১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৯ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

আবারও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব পিডিবির


রশিদ মামুন ॥ জ্বালানি তেলের মুনাফা ঠিক রাখতে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশে কমানো হয়নি। এমনকি বিদ্যুত উৎপাদনে আংশিক ছাড় দিলেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) লাভের কথা বিবেচনা করে ডিজেল বিক্রি এবং সরকারী বিদ্যুত কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। সঙ্গত কারণে বাড়তি দরের জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন করতে গিয়ে লোকসান গুনছে পিডিবি। নিজেদের লোকসান কমাতে পিডিবি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করার প্রস্তাব দিয়েছে। পিডিবির বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হলে গ্রাহকপর্যায়েও দাম বৃদ্ধি করতে হবে।

আজ সোমবার থেকে দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়া হিসেবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন গণশুনানি শুরু করবে। ইতোপূর্বে এ ধরনের উদ্যোগের শেষে সব সময় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। এবার পিডিবি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করেছে তাতে বলা হচ্ছে, পিডিবি পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৭২ পয়সা অর্থাৎ ১৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে আর গ্রাহকপর্যায়ে ৬ বিতরণ কোম্পানি সাড়ে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুত বিক্রি করে ৪ দশমিক ৮৭ টাকায়। পিডিবি দাবি করছে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ৫ দশমিক ৫৯ টাকা। এতে প্রতি ইউনিটে লোকসান হচ্ছে ৭২ পয়সা। পিডিবি এ ঘাটতির পুরোটাই সমন্বয়ের কথা বলছে।

বিপিসি এখন প্রতি লিটার ডিজেল বিদ্যুত কেন্দ্রের কাছে ৬৫ টাকা এবং ফার্নেস অয়েল ৪২ টাকায় বিক্রি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমায় জ্বালানি বিভাগ কয়েকবার দাম কমানোর কথা বলে। দুই দফায় অন্তত ১০ টাকা দাম কমানোর প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু অর্থ বিভাগ এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের সাড়া না পাওয়ায় দাম কমানো হয়নি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা কমালে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ অন্তত ৫ টাকা কমানো সম্ভব। সরকারের উচিত বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা। জ্বালানির দর নিয়ে আয়োজিত একটি সেমিনারে অধ্যাপক তামিমের বক্তব্যের পর বিদ্যুত, জ্বালানি এবং খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, বিদ্যুত কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহে সরকার পৃথক একটি ফর্মুলা তৈরি করছে। যদিও এখন পর্যন্ত সরকার তা প্রকাশ করেনি।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, বেসরকারী বিদ্যুত কেন্দ্র সরাসরি ফার্নেস অয়েল আমদানি করছে। এতে লিটারপ্রতি দাম পড়ছে মাত্র ২২ টাকা। কিন্তু একই ফার্নেস অয়েল বিপিসি সরকারী বিদ্যুত কেন্দ্রের কাছে ৪২ টাকায় বিক্রি করছে। এতে বেসরকারী বিদ্যুত কেন্দ্রের তুলনায় সরকারী বিদ্যুত কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় বেশি হচ্ছে। বিদু্যুতের উৎপাদন খরচে জ্বালানি ব্যয় ৬০ ভাগের উপরে হয়ে থাকে। ফলে জ্বালানির দর বিদ্যুত উৎপাদনে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

দেশে বেসরকারী বিদ্যুত উৎপাদনকারীদের সরকার সরাসরি ফার্নেস অয়েল আমদানি করার অনুমতি দিয়েছে। এক্ষেত্রে ফার্নেস অয়েল আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারী আমদানিকারকদের ৯ ভাগ হারে সার্ভিস চার্জ দেয়া হয়। এর কোন সুবিধাই সরকারী বিদ্যুত কেন্দ্র পায় না। সরকার নির্ধারিত দরেই বিপিসির কাছ থেকে তরল জ্বালানি সরবরাহ পেয়ে থাকে সরকারী কেন্দ্রগুলো। এতে সরকারী এবং বেসরকারী উৎপাদনকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। বিপিসি তাদের চিঠিতে বলছে, তাদের প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলে বিপিসিকে ভ্যাট হিসেবে ৫ দশমিক ২৪৭ টাকা এবং ডিউটি হিসেবে ৩ দশমিক ১৮০ টাকা প্রদান করতে হচ্ছে। প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলে সরকারী কোষাগারে জমা হচ্ছে ৮ দশমিক ৪২৭ টাকা। বেসরকারী আমদানিকারকদের এ টাকা ছাড় দেয়া হচ্ছে। এর বাইরেও ৯ ভাগ হারে সার্ভিস চার্জ দেয়া হলে ২ দশমিক ৮৬২ টাকার বাড়তি সুবিধা পায় উদ্যোক্তা আমদানিকারকরা। বিপিসি বলছে, বেসরকারী উৎপাদনকারীদের মতো একই সুবিধা পেলে তারা এখনই প্রতি লিটারে ১১ টাকার বেশি দাম কমাতে পারবে। যদিও বিপিসির এ উদ্যোগকে সরকার অনুমোদন করেনি। এক্ষেত্রে সরকারের কর কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিপিসি গত তিন অর্থবছরে দেশে জ্বালানি তেল বিক্রি থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। এছাড়া সরকার ট্যাক্স- ভ্যাট বাবদ আরও ২১ হাজার কোটি টাকা আয় করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করে। গত তিন বছর ধরে জ্বালানি তেলের দাম একই রকম থাকলেও সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা করে দাম কমায়নি। সারাবিশ্বে তেলের দামকে ভিত্তি ধরে অন্য জ্বালানির দাম নির্ধারণ করা হয়। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমলেও চলতি বছরের শুরুর দিকে দেশে গ্যাসের দর বৃদ্ধি করা হয়। এ বাড়তি দরও বিদ্যুত উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।

পিডিবি সূত্র জানায়, গত বছর যেখানে বিদ্যুত উৎপাদনে দৈনিক গ্যাসের সরবরাহ পাওয়া গেছে প্রায় এক হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, এবার সেখানে গড়ে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেসব গ্যাসচালিত বিদ্যুত কেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে তার সবগুলো দ্বৈত জ্বালানির হওয়ায় ডিজেলে চলছে। আর বাড়তি ডিজেলের দরের কারণে পিডিবির হিসাবের খাতায় লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে।

জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, তেলের দাম নিয়ে নৈরাজ্য চলছে। জ্বালানির দাম নির্ধারণের কথা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। কিন্তু তাদের পাশ কাটিয়ে দাম ঠিক করে জ্বালানি বিভাগ। আবার বিদ্যুতের দাম ঠিক করে বিইআরসি। জ্বালানি বিভাগের ঠিক করা তেলের দামে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম ঠিক করছে বিইআরসি। ফলে সমন্বয় হচ্ছে না। সামগ্রিক দিক বিবেচনায় দেখা গেছে, বেসরকারী উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বেশি দামে বিদ্যুত কেনা হচ্ছে। সরকারী কেন্দ্রের কাছ থেকে কম দামে বিদ্যুত কেনা হচ্ছে। নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বেশি সুবিধা দিতে সরকারের মধ্যে থাকা একটি অংশ এ কাজ করছে। এতে সরকারের জনপ্রিয়তা কমছে। অথচ তেলের দাম কমালে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে উল্টো কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

বড় প্রকল্পের ব্যর্থতায় সরকার আগামী গ্রীষ্মের বর্ধিত চাহিদা সামাল দিতে তিন হাজার মেগাওয়াট তেলচালিত বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করছে। ইতোমধ্যে এসব বিদ্যুত কেন্দ্রের কয়েকটিকে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। এখন মোট বিদ্যুত উৎপাদনের অর্ধেক তেলচালিত বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হচ্ছে। আগামী বছর তেলচালিত বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে আরও বেশি বিদ্যুত উৎপাদন হলে পিডিবির লোকসান আরও বাড়বে।

প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১০৬ দশমিক ৭৫ ভাগ বেড়েছে। এর বিপরীতে গ্রাহকপর্যায়ের বিদ্যুতের দাম গড়ে ইউনিটপ্রতি ৩ দশমিক ৭৬ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ৩৩ টাকা। শতকরা হারে এ বৃদ্ধির পরিমাণ ৬৯ দশমিক ২৫ ভাগ।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: