১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

জামায়াত-বিএনপির পেট্রোলবোমায় দগ্ধ মুনিয়া এখন


জামায়াত-বিএনপির পেট্রোলবোমায় দগ্ধ মুনিয়া এখন

গাফফার খান চৌধুরী ॥ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের পেট্রোল বোমায় দগ্ধ গৃহবধূ মুনিয়া বেগম। প্রায় চার বছর ধরে অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগছেন। যন্ত্রণায় মাঝেমধ্যেই জ্ঞান হারিয়ে যায়। মুখসহ পুরো শরীর ঝলসে গেছে। চামড়া ঝুলে আছে। চব্বিশ বছর বয়সী মুনিয়াকে দেখতে পঞ্চাশ বছর বয়সী নারীর মতো লাগে। এ কারণে অনেকদিন নিজের চেহারা আয়নাও দেখেন না। মুনিয়ার চিকিৎসা করাতে গিয়ে পথে বসেছে পুরো পরিবার। সামান্য হোটেল কর্মচারী অসুস্থ স্বামীর পক্ষে স্ত্রীকে আর চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না। তার ওপর একমাত্র মেয়ের চোখের সমস্যা যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিঃস্ব মুনিয়া এখন ঢাকার হাতিরঝিলের কুনিপাড়ার একটি বস্তিতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।

মুনিয়া বলছিলেন, তার পিতার নাম মাকসুদ আহমেদ (মৃত)। মায়ের নাম আছিয়া বেগম। বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। পদ্মার ভাঙ্গনে অনেক আগেই তাদের বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। এরপর জীবিকার তাগিদে ঢাকায় আসেন তারা। একমাত্র বড় বোন সনিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে। ঢাকায় গার্মেন্টসে, মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করে সংসার চলত। গ্রামে কোন বাড়িঘর না থাকায় আর যাওয়া হয় না। মাঝেমধ্যে মামার বাড়ি মাদারীপুর জেলার শিবচরে যেতেন।

২০০৭ সালে একই অফিসে চাকরি করার সুবাদে পরিচয়ের সূত্র ধরে বিয়ে হয় রানা খানের সঙ্গে। ঢাকায় থাকতাম। ২০০৮ সালে স্বামীর গ্রামের বাড়ি মেহেরপুর সদরের গৌরীপুর গ্রামে চলে যাই স্বামীর সঙ্গে। স্বামী সেখানকার হোটেলে বাবুর্চির কাজ করতেন। সেখানেই চোখে সমস্যা নিয়ে কন্যা তৃষামণির জন্ম হয়। তাকে চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেকটাই নিঃস্ব হয়ে যাই। সংসারে অভাব। মেয়ের কারণে অশান্তি ছিল। সে অশান্তি আরও বেড়ে যায় ২০১৩ সালে। সেদিনের কথা মনে করে মুনিয়া কাঁদছিলেন।

বলছিলেন, দিনটি ছিল ২০১৩ সালের ১১ নবেম্বর। অত্যন্ত জরুরী পারিবারিক প্রয়োজনে দুপুরের দিকে একটি ইজিবাইকে করে আমি প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে রানার বড় বোনের বাড়ি যাচ্ছিলাম। সে সময় বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের হরতাল-অবরোধ চলছিল। রাস্তায় কোন লোকজন ছিল না। কোন মিছিল-মিটিং ছিল না। তাই সাহস করে যাচ্ছিলাম। না গিয়েও কোন উপায় ছিল না। আমঝুপির চানবিল মাঠের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় আচমকা একটি পেট্রোলবোমা ইজিবাইকে ছুড়ে মারে বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের লোকজন। পেট্রোলবোমাটি সোজা আমার বুকে গিয়ে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীরে আগুন ধরে যায়। আমি চিৎকার করতে করতে আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। পরিস্থিতি দেখে ইজিবাইকের চালক দ্রুত সরে যান। অনেক চেষ্টা করেও আগুন নেভাতে পারছিলাম না। এরপর আর আমার মনে নেই। জ্ঞান ফিরে দেখি আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি। সারা শরীরে যন্ত্রণা আর শরীরজুড়ে ব্যান্ডেজ।

মুনিয়ার স্বামী রানা বলছিলেন, আগুনের তাপে স্ত্রী একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় পড়ে যায়। দ্রুত গিয়ে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় ব্যক্তিদের সহায়তায় মেহেরপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করি। ভর্তির পর সেখানে তার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। এরপর সেখান থেকে রাতেই তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করে। পরদিন ১২ নবেম্বর ভোরে আমরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পৌঁছি। চিকিৎসকরা জানান, মুনিয়ার শরীরের ৯০ ভাগ দগ্ধ হয়েছে। কিন্তু শ্বাসনালী মারাত্মকভাবে দগ্ধ না হওয়ায় তিনি কোনমতে বেঁচে গেছেন। চিকিৎসা চলতে থাকে। চিকিৎসার খরচ বেশিরভাগই সরকার বহন করে। কিন্তু আনুষঙ্গিক টুকটাক খরচ করতে হয়েছে আমাদের। সে খরচ চালানোর মতো টাকা ছিল না আমার কাছে। এজন্য তিন কাঠার জমির ওপর থাকা বাড়ির দুই কাঠা জমি বন্ধক দেই। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ২০১৪ সালের ২ জানুয়ারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্ত্রীকে ছুটি দেয়। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে চলে যাই গ্রামের বাড়িতে। আবার সংগ্রাম শুরু করি। কিন্তু প্রতি এক মাস বা দুই মাস পরপর স্ত্রীকে ঢাকায় আনতে হয় চিকিৎসা করাতে। প্রতিবার যাতায়াতসহ চিকিৎসা করাতে প্রায় ছয় হাজার টাকা খরচ হয়। আমি মাসে প্রায় দশ হাজার টাকা রোজগার করি। মেয়ের চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে প্রায় তিন হাজার টাকা খরচ হয়। সব মিলিয়ে আর স্ত্রী-সন্তানের চিকিৎসা করাতে পারছি না। স্ত্রীর চিকিৎসা করতে ঢাকায় এসে বাধ্য হয়ে ভাড়ায় বসবাস করা ভায়রার বস্তিঘরের রুমটিতে উঠেছি।

মুনিয়া বলছিলেন, এত কষ্ট নিয়ে আর বাঁচতে পারছি না। সারা শরীরে যন্ত্রণা হয়। সে যন্ত্রণা মনকেও গিলে খাচ্ছে। চোখের সামনে স্বামী-সন্তান না খেয়ে মরার যোগাড় হয়েছে। অথচ কিছুই করতে পারছি না। নিজে ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারছি না। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। গরম পড়লে সারা শরীরে মারাত্মক যন্ত্রণা হয়। যন্ত্রণায় কোন কোন সময় জ্ঞান হারিয়ে যায়। কোন কোন সময় ইচ্ছা হয় মরে যাই। আবার স্বামী-সন্তানের দিকে চেয়ে বাঁচতে ইচ্ছা করে।