২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

প্রান্তিক সুরের টানে জনারণ্য লোকসঙ্গীত উৎসব


প্রান্তিক সুরের টানে জনারণ্য লোকসঙ্গীত উৎসব

মনোয়ার হোসেন ॥ গান শোনার তাগিদে জড়ো হওয়া মানুষের বিপুল সমাগম। সেই সঙ্গীতানুরাগীদের পদচারণায় বিশাল প্রান্তরটাকেও যেন ছোট মনে হয়। মাঠে পা ফেললেই শরীরের সঙ্গে শরীর লেগে যায়। প্রশস্ত পরিসরও হয়ে ওঠে অপ্রশস্ত। সন্ধ্যা থেকে রাত গড়াতে উৎসব আঙিনা বনানীর আর্মি স্টেডিয়াম পরিণত হয় জনারণ্যে। তবে তাতে কিবা আসে-যায় সুররসিকদের। ঝক্কি-ঝামেলার চেয়ে আনন্দটাই হয়ে ওঠে মুখ্য। শেকড়ের সঙ্গীতে আত্মার প্রশান্তি খুঁজে নেয় তারা। লোকগানের মরমি বাণীতে হৃদয়ে বয়ে যায় উচ্ছ্বাস-আনন্দ। সেই ভাললাগার দৃশ্যকাব্য দারুণভাবে নজরে পড়ে শুক্রবার ছুটির দিনে। লোকজ সুরের মোহময়তায় রঙ্গিলা রূপে ধরা দেয় ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসবের দ্বিতীয় রজনী। এদিন শ্রোতা শুনতে পেয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের লোকগীতি।

দ্বিতীয় দিনের উৎসবে অনেক ভাললাগার মাঝেও পৃথকভাবে নজর কেড়েছে ভারতের পাঞ্জাবের জলন্ধর শহরের লোকগানের দল নুরান সিস্টার্স। রাত ১১টার পর মঞ্চে আসে শেকড়ের সুরে সমর্পিত দুই বোন জ্যোতি নুরান ও সুলতানা নুরান। ভগ্নিদ্বয়ের পরিবেশনা ছাপিয়ে যায় সুররসিকদের প্রত্যাশাকে। খর¯্রােতা নদীর মতো চড়া কণ্ঠের গানে গানে শিহরিত হয় উৎসব উপভোগকারীর হৃদয়তন্ত্রী। গানের তালে কেউ বা ঠোঁট মেলায়, সেই তালে আবার নেচে উঠল অনেকেই। সুফি ধারায় প্রভাবিত দুই শিল্পী রাঙিয়ে দিলেন উৎসবের দ্বিতীয় রাতটি। জ্যোতি ও সুলতানা পরিবেশিত গানের শিরোনাম ছিল ‘ভারি যায়ু রে’, ‘ইশকে আওয়াল্লা’, ‘কুল্লিনি ফাকিরদি’, ‘পার্দে মে র‌্যাহনে দো’ ও মিরজায়া ছবির ‘পাটাকা গুড্ডি’সহ বেশ কিছু গান। দুই গানের সুরে শেষ হয় এদিনের উৎসব।

হেমন্তের বিকেল গড়ানো সন্ধ্যায় সূচনা হয় সান কমিউনিকেশন্স আয়োজিত মেরিল নিবেদিত উৎসব। প্রথম পরিবেশনাটি উপস্থাপন করে স্বদেশের লোকগানের দল বাউলা। প্রিয়জনের প্রতি আকুলতা বর্ণিত হয় দলটির প্রথম গানে। গেয়ে শোনায় ‘ঘরে মন বসে নারে বন্ধু/আমারে ছাড়িয়া রে বন্ধু যাইওনা/তোমার লাগি পরান কান্দে ...’। প্রথম পরিবেশনাতেই করতালি ঝরে পড়ে শ্রোতার। দলটির দ্বিতীয় পরিবেশনা ছিল ‘তোমারে আমি পাইতে পারি’। তৃতীয় গানের শিরোনাম ছিল ‘রবে না এ ধন/ জীবন যৌবন’। চতুর্থ গানের শিরোনাম ‘এত যে নিঠুর বন্ধু জানা ছিল না’। প্রায় আধঘণ্টা তারা মাতিয়ে রাখে দর্শক-শ্রোতাকে। তারুণ্যনির্ভর দলটির পাঁচ সদস্য হলেন প্রকাশ, বিপ্লব মৃণাল, আর জয়, সায়ন্তা ও বিকাশ।

দ্বিতীয় পরিবেশনা উপস্থাপন করেন কেরানীগঞ্জ থেকে উঠে আসা প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী আরিফ দেওয়ান। পাঁচ শতাধিক লোকগানের রচয়িতা এ শিল্পী শুনিয়েছেন স্বরচিত গান। তেরো সদস্যের দলের নেতৃত্ব দেয়া শিল্পী প্রথমেই কণ্ঠে তুলে নেন দেহতত্ত্বের ভজন। এর পর একে একে তিনি পরিবেশন করেন ‘ঘুড্ডি কে বানাইলো রে’, মারফতি গান ‘যার কপালে যা লেইখাছে রে’, ‘হায় পিরিত বুঝলো না রীতি’সহ নানা ধাঁচের লোকগীতি। সব শেষে দলটির কণ্ঠে গীত হয় ভক্তিমূলক গান ‘শত জনমে বিরহ গাঁথা’।

তৃতীয় পরিবেশনায় শ্রোতা শুনতে পায় হিমালয় কন্যা নেপালের আদি সুর। মঞ্চে আসে দেশটির বিশ্বখ্যাত লোকগানের দল কুটুম্বা। যন্ত্রসঙ্গীতনির্ভর দলটির বিচিত্র বাদ্যযন্ত্রের সুরেলা শব্দধ্বনি মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে শ্রোতাকে। অনবদ্য পরিবেশনায় ব্যবহৃত হয় নেপালে ঐতিহ্যবাহী নানা বাদ্যযন্ত্র বাঁশের বাঁশি, সারেঙ্গী, মাদল, টুঙ্গা, ঢোল, ঝামটা,আরবাজো, ভুসায়া, চাল, চাবরাঙ ও চাসায়া। ভিন দেশের বাঁশির সুর দাগ কেটে যায় বাংলাদেশের শ্রোতার হৃদয়ে। পরিবেশনার মাঝে ছয় সদস্যের দলপ্রধান ভাঙ্গা বাংলায় বলে ওঠেন ‘ঢাকা কেমন আছো?’। প্রতি উত্তরে ভাললাগার প্রকাশে ঝরে পড়ে গানপ্রেমীদের করতালি। শেষ পরিবেশনায় নেপালের বাদ্যযন্ত্রে উঠে আসে বাংলা গানের ‘আমি তো মরেই যাব, চলেই যাব, রেখে যাব সবই’।

নেপালী সুর মূর্ছনা থামতেই মঞ্চে আসে পাকিস্তানের সুফি রক ঘরানার লোকসঙ্গীত দল মিকাল হাসান ব্যান্ড। পপ, রক, সোল ও ব্ল্যাক রকের সমন্বয়ে পরিবেশনা করা এ দলটি ১৭ বছর আগে লাহোরে প্রতিষ্ঠিত পায়। ভাঙ্গা-গড়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের শিল্পীর সমন্বয়ে গঠিত দলে থিতু হয়েছেন শিল্পী শর্মিষ্ঠা চট্টোপাধ্যায়, বাঁশিশিল্পী আহসান পাপু, বেজ গিটারিস্ট শেলভন ডি সিলভা ও ড্রামার গিনো ব্যাংকস। সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ দলটি পরিবেশন করে সুফিয়ানা কাফি ‘চল বুলিয়া’, পাকিস্তানী কালাম ‘মিলান্দার আশিকি’ ও ‘সায়ান’। বাংলা ও উর্দুর মিশ্রণে গেয়ে শোনায় ‘তুমি বিনে দয়াল বন্ধু আর পাবো না’ ও ‘তোরে বিনে মোরে চ্যায়েন না আইয়ে’।

নেপাল ও পাকিস্তানী শিল্পীর পরিবেশনার পর লোকগীতির আন্তর্জাতিক এ আসরে আবার বেজে ওঠে দেশের সুর। মঞ্চে আসে মানিকগঞ্জের শিল্পী শাহজাহান মুন্সি। দৃষ্টিহীন শিল্পীর মায়াবি কণ্ঠে আলোড়িত হয় অগণন শ্রোতার অন্তর। ঢোল-বাঁশি ও দোতরাসহযোগে মারফতি ঘরানার সঙ্গে বাউল আঙ্গিকে তার পরিবেশিত গানের শিরোনাম ‘তুমি আছো বলে দায়াল’ ‘একি প্রেমের প্রতিদান’ ‘একবার এসে প্রাণবন্ধু দেখা দাও মোরে’।

মেরিল নিবেদিত ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসবে সহযোগিতা করছে ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড। উৎসবস্থলে যেতে না পারা শ্রোতারা ফেসবুকের ‘ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্ট’ পেজ এবং উৎসবের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে পুরো অনুষ্ঠানটি লাইভ দেখার সুযোগ রয়েছে।

সমাপনী রাতের উৎসবসূচী ॥ আজ শনিবার শেষ হবে তিন দিনের ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসব। সমাপনী রজনীতেও থাকছে দারুণ সব পরিবেশনা। সন্ধ্যা ছয়টায় শুরুতেই বাংলাদেশের প্রখ্যাত দুই লোকশিল্পী শাহ আলম সরকার ও আলেয়া বেগমের পরিবেশনা। তিনি মঞ্চ থেকে নামতেই হাজির হবেন আরেক বাংলাদেশী লোকসঙ্গীত শিল্পী শাহনাজ বেলী। রাতের বাকি তিন পরিবেশনা উপস্থাপন করবেন বিশ্বের তিন প্রান্তের লোকগীতি শিল্পীরা। এ তালিকায় আছে মধ্যপ্রাচ্যের ইরানের লোকগানের দল রাস্তাক, ভারতের শান্তিনিকেতনের শিল্পী বাসুদেব দাস বাউল ও আফ্রিকার দেশ মালির লোকগানের দল তিনারিওয়েন। বিশ্বসঙ্গীতের মর্যাদাপূর্ণ গ্র্যামিজয়ী তিনারিওয়েন ব্যান্ডের পরিবেশনা দিয়ে শেষ হবে উৎসব।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: