজ, সৈয়দ মনিরুজ্জামান, মোহাম্মদ আলী ও মোঃ সবুজ। তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশী পিস্তল, একটি ম্যাগজিন, দুই রাউন্ড গুলি, দুটি চাপাতি, চারটি ছুরি, একটি ওয়াকিটকি, তিনটি ডিবি জ্যাকেট, দুটি হ্যান্ডকাফ, দুটি বেতের লাঠি, একটি ব্যাগ ও দুটি ডিবি স্টিকার উদ্ধার করা হয় এবং তাদের ব্যবহৃত দুটি কার ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়। ডিবি পুলিশ পরিচয়ের সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সদস্যদের গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে ডিবি পুলিশ।

ডাকাত দলের সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, তারা ডিবি পরিচয়ে বাসাবাড়িতে ঢুকে ডাকাতি করে আর রাস্তায় বাস, প্রাইভেটকার থামিয়ে মালামাল লুট করে। এছাড়াও মাইক্রোবাসযোগে ব্যাংকের সামনে অবস্থান নিয়ে গ্রাহক বড় অঙ্কের টাকা ব্যাংক থেকে উঠিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় ডিবি পরিচয় দিয়ে তাদের আটক করে। পরে সুযোগ বুঝে টাকা লুট করে নিয়ে যায় তারা। ডিবি পরিচয়ে ডাকাতি করার জন্য এই সংঘবদ্ধ দলের সদস্যরা ডিবি পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে অপরাধীরা ওয়াকিটকি সেট ব্যবহার করে ডাকাতি, ছিনতাই করছে। চাকরিচ্যুত অনেক পুলিশ সদস্যসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। রাজধানীর ধানম-ি, মিরপুর, রামপুরা ও বিমানবন্দর থানায় এসব ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করার পর চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীতে শতাধিক প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান ওয়্যারলেস সেটের আদলে ওয়াকিটকি সেট ব্যবহার করছে। তারা বিটিআরসি থেকে অনুমতি নিয়ে ফ্রিকুয়েন্সি ব্যবহার করছে। আর এ সুযোগে সংঘবদ্ধ অপরাধীরা ওয়াকিটকি সেট সংগ্রহ করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করছে। সাধারণ মানুষ ওয়াকিটকি সেট হাতে দেখলে মনে করে সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরিবহন থেকে শুরু করে আবাসিক হোটেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এখন ওয়াকিটকি সেট ব্যবহার হচ্ছে। এর মধ্যে সরকারবিরোধী অনেক রাজনৈতিক নেতার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্নভাবে বিটিআরসির অনুমতি নিয়ে ওয়াকিটকি ব্যবহার করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তারা অবৈধভাবে ওয়াকিটকি সেট ব্যবহার করে অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। এ সুযোগে তারা বাসাবাড়িতে ঢুকে নানাভাবে ভয় দেখিয়ে মালামাল লুট করে। প্রাইভেট সেক্টরের নিরাপত্তায় যাদের নিয়োগ দেয়া হয় তাদের মধ্যে অনেকেই অবসরপ্রাপ্ত বা চাকরিচ্যুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। যার কারণে অনেক সময় অপরাধের কাজে ওয়াকিটকি সেটের অপব্যহার হচ্ছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি মিডিয়া মাসুদুর রহমান বলেছেন, ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ওয়াকিটকি সেট ব্যবহার করে ডাকাতি করতে যাওয়া অনেক অপরাধীকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ওয়াকিটকি সেট, হ্যান্ডকাফসহ অন্য মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। ডিবি পরিচয়ে সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: