২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

কমাতে হবে বাণিজ্য ঘাটতি...


আমদানি ও রফতানির ব্যবধান ক্রমশ বেড়েই চলছে। মূলত রফতানির বিপরীতে গত অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ পাঁচগুণ বেশি হওয়ায় দেখা দিয়েছে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি। অর্থনীতির গতিধারাতে সাধারণত আমদানি ব্যয় বাড়লে রফতানি আয়ও বাড়ে। কারণ বিদেশ থেকে আমদানি করা কাঁচামাল থেকে নতুন পণ্য উৎপাদন করে রফতানি হয়। অতীতে এমন হয়ে আসলেও এবার ব্যতিক্রম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমদানি ৯ শতাংশ এবং রফতানি ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেড়েছে। অর্থের হিসাবে ৪ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়। বিপরীতে পণ্য রফতানি হয় ৩ হাজার ৪০১ কোটি ডলারের। ফলে সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৪৯ কোটি ডলার। যা গত ৬ অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে এটি চলতি দশকের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি। তার আগে ২০১০-১১ অর্থবছরে ৯৯৩ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৬৪৬ কোটি ডলার। সেই হিসাবে গেল অর্থবছরে ঘাটতি ৪৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেড়েছে।

বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ধারাবাহিক কমেছে। ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। আবার আমদানিজনিত চাপে দেশের ভেতরে বেড়েছে ডলারের চাহিদা। ফলে চাহিদার তুলনায় ডলারের যোগান কমে গেছে। এ কারণে ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন ঘটছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে প্রায় এক টাকা। আর এক বছরের ব্যবধানে কমেছে প্রায় ২ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, বর্তমানে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা ৭৮ পয়সায়। মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটে রেমিটেন্স আরও কমলে ডলারের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন আরও বাড়বে। এতে রফতানি আয়ের ওপর চাপ পড়বে আরও বেশি।

এছাড়াও আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় কারণে দেশের অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তারা বলছেন, প্রকৃত আমদানি বাড়লে অর্থনীতিতে কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই। কিন্তু আমদানির নামে অর্থ যদি পাচার হয় তাহলে ফল নেতিবাচক হবে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস রেমিটেন্স। কিন্তু গত অর্থ-বছরজুড়েই দেশে রেমিটেন্স প্রবাহ নি¤œমুখী ধারায় ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত অর্থবছরে রেমিটেন্স প্রবাহ কমেছে সাড়ে ১৪ শতাংশ। প্রবাসীরা এক হাজার ২৭৬ কোটি ৯৪ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। যা গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনি¤œ। তবে আশার খবর হলো চলতি (২০১৭-১৮) অর্থবছরে রেমিটেন্স প্রবাহে উর্ধমুখী প্রবণতা লক্ষ্য যাচ্ছে।

বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ‘সব সময়ই আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি থাকে। গত অর্থবছরে সেটি বেড়ে গেছে। এতে করে আমাদের বহিঃখাত কিছুটা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এ জন্য বৈদেশিক মুদ্রার দর ও রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে।’ অবশ্য এক বছরের পরিসংখ্যান দিয়েই কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলে মনে করেন মোস্তফিজুর রহমান। তিনি বলেছেন, রফতানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রেমিটেন্সকে অপ্রাতিষ্ঠানিক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়ে আসার কাজে হাত দিতে হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশ যেসব প্রধান প্রধান খাদ্য সামগ্রী আমদানি করে থাকে সেগুলো হলো হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ, সুপারি, গুঁড়া মসলা, চাল, গম, ভুট্টা, ডাল, তেল, দুধ, ও দুগ্ধজাতীয় পণ্য, চিপস, সুগার এবং সুগার কনফেকশনারি, কোমল পানীয়, ফল-মূল ইত্যাদি। আর যেসব পণ্য রফতানি হয় সেগুলো হলো হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ, পান, শাক-সবজি, সুপারি, নারিকেল, গুঁড়া মসলা, সুগন্ধি চাল, চিপস, কোমল পানীয়, ফলমূল ইত্যাদি।’

তোফায়েল আহমেদ আরও বলেছেন, ‘বর্তমানে বিশ্বের ৪৫টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি আছে। সেগুলো হলো আলজেরিয়া, আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, ব্রাজিল, বেলারুশ, চেকোশ্লোভাকিয়া, মিসর, হাঙ্গেরি, ইরান, ইরাক, কেনিয়া, কুয়েত, লিবিয়া, মালি, মরক্কো, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, সেনেগাল, সুদান, তুরস্ক, উগান্ডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, ইউক্রেন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, ইউএসএসআর, যুগোশ্লাভিয়া, জিম্বাবুয়ে, জাম্বিয়া, জার্মানি, ভুটান, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্র।’

ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য প্রয়োজন আমদানি ব্যয় কমানো। তাই যেসব পণ্য দেশে উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে সেগুলোর আমদানি বন্ধ করার প্রচেষ্টা করতে হবে। ফলে দেশে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগ হবে। আবার রেমিটেন্স বাড়ানোর জন্য দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তুলতে হবে। এছাড়াও প্রবাসীদের অর্থ যাতে সহজেই আসে তার নিশ্চয়তা দেয়া প্রয়োজন। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের নীতিমালায় এমন পরিবর্তন আনা দরকার যাতে কম শুল্কে পণ্য রফতানি করা যায়। কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় কমানো যেতে পারে বাণিজ্য ঘাটতি।