১৬ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

জেলে মাদক ও মোবাইল ফোন ব্যবহার ॥ সারাদেশে দুই শতাধিক কারারক্ষী গোয়েন্দা নজরদারিতে


মশিউর রহমান খান ॥ কারাগারের ভেতরে বন্দীদের মাদক সেবন ও মোবাইল ফোনে কথা বলার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে কারা অধিদফতর। কারাভ্যন্তরে কোন বন্দী কোনক্রমেই যেন মাদক গ্রহণ ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য সর্বোচ্চ কঠোর নীতি গ্রহণ করতে দেশের ৬৮ কারা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন। কারাভ্যন্তরে মাদক ও মোবাইল ফোনের ব্যবহারের বিরুদ্ধে সরকারের নীতির পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সারাদেশের ৬৮ কারাগারের প্রায় দুই শতাধিক কারারক্ষী, সহকারী প্রধান কারারক্ষী, হাবিলদার ও সুবেদারকে বিশেষ নজরদারিতে রেখেছে কারা কর্তৃপক্ষ। তালিকায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ ও কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারা কমপ্লেক্সের কমপক্ষে ৩০ কারারক্ষী ও কারা কর্মচারী রয়েছেন। এসব কারারক্ষী কারাভ্যন্তরে ও কারাগারের বাইরে ও কারাগারের অফিসে দায়িত্ব পালন করে থাকেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তাদের সব ধরনের কর্মকা- এমনকি কারাগারের নিজস্ব কোয়ার্টার ও কারা কর্মচারীদের থাকার বাসাও এসব নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। অভিযান পরিচালনার জন্য কোন কারারক্ষীকে বরখাস্ত করা হলে সারাদেশে তার শাস্তির কথা প্রচার করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারা অধিদফতর।

কারাগারে মাদক প্রবেশ বন্ধে কারাবন্দীর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে মাদক সেবনে সহায়তা করা, বাইরে থেকে মাদক সরবরাহ ও নগদ টাকায় মাদক বিক্রি, কারারক্ষী নিজে মাদক সেবন ও পরিবারের সদস্যদের (স্ত্রী ও সন্তান) মাদক বিক্রিতে জড়িত করা, মাদকাসক্ত বন্দীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও কারাগারের সংবেদনশীল সেল ও কক্ষসমূহে যাতায়াত করাসহ বেশকিছু কারণ চিহ্নিত করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। এছাড়া বিভিন্ন কৌশলে কারাভ্যন্তরে কারারক্ষীরা দায়িত্ব পালনের সময় নিজে মোবাইল ফোন বহন করে নিয়ে যাওয়া, বন্দীকে মোবাইল বহনে সহায়তা করা, কারাভ্যন্তরে অর্থের বিনিময়ে বন্দীকে মোবাইল ফোন ব্যবহারে সহায়তা করাসহ বিভিন্ন অপরাধ চিহ্নিত করা হয়েছে।

কারা সূত্র জানায়, কারা গোয়েন্দা শাখার সদস্য ও কারাগারে দীর্ঘদিন ধরে আটক কয়েদি-বন্দীদের মাধ্যমে এসব কারারক্ষী বন্দীদের মাদক সেবনে সহায়তা করে কি-না বা বন্দীকে মোবাইল ফোনে কথা বলতে কোন প্রকার সহায়তা করে কি-না তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দেশের প্রতিটি কারাগারে এসব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বা সহায়তা করেন এমন কারারক্ষী ও অন্যান্য কারা সদস্য নিয়ে একটি কালোতালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর বাইরেও নানা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত এমন সদস্যদের এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানা গেছে। প্রাথমিকভাবে কারাগারের মাদক সেবন ও বিক্রি, বন্দীকে মাদক সেবনে সহায়তা করা, কারাগারের ভেতরে মোবাইল ফোন নিয়ে ইতিপূর্বে প্রবেশকালে পরীক্ষার সময় ধরা পড়া, বন্দীর কক্ষ তল্লাশির সময় মাদক লুকাতে বা ফোনে কথা বলতে সহায়তাকারীদের এ তালিকায় রাখা হয়েছে। এসব কারা কর্মচারী কারাভ্যন্তরে ও কারাগারের বাইরে এমনকি কারা এলাকায় মাদক ব্যবসা ও মোবাইল ফোন সরবরাহ করার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বলেই কড়া নজরদারি করা হচ্ছে। তালিকায় থাকা কারারক্ষীদের দৈনন্দিন কার্যক্রম তথা ডিউটির বাইরের সময় কোথায় নিয়মিত যাতায়াত করে তাও নজরদারি করা হচ্ছে। কারা সূত্র জানায়, কিছু কারারক্ষী ডিউটি শেষে নেশাগ্রস্ত বন্দীদের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে বলে কারা গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। এসব কারারক্ষী বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক সংগ্রহ করে নিজের আবাসস্থল তথা বাসা ও ব্যারাকে এনে রাখছে। পরে সুযোগ বুঝে কারাগারের ভেতরে নানা কৌশলে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বন্দীদের কাছে সরবরাহ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কারাভ্যন্তরে নির্দিষ্ট কিছু সন্ত্রাসী ও কারাগারে দীর্ঘদিন যাবত আটক বন্দীরা এসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছে। কিছু কারারক্ষী নিয়মিত মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও একাধিক মামলার আসামি, আলোচিত মামলার আসামিদের মোবাইল ফোনে কথা বলতে সহায়তা করছে বলে জানা গেছে। তাই কারারক্ষীর পাশপাশি সংশ্লিষ্ট সব বন্দীর ওপরও নজরদারি করা হচ্ছে। কারা কর্তৃপক্ষ কারাগারের ভেতরে প্রতি মাসে সারাদেশের ৬৮ কারাগারে বিভিন্ন সময়ে তল্লাশি চালিয়ে আনুমানিক অর্ধশত মোবাইল উদ্ধার করে। কোন কোন কারাগারের ভেতরে বন্দীর অত্যাধুনিক মাল্টিমিডিয়া টাচ মোবাইল ফোন ব্যবহারেরও অভিযোগ রয়েছে। সর্বাধুনিক মোবাইল ফোন ব্যবহারের অভিযোগও শোনা যায়। তবে কারাভ্যন্তরে বন্দীকে মাদক সেবন ও ব্যবসার সঙ্গে কারারক্ষী ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে অসাধু বেশকিছু কারা কর্মকর্তা জড়িত থাকারও প্রমাণ পেয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। তাই প্রতিটি কারাগারের পক্ষ থেকে নিয়মিত এসব কারারক্ষীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সর্বশেষ তথ্য আপডেট করে কারা অধিদফতরে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে কারা অধিদফতর সূত্র জনকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছে।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার দেশের অতিগুরুত্বপূর্ণ কারাগার হিসেবে খ্যাত কাশিমপুর কারা এলাকায় অবস্থিত চারটি কারাগারের মধ্যে মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার ছাড়া বাকি তিন কারাগারের মোট পাঁচ কারারক্ষীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। মাদক সেবন, মাদক বিক্রিতে সহায়তা, কারা স্টাফ কোয়ার্টারে নিজের বাসায় ও ব্যারাকে মাদক রাখা, মাদক সরবরাহের সরঞ্জামাদি উদ্ধারসহ নানা অভিযোগে এসব কারারক্ষীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে কারারক্ষী মুস্তাকিনের (নম্বর-১৩১০৪) বাসা থেকে ১০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়। মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত থাকায় তাকে বরখাস্ত করা হয়। মাদক সেবনের অভিযোগে হাইসিকিউরিটি কারাগারের কারারক্ষী রকিবুল (ব্যাচ নং ১২৪৬৯), কারারক্ষী আল-মামুন (১৩৭২৩) এবং কারারক্ষী মজনু মিয়াকে (১১৯১৬) সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার পার্ট-২-এ কয়েদি শহিদুল ইসলামের কাছ থেকে ১০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে কারারক্ষী আজিজার রহমান (নম্বর-১৩৮২৯) ইয়াবা ট্যাবলেটগুলো দিয়েছে বলে জানায়। একপর্যায়ে কারা কমপ্লেক্সের ভেতর কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীনের নির্দেশে কারা কর্তৃপক্ষ বিশেষ অভিযান চালিয়ে আজিজার রহমানের বাসা থেকে ৬শ’ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে। পরে ইয়াবা ট্যাবলেট ও আজিজারকে জয়দেবপুর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কারাগারের ভেতরে মাদক ব্যবসার অভিযোগে কারারক্ষী আজিজারকে বরখাস্ত করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন জনকণ্ঠকে বলেন, কারাগারের ভেতরে বন্দীদের মাদক সেবন ও মোবাইল ফোনে কথা বলার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। কারাভ্যন্তরে কোন বন্দী কোনক্রমেই যেন মাদক গ্রহণ ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না পারে তার জন্য সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তির নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এসব অসাধু কর্মকা-ে জড়িত রয়েছে এমন সন্দেহে সারাদেশের প্রায় দুই শতাধিক কারারক্ষী ও কারা কর্মচারীকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। তাদের কর্মকা- কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তালিকায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ ও কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারা কমপ্লেক্সের কমপক্ষে ৩০ কারারক্ষী রয়েছে। মাদক গ্রহণ, সেবন ও বন্দীকে সরবরাহের অপরাধে সম্প্রতি কাশিমপুর কারা কমপ্লেক্সের তিন কারাগারের পাঁচ কারারক্ষীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আমরা বন্দীর মাদক সেবন ও মোবাইল ফোন ব্যবহারে সহায়তাকারী বেশকিছু অসাধু কারারক্ষীসহ কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের প্রমাণ পেয়েছি। প্রমাণ পেলেই আমরা সঙ্গে সঙ্গেই সাময়িক বরখাস্ত, ফৌজদারি অপরাধে মামলা দায়ের করা, বিভাগীয় মামলা দায়ের, স্থায়ী বরখাস্ত করাসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি প্রদান করে থাকি, যা চলমান থাকবে। এবার কারাভ্যন্তরে মাদক প্রবেশ ও মোবাইল ফোন প্রতিরোধে আমরা লাগেজ স্ক্যানার বসানো, বন্দী ও স্টাফকে মেটাল ডিটেক্টরের পরীক্ষা করাসহ নানা নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। এর পরেও বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে কারাভ্যন্তরে তল্লাশি চালিয়ে মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। এসব ফোন ব্যবহারে সহায়তা করে বেশকিছু কারা কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাই চিরতরে তা বন্ধ করতে আমরা এ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছি। মাদক প্রবেশ রোধ ও অবৈধ মোবাইল ফোনের ব্যবহার বন্ধ করতে তিনি সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন।