২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

আপীল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির সাফ জবাব ॥ সিনহার সঙ্গে বসব না


আপীল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির সাফ জবাব ॥ সিনহার সঙ্গে বসব না

বিকাশ দত্ত ॥ ছুটিতে থাকা প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার অস্ট্রেলিয়া যাত্রার পরদিনই তার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন, অর্থপাচারসহ এগারোটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছে সুপ্রীমকোর্ট। রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। আনীত অভিযোগগুলোর মধ্যে আর্থিক অনিয়মসহ দুর্নীতির কথাও বলা হয়েছে। এদিকে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তি রয়েছে বলে মনে করেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। দেশে ফিরে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণ সুদূরপরাহত। ‘গতকাল (শুক্রবার) প্রধান বিচারপতির অস্ট্রেলিয়া যাত্রার প্রাক্কালে তার বাসভবনের সামনে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে দেশবাসী বিভ্রান্ত হয়েছেন। দেশবাসীর এই বিভ্রান্তি দূর করতে পাঁচ বিচারপতির আজকের (শনিবার) দেয়া বিবৃতির প্রয়োজন ছিল।’ ‘একইসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মোঃ আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা বিচারিক কাজ পরিচালনা, বেঞ্চ গঠনসহ সকল দায়িত্ব সাংবিধানিকভাবে পালন করতে পারবেন।’ অন্যদিকে প্রধান বিচারপতির বিদেশ যাওয়ার আগে দেয়া বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছেন সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ। সভাপতি জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে বারের একাংশ প্রথমে সংবাদ সম্মেলন করে। পরে সমিতি সহসভাপতি মোঃ অজিউল্লাহ পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেন। সমিতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সহসভাপতি মোহাম্মদ অজিউল্লাহর নেতৃত্বে অপর অংশ সংবাদ সম্মেলন করতে আসে। এ অবস্থায় বিএনপি-সমর্থক ও আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। সমিতির উভয় নেতাদের মধ্যে চলে তুমুল বাগ্বিত-া। আজ সকাল সাড়ে এগারোটায় আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক তার সচিবালয় কার্যালয়ে প্রধান বিচারপতির বিবৃতিসহ অন্যান্য বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। সুপ্রীমকোর্টের বিবৃতিতে বলা হয়, এসব অভিযোগ প্রধান বিচারপতিকে জানিয়ে আপীল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতি তার কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেন। কিন্তু তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এ কারণে অন্য বিচারপতিরা তার সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় এসকে সিনহা পদত্যাগ করবেন বলেও তাদের জানিয়েছিলেন। ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতির পদটি একটি প্রতিষ্ঠান। সেই পদের ও বিচার বিভাগের মর্যাদা রাখার স্বার্থে ইতোপূর্বে সুপ্রীমকোর্টের তরফ থেকে কোন প্রকার বক্তব্য বা বিবৃতি প্রদান করা হয়নি। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে নির্দেশক্রমে বিবৃতি প্রদান করা হলো।

শুক্রবার রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে নিজ বাসভবনের সামনে সাংবাদিকদের প্রধান বিচারপতি সিনহা জানান, ‘আমি অসুস্থ না, আমি ভাল আছি, আমি পালিয়েও যাচ্ছি না। আমি আবার ফিরে আসব। আমাকে ছুটিতে যেতে বাধ্য করা হয়নি। আমি নিজে থেকেই ছুটি নিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি একটু বিব্রত, আমি বিব্রত। আমি বিচার বিভাগের অভিভাবক। আমি চাই না, বিচার বিভাগ কলুষিত হোক। বিচার বিভাগের স্বার্থে আমি সাময়িকভাবে যাচ্ছি। কারও প্রতি আমার কোন বিরাগ নেই। বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকুক, এটাই আমি চাই।’ এর পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার সুপ্রীমকোর্ট বিজ্ঞপ্তি আকারে দেয় এই বিবৃতি দিল।

প্রধান বিচারপতি দায়িত্বগ্রহণের পর একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যে পুরাতন হাইকোর্ট চত্বর থেকে ট্রাইব্যুনাল সরানের জন্য একাধিকবার আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি প্রদান, সুপ্রীমকোর্টের বাৎসরিক ছুটি কমানোর সিদ্ধান্ত, আদালতের সময় এগিয়ে আনা, সুপ্রীমকোর্ট চত্বরে ভাস্কর্য স্থাপন, বিচারপতি নিয়োগে পছন্দ মতো লোক না দেয়ায় বাধা সৃষ্টিগুলো অন্যতম। এতে করে আইনজীবীগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এছাড়া আপীল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোঃ জয়নুল আবেদীনের দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্তে করা যাবে না এমন চিঠি প্রদান, প্রধান বিচারপতির আয়কর রিটার্ন ও ব্যাংক এ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেনসহ নানা বিষয়ে জনকণ্ঠসহ মিডিয়াতে রিপোর্ট প্রকাশ পায়। এরপর সর্বশেষ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় সংসদ নিয়ে তিনি যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তাতে দেশের রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে আইনজীবী বিচারপতিরাও ক্ষোভে ফেটে পড়েন। একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি অসুস্থ হওয়ায় রাষ্ট্রপতির কাছে এক মাসের ছুটির আবেদন করেন। ১৩ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়া যাবার প্রাক্কালে তিনি যে বিবৃতি দেন তা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। শনিবার সেই বিবৃতি কেন্দ্র সুপ্রীমকোর্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেরও প্রধান বিচারপতি সিনহা সুখী ছিলেন না। একটি সূত্র জানায়, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তার স্ত্রী সুষমা সিনহার বনিবনা হতো না। যে কারণে প্রধান বিচারপতি স্ত্রীকে রেখেই অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দিয়েছেন।

সুপ্রীমকোর্টের বক্তব্য ॥ ছুটি ভোগরত মাননীয় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা মহোদয় গত ১৩/১০২০১৭ইং তারিখে বিদেশ গমনের প্রাক্কালে একটি লিখিত বিবৃতি উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের নিকট হস্তান্তর করেন। উক্ত লিখিত বিবৃতিটি সুপ্রীমকোর্টেও দৃৃষ্টিগোচর হয়েছে। উক্ত লিখিত বিবৃতি বিভ্রান্তিমূলক। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সুপ্রীমকোর্টের বক্তব্য নি¤œরূপ।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ মাননীয় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা মহোদয় ব্যতীত আপীল বিভাগের অন্য পাঁচ বিচারপতিকে বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানান। বিচারপতি মোঃ ইমান আলী মহোদয় দেশের বাইরে থাকায় বঙ্গভবনের ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেননি। অপর চারজন, অর্থাৎ বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এবং বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার মহামান্য রাষ্ট্রপতির সহিত সাক্ষাত করেন। দীর্ঘ আলোচনায় একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা মহোদয়ের বিরুদ্ধে ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সংবলিত দালিলিক তথ্যাদি হস্তান্তর করেন। তন্মধ্যে বিদেশে অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, নৈতিক স্খলনসহ আরও সুনির্দিষ্ট গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

ইতোমধ্যে মাননীয় বিচারপতি মোঃ ইমান আলী মহোদয় ঢাকায় ফেরার পর ১ অক্টোবর ২০১৭ইং তারিখে আপীল বিভাগের উল্লিখিত ৫ জন বিচারপতি মহোদয় এক বৈঠকে মিলিত হয়ে উক্ত ১১টি অভিযোগ (সংযুক্তসহ) বিশদভাবে পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ঐ সকল গুরুতর অভিযোগসমূহ প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে অবাহিত করা হবে। তিনি যদি ঐ সকল অভিযোগের ব্যাপারে কোন সন্তোষজনক জবাব বা সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হন তাহলে তার সঙ্গে বিচারালয়ে বসিয়া বিচারকার্য পরিচালনা করা সম্ভব হইবে না। এ সিদ্ধান্তের পর ওইদিনই বেলা সাড়ে ১১টায় মাননীয় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা মহোদয়ের অনুমতি নিয়ে পাঁচ বিচারপতি মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয়ের হেয়ার রোড রমনা ঢাকা বাসভবনে তার সঙ্গে সাক্ষাত করে অভিযোগগুলো নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেন।

কিন্তু দীর্ঘ আলোচনার পরও তাঁহার নিকট হইতে কোন প্রকার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বা সদুত্তর না পাইয়া আপীল বিভাগের উল্লিখিত মাননীয় পাঁচজন বিচারপতি তাকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, এমতাবস্থায় এসব অভিযোগের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে একই বেঞ্চে বসে বিচার কাজ পরিচালনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। এ পর্যায়ে মাননীয় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা সুস্পষ্টভাবে বলেন যে, তিনি পদত্যাগ করবেন। তবে এ ব্যাপারে পরেরদিন তিনি তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন।

অতপর এর পরদিন ২ অক্টোবর তিনি উল্লিখিত বিচারপতিদের কোন কিছু অবহিত না করে রাষ্ট্রপতির কাছে এক মাসের ছুটির দরখাস্ত দেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতিও তা অনুমোদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে আপীল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে অনুরূপ কার্যভার পালনের দায়িত্ব প্রদান করেন। উল্লেখ্য প্রধান বিচারপতির পদটি একটি প্রতিষ্ঠান। সেই পদের ও বিচার বিভাগের মর্যাদা সমুন্নত রাখার স্বার্থে ইতোপূর্বে সুপ্রীমকোর্টেও তরফ থেকে কোন প্রকার বক্তব্য বা বিবৃতি প্রদান করা হয় নাই। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে নির্দেশক্রমে উপরিউক্ত বিবৃতি প্রদান করা হইল।

এ্যাটর্নি জেনারেল ॥ দেশে ফিরে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণ সুদূরপরাহত বলে মন্তব্য করেছেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। শনিবার সন্ধ্যা ছয়টায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তি রয়েছে। যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, যদি কোনরকম সত্য না হতো, দেশের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এসব কথা বলা কি সম্ভব হতো? এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তাকে সরানোর বা বেঞ্চে না বসার ব্যাপারে সরকারের কোন ভূমিকাই নেই। ‘গতকাল প্রধান বিচারপতির বিদায়ের যাত্রাকালে তার বাসভবনের সামনে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে দেশবাসী বিভ্রান্ত হয়েছেন। দেশবাসীর এই বিভ্রান্তি দূর করতে পাঁচ বিচারপতির আজকের দেয়া বিবৃতির প্রয়োজন ছিল।’ ‘একইসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা বিচারিক কাজ পরিচালনা, বেঞ্চ গঠনসহ সকল দায়িত্ব তিনি সাংবিধানিকভাবে পালন করতে পারবেন।’

মাহবুবে আলম বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির ছুটি নিয়ে যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছিল, এ বিবৃতির মাধ্যমে ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটবে।’ সুপ্রীমকোর্ট প্রশাসনসহ বিচার বিভাগের যাবতীয় কার্যক্রমের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির। ছুটিতে থাকা প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার প্রাক্কালে দেয়া লিখিত বিবৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘সুপ্রীমকোর্টের দেয়া বক্তব্যে যাবতীয় বিভ্রান্তির নিরসন ঘটেছে, সবকিছু পরিষ্কার হয়েছে’।

এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে বেঞ্চে বসার ব্যাপারে সরকার বিরত করেনি বরং তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠায় তার সহকর্মীরা তার সঙ্গে বসতে রাজি হননি বলে তিনি ছুটি নিতে বাধ্য হয়েছেন। এটা দেশবাসীর জানা উচিত।’ সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগের বিচারপতিদের বৈঠকের পর রেজিস্ট্রার দফতরের দেয়া বিবৃতিতে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিরুদ্ধে অর্থপাচার, নৈতিক স্খলনসহ ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন ॥ ছুটিতে যাওয়া প্রধান বিচারপতির বিদেশ যাওয়ার আগে দেয়া বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছেন সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতারা। সভাপতি জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে একাংশ প্রথমে সংবাদ সম্মেলন করে। পরে সমিতির সহসভাপতি মোঃ অজি উল্লাহ পৃথকভাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন।

সমিতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সহসভাপতি মোহাম্মদ অজি উল্লাহর নেতৃত্বে অপর একাংশ সংবাদ সম্মেলন করতে আসে। এ অবস্থায় বিএনপি-সমর্থক ও আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের মধ্যে বাদানুবাদ চলে। উত্তেজনা দেখা দেয়। এ সময় সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, সমিতির সভাপতির বক্তব্যের পর অন্য কোন ব্যক্তির আইনজীবী সমিতির নামে কোন সংবাদ সম্মেলন বা কোন কিছু করার এখতিয়ার নেই। যদি কেউ এ রকম কিছু বলেন, তা তাঁর ব্যক্তিগত। কেউ এমন চেষ্টা করলে তা আইনজীবী সমিতির বক্তব্য হবে না।

প্রায় ১০ মিনিটের মতো বিএনপি ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত আইনজীবীদের মধ্যে বাগ্বিত-া চলে। একপর্যায়ে সমিতির সহসভাপতি বক্তব্য উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা আপত্তি জানাতে থাকেন। পরে তিনি সমিতির প্রবেশপথে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেন। আগের ঘোষণা অনুসারে, দুপুর বারোটার দিকে সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে সমিতির ব্যানারে সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়। এতে জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘রাষ্ট্রের প্রধান রাষ্ট্রপতি। কাজেই রাষ্ট্রপতির প্রতি আহ্বান বিচার বিভাগকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন।’ জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘রাষ্ট্রের তিন বিভাগ প্রশাসন, আইন ও বিচার বিভাগ। সংবিধান অনুসারে বিচার বিভাগ হচ্ছে সংবিধানের অভিভাবক। সেই অভিভাবককে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অভিমান দুঃখজনক। প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানাচ্ছি, অভিমান ভুলে বিচার বিভাগ রক্ষায় এগিয়ে আসুন।’ সংবাদ সম্মেলনে সহসভাপতি উম্মে কুলসুম বেগম, সহসম্পাদক শামীমা সুলতানা, সদস্য শেখ তাহসিন আলী উপস্থিত ছিলেন। এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ উপস্থিত ছিলেন।

পৃথক সংবাদ সম্মেলনে আইনজীবী সমিতির সহ-সভাপতি অজি উল্লাহ বলেন, ‘সমিতির সভাপতি ও সম্পাদক সংবাদ সম্মেলন করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। আমরা এর সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করছি। প্রধান বিচারপতি বলেছেন, উনি ছুটি নিয়ে বিদেশ যাচ্ছেন স্বেচ্ছায়। ছুটি শেষে আবার ফিরে আসবেন। বিচারকাজ পরিচালনা করবেন।’ প্রশাসনিক পরিবর্তন বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে একমত নন জানিয়ে অজি উল্লাহ বলেন, ‘৯৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে যাঁকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব দেয়া হবে, তিনিই প্রশাসনিক ও বিচারিক সব কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। সাংবিধানিকভাবে তাঁর এ কাজ পরিচালনায় বাধা নেই। এ নিয়ে সভাপতি-সম্পাদক বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। বক্তব্য প্রদান করার জন্য সাংবাদিকদের জানানোর পর সমিতির সভাপতি-সম্পাদকসহ অনুগামী আইনজীবীরা বক্তব্য পেশ করার সুযোগ দেননি। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’

এর আগে ছুটিতে থাকা প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা শুক্রবার রাতে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে অস্ট্রেলিয়ায় তার মেয়ে সূচনা সিনহার বাড়ির উদ্দেশ্যে গেছেন। সম্প্রতি তার আয়কর রিটার্নে অসঙ্গতি ও ব্যাংক এ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় বিতর্কের মুখে পড়েন তিনি। এর আগে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়েও সমালোচনার মুখোমুখি হন। রায়ের পর তার পদত্যাগের দাবিও ওঠে বিভিন্ন মহলে।

এর আগে ছুটি থেকে ফিরেই আবারও এক মাসের ছুটি চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এসকে সিনহা)। প্রধান বিচারপতির ছুটির আবেদনে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে বৃহস্পতিবার সকালে আইন সচিব আবু সালেহ শেখ মোঃ জহিরুল হক দুলাল স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, প্রধান বিচারপতির আবেদনে এর আগে ৩ অক্টোবর থেকে ১ নবেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিনের ছুটি মঞ্জুর করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। কিন্তু বিচারপতি সিনহা যেহেতু আরও বেশি দিন বিদেশে থাকবেন, সেহেতু রাষ্ট্রপতি নতুন আদেশ দিয়েছেন। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বর্ধিত ছুটিতে প্রধান বিচারপতির বিদেশে অবস্থানের সময়ে, অর্থাৎ ২ থেকে ১০ নবেম্বর পর্যন্ত, অথবা তিনি দায়িত্বে না ফেরা পর্যন্ত বিচারপতি মোঃ আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা প্রধান বিচারপতির কার্যভার সম্পাদন করবেন।

মওদুদ আহমদ ॥ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, ‘প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে মিথ্যাচার করে সরকার সমস্ত বিচার বিভাগকে অপমানিত করেছে, প্রধান বিচারপতি তো একটি প্রতিষ্ঠান। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে মন্তব্য করে সুপ্রীমকোর্টেও ভাবমূর্তি এ সরকার সম্পূর্ণভাবে ধূলিসাৎ করেছে।’ শনিবার সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির ভবনের সাংবাদিকদের সামনে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি বিদেশ যাওয়ার আগে তার বাস ভবনের সামনে একটা লিখিত বক্তব্য দিয়ে গেছেন। ওই বক্তব্যের মাধ্যমে আজকে দুটি জিনিস প্রমাণিত হলো। তার একটি হলো- দুই অক্টোবর লেখা আইনমন্ত্রীকে চিঠি দেখিয়েছেন সে চিঠি প্রধান বিচারপতি লিখেননি এবং তিনি তাতে সইও করেননি। আর দ্বিতীয়টি হলো- প্রধান বিচারপতি কখনোই অসুস্থ ছিলেন না। তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। আর সে কথা নিজ মুখেই জাতির কাছে বলে গেছেন প্রধান বিচারপতি।’ বিএনপির সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘দুই অক্টোবরের লিখা প্রধান বিচারপতির যে চিঠি দেখানো হয়েছিল সেটা ছিল একটি ভুয়া চিঠি। আইনমন্ত্রী যে চিঠিটি আপনাদের দেখিয়েছিলেন তাতে ৬টি বানান ভুল ছিল। তাতে যে স্বাক্ষরটি দেখানো হয়েছিল সেটি প্রধান বিচারপতির কিনা তাতে সন্দেহ দেখা গেছে।’ প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে যে সমস্ত মিথ্যাচার করছে তাতে বিচার বিভাগকে অপমানিত করা হয়েছে এমনটি উল্লেখ করে মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এর প্রতিক্রিয়া হবে গভীর। এটা কখনও কল্পনাও করা যায় না।’

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: