২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

বাংলাদেশী ডেনিম পোশাকের অপার সম্ভাবনা


আশার খবর বর্তমানে বাংলাদেশে সেরা মানের ডেনিম তৈরি হচ্ছে। ডেনিম পোশাক তৈরি ও রফতানিতে প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ভাবতে ভাল লাগে- ডেনিম বা জিন্স ফেব্রিক্স ও গার্মেন্ট তৈরিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববাজারে ভাল চাহিদা থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পে একটি শক্ত জায়গা করে নিয়েছে ডেনিম। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোয় ডেনিম প্রোডাক্ট রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে। ৩৫০ কোটি ডলারের ডেনিম পণ্য তৈরি করে বিশ্বে বছরে ডেনিমের প্রায় ৮ হাজার কোটি ডলারের বাজার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের নাম এখন আলোচনায়।

৭০০ কোটি ডলারের সম্ভাবনা

ইউরোপের বাজারে প্রথম স্থান দখল করেছে বাংলাদেশের ডেনিমস (জিন্স পণ্য)। অল্প সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও তৃতীয় স্থান দখল করেছে ডেনিমস। এ কারণে এ খাতে উদ্যোক্তাদের ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ইউরো স্টেটের তথ্য মতে, ২০১৫ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪ হাজার ৬৫১ মিলিয়ন ইউরোর ডেনিম পণ্য আমদানি করে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। এরমধ্যে বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ১৭৬ মিলিয়ন ইউরোর ডেনিম পণ্য রফতানি হয়েছে। ২০১৪–তে ৯৩৯ মিলিয়ন, ২০১৩–তে ৮০৮ মিলিয়ন, ২০১২–তে ৭২৫ মিলিয়ন, ২০১১– তে ৫৯১ মিলিয়ন এবং ২০১০ সালে ৪৪৪ মিলিয়ন ইউরোর ডেনিম পণ্য রফতানি হয়েছে ইউরোপে। বিশ্বে বাংলাদেশের ডেনিমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সে হারে উৎপাদন হচ্ছে না বলে এ খাতে রফতানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের দেশে ২৬টি ডেনিম ফ্যাক্টরি আছে। এছাড়া প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানায় ডেনিম থেকে পোশাক তৈরির মাধ্যমে রফতানি করে। এ খাতে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করেছেন ৮৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। কিন্তু কাঁচামালের জন্য আমাদের সেই চীন, থাইল্যান্ড ও ভারতের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। ডেনিম খাতকে এগিয়ে নিতে পারলে ২০২১ সালের মধ্যে ৭০০ কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে। এই অফুরন্ত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে কম সুদে ঋণ, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশী ডেনিমের সবচেয়ে বড় গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ শতাংশ মানুষ নিয়মিত ডেনিম পণ্য ব্যবহার করে। যে কোন সময় তাদের কাছে গড়ে অন্তত সাতটি ডেনিম পণ্য পাওয়া যায়। আর ইউরোপে সবচেয়ে বড় বাজারগুলোর একটি হলো যুক্তরাজ্য। সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তির ঘরে অন্তত গড়ে ১৭টি ডেনিম পণ্য থাকে। বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে লিভাইস, ডিসেল, জি-স্টার র, এইচ এন্ড এম, ইউনিক্লো, টেসকো, র‌্যাংলার, এস অলিভার, হিউগো বস, ওয়ালমার্ট ও গ্যাপ বাংলাদেশ থেকে ডেনিম আমদানি করে।

ডেনিম ইনোভেশন নাইট

অভিনব ডিজাইন এবং সৃজনশীল ডেনিম পোশাক প্রস্তুত করতে বাংলাদেশের নৈপুণ্য ও সক্ষমতাকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে আগামী ৮ নবেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘ ডেনিম ইনোভেশন নাইট’। বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপো এখন পোশাক শিল্পের ব্র্যান্ডিংয়ে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সামনে বাংলাদেশের ও অন্য দেশের উদ্যোক্তারা তাদের ডেনিম পণ্য প্রদর্শনের সুযোগ পাচ্ছেন।

দেশে বর্তমানে ৩০টি ডেনিম কারখানা রয়েছে। এগুলোতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছেন উদ্যোক্তারা। কারখানাগুলোর বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা সবমিলিয়ে প্রায় ৪৩ কোটি ৫০ লাখ গজ।

অভিনব-অভিজাত ফ্যাশনে ডেনিম

একটা সময়ে জিন্স মানেই ছিল অনেক মোটা কাপড় আর শীতের সময়ে আরামদায়ক এমন পোশাক। কিন্তু এখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে জিন্স। এখন জিন্সের প্যান্ট অনেক পাতলা ও নরম কাপড়ের হওয়ায় এর জনপ্রিয়তা বেড়েছে অনেক। রং ও সুতার ব্যবহারে এখন মাথায় রাখা হয় ঋতু। তাই শীত-গ্রীষ্ম সব সময়ই জিন্স আরামদায়ক। জিন্স হলো ডেনিম কাপড়ে তৈরি প্যান্ট বা ট্রাউজার্স। জিন্সের পোশাক বিশ্বের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠীর পছন্দের। জিন্সের এমন গ্রহণযোগ্যতার মূল কারণ এতে ব্যবহৃত ডেনিম কাপড়। বুনন এবং ইনডিগো রঙের বিশেষ সমাহারের কারণে ডেনিম বিখ্যাত। এই কাপড়ের পোশাক সব সময়ই শরীরের অনুকূল। এটাই মূলত বিশ্বব্যাপী এর জনপ্রিয়তার প্রধান একটি কারণ। আশার খবর হচ্ছে- দেশীয় বাজারে ডেনিমের চাহিদা এখনও প্রথম সারিতে। আরও সুখবর হচ্ছে বিশ্ব ট্রেন্ডে এখন ডেনিমের ডিজাইনে আসছে নতুনত্ব।

ট্রেন্ডি ফ্যাশনেবল জিন্সে এখন বেশ চলছে রকমারি প্রিন্টের ডিজাইন। তা হতে পারে ডেনিমের বুননে অথবা স্ক্রিন প্রিন্টে।

পাট থেকে ডেনিম কাপড়

বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধির অংশ হিসেবে পাট থেকে ডেনিম কাপড় তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রথমে পাট ও তুলার মিশ্রণে সুতা তৈরি করা হবে। সেই সুতা থেকে বানানো হবে ডেনিম কাপড়। উৎপাদিত কাপড় থেকে প্যান্ট, জ্যাকেট ও শার্টের মতো পোশাক বানিয়ে রফতানি করা হবে। পাশাপাশি দেশের বেসরকারী খাতে কাপড় সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। জানা গেছে, দেশের পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি পাটের বহুমুখী ব্যবহার এবং ডেনিমের বিশ্ববাজার ধরতে এ উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট পাট ও তুলা এবং একই রকম আঁশ জাতীয় দ্রব্যের সংমিশ্রণে সাশ্রয়ী মূল্যে সুতা উৎপাদনের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। এ পদ্ধতি ব্যবহার করে উন্নতমানের ডেনিম কাপড় তৈরি করা যাবে।

ডেনিম হিজাব

ওয়াশিংটন: আমেরিকান পোশাক ব্যান্ড ‘ইগল’, ‘এইরি’এবং ‘নাইকি’র নতুন পণ্য হচ্ছে ‘ডেনিম হিজাব’। এতে হিজাব কতটা প্রয়োজন সেটিও প্রমাণ করতে চাচ্ছে। তারা এর মাধ্যমে সবার জন্য রুচিশীল পোশাক এবং আনুষঙ্গিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে তারা একটি রাস্তা তৈরি করছে। বর্তমান সময়ে যেহেতু এটি পরার প্রবণতা চলছে, তখন সেখানে আমেরিকান ইগলের তৈরি হিজাব নিয়ে ইস্যু তৈরি করার অনেক লোক রয়েছে। হিজাব পরিধান করে এমন ব্যক্তিদের জন্য এটা সত্যিই একটি অপ্রচলিত বাজার এবং অনেক সম্ভাবনাময়।

বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ছে বাংলাদেশী ডেনিমের

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ডেনিম পোশাকের কদর বাড়ছে। উন্নতমানের ডেনিম রফতানি, বিশ্বমানের কারখানা এবং শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের ফলে এই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ডেনিমে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলো-চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া। তবে উচ্চমূল্যের ডেনিম কাপড় উৎ্পাদনে তুরস্কের বিশেষ সুনাম রয়েছে। পাশাপাশি ডেনিম উৎপাদনে বাংলাদেশও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতি বছর ডেনিম কাপড় উৎপাদনে দেশের সক্ষমতা রয়েছে ৩৬ কোটি গজ। আর চাহিদা রয়েছে প্রায় ৬০-৬৫ কোটি গজ। চাহিদার অর্ধেকের কম কাপড় উৎপাদিত হচ্ছে। ২০২১ সালের মধ্যে এ চাহিদা ১২০ কোটি গজে দাঁড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে। সুতরাং এ খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক জায়গা রয়েছে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। দেশের বৃহত্তম পারটেক্স ডেনিম এর উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে উদ্যোক্তা। স্কয়ার ডেনিম দীর্ঘদিন ধরেই সুতা উৎ্পাদন করে আসছে। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের অলিপুরে প্রায় ৩০০ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে স্কয়ার ডেনিম লিমিটেডের ডেনিম ফেব্রিকস উৎ্পাদনের বিশাল কারখানা।

বাংলাদেশের ডেনিমই বিশ্বসেরা

সাশ্রয়ী দাম আর গুণগতমানে সেরা বলে বাংলাদেশের ডেনিম বিশ্বব্যাপী বেশ জনপ্রিয়। বাংলাদেশে ডেনিমের বাজার সম্পর্কিত বিভিন্ন সমীক্ষা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৯৮৯ সালে প্রথম হংকং ও ফিলিপিন্সের দুটি প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে ডেনিম পোশাক তৈরির দুটি কারখানা স্থাপন করে। ১৯৯২ সালের নবেম্বরে বাংলাদেশ বিশ্বের ১১তম ডেনিম সরবরাহকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর আগের বছরের তুলনায় সরবরাহ ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়াই মেলে এ স্বীকৃতি। পরে ১৯৯৬ সাল থেকে তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশীয় ডেনিম কাপড়ের ওপর নির্ভর করতে শুরু হয়। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে ১৭ কোটি পিসের বেশি ডেনিম পোশাক বিক্রি করে আয় করেছে প্রায় ৯৪ কোটি ডলার। একই সময়ে চীন একই বাজারে বিক্রি করে মাত্র সাড়ে ১১ কোটি পিস। ডেনিমের বিশাল বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে- উদ্যোক্তাদের মতানুযায়ী বাংলাদেশের ডেনিমই বিশ্বসেরা। শিল্প সংশ্লিষ্টদের আশা ডেনিম শিল্পের অভিযাত্রা সফল হলে এ দশকেই বার্ষিক লাখো কোটি টাকা আয় হতে পারে। বছরে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ ডেনিম পণ্য রফতানি করছে ৩৫০ কোটি ডলারের। বছরে ডেনিম পণ্য রফতানির প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশের ওপরে। বিশ্বে ডেনিমের বাজার প্রায় ৫ হাজার ৬২০ কোটি ডলারের। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবদান ২৫০ কোটি ডলার। বিশ্বে বাংলাদেশের ডেনিমের ব্যাপক চাহিদা থাকায় ডেনিম পণ্য রফতানি করে বছরে ৫০০ কোটি ডলার আয় করা সম্ভব।