২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

চোখ ধাঁধানো কারুকাজ নক্সা, আজও মুগ্ধ করে পর্যটকদের


চোখ ধাঁধানো কারুকাজ নক্সা, আজও মুগ্ধ করে পর্যটকদের

খোকন আহম্মেদ হীরা

মূল্যবান ইট, পাথর আর সুড়কি দিয়ে গাঁথা, চোখ ধাঁধানো কারুকার্য খচিত নক্সা আজও মুগ্ধ করে পর্যটকদের। এক সময়ের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চার স্থান হিসেবে ব্যাপক পরিচিত, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এলাকা এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্বাচনী প্রচারের সেই জনসভাস্থল বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠী এলাকার তের জমিদার বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অথচ তের জমিদারের বসবাসস্থল কলসকাঠীকে ঘিরে রয়েছে প্রায় পাঁচ শ’ বছরের পুরনো ইতিহাস।

জমিদার বাড়ির প্রবেশ পথে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন মঠ, বেশ কিছু ভাঙ্গা মন্দির ও সংস্কারের অভাবে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত বেশ কিছু বাড়ি। পাশেই রয়েছে শান-বাঁধানো একটি পুকুর। বাড়ির ভেতরের মন্দিরে রয়েছে মূল্যবান কষ্টিপাথরের শিব মূর্র্তি। চুরির ভয়ে মন্দিরের ভেতরে দেবীর মূর্তিকে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। ওই মন্দিরের সামনেই রয়েছে ছোট একটি বেদি। পূজার সময় এখানে প্রাণী বলি দেয়া হয়। প্রতি বছরের নবেম্বর মাসে এখানে ঐতিহ্যবাহী জগদ্বাত্রী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ পূজাকে ঘিরে কলসকাঠী পরিণত হয় লাখো মানুষের মিলনমেলায়। দ্বিতল জমিদার বাড়ির ভেতর দিয়ে রাস্তা চলে গেছে অন্দরমহলের দিকে। সিঁড়িপথ উঠে গেছে ওপরে। সিঁড়িপথের নিচে রয়েছে আরেকটি দরজা, যেটা দিয়ে বাড়ির মূল অংশে প্রবেশ করা হয়। পুরো বাড়িটি সংস্কারের অভাবে আজ জরাজীর্ণ হলেও ঐতিহ্যবাহী বাকেরগঞ্জের কলসকাঠীর জমিদার বাড়িকে ঘিরে থেমে নেই পর্যটকদের ভিড়। ইতিহাস ঐতিহ্যখ্যাত এ জমিদার বাড়িতে প্রতিদিন সকল বয়সের মানুষের ভিড় লেগেই রয়েছে। সরকারী উদ্যোগে তের জমিদারের বসবাসস্থল বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণ করা না হলে খুব শীঘ্রই পুরো বাড়িটি বিলীন হয়ে যাবে। অথচ সংস্কারের মাধ্যমে এ বাড়িটি হতে পারে বরিশালের আকর্ষণীয় একটি পর্যটন কেন্দ্র।

কলসকাঠীর ইতিহাস ॥ একটি প্রাচীন জনপদের নাম কলসকাঠী। বাকেরগঞ্জ তৎকালীন আওরঙ্গপুর পরগণার অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাস্তবিক পক্ষে কলসকাঠীর ইতিহাস জমিদারির ইতিহাস। ১৭০০ সালের গোড়ার দিকে জমিদার জানকি বল্লভ রায় চৌধুরী কলসকাঠী স্থাপন করেন। আগে এর নাম ছিল কলসকাঠী। জানকি বল্লভ রায় চৌধুরী ছিলেন গারুড়িয়ার জমিদার রামাকান্তের পুত্র। জানকি বল্লভ রায় চৌধুরীরা ছিলেন দুই ভাই। বড় ভাই রাম বল্লভ। জানকি বল্লভকে হত্যার চক্রান্ত করে রাম বল্লভ। বিষয়টি তিনি (জানকি বল্লভ) তার বৌদির মাধ্যমে জানতে পেরে রাতের আঁধারে গারুড়িয়া ত্যাগ করে মুর্শিদাবাদ চলে যান। সেখানে তিনি নবাবের কাছে সমস্ত ঘটনা খুলে বলার পর নবাব তাকে (জানকি বল্লভ) আওরঙ্গপুর পরগনার জমিদার হিসেবে নিয়োগ করেন। জমিদারি পেয়ে জানকি বল্লভ কলসকাঠীতে এসে বসতি স্থাপন করেন। কলসকাঠীর তের জমিদার মূলত জানকি বল্লভের পরবর্তী বংশধর। তার বংশধররা সবাই প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন। তাদের একজন বিশ্বেশ্বর রায় চৌধুরী এ বাড়িটি নির্মাণ করেন। জমিদার পরিবারের সদস্যরা পাকিস্তান আমলে ভারত চলে যান। জমিদার বাড়ির ধংসস্তূপ আজও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।

মূল জমিদার বাড়িতে দীর্ঘদিন থেকে একটি হিন্দু পরিবার বসবাস করছেন। যেকোন দর্শনার্থীর কাছে তারা পুরো বাড়ির ইতিহাস বলে থাকেন। তাদের কারণেই আজও জমিদার বাড়িটি টিকে আছে। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের মতে, কলসকাঠীতে তের জমিদারের বাস ছিল। এখানকার জমিদার বাড়িগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। পুরো কলসকাঠীকে পৃথক জমিদার বাড়ি না বলে, বলা যায় পূর্ণাঙ্গ একটি প্রাচীন শহর। কলসকাঠী বাজার সংলগ্ন বাড়িটি হচ্ছে মূল জমিদার বাড়ি। এখান থেকে পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে একেক জমিদার গ্রামের বিভিন্নস্থানে বাড়ি নির্মাণ করেন। গ্রামের ভেতরে পুরনো আমলের জমিদার বাড়িগুলো অধিকাংশই এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত। পুরো গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে জমিদার আমলের বেশ কয়েকটি নয়নাভিরাম মন্দির।

কলসকাঠীতে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চা ছিল জমিদার আমল থেকেই। সে সময় (জমিদার আমলে) কলকাতা থেকে নামীদামী ফুটবল খেলোয়াড় আসত কলসকাঠীতে ফুটবল খেলতে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মধ্যে গান, নাটক ও যাত্রাপালায় বারো মাসই মুখরিত থাকত পুরো কলসকাঠী। ১৯০৮ সালে কলসকাঠীতে ‘বান্ধব সমিতি’ ও ‘নরেন্দ্র রায় চৌধুরী শক্তি লাইব্রেরি’ গঠিত হয়। ১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাম কৃষ্ণ মিশন। ১৯৩০ সালে ‘লবণ আইন’সহ অন্যান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে কলসকাঠীর জনগণ। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর সকল জমিদার ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। শুধুমাত্র বিজয় রায় চৌধুরী ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলসকাঠীতে এসেছিলেন। বর্তমান কলসকাঠী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে তিনি জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৪ মে পাকহানাদার বাহিনী কলসকাঠীতে আক্রমণ করে। ওইদিন গ্রামের নিরীহ কয়েক হাজার নারী-পুরুষকে কলসকাঠীর খালের পাড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে পাকসেনারা গুলি করে হত্যা করে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: