২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

আরও মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক


রহিম শেখ ॥ মোবাইল এ্যাপস ব্যবহার করে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থপাচারের অভিযোগে আরও কয়েকটি মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতোমধ্যে দেশের শীর্ষ মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বিকাশের দুই হাজার ৮৮৭টি এজেন্ট হিসাবের লেনদেন স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে একাধিক হিসাব থাকায় প্রায় ৮০ হাজার এজেন্টের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নির্দেশনা লঙ্ঘন করায় বিকাশের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকিং সেক্টরের মাধ্যমে দেশে প্রবাসী আয় আসে ৫০ দশমিক ৭২ শতাংশ আর হুন্ডির মাধ্যমে আসে ১২ দশমিক ৩১ শতাংশ। এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১৪ দশমিক ৩১ শতাংশ, পোস্ট অফিসের মাধ্যমে দশমিক ২১ শতাংশ। হুন্ডিতে যেসব দেশ থেকে বেশি টাকা আসে এর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা, সিঙ্গাপুর, ওমান, গ্রীস ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কয়েকটি মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স প্রবাহ কমে গেছে। অস্বাভাবিক হারে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি বছরের শুরু থেকেই নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স আহরণকারী দেশগুলো বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কিভাবে রেমিটেন্স হুন্ডি হচ্ছে তা সরেজমিন তদন্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এর অংশ হিসেবে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত টিম পাঠায়। তদন্ত টিমের প্রতিবেদনে কয়েকটি মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হুন্ডির মাধ্যমে রেমিটেন্স পাঠানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার তথ্য উঠে আসে। তদন্ত টিমের এক সদস্য জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে দুটি মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে প্রবাসীদের কাছ থেকে রেমিটেন্স আহরণের চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরেজমিন তদন্ত টিম পাঠানোর পাশাপাশি সর্বাধিক রেমিটেন্স আসে বিশ্বের এমন আটটি দেশের বাংলাদেশের দূতাবাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চিঠি দেয়া হয়। চিঠিতে হুন্ডির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তালিকা করে সংশ্লিষ্ট দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করতে অনুরোধ করা হয়।

বেসরকারী একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, তার ব্যাংকের পাঁচ হাজার টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত রেমিটেন্স প্রবাহ কমে গেছে। তারা জানতে পেরেছেন, এসব ছোট রেমিটেন্স মোবাইল এ্যাপসের মাধ্যমে দেশে আসছে। এসব রেমিটেন্সের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে না। এভাবেই কমে যাচ্ছে রেমিটেন্স প্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুধু রেমিটেন্সই হুন্ডি হচ্ছে না, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অপহরণ, প্রতিবেশী দেশ থেকে আনা মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্যের বিপরীতে অর্থ পরিশোধ, জঙ্গী অর্থায়নসহ নানা অপকর্মের চিত্র পেয়েছেন তারা। এ কারণে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের এজেন্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন তারা। বিকাশের মতো আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের এজেন্টেদের বিরুদ্ধে শীঘ্রই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে দেশের শীর্ষ মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বিকাশের দুই হাজার ৮৮৭টি এজেন্ট হিসাবের লেনদেন স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে একাধিক হিসাব থাকায় প্রায় ৮০ হাজার এজেন্টের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেই হুন্ডি তৎপরতা বেশি। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশ থেকে রেমিটেন্স আসে মোট রেমিটেন্সের প্রায় ৬৫ শতাংশ। পাচারকারীরা এ আটটি দেশকে বেছে নিয়েছে। যেসব এলাকায় প্রবাসী বাংলাদেশীদের বসবাস ওই সব এলাকায় হুন্ডি তৎপরতা বেশি চালানো হয়। মোবাইল এ্যাপসের মাধ্যমে নিমিষেই দেশে অর্থ প্রেরণ করা হয়। এক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা সংশ্লিষ্ট দেশেই থেকে যায়, শুধু প্রবাসীদের দেশে থাকা সুবিধাভোগীরা স্থানীয় মুদ্রা পেয়ে যাচ্ছে। এভাবেই ব্যাপক হারে কমে যাচ্ছে রেমিটেন্স প্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, হুন্ডির মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি টাকা পাঠায় দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থান করা প্রবাসী বাংলাদেশীরা। দেশটি থেকে যে পরিমাণ প্রবাসী আয় আসে তার ২৩ দশমিক ৬৪ শতাংশই আসে হুন্ডির মাধ্যমে। এছাড়া ওমান থেকে আসা প্রবাসী আয়ের ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ, সৌদি আরবের ১৪ দশমিক ৫১, গ্রীস থেকে ১৫, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১৩ দশমিক ০৪, ব্রুনাই দারুসসালাম থেকে ১১ দশমিক ৩০ এবং ইতালি থেকে ১০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ আসে হুন্ডির মাধ্যমে। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে ১৪ দশমিক ৩১ শতাংশ প্রবাসী আয় দেশে আসে। এ অবস্থায় গত বছর মধ্যপ্রাচ্যের শহর দুবাই থেকে মোবাইল এ্যাপ ব্যবহার করে অবৈধ পথে বাংলাদেশে টাকা পাঠানোয় ২৫টি দোকানকে জরিমানা করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিভাগ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভংকর সাহা বলেন, সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে ব্যাংকিং চ্যানেল এখন অনেক সজাগ। এর পাশাপাশি আরও গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ওপর। এক্ষেত্রে যেসব আইন রয়েছে তার পরিপালন নিয়ে কাজ করছি আমরা। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। শতভাগ হয়ত কেউই পারে না, আমরাও পারিনি। তবে পরিপালনের জন্য সর্বোচ্চ কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, মোবাইলে আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যদি লেনদেনের সময় সিমকার্ডের মালিককে শনাক্ত করতে পারে তাহলে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে অর্থায়ন কমে যাবে। একই সঙ্গে সেবা প্রদানকারী এজেন্টকে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে অর্থায়নের আইন-কানুন সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। তাহলে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে অর্থায়ন রোধ করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে এ সংক্রান্ত বিধিমালা কঠোরভাবে মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: