২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

শিশু ‘অনামিকা’র মা বাবার খোঁজ ১৭ দিনেও মেলেনি


শিশু ‘অনামিকা’র মা বাবার খোঁজ ১৭ দিনেও মেলেনি

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ॥ জন্মই যেন তার আজন্ম পাপ! কথাটি যেন এই শিশুটির জন্যই প্রযোজ্য। কোন এক মায়ের গর্ভ থেকে সদ্য জন্ম নেয়া এই শিশুর ঠাঁই মেলেনি মায়ের কোলে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে জন্মের পর শিশুটির স্থান হয়েছিল নর্দমার পাশের এক রাস্তায়। মায়ের পেট থেকে পড়েই কী নির্মমতা! শিশুটির শরীরের সঙ্গে মায়ের নাড়ি লেগেইছিল। সেভাবেই শিশুটিকে শপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রাস্তায় ফেলে রেখে যায় কোন এক পাষ-। তার কান্নার শব্দে এক নারী তাকে উদ্ধার করেন। বলছিলাম, খিলগাঁওয়ের এক রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া শিশুটির কথা। উদ্ধারের পর থেকে ঢামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের ইনটেনসিভ কেয়ারে তার চিকিৎসা চলছে। এখনও পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত নয় শিশুটি; বাঁচার জন্য লড়ছে সে। ছোট্ট হাতে ক্যানোলা ঢোকানো। শরীরে চলছে স্যালাইন। খাবার খেয়ে হজম করার শক্তিটুকুও নেই তার। ইতোমধ্যেই চিকিৎসকরা তার নাম রেখেছেন ‘অনামিকা’। শিশু বিভাগের মধ্যমণি এখন অনামিকা। তাকে বাঁচানোর চেষ্টায় চিকিৎসকরা লড়ে যাচ্ছেন। তারা আনিশার মতো এই শিশুকেও হারাতে চান না।

২ অক্টোবর সকালে ঢাকার খিলগাঁওয়ে পলিথিনের শপিং ব্যাগের ভেতর পাওয়া যায় শিশুটিকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ওই দিন সকালে শিশুটিকে খিলগাঁওয়ে সি ব্লকের একটি বাসার সামনে নর্দমার পাশে শপিং ব্যাগে রেখে যান কালো বোরকা পরা এক নারী। সে দৃশ্য আশপাশের অনেকেই দেখেন। বোমা বা ক্ষতিকর কোন বস্তু ভেবে প্রথমে ভয়ে কেউ কাছে যায়নি। পরে শপিং ব্যাগ থেকে কান্নার শব্দ শুনে শাহনূর বেগম ওরফে খুকি নামে স্থানীয় এক নারী শিশুটিকে কোলে তুলে নেন। ঘটনা দেখে অনেকে ভিড় জমায়। তারা পুলিশে খবর দেয়। জন্ম নেয়ার পর পরই তাকে ব্যাগে ভরে রাস্তায় ফেলে রেখে যাওয়া হয়। তবে ওর শরীরে কোন আঘাতের চিহ্ন ছিল না বলে জানায় পুলিশ।

এই ঘটনার ১৭ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও মা-বাবার সন্ধান মেলেনি। জন্মের পর শিশুটির শারীরিক ধকল কাটেনি। এখনও বেশ অসুস্থ। নবজাতক বিভাগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা চলছে। শিশুটির শারীরিক অবস্থার বিষয়ে হাসপাতালের অধ্যাপক মনীষা ব্যানার্জি জনকণ্ঠকে বলেন, ‘প্রিম্যাচিউর বেবি’। সে এখনও খাবার খেতে পারছে না। আমরা দুবার খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু খাবার খেলে ওর পেট ফুলে যাচ্ছে। যদি সে খাবার খেতে পারত তাহলে দ্রুতই সুস্থ হয়ে যেত। এখনও সে পুরোপুরি শঙ্গামুক্ত নয়। আমরা প্রাণপণে চেষ্টা করছি শিশুটিকে সুস্থ করে তুলতে।

সুস্থতার জন্য কন্যাশিশুটির শরীরে রক্ত দেয়া হয়েছে বলে জানান মনীষা ব্যানার্জি। তিনি বলেন, আসলে জন্মের পর পরই মেয়েটিকে ফেলে দেয়া হয়। যখন হাসপাতালে নেয়া হয় তখন ওর শরীরে জন্ডিস ছিল। এখনও রক্তে সংক্রমণ রয়েছে। কিছুদিন আগে ওর শরীর খারাপ হয়েছিল। এখনও যে খুব ভাল, তা নয়। তবে যতটা খারাপ হয়েছিল, তার চেয়ে একটু ভাল। এখনও স্যালাইন দেয়া হচ্ছে।

শিশুটির বাবা-মা এখনও খোঁজ নিতে আসেননি বলে জানান চিকিৎসকরা। এমনকি তার পরিচয় ও জন্মপরিচয়ও পাওয়া যায়নি। ইতোমধ্যেই অনেক নিঃসন্তান দম্পতি বাচ্চাটিকে দত্তক নেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। নিজের মা-বাবা খবর না নিলেও অনেকে সন্তান হিসেবে শিশুটিকে নিতে চাইছেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত ১২ দম্পতি কন্যাশিশুটিকে দত্তক নিতে চেয়েছেন। তারা সমাজকল্যাণ অধিদফতরের মাধ্যমে আবেদন করেছেন।

শিশুটি অসুস্থ হওয়ায় হাসপাতালে দেয়া হয়েছে বলে জানান খিলগাঁও জোনের সহকারী কমিশনার নাজিয়া জুঁই। সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। শিশুটির মা-বাবা কে, তা জানা যায়নি। তবে তদন্ত চলছে।

এর আগে চলতি বছরের ১১ মার্চ রাজধানীর মিরপুরের একটি ডাস্টবিন থেকে উদ্ধার করা হয় সদ্যোজাত এক কন্যাশিশুকে। উদ্ধারের পর তাকে সুস্থ করে তুলতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের স্পেশাল বেবি কেয়ার ইউনিটের চিকিৎসক-নার্সসহ সবাই এক মাস আপ্রাণ চেষ্টা চালান। একমাসের মধ্যেই শিশুটি শিশু বিভাগের চিকিৎসকদের চোখের মণি হয়ে উঠেছিল। তার নাম রাখা হয়েছিল আনিশা। কিন্তু চিকিৎসকরা অনেক চেষ্টার পরও শিশু আনিশকে বাঁচাতে পারেননি। ছোট্ট শিশুটি হেপাটাইটিসে ভুগছিল। ১৭ এপ্রিল ঢামেক হাসপাতালে মারা যায় শিশু আনিশা।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: