১৩ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

রোহিঙ্গা জাতিগত নিধনের নীলনক্সা বাস্তবায়নে আইএসআইর উস্কানি


শংকর কুমার দে ॥ দেশ-বিদেশে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গাদের মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বরোচিত হামলার মাধ্যমে পাশবিক নির্যাতন ও নিধনযজ্ঞের বিষয়টি নিয়ে যখন নিন্দা, ঘৃণা, ধিক্কারের ঝড় বইছে তখন তিনটি টেলিফোন কথোপকথনের ভয়েস রেকর্ড হস্তগত করেছে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা। রোহিঙ্গা জাতিগত নিধনের যে নীলনক্সা তৈরি করেছে তার বাস্তবায়ন ঘটাতে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) যে উস্কানি দিয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে টেলিফোনে কথোপকথনের ভয়েস রেকর্ডে। পাকিস্তানের মাটিতে মিয়ানমারের আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিও (আরসা) গঠন করে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। বাংলাদেশের ভেতরে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ঠেলে দিয়ে অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টির যে ছক কষা হয়েছে তাতে টেলিফোন ভয়েস রেকর্ডে তথ্য পাওয়া গেছে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার আশফাক টেলিফোনে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির(আরসা) সামরিক প্রধান হাফিজ তোহার সঙ্গে কথোপকথন করেছেন তার ভয়েস রেকর্ড সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা। টেলিফোনে কথোপকথনের ভয়েস রেকর্ডটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সত্যতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

ওই সূত্রের খবরে আরও জানা গেছে, জাতিসংঘের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল কোফি আনান কমিশনের রিপোর্ট দেয়ার পর পরই মিয়ানমারের জাতিগত নিধনের নীলনক্সা বাস্তবায়নের ঘটনার এই কথোপকথনের ঘটনা ঘটেছে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার আশফাক টেলিফোনে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সামরিক প্রধান হাফিজ তোহার সঙ্গে কথোপকথনের পর রোহিঙ্গা নিধনের জাতিগত সূচনা ঘটার ফলে প্রাণে বাঁচার জন্য সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমার থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নর-নারী ও শিশু বাংলাদেশে আগমনের ঘটনা ঘটতে থাকে। বাঁধভাঙ্গা স্রোতের মতো রোহিঙ্গাদের সীমান্ত পেরিয়ে আসার ঘটনা ঘটতে থাকে যা এখনও অব্যাহত। ঢাকার গোয়েন্দা সংস্থা মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ বিষয়ক টেলিফোন কথোপকথনের ভয়েস রেকর্ডসহ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকেও অবহিত করেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, জাতিসংঘের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল কোফি আনান কমিশন রিপোর্ট তৈরি করেছে গত মার্চ মাসে। তখন থেকেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই মিয়ানমারে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ছক তৈরি করে। কোফি আনান রিপোর্টটি গত মার্চ মাসে পেশ করলেও রিপোর্টটি পেশ করেন গত ২৪ আগস্টে। কোফি আনানের রিপোর্টটি পেশ করার পর পর আইএসআইয়ের নির্দেশে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পুলিশ ও সেনা ক্যাম্পে সশস্র হামলা চালানোর টেলিফোন কথোপকথনের ঘটনা ঘটে। এরপর গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা নিধন শুরু করে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা নিধন, ধর্ষণ, আগুন দেয়া শুরু করলে প্রতিদিনই হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশু সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার, বান্দরবান জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আশ্রয় নিতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের বাঁধভাঙ্গা স্রোতের মতো বাংলাদেশে প্রবেশের ঘটনাটি সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে অবহিত করা হয়। সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে ঘটনাটি আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবতার দিকটা বিবেচনায় নিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, খাদ্য, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, নিরাপত্তার জন্য সার্বিক ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে মানবাধিকার ও শান্তি স্থাপনের এক বিরল ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ভূয়সী প্রশংসা অজর্ন করেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পুলিশ ও সেনা ক্যাম্পে সশস্র হামলা করে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান নির্যাতনের ইস্যুটিকে সামনে আনার জন্য পাকিস্তান ও পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার আশফাকের সঙ্গে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির সামরিক প্রধান হাফিজ তোহারের দীর্ঘ তিনটি কল রেকর্ড হস্তগত করেছে ঢাকার গোয়েন্দারা। গত ২৩ আগস্ট ও ২৪ আগস্ট দীর্ঘ সময়ব্যাপী এসব ফোন কলে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ওপর হামলার বিষয়ে কথা বলার কথা প্রকাশ পায় টেলিফোন কল রেকর্ডে। তারপরই গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ও তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালানো হয়। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের নীলনক্সা অনুযায়ী মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে উস্কানি দিয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বরোচিত নির্যাতন চালানোর কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক ব্যাপক ও বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেয়া হয়।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, পাকিস্তানের জঙ্গী সংগঠন লস্কর-ই- তৈয়বা (এলইটি) ও আকা মুল মুজাহেদীনের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে আরসার সামরিক কমান্ডার হাফিজ তোহার। গত ২৩ আগস্ট রাতে আইএসআইয়ের কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার আশফাকের সঙ্গে ৩৪ মিনিটব্যাপী কথোপকথন হয় হাফিজ তোহার। ওই ফোন কলে হাফিজ তোহার জানান, তারা হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত। সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করা হয় এসব ফোন কলে। পরে বাংলাদেশী গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ভারতীয় গোয়েন্দাদের বিষয়টি জানায়। আইএসআই কর্মকর্তা আশফাক ফোনে হাফিজ তোহারকে বলেন, ‘কালা আদমি রিপোর্টে দিতেহি হামলা হো’। তোহার উত্তর দিয়েছিলেন, ‘জি জনাব’, ‘জো হুকুম। পার ২৪ রাত সে পেহলে নাহি হোগা’। ‘কালা আদমি’ (কালো মানুষ) বলতে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কোফি আনানকেই বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ পাকিস্তানের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) কর্মকর্তা আশফাক রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোফি আনানের রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার পরপরই হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, টেলিফোনের দ্বিতীয় কলটি এসেছিল ২৪ আগস্ট বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ১৩ মিনিটে। ২৮ মিনিটের ওই ফোন কলে হাফিজ তোহারকে আশফাক বলেন, ‘কালা আদমি (কোফি আনান) রিপোর্ট পাবলিক (প্রকাশ) করতে যাচ্ছে। হাফিজ তোহার বলেন, ‘আর কয়েক মিনিট বাকি’। আইএসআই কর্মকর্তা আশফাক যতদ্রুত সম্ভব হামলা চালানোর অনুরোধ করেন। হাফিজ তোহার বলেন, নির্দেশনা দেয়ার পর ‘রানারদের’ (বার্তাবাহক) সব আরসা (আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি) স্কোয়াডে পাঠানো হয়েছে। মধ্যরাতে হামলা চালানো হবে। আশফাক উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘দের কিউ কর রাহা হো ?’ (দেরি কেন করছো ?)। হাফিজ তোহার উত্তর দেন, ‘মেসেজ পৌঁছানোয় টাইম লাগতা হ্যায় স্যার।’ (বার্তা পাঠাতে সময় লাগে)। এরপর বিকেল ৬.০২ মিনিটে ইরাক থেকে তৃতীয় কলটি আসে। কল করা ব্যক্তি নিজেকে ‘আল আদমি অব দায়েশ’ (আইএসের কর্মীরা দায়েশ নামে পরিচিত) বলে তোহারকে পরিচয় দেয়। ১৪ মিনিটের ওই কলটিতে বলা হয়, আইএস জানে আরাকান রোহিঙ্গা স্যাালভেশন আর্মি (আরসা) বর্মার উপনিবেশবাদী, বৌদ্ধ ও হিন্দুদের বিরুদ্ধে ভালভাবেই জিহাদ করবে।

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার আশফাকের সঙ্গে মিয়ানমারের আরসা নেতা হাফিজ তোহারের সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনের পর আরসার শীর্ষ নেতা আতা উল্লাহর নেতৃত্বে মিয়ানমারে হামলা চলে। এই আতা উল্লাহ বেড়ে উঠেছে পাকিস্তানের করাচিতে। আতা উল্লাহ একটি মসজিদে কোরান পড়াতেন। আতা উল্লা করাচির একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতেন। এরপর পরিবারসহ সৌদি আরবের রিয়াদে পাড়ি জমান। সৌদি আরব থেকে কয়েক কোটি টাকা নিয়ে পাকিস্তান আসেন আতা উল্লাহ। তারপর সেখান থেকে তাকে পাঠানো হয় মিয়ানমারে। আর এসবের নেপথ্যে কাজ করেছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের ছক অনুযায়ী বাংলাদেশের ভেতরে রোহিঙ্গাদের ঠেলে দিয়ে সেখান থেকে আরসা সংগঠনের মাধ্যমে মিয়ানমারে সশ¯্র হামলা চালিয়ে বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আইএসআইয়ের নীলনক্সা ফাঁস হয়ে যায়। বাঁধভাঙ্গা ¯্রােতের মতো লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়ে মিয়ানমারে ফেরতদানের উদ্যোগ গ্রহণ করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের ভাষণে ও নিউইয়র্কে গণমাধ্যমে পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছেন, কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখ- ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। শান্তি ও মানবাতর প্রতীক হিসেবে সারা বিশ্বে উজ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাকিস্তান ’৭১সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে পরাজিত হয়ে যে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নীলনক্সার অংশ হিসেবে মিয়ানমারকে ব্যবহার করে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: