২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সিডনির মেলব্যাগ ॥ রক্তাক্ত নবেম্বর ॥ শেখ হাসিনার কাছেই বিতর্কের সমাধান


অতীত যদি শক্তি না হয় তো সে অতীত নিয়ে এত কচলানোর কি আছে? আজ বাংলাদেশ উন্নতির ধারায় ধাবমান। সেখানে ১৯৭৫ সালের অশুভ নবেম্বরকে হাইলাইট করে যারা ধান্দা করছেন তাদের বলি, অতীতে যার যা আবদান সে তা পাবেনই। কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না, পারবেও না। কিন্তু জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ, কর্নেল তাহেরের নাম এনে তারপর কৌশলে ভারত বিরোধিতা জাগিয়ে মানুষকে আর বিভ্রান্ত করবেন না। মানুষের হাতে এখন এত সময় নেই আপনাদের মনগড়া ইতিহাস জানার। কে না জানে সে সময়টায় বাংলাদেশকে মূলত অকার্যকর একটি রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্যই মূলত এগুলো করা হয়েছিল। যার প্রথম আঘাত আসে আগস্টের পনেরো তারিখে। তারপর নবেম্বর পরিণত হয়েছিল মৃত্যুকূপে। দেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকের উদ্দেশ্য আমরা বুঝি। তাদের কেউ না জিয়া, না খালেদ মোশাররফ, না তাহেরের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, না জানতেন আসলে কি হচ্ছে। অথচ বানোয়াট মনগড়া স্পেকুলেশনে দেশের তরুণ-তরুণীদের মাথা চিবিয়ে খাওয়ার কাজ বন্ধ করা উচিত। কারণ এতে দেশের কোন লাভ নেই।

এটা মানি অতীত অস্বীকার করা যাবে না। দরকারও নেই। আমাদের অতীত এখনও বহু দেশের চাইতে ভাল। সামরিক বাহিনীর লোকেরা গদির লোভে বা দেশ বাঁচানোর নামে যা যা করেছিলেন সেটা ইতিহাসের একটা অংশ বটে। সবটা নয়। সে কারণে শেষ পর্যন্ত মানুষের জয় হয়েছিল এ দেশে। কে বীর আর কে খলনায়ক সে কাহিনী ইতিহাসের চাইতে ভাল কেউ জানে না। মাঝখান থেকে আমরা হারিয়েছিলাম বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। শেখ হাসিনা সরকারে এসে শক্ত হয়ে বসার আগে আমরা তাদের হারানো ব্যতীত একজন রাজাকারেরও টিকি স্পর্শ করতে পারিনি। সেটা ভুলে যান কেন আপনারা? যদি সত্যি আমাদের উদ্দেশ্য হয় মুক্ত উদার সমাজ আর কলঙ্কহীন ইতিহাস শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞতার বিকল্প আছে?

ভাল করে চেয়ে দেখুন কোন বিদেশী শক্তি সেদিন মাঠে ছিল না। তাদের ভূমিকা বা খেলা ছিল নেপথ্যে। আর সুযোগ দিয়েছিলাম আমরাই। মোশতাকের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর পর যে সোনার দেশ বা শোষণ মুক্তি তার মেয়াদ ছিল ৮১ দিন। এরপরই লেগে গেল গদি নিয়ে কাড়াকাড়ি। সে লড়াই এত অসম আর এত ভাতৃঘাতী তারপরও আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বড়াই করে চলেছে কে বড়? জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ বা কর্নেল তাহের কেউ বড় আর ছোট হলে এখন কি লাভ? না এর কোন মূল্য আছে আর? যাদের পরিবার এতিম হয়েছিল, যাদের সন্তানরা বাবা হারিয়েছিল, যাদের স্ত্রীরা স্বামীহারা হয়েছিলেন তাদের জীবনে কি ফিরে আসবে সেসব সোনালি দিন? আসবে না জেনেও আমরা সেই নারকীয় দিনগুলো নিয়ে মাতম করি। বাংলাদেশের নির্মোহ ইতিহাসে পালাবদলের বাইরে এই দিনগুলো আসলেই ভয়াবহ। ঢাকা স্টেডিয়ামে লিফলেট বিতরণ করা গণবাহিনীর সদস্যরা যেমন জিয়াউর রহমানের হাত শক্তিশালী করার দায় এড়াতে পারবেন না, তেমনি তাকে মুক্ত করার দায়ও তাদের। জাসদের সঙ্গে যে স্বপ্ন ও বিপ্লবের যোগ সেটা সেদিনই কেটে গিয়েছিল। কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের কাছে মাথার খুলি উড়ে যাওয়ার পরও মুক্তিযুদ্ধে বেঁচে যাওয়া খালেদ মোশাররফের নিথর দেহ বলছিল, হায় দেশ এই কি বীরের পরিণতি? এত বছর পর আমার মতো সেদিনের যৌবনে পা দেয়া মানুষ কিছুতেই ফিরতে চাই না সে বাস্তবতায়।

আজকের বাংলাদেশ বহু দিক থেকে ফলে-ফুলে ভরে ওঠা এক ভূখ-। তার গায়ে এখনও দুশমনের বিষাক্ত নিঃশ্বাস। কিন্তু তার জনগণ কখনও হাল ছেড়ে দেয়নি। এত প্ররোচনা এত উন্মাদনার পরও বাংলাদেশ বিস্ময় জাগিয়ে এগিয়ে চলেছে। জাতীয় ঐক্যের এত ঘাটতি আর কোন দেশে নেই। সেটা থাকলে আমরা যে কোন প্রতিবেশী, পাকিস্তান এসব দেশের চাইতে আরও অনেক এগিয়ে যেতে পারতাম। এজন্যই একটি জাতীয় সমঝোতার প্রয়োজন। সেটি আমাদের জীবদ্দশায় দেখব কি-না জানি না। এটুকু বলি, যাদের জন্ম বেয়নটে, যাদের রাজনীতির পাঠশালা অগণতন্ত্রে ভাগ্যক্রমে আপনারা জনসমর্থন পেলেও এসব ভুলে যাবেন না। রাজনৈতিক দল আর রাজনীতিই বিপদ থেকে উদ্ধার করে দেশকে এই জায়গায় এনে দিয়েছে। এখন সময় রাজনীতিকে শুদ্ধ করার। সবার মত আর পথ মেনে সরকার ও সমাজ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার। সেজন্য অতীতকে সম্মানের জায়গায় রেখে তা নিয়ে বচসা না করে তারুণ্যকে পথ দেখানোর জন্য ঝগড়া বন্ধ করা উচিত।

আমরা ভুলে যাব না কর্নেলদের কেউই জাতির পিতাকে বাঁচাতে যায়নি। তাদের কারও সময় হয়নি। অথচ সে রাতে প্রাণ দিয়েছিলেন জামিল সাহেব। কই তাকে নিয়ে তো কেউ কাব্য লেখেনি? কেউ তার বীরত্ব নিয়ে একটি নাটক করেছেন কোনদিন? কারও মনে হয়নি জাতির পিতার দুই যুবক ছেলে আর শিশু রাসেলকে নিয়ে একটি ছবি বানানোর। আজ এত বছর পর আমাদের শুনতে হচ্ছে যেসব কর্নেল জিয়াকে মুক্তি দিয়েছিল তারাই নাকি হিরো। অথচ আমরা এও শুনেছি, এদের মুখে ছিল বঙ্গবন্ধুর লাশ সাগরে ফেলে দেয়ার অশুভ হুঙ্কার। আমাদের ইতিহাসের বড় কলঙ্কিত মাস এই নবেম্বর। এ মাসে বাংলাদেশের অনেক দেশপ্রেমিক সেনা অফিসার প্রাণ দিয়েছেন। এই মাসে আমরা হারিয়েছি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অভিভাবক চার নেতাকে। এই মাসে আমাদের কাঁধে চেপে বসেছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নামে এক ভূত। আজও তাকে নামানো যায়নি। সেদিন জিয়াউর রহমানের গদি লাভ করা সম্ভব না হলে দেশের এই হাল হতো না। এত এত স্বাধীনতাবিরোধীদের জন্ম হতো না রাজনীতিতে। এত বছর ধরে সমাজ ও নীতি কলুষিত করতে পারত না তারা। আমাদের সৌভাগ্য বহুকাল পর আমরা বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে পেয়েছি আমাদের সঙ্গে, যিনি আমাদের উদ্ধার করছেন।

অথচ দেখুন তাঁকে সম্মান বা সমর্থন জানানোর বিপরীতে আজ এই নবেম্বরেও চলছে ছলনা আর ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। কি চাই আমরা? নতুন পাকি ধারণার দেশ? স্বাধীনতাবিরোধীদের ফিরিয়ে আনা? না মুক্তিযুদ্ধের আলোকে দেশ এগিয়ে নেয়া? তাহলে শেখ হাসিনার পাশে দঁাঁড়ানোর বিকল্প কোথায়? তাই হানাহানির বাইরে এক নতুন আলোয় পথ চলুক নবেম্বর।

রক্তাক্ত নবেম্বর স্মৃতি হয়ে থাকুক। তাকে সম্মান জানানোর নামে অসম্মানের দরকার নেই। বাংলাদেশ উন্নত শক্তিশালী আর আধুনিক দেশ হোক এটাই তারা চেয়েছিলেন। ফলে সে কাজেই মনোযোগী হোক রাজনীতি। তা না হলে আমরা বিদেহী আত্মার অভিশাপ এড়াতে পারব না। মায়া আর মমতার দেশে যত হত্যাকা- তার নিন্দা জানাই। আর যেন জীবনেও ফিরে না আসে এই অভিশাপ। জয় হোক বাংলাদেশের। জয় হোক মানুষের।