১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৯ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল নির্মাণে গতি সঞ্চার


হাসান নাসির, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বে-টার্মিনাল নির্মাণ প্রক্রিয়া গতি পেয়েছে ভূমি অধিগ্রহণের অনুমোদন পাওয়ার মধ্য দিয়ে। কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটি ইতোমধ্যেই বন্দর কর্তৃপক্ষকে এই অনুমোদন দিয়েছে। সরকারী খাস জমির পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানার ৬৮ একর ভূমি পাওয়া গেলে সাগর পাড়ে বিরাট পরিসরে নির্মিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত বে-টার্মিনাল, যার ফলে বন্দরের উৎপাদনশীলতা এবং সক্ষমতা বেড়ে যাবে। অধিগ্রহণ কাজ শেষ করার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই টার্মিনালের ইয়ার্ড নির্মাণ কাজ শেষ করতে চায় কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বে-টার্মিনালকে বিবেচনা করা হচ্ছে আগামীর বন্দর হিসেবে। শুধু তাই নয়, গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই টার্মিনাল দিয়েই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি এমনকি প্রতিবেশী দেশকেও সেবা প্রদান করা যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কেননা, এ টার্মিনালের একসঙ্গে বার্থিং নিতে পারবে ৩০ থেকে ৩৫টি জাহাজ। অথচ বর্তমান বিদ্যমান সুবিধা বার্থিং নিতে পারে ১১টি জাহাজ। তাছাড়া অনেক বড় জাহাজ ভেড়ানো যাবে বে-টার্মিনালে। ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ট্রেডবডির দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এই টার্মিনাল নির্মাণের। তবে ভূমি নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বোঝাপড়া হওয়ায় সে সমস্যা কেটে গেছে। প্রায় ৯০৭ একর ভূমিতে তৈরি হবে টার্মিনাল।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (এডমিন এন্ড প্লানিং) জাফর আলম মঙ্গলবার জনকণ্ঠকে জানান, ভূমি অধিগ্রহণের অনুমোদন যেহেতু পাওয়া গেছে তাহলে কাজ শুরু এবং দৃশ্যমান হতে আর দেরি নেই। শীঘ্রই ডিজাইন প্রস্তুত করার জন্য কনসালটেন্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। ভূমি অধিগ্রহণের পর সেখানে ইয়ার্ড নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে যাবে। জেটি নির্মাণের কাজটি হবে একটু পরে। তবে ইয়ার্ড নির্মাণ হলেই সেই ইয়ার্ড ব্যবহারও শুরু করা যাবে। এতে করে বর্তমান বন্দরের ওপর চাপ কমবে।

বে-টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শেষ হলে বন্দরের কার্যক্রম আর জোয়ার ভাটা নির্ভর থাকবে না। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে জাহাজ ভেড়ানো এবং ছাড়ার জন্য জোয়ার এবং ভাটার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এছাড়া নাইট নেভিগেশনও (রাতে জাহাজ চলাচল) ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু বে-টার্মিনালে জোয়ার ভাটার ওপর নির্ভর না করে ২৪ ঘণ্টাই জাহাজ ভেড়ানো যাবে। এতে করে দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি-রফতানি এবং অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে যাবে বন্দরের সক্ষমতাও।

বে-টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নে এখন আর কোন অনিশ্চয়তা নেই বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সময়ের দাবি বিবেচনায় সকল পক্ষই একমত এবং সরকারও গুরুত্বপূর্ণ এ কাজটিকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে নিয়েছে। এ টার্মিনাল নির্মিত হলে সেখানে ১০ থেকে ১২ মিটার ড্রাফটের জাহাজও ভিড়তে পারবে। অথচ বর্তমানে ভিড়তে পারছে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৫০ মিলিমিটার ড্রাফটের জাহাজ। বে-টার্মিনালে ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্যরে জাহাজ অনায়াসে আসা যাওয়া করতে পারবে। ৫ হাজার টিইইউএস কন্টেনার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ হ্যান্ডলিং করা যাবে বে-টার্মিনালে। কিন্তু বর্তমান বিদ্যমান সুবিধায় সর্বোচ্চ ১৮শ’ টিইইউএস কন্টেনারের জাহাজ ভিড়তে পারে। টার্মিনালের সঙ্গে রেল এবং সড়ক সুবিধা যুক্ত হবে, যার ফলে সারাদেশে পণ্য পরিবহনে অনেক সুবিধা হবে। টার্মিনালটি একেবারে সাগর পাড়ে হওয়ায় পণ্যবাহী বন্দর কেন্দ্রিক যানবাহনগুলোর প্রভাব চট্টগ্রাম নগরীতে পড়বে না।

বন্দর বহির্নোঙ্গরে জাহাজের আধিক্য

এদিকে জাহাজের আধিক্যের কারণে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙ্গরে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে জাহাজের সংখ্যা। ফলে পণ্য আনলোডিংয়ে সময় লাগছে বেশি। শিপিং কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রোটেকশন এন্ড ইনডেমনিটি (পিএন্ডআই) ক্লাব এর পক্ষ থেকেও সতর্ক বার্তা জারি করা হয়েছে।

সংস্থাটি বলছে, চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙ্গর এলাকায় সর্বোচ্চ ১শ’ জাহাজ নিরাপদে নোঙ্গর করে থাকতে পারে। কিন্তু সেখানে মাঝে মধ্যে দেড় শতাধিক জাহাজও হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে একটি জাহাজ থেকে আরেকটি জাহাজের দূরত্ব যেটুকু থাকা প্রয়োজন সেটুকু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। প্রাকৃতিক বৈরী পরিবেশে কোন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। জেটিতে ভেড়ার জন্য অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যাও এখন আগের চেয়ে বেশি। একটি জাহাজের পণ্য হ্যান্ডলিং কাজে বেশি সময় লাগার কারণেই এ ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছে বিশেষায়ত সংস্থাগুলো।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (এডমিন এন্ড প্লানিং) জাফর আলম এ উদ্বেগ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা বিষয়টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছি না। কারণ চট্টগ্রাম বন্দর পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম। তাছাড়া যে পরিমাণ জাহাজ সাধারণ বহির্নোঙ্গরে অবস্থান করে তা খুব বেশি নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বন্দরের এ কর্মকর্তা বলেন, সাধারণত সারাবছর এ রকম থাকে না। হঠাৎ করে চাল এবং পাথর আমদানি বেড়েছে। জরুরী ভিত্তিতে আমদানি হওয়ায় এসব জাহাজ থেকে পণ্য খালাসকে অগ্রাধিকারও দিতে হচ্ছে। একটি জাহাজ থেকে চাল খালাসে ১৮ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। পাথর খালাসের ক্ষেত্রেও তাই। ফলে অন্য জাহাজগুলোকে কিছুটা বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এ সমস্যাকে সাময়িক অভিহিত করে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, যেহেতু চালসহ কিছু জরুরী পণ্যের আমদানি সারাবছরই এমন থাকে না সেহেতু সমস্যাও সারাবছর থাকার কথা নয়।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: