১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

‘ক্যারিয়ারের স্বার্থেই বিদেশ যেতে চাই’


বাংলাদেশের ফুটবলারদের মধ্যে যে ক’জন লাইফবয় সাবানের বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন, লাক্সমির বাবা রাজ্জাক তাদের একজন এ প্রসঙ্গে লাক্সমির অভিমত, ‘আমি যখন খুব ছোট, তখন এই এ্যাডটা দেখি আমাদের বাসার সামনেই পোস্টার লাগানো ছিল বন্ধু-বান্ধবী বা ক্লাসমেটদের কাছে কিছু বলতে হয়নি, তারাই আমাকে বলত, তোমার বাবা লাইফবয়ের এ্যাড করেছেন তখন গর্বে আমার মনটা ভরে যেত বাবার মতো মডেলিংয়ের অফার পেলে করবেন? না কারণ আমি মডেলিং করলে খেলার প্রতি ফোকাসটা সরে যাবে তাছাড়া এটা মা-বাবারও পছন্দ নয়

বাঁকা পথে হাঁটলে হয়ত কম পরিশ্রমে সাফল্য পাওয়া যায়, কিন্তু সে সাফল্যে কোন গৌরব নেই, নেই আত্মগরিমা আর কৃতিত্ব; বরং আছে হতাশা আর ধিক্কারের গ্লানি। ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি’ এ প্রবাদ মেনে যারা নিরলস নিরন্তর সুকঠিন সাধনা করে গেছেন, তাঁরাই হয়েছেন স্মরণীয়-বরণীয়। অনেক কষ্ট আর ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে, বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে যাঁরা সফলÑ তাঁদেরই একজন হতে অন্তঃপ্রাণ শাহ্ সাফিনা লাক্সমি। বাংলাদেশের মহিলা টেনিসে এ মুহূর্তে অন্যতম প্রতিভাবান খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত এ অষ্টদশী সুদর্শনা চান নিজেকে আরও শাণিত করতে। এজন্য বিদেশে গিয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ নিতে বদ্ধপরিকর তিনি। টেনিস থেকে অবসর নেয়ার পরও চান বিভিন্ন ভূমিকায় টেনিসের সঙ্গে থাকতে।

বাবা আবদুর রাজ্জাক ছিলেন দেশের শীর্ষ পর্যায়ে খেলা ফুটবলার। বর্তমানে বাফুফের লাইন্সেসধারী কোচ (সোমবার মালয়েশিয়া যান এএফসির ফিটনেস কোচিং কোর্স করার জন্য)। বাবার খেলা দেখেছেন কখনও? ‘না। বাবার খেলা কখনও দেখিনি। জন্মের পর যখন বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই ওনাকে কোচ হিসেবে দেখে আসছি।’ বাবার মতো ফুটবলার কেন হলেন না? বাংলাদেশের মহিলা ফুটবল তো এখন বেশ ভাল অবস্থানে। ‘আসলে আমার বাবা-চাচাদের খুবই পছন্দের খেলা টেনিস। কিন্তু তারা কখনও এই খেলাটি খেলতে পারেননি। এজন্যই তারা নিজেদের অপূর্ণ ইচ্ছাটা আমাকে দিয়ে পূরণ করাতে চেয়েছেন। বাবা সবসময়ই আমার অনুশীলন এবং ম্যাচ দেখতে আসে। জিতলে উৎসাহ আর হারলে সান্ত¦না দেন (মা রাবেয়া সুমা একটি ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত)।’

বাংলাদেশের ফুটবলারদের মধ্যে যে ক’জন লাইফবয় সাবানের বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন, লাক্সমির বাবা রাজ্জাক তাদের একজন। এ প্রসঙ্গে লাক্সমির অভিমত, ‘আমি যখন খুব ছোট, তখন এই এ্যাডটা দেখি। আমাদের বাসার সামনেই এ্যাডের পোস্টার লাগানো ছিল। বন্ধু-বান্ধবী বা ক্লাসমেটদের কাছে কিছু বলতে হয়নি, তারাই আমাকে বলতো, তোমার বাবা লাইফবয়ের এ্যাড করেছে না? তখন গর্বে আমার মনটা ভরে যেত।’ বাবার মতো মডেলিংয়ের অফার পেলে করবেন? ‘না। কারণ আমি মডেলিং করলে খেলার প্রতি ফোকাসটা সরে যাবে। তাছাড়া এটা মা-বাবারও পছন্দ নয়।’

ষোড়শ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে টেনিস খেলাটির উৎপত্তি। আজ পর্যন্ত খেলাটি বিশ্বের অনেক দেশেই চর্চিত ও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অন্যতম গ্ল্যামারাস খেলা হিসেবেও খেলাটি চিহ্নিত। কিন্তু বাংলাদেশে নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মেয়েরা টেনিসে আসতে চায় না কেন? ‘কারণ এই খেলাতে ফ্যাসিলিটিজ, প্রাইজমানি কম। আমরা যারা আছি, তারা খেলাটাকে ভালবাসি। রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে খেলাটা। তাছাড়া বিকেএসপিতে পড়ার সুবাদে টেনিসটাকে বেছে নিতে হয়েছে। এখনও টেনিস খেলার সেটাও একটা কারণ।’

টেনিস ফেডারেশনের কার্যক্রমের মধ্যে কোন ঘাটতি আছে? ‘অবশ্যই, অনেক ঘাটতি। তারা খেলোয়াড়দের সেভাবে কোচিং করায় না। কোচিং না পেলে খেলোয়াড়দের মানের উন্নতি হবে কিভাবে? বাংলাদেশী কোচই পাই না, আবার বিদেশী কোচের অধীনে প্রশিক্ষণ নেয়াটা তো আকাশ কুসুম কল্পনা। এছাড়া জাতীয় টেনিস কমপ্লেক্সের কোর্টগুলোও সেভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। মাত্র দুটি কোর্ট রঙ করা হয়েছে। কিন্তু কোর্টের সাইডে কোন রঙ করা হয়নি। এখানে তো কোর্টের নেট ছিঁড়ে বল ঢুকে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এখানে খেলতে গিয়ে বরফ এবং চিকিৎসা নেয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। অথচ বিদেশে খেলতে গিয়ে দেখেছি সেখানকার কোর্টগুলো কত উন্নতমানের, কত সুযোগ-সুবিধা!’

এই সমস্যাগুলো কি কখনও খেলোয়াড়রা ফেডারেশনকে জানায় না? ‘জানাবে না কেন? সবসময়ই জানায়। কিন্তু কাজ তো হয় না। ফলে আমরা এখন টায়ার্ড। আর কিছু বলি না। মাঝে মাঝে মিডিয়ার কল্যাণে এগুলো জানা যায়।’

টেনিস নিয়ে ভবিষ্যত লক্ষ্য বা পরিকল্পনা কি? ‘ভবিষ্যতে ইচ্ছে আছে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার। সেটা টেনিসের স্বার্থেই। বিদেশেও গিয়েও দেশের পক্ষেই খেলতে চাই।’ লাক্সমির আগে অতীতে আরও দুই বাংলাদেশী মহিলা টেনিস খেলোয়াড় বিদেশে চলে গিয়ে পরে আর দেশের হয়ে খেলেননি (বৈশাখী এবং শারদা)। বিষয়টি লাক্সমিকে স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, বিষয়টি ভালমতোই জানি। ওনারা বিদেশে গিয়েছিলেন থাকার জন্য। কিন্তু আমি যাব খেলা ও প্রশিক্ষণের জন্য। কাজেই আমার বেলায় এমনটি হবে না। অচিরেই টেনিস খেলার ওপর স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছি। ইতোমধ্যেই কোর্স করছি ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে।’

বিদেশে থাকাকালীন কিভাবে দেশের হয়ে টেনিস খেলবেন? ‘দেশে কোন খেলা থাকলেই আমি এখানে খেলতে চলে আসব। আর বিদেশে কোন খেলা হলে বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনকে জানাব ওই টুর্নামেন্টে আমি খেলতে আগ্রহী। তখন ফেডারেশন আমাকে খেলার অনুমতি দেবে এবং ব্যবস্থা করে দেবে। এভাবেই খেলা যাবে।’ স্কলারশিপ পেলে বিদেশের কোন বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বিশ^বিদ্যালয় দলের হয়ে খেলার সুযোগও পাবেন বলে জনকণ্ঠকে জানান লাক্সমি।

চলমান আন্তর্জাতিক জুনিয়র টেনিসে অংশ নেয়ার লাক্সমির (এ নিয়ে চতুর্থবার) উদ্দেশ্য ছিল র‌্যাংকিংয়ে ঠাঁই (টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গেলে র‌্যাংকিংয়ের আওতায় আসা যাবে। কিন্তু লাক্সমির সেই স্বপ্ন হোঁচট খায় প্রথম রাউন্ডেই ভারতীয় প্রতিপক্ষের কাছে হেরে যাওয়ায়। এর অবশ্য কারণও ছিল। সময়ের অভাবে প্রস্তুতিটা তেমন ভাল হয়নি তার।

এই আসরে প্রথম অংশ নিয়েছিলেন ২০১৪ সালে। তখন তিনি বিকেএসপির খেলোয়াড়। এখন অবশ্য কোন ক্লাব বা সংস্থার হয়ে নয়, একাই খেলে যাচ্ছেন। ক্লাব না পাওয়ার কারণ? ‘টেনিসে বাংলাদেশের মেয়েদের বেলায় ক্লাব পাওয়াটা খুবই কঠিন। ক্লাবগুলো চায় মেয়েদের কোচ হিসেবে, খেলোয়াড় হিসেবে নয়। আমার বেলাতেও তাই ঘটেছে। কিছু ক্লাব (গুলশান ক্লাব, উত্তরা ক্লাব) আমাকে বলেছে তাদের কোচ হিসেবে কাজ করতে! আমি বলেছি আমি তো এখনও জুনিয়র খেলোয়াড়, অবসর নিতে এখনও অনেক সময় বাকি আছে। তাহলে কোচ হিসেবে কেন যাব? এজন্যই কোন ক্লাব পাইনি।’

কেন, কোচ কাম খেলোয়াড় হিসেবেও তো কোন ক্লাবে যোগ দেয়া যেত না? ‘হয়ত যেত। কিন্তু কোচিং করিয়ে আসলে খেলার জন্য আলাদা সময়ই বের করা যাবে না। তাছাড়া আমার নিজের খেলার উন্নতিও তো হবে না। কেননা আমাকে কোচিং করাবে কে? এজন্যই ওদের প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারিনি।’ লাক্সমির ব্যাখ্যা।

এত খেলা থাকতে টেনিসটাকে বেছে নেয়ার কারণ কি? ‘আসলে আমার পরিবারই এই খেলাটা খুব পছন্দ ছিল। তাদের আগ্রহেই বেছে নিই খেলাটি। এমনিতে আমার কোন চয়েস ছিল না। পরে খেলতে খেলেতে টেনিসের প্রেমে পড়ে যাই।’

লাক্সমির আদর্শ খেলোয়াড় রাশিয়ার মারিয়া শারাপোভা, ভারতের সানিয়া মির্জা এবং সুইজারল্যান্ডের রজার ফেদেরার। সানিয়া মির্জা একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন। ঢাকা থেকে বিকেএসপি গেলে সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল টেনিস খেলার সুবাদে এ পর্যন্ত তিনটি দেশে ভ্রমণ করা (ভারত, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনাম) লাক্সমির।

এ পর্যন্ত টেনিস খেলে বিভিন্ন ইভেন্টে মোট ২৭টি শিরোপা জিতেছেন লাক্সমি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ ২০১৪ ও ২০১৬ সালে অনুর্ধ-১৪ এশিয়ান কাপ প্রতিযোগিতার এককে, ২০১৪ সালে অনূর্ধ-১৪ এশিয়ান কাপ প্রতিযোগিতার দ্বৈতে, ২০১৪ সালে জাতীয় প্রতিযোগিতায় অনূর্ধ-১৬ বিভাগে এককে চ্যাম্পিয়ন হওয়া। জাতীয় প্রতিযোগিতায় অবশ্য সিনিয়র পর্যায়ে এককে এখনও কোন শিরোপা জিততে পারেননি। ২০১৬ আসরের ফাইনালে হেরে যান আফরানা ইসলাম প্রীতির কাছে।

ক্যারিয়ারে কোন স্মরণীয় ম্যাচ? ‘২০১৩ সালে এটিএফ অনূর্ধ-১৪ আসরে একটা ম্যাচের কথা মনে পড়ছে। সেমিফাইনাল ম্যাচ। জাতীয় টেনিস কমপ্লেক্সের এক নম্বর কোর্টে খেলা। প্রতিপক্ষ আমারই বিকেএসপির সতীর্থ, রেবেকা সুলতানা জয়া। আমি ৫-২ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে হেরে যাই। কারণ ছিল নার্ভাসনেস। গ্যালারিতে জয়ারই বেশি সাপোর্টার ছিল। তাদের তীব্র চিৎকারে আমার মনোসংযোগে বিঘ্ন ঘটে। ফলে হেরে যাই।’ লাক্সমির খেলার ধরন হচ্ছে তিনি ফোরহ্যান্ডে শক্তিশালী। আর দুর্বল দিক? ‘এটা বলতে চাই না। না বলাই ভাল। বললে প্রতিপক্ষরা জেনে যাবে (হাসি)!’

ক্যারিয়ারের প্রথম কোচ বিকেএসপির রোকনউদ্দিন আহমেদ। বর্তমানে কোন ক্লাবের হয়ে না খেলায় লাক্সমির কোচ নেই। কোচ ছাড়া কিভাবে খেলছেন, সমস্যা হচ্ছে না? ‘টেনিস কমপ্লেক্সে এসে অনুশীলন করার জন্য একজন হিটিং পার্টনার ম্যানেজ করেছি। এভাবেই চলছে। তবে কোচ না থাকায় বড় একটা গ্যাপ ঠিকই সৃষ্টি হচ্ছে। ফিটনেস, টেকনিক ... এগুলো নিয়ে কাজ করতে পারছি না। এটা অবশ্যই আমার জন্য নেতিবাচক দিক।’ লাক্সমির হতাশামাখা উত্তর।

খুলনার খালিশপুরে ১৯৯৯ সালের ৫ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন লাক্সমি। সেখানকার এলিজাবেথ মারভেল স্কুলে প্রাইমারি পর্যন্ত পড়ে তারপর ভর্তি হন সাভারের জিরানির বিকেএসপিতে। এখন লালমাটিয়া মহিলা কলেজে পড়ছেন জিওগ্রাফি বিষয় নিয়ে। এ পর্যন্ত দেশে যে কজন খেলোয়াড়ের মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ মনে হয়েছে কাকে? ‘ঈশিতা আফরোজ রিতু আপুকে। উনিও বিকেএসপির। ওনার কিছু শট আছে, যা ফেরানো খুবই কষ্টকর। আমি মনে করি উনি যদি বিদেশে ট্রেনিং নিতে পারতেন, তাহলে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে আরও অনেক উঁচুতে থাকতে পারতেন।’ কতদিন পর্যন্ত খেলতে চান টেনিস? ‘টেনিস খেলার কোন বয়স নেই। যতদিন পর্যন্ত ফর্ম ও ফিটনেস থাকবে, ততদিনই খেলা যায়। আমার বেলাতেও তাই হবে।’

টেনিস খেলা থেকে একসময় অবসর নিলেও টেনিসকে ছাড়বেন লাক্সমি, ‘কোচ বা টুর্নামেন্টের সাংগঠিক কমিটির কর্মকর্তা হিসেবে এই খেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার খুবই ইচ্ছে আছে।’ ক্যারিয়ারে কোন বড় ধরনের ইনজুরি? ‘হ্যাঁ। তখন আমি বিকেএসপিতে। ২০১৫ সালে অনুশীলন করতে গিয়ে ব্যাক ইনজুরিতে পড়ে তিন মাস খেলতে পারিনি।’

টেনিস ছাড়া লাক্সমির অন্য প্রিয় খেলা বাস্কেটবল। বিকেএসপিতে এই খেলাটিও খেলার অভিজ্ঞতা আছে। অবসরে ইংরেজীতে কথা বলার চর্চা এবং ফেসবুকে ফ্রেন্ডদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পছন্দ করেন তিনি।

এখন দেখার বিষয়Ñ টেনিস নিয়ে লাক্সমির ভবিষ্যত পরিকল্পনা কতটা সফল হয়।