২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

হাতে লেখা পান্ডু-লিপি চিঠিপত্র, দুর্লভ গ্রন্থ সম্ভার হস্তান্তর


হাতে লেখা পান্ডু-লিপি চিঠিপত্র, দুর্লভ গ্রন্থ সম্ভার হস্তান্তর

মোরসালিন মিজান

শওকত ওসমান নেই। বহু বছর হয়ে গেল, নেই তিনি। তবে প্রখ্যাত লেখকের অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন পরিবারের সদস্যরা আগলে রেখেছেন। মেয়েরা এ কাজে ভাল করেন বটে। ছেলেরা অতটা পারেন না। তবে শওকত ওসমানের পুত্ররা এ ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম-ই বলতে হবে। বাবার স্মৃতি ধরে রাখতে সচেতন প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন তারা। শওকত ওসমানের লেখা পান্ডু-লিপি, বই, চিঠি, পোর্স্ট কার্ড, চশমা ইত্যাদি যত্নের সঙ্গে পরিবারেই সংরক্ষিত হচ্ছিল। সম্প্রতি জাতীয় জাদুঘর আয়োজিত প্রদর্শনীতে এগুলো দেখা গেছে আর মঙ্গলবার পরিবারের পক্ষ থেকে স্মৃতি নিদর্শনগুলো দান করা হয় জাদুঘরে।

এ উপলক্ষে বিকেলে বোর্ডরুমে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ছোটখাটো আয়োজন। তবে দুইজন ফুল মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন! একজন ওসমান পরিবারের বড় সন্তান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান। অন্যজন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তিনিও ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠজন। ফলে আয়োজনটি ঘিরে আনুষ্ঠানিকতা কম ছিল। বেশি ছিল আন্তরিকতা।

জানা যায়, নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করছিলেন শওকত ওসমানের কনিষ্ঠ পুত্র জাঁ-নেসার ওসমান। বিখ্যাত বাবার স্মৃতিনিদর্শন বলে কথা। অনেকে স্বত্ব ত্যাগ করতে রাজি হন না। তিনি জাদুঘরের গুরুত্ব বোঝেন বলেই হয়ত সানন্দে দান করেছেন। এ প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৯৭৬ সাল থেকে বাবার এসব স্মৃতিনিদর্শন সংরক্ষণ করছিলাম আমি। ৪০ থেকে ৪৩ বছর পর জাদুঘরে দিলাম। এখন থেকে এগুলো জনগণের হয়ে গেল। জাদুঘরের দর্শনার্থীরা এসব নিদর্শনের মাঝে তাদের প্রিয় লেখককে খুঁজে পাবেন বলে আশা করেন তিনি।

স্মৃতিনিদর্শন জাদুঘরে দেয়ায় দাতাদের ধন্যবাদ জানান সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তিনি বলেন, শওকত ওসমান নিজের ব্যাপারে অনেক ক্ষেত্রেই ছিলেন উদাসীন। বৈষয়িক কোনকিছু তাকে খুব টানেনি। কিন্তু দেশ ও মানুষ সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতেন। তার লেখা পড়ে আমরা সেগুলো বুঝতে পারি। কখনও কোন বিষয়ে আপোস করেননি তিনি। লেখায় বক্তব্যে জীবনযাপনে সৎ থেকেছেন। স্মৃতিনিদর্শনে তাকে খুঁজে নেয়ার সুযোগ পাবেন জাদুঘরের দর্শনার্থীরা। মন্ত্রী বিখ্যাত ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর নানা নিদর্শন সংগ্রহের গুরুত্ব অস্বীকার না করলেও স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, কীর্তিমানদের জীবদ্দশায় তাদের নিয়ে কাজ করতে পারলে সেটি আরও বেশি ফলপ্রসূ হয়।

বড় ছেলে ইয়াফেস ওসমান এদিন বেশ স্মৃতিকাতর ছিলেন। দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। মুখ খুলতেই সেটি পরিষ্কার হলো। বললেন, আমি আজ সত্যি নস্টালজিক। তার সামনেই সাজিয়ে রাখা হয়েছিল পিতার স্মৃতি চিহ্ন। শওকত ওসমানের স্মৃতি চিহ্নের তালিকায় এ¯্রাজ দেখে অনেকেই তো অবাক। কথাশিল্পীর চাই কলম। এ¯্রাজের দিয়ে কী করতেন? জবাব দিলেন পুত্র। এ¯্রাজের ছড় হাতে নিয়ে বললেন, এটি দিয়ে বাবা এ¯্রাজ বাজাতেন। আমি গাইতাম। বিজ্ঞানের মন্ত্রী গানও করতেন! চমকপ্রদ তথ্য বটে। কোন্ গানটি? মন্ত্রী জানালেন, পিতার সঙ্গে রজনীকান্তের বিখ্যাত গান ‘তুমি, নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে’ গাইতেন তিনি। মানুষ হিসেবে শওকত ওসমান অন্যরকম ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, অনেকের কাছেই বাবা মানে স্কুলের হেডমাস্টার। কিন্তু আমরা তাকে পেয়েছি বন্ধু হিসেবে। তখন ঢাকা কলেজের শিক্ষক তিনি। আমি মেট্রিক পাসের পর নটর ডেম কলেজে ভর্তি হওয়ার আগ্রহ দেখাতেই বললেন, হুম, এক ঘরে দুই পীর না থাকাই ভাল! শওকত ওসমান শৌখিন মানুষ ছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এদিন শওকত ওসমানের ১৫ ধরনের নিদর্শন জাদুঘরে হস্তান্তর করা হয়। লেখক যেহেতু, নিজ হাতে লেখা পা-ুলিপির আলাদা গুরুত্ব। তেমন একটি পা-ুলিপি জাদুঘরে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিদেশী নাট্য কাহিনী অবলম্বনে লেখা ‘কর্ণভস্ম’ এখন থেকে জাদুঘরে সংরক্ষিত হবে। আছে শওকত ওসমানের নিজের হাতে লেখা ৬টি চিঠি। স্পষ্ট সুন্দর হস্তাক্ষর। এগুলো মূলত নিজের পরিবারের সদস্যদের লেখা। ব্যক্তিগত কথাবার্তা হলেও, পত্র সাহিত্যের স্বাদ পাওয়া যাবে। নানা বিষয় উঠে এসেছে এসব পত্রে। নিজের পরিবারের প্রতি সন্তানদের প্রতি লেখকের যে ভালবাসা, যে দায়বোধ, ছোট ছোট বলা থেকে বেশ অনুমান করা যায়। পুত্র জাঁ-নেসার ওসমানকে তিনি লিখছেন, ‘বই পাঠাচ্ছি। প্রচ্ছদ যেন সিনেমা পোস্টার। রুচিতে মেলে না। এরা করে বসেছে...।’ অর্থাৎ নিজের বইয়ের প্রচ্ছদটি কী হবে তা নিয়েও নিজস্ব ভাবনা ছিল শওকত ওসমানের। ৩টি পোস্ট কার্ড থেকেও তার সময়টাকে পড়া যায়। জাদুঘরে এসেছে শওকত ওসমানের ৯টি বই। বইগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রথম উপন্যাস ‘জননী।’ অনেক পুরনো সংস্করণ। প্রকাশ করেছিল ঢাকা বুকস। ‘জননী’র উর্দু সংস্করণটিও আছে এখানে। অন্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সিলেক্টেড স্টোরিজ’, নির্বাচিত গল্প’, ‘রাজা উপাখ্যান’ ও শেখের সম্বরা।’ প্রয়াত লেখকের ব্যবহার করা কলম চশমা ইত্যাদিও দেয়া হয়েছে জাদুঘরে। বাদ যায়নি পোশাক। পাঞ্জাবি, পাজামা, ব্লেজার, ওভার কোট, ফতুয়ায় শওকত ওসমানকে খুঁজে নেয়া যাবে।

তবে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা জরুরী যে, কথাশিল্পী শওকত ওসমানের স্মৃতিনিদর্শন আরও আছে। জাদুঘরে রাখার মতো অনেক অমূল্য নিদর্শন পরিবারের অন্য সদস্যরা সংরক্ষণ করছে বলে জানা যায়। সেগুলো থেকে যতটা সম্ভব জাদুঘরে হস্তান্তর করা হলে, জাদুঘর কর্তৃপক্ষ আগ্রহী হয়ে গ্রহণ করলে সংগ্রহটি আরও সমৃদ্ধ হবে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: