২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

মংডুতে ৩ গণকবরের সন্ধান ॥ দুদিনে এসেছে আরও ২০ হাজার


মোয়াজ্জেমুল হক/ এইচএম এরশাদ ॥ গণতন্ত্রের লেবাসধারী অথচ সামরিক জান্তা নিয়ন্ত্রিত মিয়ানমার সরকার। মঙ্গলবার পর্যন্ত গত ৩৩ দিনে রাখাইন রাজ্যের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর লোমহর্ষক বর্বরতা চালিয়েছে, গণহত্যা ও গ্রামের পর গ্রাম রোহিঙ্গা বসতিগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং প্রাণ রক্ষার্থে লাখ লাখ রোহিঙ্গা দেশান্তরী হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে- তা সারাবিশ্বকে আলোড়িত করেছে। পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ চালিয়ে মিয়ানমার যে বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে তা ইতোমধ্যে ভ্রান্তনীতি ও লক্ষ্যভ্রষ্ট পথ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রোহিঙ্গা নিধনে সামরিক অভিযান শুরু করে মিয়ানমার সরকার ওপারের সীমান্তে আন্তর্জাতিক সকল রীতিনীতি লঙ্ঘন করেছে। সীমান্ত এলাকা জুড়ে স্থলমাইন স্থাপন, বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন, ড্রোন প্রেরণ, জিরো পয়েন্টগুলোতে সেনা টহলসহ এমন কোন উস্কানিমূলক ঘটনা নেই যা তারা ঘটায়নি। বাংলাদেশ সামরিক পরিস্থিতি চরম ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছে এবং এখনও করে যাচ্ছে।

বিজিবি সূত্রে জানানো হয়েছে, গত ২৫ আগস্টের পর থেকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে মিয়ানমারকে দশ দফায় প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়েছে। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে দুদেশের সমপর্যায়ের কমান্ডিং অফিসারের কাছে ছাড়াও বিজিবি মহাপরিচালকের দফতর থেকেও প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়েছে। মিয়ানমারের সেনা ও সীমান্ত রক্ষীবাহিনী দফায় দফায় উস্কানিমূলক তৎপরতা শুরু করায় এসব প্রতিবাদ পাঠানো হয়েছে। কিন্তু শুরুতে শুধুমাত্র একবার ছাড়া আর কোনবার প্রতিবাদের কোন জবাব দেয়নি মিয়ানমার বিজিপি।

রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার স্বরূপ কিছুটা হ্রাস পেলেও সিটওয়ে এলাকায় এখনও সেনা অভিযান চলছে। ফলে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ আগের তুলনায় কম হলেও অব্যাহত রয়েছে। সার্বিক ঘটনাবলী নিয়ে মিয়ানমার নিজ দেশে, বিদেশে এমনকি জাতিসংঘেও চরম মিথ্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। তবে মিয়ানমার সরকারের ভ্রান্তনীতি ও লক্ষ্যভ্রষ্ট কর্মকা-ে বিশ্বজুড়ে যেমন চাপের মুখে পড়েছে, তেমনি চরম নিন্দিতও হয়েছে। বর্তমানে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাওয়া রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে মগ সন্ত্রাসীরা শেষ বর্বরতায় অংশ নিয়েছে বলে সীমান্তের ওপারের সূত্রগুলো জানিয়েছে।

আরও একটি গণকবর ॥ মঙ্গলবার উত্তর মংডুর ২ নম্বর সেক্টরের কামং চি এলাকায় নতুন একটি গণকবরের সন্ধান মিলেছে। এ গণকবর থেকে উদ্ধার হয়েছে ১৭ রোহিঙ্গার লাশ। এর আগে গত সোমবার সন্ধান মিলে ২টি গণকবরের। মংডুতেই বিশালাকৃতির দুটি পৃথক গর্তে গণকবর দুটির সন্ধান মেলে। এ দুটি গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয় ২৮ রোহিঙ্গার গলিত লাশ।

থামছে না অনুপ্রবেশ ॥ মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার এক মাস পেরিয়ে গেলেও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এখনও থামছে না। টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ওসব রোহিঙ্গা এদেশে অনুপ্রবেশ করছে। গত সোম ও মঙ্গলবার আরও প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাংলাদেশে। তবে আগের মতো দলে দলে নয়, নাফ নদী সীমান্ত পেরিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে আসছে রোহিঙ্গারা। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, রাখাইন রাজ্য এখনও অশান্ত এবং উত্তপ্ত। সেখানে ঘর থেকেও বের হওয়া মুস্কিল, তাই প্রাণ বাঁচাতে দেরিতে হলেও বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে।

সেনা তৎপরতায় দ্রুত ফিরছে শৃঙ্খলা ॥ গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ব্যবস্থা ও ত্রাণ সহায়তায় সেনা মোতায়েনের পর বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে শৃঙ্খলায় ফিরেছে ব্যাপকভাবে। সেনা সদস্যরা ত্রাণ তৎপরতা এবং আশ্রয় স্থল নির্মাণের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্যাম্পের প্রবেশ পথে তল্লাশি কার্যক্রমও শুরু করেছে। এছাড়া পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবির তৎপরতাও চলছে। ইতোপূর্বে ত্রাণ বিতরণে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ছিল এখন তা অনেকাংশে শৃঙ্খলায় এসেছে। অপরদিকে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো ঘিরে যে জটলা পরিস্থিতি ছিল এরও অবসান হচ্ছে দ্রুত। উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ইউপি সদস্য বখতিয়ার আহমদ জানিয়েছেন, ঢলের মতো রোহিঙ্গা আছড়ে পড়ায় গোটা এলাকায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। এখন সে অবস্থা আর নেই। রাস্তার দুপাশ ঘিরে থাকা রোহিঙ্গা বস্তিগুলো তুলে দেয়া হয়েছে।

পুটিবুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি আশ্রিত রোহিঙ্গা ॥ রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরুর পর টেকনাফ থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং বিভিন্ন পাহাড় ও সমতল এলাকায় এরা বসতি গেড়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গার অবস্থান রয়েছে টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকার পুটিবুনিয়ায়। বেসরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ পুটিবুনিয়ায় প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয় হয়েছে। বিজিবি প্রধান মেজর জেনারেল আবুল হোসেন গত সোমবার এ এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন।

হাতি চলাচলের ঝুঁকিপূর্ণ ১২ পয়েন্ট ॥ বালুখালী, থাইনখালীসহ সীমান্তের ১২টি পয়েন্ট রয়েছে বন্যহাতি চলাচলের পয়েন্ট। এসব পয়েন্টে ইতোমধ্যে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অবস্থান হয়েছে। ফলে বন্যহাতি চলাচলের স্বাভাবিক অবস্থায় নেমে এসেছে প্রতিবন্ধকতা। ইতোমধ্যেই হাতির পায়ের চাপায় মৃত্যু হয়েছে দুই রোহিঙ্গার। আগামীতেও অনুরূপ ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, চুনতি থেকে সুদূর উখিয়া পর্যন্ত পাহাড়ী এলাকাজুড়ে বন্যহাতির অবস্থান রয়েছে। এরা বিভিন্ন সময়ে বারোটি পয়েন্ট দিয়ে এক পাশ থেকে অপর পাশে চলাচল করে থাকে। কিন্তু আকস্মিকভাবে এসব এলাকায় আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অবস্থান হওয়ায় হাতি চলাচলের পথ রুদ্ধ হয়ে আছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প-বস্তিতে কলেরার ঝুঁকি ॥ টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-বস্তিতে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছে বহু শিশু। পানিবাহিত রোগের বিস্তৃতির কারণে ব্যাপক ঝুঁকিতে রয়েছে অনুপ্রবেশকারী ৬০ শতাংশ শিশু। ফলে ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কলেরার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার পর্যন্ত ৩৩ দিনে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের বৃহৎ অংশটি রয়েছে নারী ও শিশু। আবার এ নারী ও শিশুর মধ্যে এককভাবে শিশুর সংখ্যা ৬০ শতাংশ।

বুলেটবিদ্ধ বহু রোহিঙ্গা শিশু ॥ রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনা অভিযান শুরু হওয়ার পর নর-নারীদের পাশাপাশি বহু রোহিঙ্গা শিশু বুলেটবিদ্ধ হয়েছে। বুলেটবিদ্ধ অবস্থায় অনেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। যন্ত্রণাকাতর এসব শিশুকে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। যাদের অবস্থা আশঙ্কাজন তাদের কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সীমান্ত বাণিজ্যে ভাটা ॥ মিয়ানমার থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা আগমনে টেকনাফ স্থলবন্দরে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এ স্থলবন্দরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্য কার্যক্রম অলিখিতভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। মিয়ানমানের মংডুর সঙ্গেই এ স্থলবন্দরের সিংহভাগ বাণিজ্য কর্মকা- চলে। তবে সিটওয়ে (আকিয়াব) থেকেও কিছু কিছু পণ্য আমদানি হয়ে থাকে। রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে আকিয়াব থেকে কিছু চালান এলেও মংডুর ঘাট থেকে আমদানিপণ্য আসা এখন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

গত ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যে শুরু হয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়ন। টেকনাফ শুল্ক স্টেশন দফতর সূত্র জানায়, মিয়ানমারে সহিংসতা শুরু হওয়ার আগের দিনেও মংডু থেকে আমদানি পণ্যবোঝাই নৌযান এসেছিল। কিন্তু ঘটনার পর থেকে আর কোন আমদানিপণ্য আসেনি।

ব্যাপক যানজট ॥ রোহিঙ্গা ভারে জর্জরিত টেকনাফ থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়কে ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হচ্ছে দিনে-রাতে। লাখ লাখ রোহিঙ্গা হঠাৎ বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে কক্সবাজার পুলিশ সূত্র জানায়। এছাড়া রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ সহায়তা বিতরণের জন্য প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসছে। তাদের সঙ্গে আসছে ত্রাণ সহায়তাদানের কর্মী বাহিনীও। এছাড়া প্রতিদিন একাধিক ভিআইপিও এসব এলাকা পরিদর্শন করছেন। ফলে সড়কে প্রতিনিয়ত যানজট লেগেই থাকছে। ইতিপূর্বে সড়কজুড়ে রোহিঙ্গাদের অবস্থান ছিল। সেনা মোতায়েনের পর তাদের অধিকাংশকে নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। কিন্তু চলাফেরা এবং বিভিন্ন স্থান থেকে আসা যানবাহন ও মানুষের ভারে যানজট পরিস্থিতি ব্যাপকতর হয়েছে।