২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বৃষ্টিতে ডুবল দেশ


বৃষ্টিতে ডুবল দেশ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঋতু বৈচিত্রের ধরন অনুযায়ী হেমন্ত অনেকটা শান্ত আর নরম। নীল আকাশ আর সোনালি রোদের মিশেলে একাকার থাকে এই সময়ের প্রকৃতি। আর সুসংবাদ থাকে নবান্নের। বর্ষা বিদায় জানিয়ে আহ্বান জানায় শীতের আগমনের। কিন্তু এবার সেই প্রকৃতির চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সেই হেমন্তে শ্রাবণের ধারায় থমকে গেছে দেশের গোটা জনজীবন। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে যে অঝোর ধারা শুরু হয়েছে তা থামার কোন লক্ষণ নেই। আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা আর বৃষ্টির একটানা রিমঝিম শব্দে প্রকৃতি যেন এক গভীর ঐকতান সৃষ্টির খেলায় মেতেছে।

আবহাওয়া অফিস জানাচ্ছে, গত তিনদিনে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ২৮৭ মিলিমিটার। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত রেকর্ড হয়েছে ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ১৪৯ মিলিমিটার। শুধু শনিবার সকাল থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে ৮৪ মিলিমিটার। শনিবার সকাল থেকে ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে ফেনীতে ১৬৩ মিলিমটার। সাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে অব্যাহত বৃষ্টিপাত জনজীবনে যে কতটা ভোগান্তি সৃষ্টি করছে তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানে। তিনদিনের দুর্যোগপূর্ণ বৈরী আবহাওয়ার কারণে সকাল থেকে সারাদেশের পাশাপশি থমকে গেছে পুরো ঢাকা শহরের জনজীবন। মানুষের আনাগোনাও নেই বেশিরভাগ রাস্তায়। যানবাহনের সংখ্যাও ছিল অনেক কম। তিনদিনের বৃষ্টিতে ঢাকার প্রধান প্রধান সড়ক, অলিগলি এমনকি বাসাবাড়িতে পানি উঠেছে। স্কুলগামী শিশুদের এবং তাদের অবিভাবকদের সকালে বৃষ্টির মধ্যে ভিজে গন্তব্যস্থলে যেতে দেখা গেছে। অনেকে আবার বৃষ্টিতে ভিজেই পরিবহনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। বৃষ্টির কারণে ঢাকার রাস্তায় সিএনজি চালিত পরিবহন চলাচল করেছে খুব কম। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়। বৃষ্টিতে সারাদেশেই দুর্ভোগের চিত্র যেন একই।

লঞ্চ চলাচল বন্ধের পাশাপাশি বৈরী আবহাওয়ায় বাতাসের বেগ বেড়ে যাওয়ায় শনিবার পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এ কারণে নৌরুটের উভয়পাশে ফেরিঘাটে যানবাহনের লাইন কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। এতে হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। গুঁড়ি গুঁড়ি টানা বৃষ্টির মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা। এদিকে ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাট টার্মিনালে শনিবার সকাল নয়টা থেকে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত সদরঘাট থেকে ৪১টি রুটে নৌচলাচল বন্ধের এ নির্দেশ বহাল থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

টানা বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়ায় পদ্মার শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌপথেও একই অবস্থা। সব ধরনের নৌচলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে ঘাটে আটকা পড়েছে ছয় শতাধিক যানবাহনের হাজার হাজার যাত্রী। কর্তৃপক্ষ জানায় শনিবার সকাল থেকে প্রচন্ড ঝোড়ো হাওয়া, বৃষ্টি আর তীব্র স্রোতের কারণে ফেরি, স্পিডবোট ও লঞ্চসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। তারা জানায়, শুক্রবার সকাল থেকেই উত্তাল পদ্মায় যান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছিল। আর নৌ চলাচল বন্ধ রাখায় চরম দুর্ভোগে পড়ে যানবাহনের হাজার হাজার যাত্রী। টানা বৃষ্টিপাতের কারণে কাজের প্রয়োজনে বের হতে পারেনি দিনমজুর এবং শ্রমিকরাও। হাত গুটিয়ে তাদের অলস সময় কাটাতে হচ্ছে। অনেক স্থানে উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবরও পাওয়া গেছে। ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে শীতের শাকসবজিরও। নিম্নচাপের প্রভাবে সাগর উত্তাল হওয়ায় নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে পটুয়াখালীর বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ও উপচে ১৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অর্ধশত চরসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে ভেসে গেছে বহু পুকুর ও মাছের ঘের।

এদিকে শনিবার আবহাওয়া অফিসের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উড়িষ্যা এলাকায় অবস্থানরত স্থল নিম্নচাপটি উত্তর-উত্তরর্পূর্ দিকে অগ্রসর হয়ে শনিবার সকাল ৯ টায় পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থান করছিল। এটি আরও উত্তর/উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে এবং গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা তৈরি অব্যাহত রয়েছে। ¤িœচাপের প্রভাবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয় নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠী, পিরোজপুর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ১-২ ফুট অধিক উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। এ কারণে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা বজলুর রশিদ জানান, নিম্নচাপের প্রভাবে আজ রবিবার সারাদেশে ভারি বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থানরত স্থল নিম্নচাপের কারণে শনিবার সকাল ১১ টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে।

কোথায় কত বৃষ্টিপাত ॥ আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, স্থল নিম্নচাপের কারণে বৃহস্পতিবার রাত থেকেই সারাদেশের ওপর ভারি বৃষ্টিপাত বয়ে যাচ্ছে। আজ রবিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রায়েছে। তাদের হিসাব মতে গত তিনদিনে রাজধানী ঢাকায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ২৮৭ মিলিমিটার। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ৫০ মিলিমিটার, শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ১৪৯ মিলিমিটার এবং শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকায় ৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে ১২ টা পর্যন্ত ফেনীতে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে; ১৩৩ মিলিমিটার। এর বাইরে শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত টাঙ্গাইলে ৭৮, ফরিদপুরে ৪৭, মাদারীপুরে ৫৫, কুমিল্লায় ৯৭, চাঁদপুরে ৪৭, মাইজদকোর্টে ৯৭, হাতিয়ায় ৬২, ঈশ্বরদীতে, ৫৯ বগুড়ায় ৬২ এবং ভোলায় ৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

এছাড়া শনিবার সকাল থেকে পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় গোপালগঞ্জে সর্বোচ্চ ২৭১, টাঙ্গাইলে ১৪৬, মাদারীপুরে ১৭১, ফরিদপুরে ১৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। নোয়াখালীর মাইজদীতে ১৯৫, হাতিয়ায় ১০৩, চাঁদপুরে ১৩৭, বরিশালে ১৮৬, পটুয়াখালীতে ১৬৪, ভোলায় ৮৩, খুলনায় ১৬৩, মংলায় ১৩০, যশোরে ১৬২, সাতক্ষীরায় ১২৩, চুয়াডাঙ্গায় ১০২, কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ১৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। রাজশাহী বিভাগের ঈশ্বরদীতে ১৩৯ এবং সিরাগঞ্জের তাড়াশে ১৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

ঢাকার দুর্ভোগের চিত্র ॥ অব্যাহত বৃষ্টিপাতের কারণে বৃহস্পতিবার রাত থেকেই চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে রাজধানী ঢাকার জনগণকে। বৃষ্টিপাতের কারণে ঢাকার অধিকাংশ সড়ক এবং অলিগলি তলিয়ে যায়। শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার দুপুর দেড়টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের কোনই বিরাম ছিল না। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই কাজের প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হয়েছে। নিজের বাসাবাড়ির বাজার করাও বৃষ্টিতে কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তবে শুক্র, শনিবার সরকারী ছুটির দিন থকায় জনদুর্ভোগ অন্যদিনের চেয়ে তুলনামূলক কম ছিল। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে যেমন বের হয়নি তেমনি ঢাকার রাস্তায় দুদিন গণপরিবহন কম ছিল।

ঢাকার ব্যস্ততম একটি এলাকা মিরপুর। তিনদিনের বৃষ্টিপাতের কারণে মিরপুর ১ নম্বর থেকে ১০ নম্বর এবং চিড়িয়াখানা পর্যন্ত এলাকা পানিতে নিচে তলিয়ে যায়। ফলে ওই এলাকা থেকে গুলিস্তাগামী যানবাহন কম চলতে দেখা গেছে। সিএনজি চালিত অনেক পরিবহন বৃষ্টির কারণে রাস্তায় নামেনি। বাস শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃষ্টির কারণে যাত্রী যেমন কম ছিল তেমনি ঠিকমতো বাস চালাতে না পেলে অনেক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। মিরপুর আনসার ক্যাম্পের পাশে বৃষ্টিতে ভিজেই বাসের অন্য অপেক্ষা করছিলেন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মাহমুদ দুলাল নামের একজন। তিনি জানান, অনেকক্ষণ বাসের অক্ষোয় রয়েছি। পরিবহন স্বল্পতার কারণে বৃষ্টিতে ভোগান্তির যেন শেষ নেই।

সরেজমিন মানিক মিয়া এ্যাভিনিউয়ে দেখা যায় পশ্চিম প্রান্তে অথৈ পানিতে এলাকায় ঢেউ আছড়ে পড়ছে। পাশ দিয়ে হাঁটুপানি মারিয়ে অনেক পথচারীকে বৃষ্টিতে ভিজেই চলাচল করতে দেখা যায়। একই অবস্থ্া দেখা গেল ধানম-ির ২৭ নম্বরের। রাস্তায় প্রায় হাঁটুপানি জমে গেছে। কষ্ট নিয়ে চলাচল করছে পথচারী এবং যানবাহন।

শুধু এই এলাকা নয়। রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকা হাঁটুপানিতে ডুবে গেছে টানা বৃষ্টিপাতের কারণে। সড়কে যানবাহন চলাচলও থমকে গিয়ে ভোগান্তির মাত্রা আর বাড়িয়ে দিয়েছে। আকাশে কালো মেঘ ও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বাইরে বের হয়েই তাদের বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছে। তিন দিনের বৃষ্টির পানি রাজধানীর সড়ক-অলিগলিতে জমেছে।

রাজধানীর মিরপুর, গ্রীন রোড, বসুন্ধরা সিটির পেছনের রাস্তা, তেজকুনিপাড়া, তেজতুরী বাজার, খিলগাঁও, গোড়ান, বাসাবো, নয়াপল্টন, কাকরাইল, শান্তিনগর, মৌচাক, মগবাজারের ভেতরের দিকে গলি, ফার্মগেট থেকে কাওরান বাজার সব এলাকায় একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। এসব এলাকায় কোথাও হাঁটুপানি, আবার কোথাও কোমর পানি জমে রয়েছে। রমনা পার্কে লেক ভরাট হয়ে পুরো পার্কে দক্ষিণ এবং পূর্ব পাশে পানি জমে গেছে। ফলে গত দু’দিনে রমনা পার্ক দিয়ে যাত্রী চলাচল করতে পারেনি।

বৃষ্টির কারণে রিক্সা ভাড়াও হঠাৎ দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে গেছে। ২০ টাকার ভাড়া এক শ’ টাকায় গুনতে হচ্ছে অনেককে। আবার অনেক রিক্সাওয়ালাকে দেখা গেল বৃষ্টির মধ্যে কাক ভেজা হয়েই যাত্রী পরিবহন করছে। একজন রিক্সাওয়ালা বলেন, বৃষ্টির মধ্যে ভিজে যাত্রী টানতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে ভাড়া তো একটু বেশি হবেই। এদিকে গত তিন দিনে ঢাকা ফুটপাথে বৃষ্টির কারণে পণ্যের পসরা বসাতে দেখা যায়নি। ফলে যারা ফুটপাথে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন তাদের মাথায় হাত পড়েছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাতে ভোগান্তির খবর

গাজীপুর ॥ কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাতের কারণে গাজীপুরে পৃথক স্থানে দেয়াল চাপা পড়ে গার্মেন্টস কর্মী এক নারী ও এক শিশু নিহত হয়েছে। এ সময় আহত হয়েছে আরও দু’জন। ধসে পড়া মাটির দেয়াল ও টিনের নিচে চাপা পড়ে শিশু জাহিদ ঘটনাস্থলেই মারা যায় এবং তার মা রীনা আক্তার (২২) ও খালা রুনা আক্তার (১৮) আহত হয়। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির কারণে মাটির দেয়াল ভিজে নরম হওয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে।

কুষ্টিয়া ॥ অতিবর্ষণে বসতবাড়ির মাটির দেয়াল ধসে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তার নাম রূপচাঁদ মল্লিক (৫২)। শনিবার ভোরে মিরপুর উপজেলার চিথুলিয়া ইউনিয়নের মল্লিকপাড়া গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

শরীয়তপুর ॥ শনিবার ভোর থেকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে শরীয়তপুর-চাঁদপুর ও কাওড়াকান্দি-শিমুলিয়া নৌরুটে ফেরিসহ সব প্রকার নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়াও নড়িয়া উপজেলার সুরেশস্বর ও ওয়াপদা লঞ্চঘাট থেকে কোন লঞ্চ ছেড়ে যায়নি। বন্ধ রয়েছে স্পিডবোটও। এতে ভেদরগঞ্জ উপজেলার নরসিংহপুর ফেরিঘাট ও জাজিরার কাওড়াকান্দি ফেরিঘাটে ৬ শতাধিক যানবাহন আটকা পড়েছে। দুর্ভোগে পড়েছেন এসব এলাকার হাজার হাজার যাত্রী। একই সঙ্গে বিদ্যুতের চরম ভোগান্তিতে ছিল জেলা শহরবাসী। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুতবিহীন ছিল শরীয়তপুর শহর।

মাদারীপুর ॥ বৈরী আবহাওয়া প্রচন্ড বাতাস ও প্রবল বর্ষণে পদ্মা উত্তাল থাকার কারণে কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌরুটে শুক্রবার সকাল থেকে ফেরি, লঞ্চ ও স্পিডবোট চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে কাঁঠালবাড়ি ঘাট এলাকা ও টার্মিনালে পারাপারের অপেক্ষায় কয়েক শ’ যানবাহন দু’দিন ধরে আটকে রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ॥ বৈরী আবহাওয়ার কারণে আশুগঞ্জ নদী বন্দর থেকে ৬টি রুটে লঞ্চ ও নৌচলাচল বন্ধ রয়েছে। শনিবার সকাল থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে সব প্রকার নৌযান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।

ভোলা ॥ গত ২ দিন ধরে ভোলার ওপর দিয়ে টানা বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসে এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ভোলা-লক্ষীপুর রুটে গত ২ দিন ধরে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে লঞ্চ চলাচলও বন্ধ রয়েছে। চরম দুর্ভোগে রয়েছে যাত্রীরা।

মানিকগঞ্জ ॥ বৈরী আবহাওয়ার কারণে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি ১০ ঘণ্টা পর চালু হয়েছে। ফলে ওই রুটে নৌযান চলাচল শুরু হওয়ায় ঘাটের দু’পারে পারে অপেক্ষমাণ শত শত যানবাহনের জট খুলছে।

বরিশাল ॥ সমুদ্রে নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার কারণে বৈরী আবহাওয়ায় বরিশালের অভ্যন্তরীণ নৌরুটে সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়া অনুকূলে না আসা পর্যন্ত এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বরগুনা ॥ ভারিবর্ষণ ও অমাবস্যার জোয়ারের পানির প্রভাবে বিপদ সীমার ৪১ সেমি. ওপর দিয়ে বইছে জোয়ারের পানি। জোয়ারের চাপে বরগুনা সদরসহ তালতলী, বেতাগী ও পাথরঘাটা উপজেলার বেশ কয়েকটি এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত হয়েছে ২০টি গ্রাম, পৌর শহরসহ উপকূলের নিম্নঞ্চল। ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে লবণ পানিতে নষ্ট হচ্ছে ফসলী জমি। ভাসিয়ে নিয়ে গেছে মাছের ঘের। এ ছাড়াও আমতলী প্রতিনিধি জানিয়েছেন এলাকার পশ্চিম ঘাটখালী বালিয়াতি ও তেঁতুলবাড়িয়ার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অনেক মানুষ বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছে। পাথরঘাটায় ঝড়বৃষ্টিতে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে আহত হয়েছে ৫ জন।

লক্ষ্মীপুর ॥ দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীহাট থেকে সব প্রকার ফেরি ও লঞ্চ চলাচল দ্বিতীয় দিনের মতো বন্ধ রয়েছে। ভারি বর্ষণের শহরের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। রামগতি-কমলনগরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, সদর ও রায়পুরের আংশিক এলাকা ৩ থেকে ৫ ফুট জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। রায়পুর-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কসহ বিভিন্ন সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। শহরে বিদ্যুত সরবরাহ না থাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। অপরদিকে রামগতি, কমলনগর, রায়পুর, রামগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুত সরবরাহ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

নওগাঁ ॥ শুক্রবার-শনিবার টানা দু’দিনের লাগাতার বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় ক্ষেতের রোপা আমন ধান মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। ধান ক্ষেতের অবস্থা দেখে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা এখন ফলন বিপর্যয়ের আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ধান ওঠার আগ মুহূর্তে সেই মুহূর্তে হঠাৎ বৈরী আবহাওয়া কৃষকের সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে ল-ভ- করে দিয়েছে।

বাগেরহাট ॥ বৃষ্টিতে চার শতাধিক গ্রাম জলমগ্ন হয়ে আছে। হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দী চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন। নিম্নচাপ, টানা প্রবল বর্ষণ ও অমাবস্যার প্রভাবে সকল নদ-নদীতে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে কোড়ামারা, কালশিরা, ডুমুরিয়া, উজলকুড়, গোপালকাঠি, যাত্রাপুর, বিষ্ণুপুর, রাধাবল্লভ, মোরেলগঞ্জ, রামপাল, মোল্লাহাট, কচুয়াসহ জেলার ১৩টি স্থানে সড়ক ও বেড়িবাঁধ ধসে গেছে। বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ উপচে পানি ঢুকছে। কাঁচা-পাকা সড়কের অংশবিশেষ নদীতে চলে গছে অনেক স্থানে। বৃষ্টির সঙ্গে ঠা-া ঝড়ো হাওয়ার কারণে অসংখ্য গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙ্গে পড়েছে। ফলে সড়ক যোগাযোগ ও বিদ্যুত সরবরাহ মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। পুকুর ও মৎস্য ঘের ভেসে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফসলের ক্ষেত, রাস্তাঘাট জলে তলিয়ে আছে। শহরের রাস্তায়ও জমেছে পানি। অফিস, রাস্তাঘাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল-মাদ্রাসা, বাড়িঘর, পানবরজ ও ফসলের ক্ষেত জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।

যশোর ॥ ভারি বর্ষণে তলিয়ে গেছে যশোর শহর ও শহরতলির নিম্নাঞ্চল। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে হাজারখানেক পারিবার। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শত শত বিঘা সবজির ক্ষেত। সদরের চুড়ামনকাটি, বারীনগর, হৈবতপুর, কাশিমপুর ইউনিয়নের শত শত বিঘা জমির সিম, মুলা, পটোল, উচ্ছে, করলা, পাতাকপি, বাঁধাকপির ক্ষেত তলিয়ে গেছে পানিতে। ফলে চাষীরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।

জয়পুরহাট ॥ একটানা দু’দিন দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টির কারণে জয়পুরহাট জেলায় রোপা আমন ধানসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগ জানায় প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী দমকা হাওয়া ও বৃষ্টির কারণে ১লাখ ১২৫ বিঘার আমন ধান মাটিতে হেলে ও শুয়ে পড়েছে এবং ১ হাজার বিঘা জমির শাক-সবজি বৃষ্টিতে আক্রান্ত হয়েছে। তবে এর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। অবিরাম বৃষ্টির কারণে ফলে জয়পুরহাটে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।

নড়াইল ॥ নড়াইলে দু’দিনের অবিরাম বর্ষণে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ধানসহ শীতকালীন শাক-সবজি ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। লোহাগড়া পৌর শহরের ও গ্রামাঞ্চলের বেশিরভাগ রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, পুকুর, ডোবা ডুবে গেছে।

সাতক্ষীরা ॥ ঝড়ের আঘাতে একটি ইউনিয়নের তিনটি গ্রামের শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্থানীয় বাজারের ২৮টি দোকান। এতে গৃহহীন হয়ে পড়েছে অনেকেই। শুক্রবার শেষ রাতে শ্যামগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের তিনটি গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যায় এই ঝড়। প্রবল ঝড়ের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো হলো চকবারা, খোলপেটুয়া ও গাবুরা।

কক্সবাজার ॥ সাগরের পানিতে মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও পেকুয়া উপজেলার ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপে অত্যধিক জোয়ারের কারণে বেড়িবাঁধে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। শনিবার দিনের জোয়ারের সময় ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে ধলঘাটা ও মাতারবাড়ি, পেকুয়া বকশিয়া ঘোনা উওর পাশে জহিরের দোকানের পেছনে ও পশ্চিম পাশে নেজামের বাড়ির সামনে বেড়িবাঁধে দুটি আলাদা অংশ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে। এ ছাড়াও বেড়িবাঁধ উপচে সাগরের পানি ঢুকে ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। স্লুইচগেট বন্ধ থাকায় পানি আটকে রয়েছে। এতে মানুষ দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।

গলাচিপা ॥ প্রবল বর্ষণ ও জোয়ারে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার ৬ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ফলে এরই মধ্যে ফসলী ক্ষেত তলিয়ে আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

কলাপাড়া ॥ অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে এলাকার আমনক্ষেত পানির নিচে ডুবে আছে। ক্ষতির কবলে পড়েছে দুই হাজার কৃষক পরিবার। অস্বাভাবিক জোয়ারে এলাকার চার কিলোমিটানর বাঁধ ভেঙ্গে গেছে।

বাউফল ॥ কেশবপুর ও চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে সহস্রাধিক পরিবার। কয়েক হাজার হেক্টর জমির আমন ফসল তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে মাছের ঘের, হাঁস ও মহিষের খামার।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: