১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

জেএমবির সারোয়ার তামিম গ্রুপের আমির কে?


শংকর কুমার দে ॥ রাজধানীতে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’ বা ‘সারোয়ার-তামিম গ্রুপে’র ‘ব্রিগেড আদ্-দার-ই-কুতনি’র কমান্ডার ইমাম মেহেদী হাসান ওরফে আবু জিব্রিলকে গ্রেফতারের পর চার দিন রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পর এখন আবার নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, নব্য জেএমবি বা সারোয়ার-তামিম গ্রুপের আমির কে? জেএমবি প্রতিষ্ঠার পর থেকে আঠারো বছরে অন্তত এক ডজন আমিরের নাম পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে কেউ গ্রেফতার হয়েছে, কারও ফাঁসি হয়েছে, আবার কেউ পুলিশের জঙ্গী বিরোধী অভিযানে নিহত হয়েছে। এখন আবার মেহেদী হাসান গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীরা জানতে পারে যে, বর্তমানে নব্য জেএমবি বা সারোয়ার-তামিম গ্রুপে ‘ব্রিগেড আদ্-দার-ই-কুতনি’ সক্রিয় রয়েছে। আর এই ব্রিগেডের কমান্ডারের দায়িত্বে ছিল আটক ইমাম মেহেদী হাসান ওরফে আবু জিব্রিল। প্রশ্ন উঠেছে, এই জঙ্গী সংগঠনের আমির কে ?

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রী থেকে মেহেদীকে গ্রেফতার করে চার দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারীরা জানতে পারে, দেশের বাইরে জিহাদ করার ইচ্ছে থেকেই জঙ্গীবাদে আকৃষ্ট হয় ও একসময় সারোয়ার-তামিম গ্রুপের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়া সে অনলাইনভিত্তিক জঙ্গীবাদ কার্যক্রম পরিচালনাসহ আইটি এক্সপার্ট। মেহেদী ২০১৫ সাল থেকে জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের সঙ্গে। শীর্ষ জঙ্গী নেতা থেকে শুরু করে অনেক সদস্যের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। শুরুতে সে সদস্য ও অর্থ সংগ্রহ, জঙ্গীবাদে উদ্বুদ্ধকরণ এবং হিযরত পূর্ব-প্রস্তুতিমূলক পর্ব সম্পন্নের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অব্যাহত অভিযানে জঙ্গীরা কোণঠাসা হয়ে পড়লে, সে সারোয়ার-তামিম গ্রুপের রিজার্ভ হিসেবে থাকা ব্রিগেড আদ দার-ই-কুতনির কমান্ডারের দায়িত্ব নিয়ে কর্মী সংগ্রহে নিয়োজিত হয়। নব্য জেএমবি বা সারোয়ার-তামিম গ্রুপ দুটি অপারেশনাল ব্রিগেডের একটি হলো ‘বদর স্কোয়াড ব্রিগেড’ ও ‘ব্রিগেড আদ্-দার-ই-কুতনি’। হলি আর্টিজানসহ অন্যান্য হামলায় সক্রিয় ভূমিকা রাখে বদর স্কোয়াড ব্রিগেডের সদস্যরা। আর ব্রিগেড আদ্-দার-ই-কুতনি ব্যাকআপ বা রিজার্ভ ব্রিগেড হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। এই ব্রিগেড আদ্-দার-ই-কুতনি তথ্যপ্রযুক্তিতে শিক্ষিত। এ ব্রিগেড গোপনে সদস্য সংগ্রহে নিয়োজিত ছিল। সারাদেশে জঙ্গীবিরোধী অভিযানে মূল অপারেশনাল কাজে অংশগ্রহণকারী বদর স্কোয়াড ব্রিগেডের বেশিরভাগ সদস্য নিহত ও আটক হওয়ায় ব্রিগেডটি দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে ব্যাকআপ ব্রিগেড হিসেবে থাকা ব্রিগেড আদ্-দার-ই-কুতনি নতুন করে সদস্য সংগ্রহের মাধ্যমে দুর্বল হয়ে পড়া ব্রিগেডকে শক্তিশালী করতে কার্যক্রম শুরু করে। জিজ্ঞাসাবাদে মেহেদী জানায়, ব্রিগেড আদ্-দার-ই-কুতনির সদস্যদের যেকোন ধরনের নাশকতা পরিচালনার সামর্থ্য রয়েছে। তারা অপারেশনাল সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং যেকোন স্থানে নাশকতা চালাতে সক্ষম। এই ব্রিগেডের বাকি সদস্যদেরও চিহ্নিত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হলি আর্টিজানে ভয়াবহ হামলার পর আলোচনা উঠে আসা জঙ্গী সংগঠন নব্য জেএমবির আমির কে। তা নিয়ে রীতিমতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও বিতর্ক দেখা দেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে একবার বলা হয়েছে সোহেল মাহফুজ আমির। র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সারোয়ার জাহান ওরফে আব্দুর রহমান ওরফে আবু ইব্রাহিম আল হানিফ? পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট বলছে, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম চৌধুরী। গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে, নব্য জেএমবির আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শায়খ মাওলানা আবুল কাশেম। এই আধ্যাত্মিক গুরু এখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে।

তদন্ত সূত্র জানায়, ১৯৯৮ সালে শায়খ আবদুর রহমান জা’মাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) প্রতিষ্ঠা করেন। অনেক ঘটনার জন্ম দিয়ে ২০০৬ সালের ২ মার্চ সিলেটের সূর্যদিঘল বাড়ি থেকে তিনি আটক হন এবং ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ কুমিল্লা কারাগারে ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। এরপর নানা সময়ে জেএমবির নেতৃত্ব তছনছ করে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে পর্যায়ক্রমে মাওলানা সাইদুর রহমান ও সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াউল হকের নাম আসে জেএমবির আমির হিসেবে। সাইদুর রহমান আটক ও মেজর জিয়ার রহস্যজনক অন্তর্ধানের পর নব্য জেএমবি গঠিত হয়েছে বলে প্রচার রয়েছে। নব্য জেএমবির আমির হিসেবে আবদুর রহমান, আবুল কাশেম, সোহেল মাহফুজ, তামিম চৌধুরী, সারোয়ার জাহান, মাঈনুল হক মুসা ও সর্বশেষ আইয়ুব বাচ্চু ওরফে সাজিদের নাম প্রচার পেয়েছে। তবে কেবল আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে নব্য জেএমবির আমিরের যোগাযোগ থাকতে পারে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধারণা করছে। ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কাশিমপুর কারাগার থেকে ময়মনসিংহ আদালতে নেয়ার পথে গুলি ও বোমা হামলা চালিয়ে সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন, জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজান ও রাকিবুল হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদকে ছিনিয়ে নেয় জঙ্গীরা। পরদিন টাঙ্গাইলে হাফেজ মাহমুদ পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেলেও সোহেল মাহফুজ ও বোমরু মিজান পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। একসময়ের জেএমবির শূরাসদস্য সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন বর্তমানে আমিরের দায়িত্ব পালন করছে বলে মনে করেন কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা। গুলশান হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও গ্রেনেড দুটোই সোহেল মাহফুজ সরবরাহ করেছিল বলে তথ্য পান গোয়েন্দারা।

পুলিশ সদর দফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, একের পর এক শীর্ষ নেতা আটক ও নিহত হওয়ার ঘটনায় পুরনো জেএমবি বা নব্য জেএমবির নেতৃত্ব শূন্য বলেই তো খবর পাওয়া যাচ্ছে। এখন আবার মেহেদী হাসান ও জঙ্গী অর্থায়নের বিষয়ে অনেকেই গ্রেফতার হচ্ছে। এতে মনে হচ্ছে পর্দার অন্তরাল থেকে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জঙ্গী সংগঠনটির হাল ধরেছে। এই ঘটনার পর এখন নেতৃত্বে নতুন নতুন নাম আসায় এরপর নব্য জেএমবির আমিরের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। যদিও জেএমবি আমির হিসেবে যাদের নাম আলোচনা হচ্ছে তাদের অনেকের কর্মকা-ই তেমন আলোচিত নয়। হঠাৎ্ একেক নাম শুনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সংন্থার কাছেও গোলক ধাঁধা বলে মনে হচ্ছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, নব্য জেএমবি ও পুরনো জেএমবি নামে এখন দুটি গ্রুপ সক্রিয়। তবে এ দুটি গ্রুপের বর্তমান নেতৃত্বে যারা রয়েছেন তাদের কেউই বাংলাদেশে নেই। তারা দু’জনই ভারতে অবস্থান করছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। সেখান থেকেই তারা তাদের অনুসারীদের দিক নির্দেশনা দিয়ে আসছে। পুরনো জেএমবির নেতৃত্ব দিচ্ছে সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন। তামিম চৌধুরী নিহত হওয়ার পর নব্য জেএমবির নেতৃত্ব দিচ্ছে বা আমির হিসেবে নাম আসে আইয়ুব বাচ্চুর। এরপর হাতকাটা সোহেল মাহফুজের নাম আসে। তারা তো ধরা পড়েছে। তবে এখন নিহত সাইফুল ইসলাম ও তার সহযোগী যারা পালিয়ে গেছে তাদের যে পাঠিয়েছে সেই আমির কে? এই প্রশ্নটিও এখন তদন্তকারীদের সামনে এসেছে। জঙ্গীদের কয়েকটি শাখার নামও বিভিন্নভাবে আলোচনায় আসছে। কেউ কেউ আইএস ভাবাদর্শে শাখার নাম প্রচার করে আসছে। আসলে জঙ্গী সংগঠনের নাম বা আমির যেই হোক না কেন তাদের মূল লক্ষ্য একই।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তারই প্রশ্ন, একের পর এক জঙ্গী বিরোধী অভিযানে শীর্ষ জঙ্গীরা হয় নিহত, নয়ত গ্রেফতার বা পলাতক থাকার মধ্যেই গ্রেফতার হচ্ছে। জঙ্গী অর্থায়নে ধরা পড়ছে। আত্মঘাতী জঙ্গী তৎপরতা চলছে। এই ধরনের জঙ্গী তৎপরতা চলছে কিভাবে, কার নেতৃত্বে? তা হলে কি জঙ্গী সংগঠনগুলোর নেপথ্যে কোন শক্তি বা মহল কাজ করে যাচ্ছে? নতুবা একজন নিহত বা আটক হলেই আরেক জনকে আমির ঘোষণা করা হচ্ছে কিভাবে? আর কিছুদিন পর পরই আত্মঘাতী জঙ্গী নিহত বা গ্রেফতার হওয়ার ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে।