১৩ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

রোহিঙ্গাদের জন্য সেফ জোনের প্রস্তাব সারা বিশ্ব গ্রহণ করেছে ॥ বিএনপির আপত্তি কেন?


রোহিঙ্গাদের জন্য সেফ জোনের প্রস্তাব সারা বিশ্ব গ্রহণ করেছে ॥ বিএনপির আপত্তি কেন?

শংকর কুমার দে ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৫ দফা দাবিসহ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে শান্তিরক্ষী বাহিনীর অধীনে মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে সেফ জোন করার প্রস্তাব জাাতিসংঘসহ সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। অথচ বিএনপির ও এই দলের নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব দেয়া সেফ জোনের বিরোধিতা করার বিষয়টি বিস্মিত করেছে দেশী-বিদেশী আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীসহ সকল মহলকে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বার বার চুক্তি ভঙ্গসহ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। এখন তাদের অতীতের সেই ব্যর্থতা ঢাকতে রোহিঙ্গা ইস্যুকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার ষড়যন্ত্র করছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে এ খবর জানা গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানান, বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সমস্যা ও সঙ্কট তৈরি হয়েছে ৩৯ বছর আগে সেই ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু। সে সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার সময়েই বাংলাদেশে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করে। ১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা হলেও জিয়াউর রহমানের সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তখন চুক্তি ভঙ্গ করে মিয়ানমার সরকার। এমনকি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে ১৯৯২ সালে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নিয়ে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে নানা ধরনের নাটকের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশকে আবারও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। যার খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেফ জোন করে সেখানে রোহিঙ্গাদের বসবাসের ব্যবস্থা করার জন্য যে প্রস্তাব দিয়েছেন তারও বিরোধিতা করছেন বিএনপি ও এই দলের নেতৃবৃন্দ। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে সমস্যা সমাধানে যাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই ধরনের তথ্য রয়েছে বলে দাবি করেছে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছেন এমন দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংগঠন ও গোয়েন্দা সংস্থা।

মিয়ানমারে গত ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেছেন। এটি করে তিনি একটি বড় মানবিক দায়িত্ব পালন করেছেন। এ জন্য তিনি দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছেন। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে ভাষণদান, বিদেশী রাষ্ট্রপ্রধান, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার প্রধানসহ বিভিন্ন সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে মানবাধিকার ও বিশ্বে শান্তির প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের এই মানবিক অবস্থানকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়, তা নিয়েও দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন, যা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে মিয়ানমার সরকার। যে পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ফেরত না নেয়া হবে সেই পর্যন্ত রোহিঙ্গারা যাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আনাচে-কানাচে মিশে যেতে না পারে সে জন্য মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের নির্দিষ্ট এলাকায় পুনর্বাসনের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, সারা পৃথিবীতে রোহিঙ্গাদের মতো যারা নিজ দেশের ভিটেমাটি ছাড়া হয়েছেন তাদের দায়দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রকে বাধ্য করার জন্য নিরাপত্তা অঞ্চল গঠন করা এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে নিরাপত্তা দেয়ার বিভিন্ন উদাহরণ রয়েছে। বর্তমানে এর পরিধিও বেড়েছে বহুগুণ। শুধু যুদ্ধাবস্থা বা সংঘর্ষ নিরসন নয়, বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে রক্ষা, মানবাধিকার লালন, আইনের শাসন পুনরুদ্ধারসহ বিভিন্ন লক্ষ্যে এখন শান্তিরক্ষী বাহিনী নিয়োগ করা হয়। সেই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে জাতিসংঘের শান্তি বাহিনীর তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের জন্য সেফ জোন তৈরি করার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অথচ মিয়ানমার সরকার সেই যে ৩৯ বছর আগে থেকে যেই জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে এখন বিএনপি ও তাদের দলের নেতারা মিয়ানমার সরকারের পক্ষাবলম্বন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া ৫ দফাসহ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেফ জোনের বিরোধিতা করছেন। বিএনপির নেতৃবৃন্দ এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাব করা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের সেফ জোন করার বিরোধিতা করছে কেন তা খুবই রহস্যাবৃত। বিএনপি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের সবকিছুতেই বিরোধিতা করে আসার ধারাবাহিকতায় এখন রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়ে সেখানে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে শান্তিরক্ষী বাহিনীর নেতৃত্বে সেফ জোন করাসহ রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিএনপি এখন শেখ হাসিনার সরকারের সমালোচনায় সরব। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপি ও এই দলের চেয়ারপার্সন তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রোহিঙ্গাদের ফেরতদানে বার বার ব্যর্থ হয়েছেন। অথচ এখন তাদের দল বিএনপির নেতারা মিয়ানমারের রাখানেই সেফ জোন করে রোহিঙ্গাদেও সেই সেফ জোনে রাখার বিরোধিতা করছেন। বিএনপি নেতৃবৃন্দ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের রাখার বিরোধিতা করছেন কেন? বিএনপি ও তার দলের নেতৃবৃন্দ রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেফ জোন করে রোহিঙ্গাদের রাখার বিরোধিতা করে কি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে রাখতে চান। বর্তমানে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া আবারও রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের জন্য অনুরোধ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। লন্ডনে অবস্থানরত খালেদা জিয়ার পক্ষে এ বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বিবৃতিতে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিতে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এভাবেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ দফা দাবিসহ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য যে সেফ জোন করার প্রস্তাব দিয়েছেন তারও বিরোধিতা করে চলেছেন বিএনপি ও তার দলের নেতৃবৃন্দ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে কোফি আনান কমিশন সুপারিশ বাস্তবায়নে মিয়ানমারের ওপর বাংলাদেশের এখন আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা অব্যাহত আছে। এই কমিশন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সব অধিকারসহ পুনর্বাসন করতে বলেছে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের সহায়তা প্রদানের সুপারিশও করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এখন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে একটি উন্নত কর্মকৌশল ঠিক করতে হচ্ছে। বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে স্পষ্টভাবে এই বার্তা দেয়া হচ্ছে যে, বাংলাদেশ নিন্তান্ত মানবিক কারণে ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু এই অবস্থা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকাল ধরে মেনে নিতে পারে না। অন্য দেশ থেকে অবৈধভাবে ঠেলে দেয়া মানুষের বোঝা অনির্দিষ্টকাল ধরে কোন দেশই গ্রহণ করতে পারে না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়োচিত বিজ্ঞজনিত পদক্ষেপের কারণেই রোহিঙ্গাদের নির্বিচার হত্যাকা-ও বিতাড়নকে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ইতোমধ্যে এথনিক ক্লিনজিং বা জাতিগত নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। নির্বিচার ও পরিকল্পিত হত্যাকা- এবং জাতিগত নিধন গণহত্যা কনভেনশন, রোম স্ট্যাচু, জাতিসংঘের চার্টারসহ বিভিন্ন সনদে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। আন্তর্জাতিক অপরাধগুলোর মধ্যে এগুলো আবার সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হিসেবে ‘এ্যাটরোসিটিস ক্রাইমস’ হিসেবে আখ্যায়িত। মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল গঠন করে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর আউং সান সুচি ও সেনাপ্রধানকে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করে শাস্তি বিধানের জন্য রায় প্রদান করেছে। এটাও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরাট সাফল্য। তার সাফল্যের কারণেই এ ধরনের অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের দায়দায়িত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০৫ সালে রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্ট নামে একটি নীতি গ্রহণ করেছে। এই নীতি অনুসারে প্রতিটি দেশের ভেতরে থাকা যে কোন জাতিসত্তা বা জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব সে দেশের। দেশটি তাতে ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক মহলের অধিকার রয়েছে তাকে এটি করতে বাধ্য করা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আসার সুযোগ করে দিয়েছে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক সেনাপ্রধান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রয়াত জিয়াউর রহমান। আর বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দান করার সুযোগ করে দিয়েছে সাবেক সেনাপ্রধান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বিএনপির চেয়ারপার্সন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার পর জঙ্গীগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক যুদ্ধাপরাধীর দল জামায়াত। আর এরই উত্তরসূরির ধারাবাহিকতার জের এখন টানতে হচ্ছে ১৪ দলীয় জোটের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ২০১৬ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ২ বছরে মিয়ানমার থেকে আগত কয়েক হাজার নৌকাবোঝাই রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টাকালে সীমান্ত এলাকা থেকে ফেরত পাঠায়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে এই ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করেছে বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা। সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন রোহিঙ্গার বিষয়টি নিয়ে আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সম্ভাব্য পরিণতি নজরদারিসহ বহুমুখী কাজ করছেন। গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা এক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রথম আগমন ঘটে ১৯৭৮ সালে। তখন বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হওয়া বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কোন উদ্যোগই গ্রহণ করা হয়নি। বরং তখন তাদের পুনর্বাসিত করার সুযোগ দেয়া হয়। সেই ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা জিয়াউর রহমান এ দেশে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করে। বর্তমানে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দশ লক্ষাধিকে। যাদের অনেকেই নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িত। যার খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। সাবেক সেনাপ্রধান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট এএইচএম এরশাদের আমলে মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কক্সবাজার ও বান্দরবানের বিভিন্ন জেলায় এসে বসবাস করে বিয়ে করে নাগরিকত্ব নিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করে দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করার সুযোগ গ্রহণ করে। এরশাদ সরকারের পতনের পর বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের শাসনামলে ১৯৯২ সালে আবারও রোহিঙ্গাদের ব্যাপক হারে আগমন ঘটে। এরশাদ সরকারের মতোই বেগম খালেদা জিয়ার সরকারও মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কোন সফল উদ্যোগ গ্রহণই করতে পারেননি। বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে ১৯৯৫ সাল থেকে মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু বিএনপি সরকার মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোন টু শব্দটি পর্যন্ত করেনি। ফলে তখন বাংলাদেশে আগত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় চার লাখেরও বেশি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেয়া গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসে বিয়ে সাদী, নাগরিকত্বসহ নানা সুযোগ-সুবিধা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তারা বিভিন্ন ক্যাম্পে জঙ্গী প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে।

এখনও আছে। বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের আগাগোড়াই যোগাযোগ ছিল, য়া এখনও অব্যাহত আছে। রোহিঙ্গাদের জঙ্গীবাদে জড়িত করার বিষয়টি তদারকি করেছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার যখন মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র, রাষ্ট্রপ্রধান, জাতিসংঘের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছেন তখন লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া আবারও রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের জন্য অনুরোধ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। বর্তমানে লন্ডনে অবস্থানরত খালেদা জিয়ার পক্ষে এ বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বিবৃতিতে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিতে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের সঙ্গে গত বছর ২০১৬ সালে মিয়ানমার সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদ্বয়ের মধ্যে ও কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা হয় তখন রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে মিয়ানমার রাজি হয়। মিয়ানমার তখন তার দেশটি থেকে গত বছরের ২০১৬ সালের অক্টোবরের ৯ তারিখের পড়ে যে ৬৫ হাজার বেশিও রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে, তাদের ফেরত নিতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশে অবস্থানকারী ৪ লাখ রোহিঙ্গাকেই ফিরিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ একটি টেকসই প্রত্যাবাসন কর্মকৌশলও চায়। এর ফলে যারা ফেরত যাবে, তারা যেন আর ফিরে আসতে না পারে। রোহিঙ্গারা রাখাইন প্রদেশে যেন সম্মানের জীবনযাপন করতে পারে। কিন্তু গত ২৫ আগস্ট হঠাৎ করেই আরাকানের পুলিশ তল্লাশি চৌকিতে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা নামে একটি সংগঠন হামলা চালায়। এ হামলার পরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন শুরু করে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের মদতে রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা নামে একটি সংগঠন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে পাকিস্তান এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা করেছে। একদিকে রোহিঙ্গাদের স্বাধীন আরাকানে রাখাইন রাজ্য গঠন করার স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। অপরদিকে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের ভূখ-ে ঠেলে দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারকে বেকায়দায় ফেলার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে যাতে তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে না পড়তে পারে এবং তাদের শরণার্থী ক্যাম্পে রেখে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতানের শিকারে পরিণত হয়ে প্রাণে বাঁচার জন্য আগত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে সাময়িকভাবে আশ্রয় দানের মানবতার বিষয়টি নিয়েও বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট রাজনীতি শুরু করেছে।

প্রসঙ্গত, জাতিগত দাঙ্গাসহ নানা নির্যাতনের কারণে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৮ সাল থেকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাংলাদেশে প্রবেশ করে বসবাস করা শুরু করলেও গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কয়েকটি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনাঘাঁটিতে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার অভিযোগ আনা হয় আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির বিরুদ্ধে। এরপর থেকেই সেখানে সেনাবাহিনী ব্যাপক মানবতাবিরোধী অপরাধ চালিয়ে আসছে। নিপীড়নের মাত্রা এতটাই মারাত্মক যে, রোহিঙ্গা নিজ দেশ ছেড়ে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ, বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান, মানবাধিকার সংগঠন, শরণার্থীবিষয়ক জাতিসংঘের কমিটিসহ বিদেশে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করার ফলে মিয়ানমার সরকার এখন বাধ্য হয়েই বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে আলোচনায় রাজি হয়েছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: